Monday, September 19th, 2016
বরিশাল নগরীর জয়যাত্রা
September 19th, 2016 at 10:15 pm
বরিশাল নগরীর জয়যাত্রা

প্রিমা সরকার, বরিশাল:  ৩ অক্টোবর। ক্যালেন্ডারের পাতায় বাকি তারিখগুলোর মতই খুব সাধারণ একটা তারিখ। ক্যালেন্ডারের পাতায় বেশ গোটা করেই লেখা তারিখটা গত ৩ বছরে যতবার দেখেছি, ঠিক ততবার মন উচ্ছসিত হয়ে উঠেছে। কোনো একটা বিশেষকারণে যদি কোনো একটা দিন বিশেষিত হয়, তাহলে পরের বছরগুলোতে মানুষ তার অ্যানিভার্সেরি বা বার্ষিকী অনুষ্ঠান পালন করে। ৩ অক্টোবর আমি ও আরও ৩৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য তেমন বিশেষ একটা দিন। গত ৩ বছর ধরে আমার ক্যালেন্ডারের অক্টোবর মাসের ৩ তরিখের ঘরটাতে সবুজ রঙের মার্কার দিয়ে দাগ কেটে রাখা। কারণ? আমাদের কাছে এটা একটা ‘সবুজ তারিখ’।

সালটা ২০১২। লিপ ইয়ার। চার বছর পরপর একটা দিন বেশি পাবার মাহাত্ম্যতার থেকেও সেবার সেই ‘সবুজ তারিখ’-এর দিনটা বেশি মাহাত্ম্যপূর্ণ ছিল আমাদের কাছে। তখন বেশ ছোটই ছিলাম। ৭ম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী আর কতটাইবা বুঝবে, আর কতটাই বা পারবে। এটাই সবাই মনে করে। আমার মত আরো ৩৯ জন স্কুল কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীও হয়ত অনেক বড় কোনো দায়িত্ব পায় নি কখনো, ফলে আমরাও মনে মনে তাই হয়ত বিশ্বাস করতাম। কিন্তু সেই বিশেষদিনটির আগের দিন অর্থাৎ, ২ তারিখ এমন কিছু ভিন্ন চিন্তাধারার মানুষের সাথে পরিচয় হলো, যারা আমাদের নিজেদের মনের দৃঢ় বিশ্বাস বহু গুণে বাড়িয়ে দিলেন।

সেদিন দুপুরের দিকে স্কুলে বসে ডাক এল, কর্ম-পরিকল্পনা তৈরির সেইপ্রোগ্রমটার জন্য একটা মিটিং আছে, যাদের যাওয়ার কথা ছিল, তারা ঝটপট এক ম্যাডাম আর স্যার এর সাথে চলে গেলাম। পৌঁছলাম গন্তব্যস্থলে, আরো ৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র-ছাত্রী এল। তখনো বুঝে উঠতে পারলাম না আমরা পরেরদিন ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে যাচ্ছি। সেই প্রোগ্রামের কর্ম-পরিকল্পনা তৈরি ব্যবস্থাপকগন বিষয়টা ব্যাখ্যা করলেন। প্রকৃতিকে নিজেদের আত্মোপলব্দির অংশীদার করতে হবে, ভাবতে হবে, তার প্রকৃত রূপ আর সুখটা কিভাবেফিরিয়ে আনা যায়, সেই দায়িত্ব আমাদের। আরো বললেন আমাদের সাগরদী খাল ও তার আশেপাশের এলাকার জন্য একটি পরিকল্পনা করতে হবে। মিটিং-এ আমাদের সাথে সাগরদী খালের কিছু বাসিন্দাও ছিলেন জীবন ও জীবিকা বিশেষজ্ঞ হিসেবে। তারা আমাদের উপলব্ধির মাত্রাটা বাড়িয়ে দিলেন। যা হোক, খুব উত্তেজনা আর উৎসাহ নিয়ে মিটিং শেষে বের হলাম। কারণ আমরা তো আসলে সবসময় একটা প্রেসার কুকারের মধ্যে থাকি, তাই কোনোরকম চাপমুক্ততারসন্ধান মিললে সেসব থেকে ত্রাণ মেলে।

সারারাত উত্তেজনায় ঘুমাতে পারিনি। সাগরদী খাল থেকে কীতর্নখোলা সংলগ্ন এলাকার একটা মাস্টারপ্ল্যান এর মতো বিশালকায় একটা দায়িত্ব পালন করতে হবে আগামিকাল। বারবার মনে হচ্ছিল, আমরা কি পারব? রাতটা যেনতেন ভাবে কাটিয়ে খুব সকালে আমরা স্টার্টিং পয়েন্ট, মল্লিকবাড়ি পৌঁছলাম, সবাই প্রস্তুত। সব থেকে চিত্তাকর্ষক ব্যাপার ছিল নৌকাভ্রমণ আর তার জন্য লাইফ জ্যাকেট পড়া। ঐ প্রথম লাইফ জ্যাকেটের অভিজ্ঞতা। নৌকাভ্রমণের সময় সবাই চোখ কান খোলা রেখে সবকিছু খেয়াল করতে শুরু করলাম। সারা বছর খালটা প্রায় শুকনোই থাকে, বর্ষায় পানিপূর্ণ হয়। মা-এর স্কুল সেই পথে হওয়ার সুবাদে খালটা আমার পরিচিত। সত্যি কথা বলতে, যখন খালের পাশের রাস্তাধরে যেতাম, তখনকখনো চিন্তাও করিনি যে এই খালে আমি কখনও নৌকাভ্রমণও করব।

খাল পর্বেক্ষণের সময় অবাক করা কিছু বিষয় লক্ষ্য করলাম। খালের ডান দিক দেখে মনে হয় শহর, বামদিকটা গ্রাম। খালের দুইদিকের চিত্র যেহেতু দুই রকম, স্বভাবতই দুইদিকের মানুষজনের জীবনযাত্রাও ভিন্নই হবে। ‘শহর’ পাড়ের লোকজন খালটাকে ডাস্টবিন ভেবে একদিকে ময়লা ফেলছে, আর সেই একই খালের বামদিকের, অর্থাৎ, ‘গ্রাম’ পাড়ের মানুষ সেই পানিকেই ব্যবহার করছেন গোসলকরা, বাসন ধোয়ার মত কাজে আর আক্রান্ত হচ্ছে চর্মরোগসহ নানা ব্যাধিতে। সবথেকে জঘন্য একটা ব্যাপার ছিল, দেখছি, বাড়ির ল্যাট্রিনগুলোর সংযোগ ছিল খালে, আর তার পাশেই দেখছি একজন সেই পানি দিয়ে বাসন ধুচ্ছেন,আরেকজন গোসল করছেন। একজন নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে বসে যে কেন তারা এই পানি ব্যবহার করছে, তখন উত্তর আসে, ‘তাইলে আপনারাই ভাল পানির ব্যবস্থা কইরা দেন।’ খুব খারাপ লাগলো বিষয়টা। নোট করে রাখলাম।

তারপরে এমন বেশ কিছু সাঁকোর নিচ থেকে যাচ্ছিলাম, যেখান থেকে মাথা নিচু করে যেতে হয়েছে। নোট করলাম সাথে সাথে যে এগুলো সঠিক পরিমাপ দিয়ে পুনর্নির্মাণ করতে হবে। সাগরদী ব্রিজের কাছাকাছি আসতে দেখলাম পাশের সাগরদী বাজারের এক কসাই দরজা দিয়ে পশু-পাখির আবর্জনা ফেলছে। সামনে এগোচ্ছি, বদ্ধভূমি ব্রিজের ইতিহাসসহ পুরো খালের আগের কথা শুনলাম, আমাদের সাথের জীবন ও জীবিকা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে, কতস্মৃতি তাদের এই খাল, এই এলাকাকে ঘিরে। তখন প্রকৃতির সৌন্দর্যেরও দেখা মিলল। আগের গুমোটভাবটা নেই এখানে। খাল কীর্তনখোলায় মিলিত হল, আমরা তখন কল্পনা করছিলাম, এই কীর্তনখোলায় এই যে একটা জাহাজ ঢুকল, ঐ যে তার একটু দূরে আরো একটা! কল্পনা করতে করতে ডাঙায় এলাম, ৩০ গোডাউন বদ্ধভূমিতে।

জাতীয় সঙ্গীত, নাস্তার শেষে কাজে নেমে পড়লাম। চারটা দলে ভাগ করে দেয়া হল, চারজন লিডারের সাথে। ম্যাপ ছিল কয়েক ধরনের, পুরো সাগরদীকে দেখতে পাচ্ছিলাম। নোট করা পয়েন্টগুলো সবাই শেয়ার করলাম, কোথায় কোন সমস্যা, কেনো হচ্ছে, কি কি করতে হবে, কোথায় করতে হবে, কিভাবে করতে হবে এবং কারা সেগুলো করবে, সবকিছু বিস্তারিত ভাবে লিখে ফেললাম দলের একেক জন। সবার আইডিয়াগুলো আলোচনা করে লিখে নিলাম। ম্যাপে এঁকেও দিলাম কোথায় কাজ করতে হবে। সেতু, নতুন ড্রেনেজ সিস্টেম, স্যানিটেশন সিস্টেম, খালের নাব্যতা বৃদ্ধি, ডাস্টবিন, গাছ লাগানো, আবর্জনা রিসাইক্লিং সেন্টার নির্মাণ এগুলো ছিল আমাদের মাস্টারপ্ল্যানের একাংশ।

সবশেষে হয়ত প্রশ্ন আসতে পরে যে কি লাভ হল এত কষ্ট করে? হ্যাঁ, অনেক লাভ হয়েছে। ‘ধান নদী খাল’-খ্যাত আমাদের এই বরিশালের খালগুলোর পরিণতি স্বচক্ষে অবলোকন করতে পারলাম, উপলব্ধির দীপটা প্রোজ্জ্বলিত করতে পারলাম। আর মনে ধারণ করতে পারলাম, ‘আমরাও পারি’ না, আমরাই পারি। আরও উপলব্ধি করতে পারলাম, শহর এবং দেশের পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়নের যোগ্যতা, অধিকার ও দায়িত্ব সবই জনগণের। জনগণ যদি জাগ্রত থাকে, সেখানকার উন্নয়ন অবশ্যম্ভাবী। তাই অবশ্যই জনগণকে তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। শুকনো খঁড়গাদার মধ্যে যদি কেউ একটা দিয়াশলাই জ্বালিয়ে ছেড়ে দেয় তাহলে তা পূর্ণ উদ্যমে চলতে থাকবে। ভিঁজে বা, অনুপযোগী খঁড়গাদায় যতই জ্বলন্ত দিয়াশলাই ছোঁড়া হোক, তাতে যেমন ব্যর্থ হতে হয়, তেমমনি উদ্যোগের প্রতিকূল চিন্তাধারার মানুষজন থাকলে শত উদ্যোগেও কোন মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। ইচ্ছে ছিল, আমাদের করা মাস্টার প্ল্যানটা বাস্তবে রূপ নিতে যেন দেখতে পারি। সেই পদক্ষেপ অগ্রসর হতে দেখছি।

এইতো কিছুদিন আগে জেলা প্রশাসক খাল বাঁচানোর উদ্যোগ নেন। আর তার সেই ডাকে স্বতস্ফূর্তার সাথে সাড়া দেন সমগ্র জনসমাজ। আমাদের দেখা সেই খালের সাথে যেসব অবৈধ স্থাপনা ছিল, সেগুলো সহ সব খালপাড়ের অবৈধ দালান, দোকান, ভবন উচ্ছেদের কাজ শুরু হয়। পাশাপাশি খালগুলো পরিষ্কার করার উদ্যোগও শুরু হয়। পরিবেশ রক্ষার্থে একরকম আদা জল খেয়ে নামেন খালপাড়ের মানুষজনসহ সমগ্র বরিশালবাসী যার একটা অংশ ছিল বরিশালের শিক্ষার্থীসহ তরুণ সমাজ। এই পদক্ষেপে সামিল হতে একটুও উৎসাহের কমতি ছিল না কারো। এর উন্মেষটা আসলে সেই ২০১২ এর সেই সবুজ তারিখটাতেই। আমরা, বরিশালের মানুষরা এমন উদ্যোগে সামিল হওয়ার জন্য আসলে আগে থেকেই প্রস্তুত হচ্ছিলাম, সেই ২০১২ থেকেই। কোনো পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত এমন ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন মানুষের জন্য শুধু চাই একটুখানি পথপ্রদর্শনা, নেতৃত্বের। তাহলেই তাদের মধ্যকার তেজদিপ্ত আভার বিস্ফোরণ ঘটবে এবং তার প্রতিফলন পড়বে সকল আঁধারের ওপর। জানি, একদিন প্রাচ্যের ভেনিস-খ্যাত বরিশাল ফিরে পাবে তার ঐতিহ্য, তার হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য। আমরা স্বপ্ন যেমনটা দেখতে জানি, সেই স্বপ্নকেবাস্তবরূপ দিতেও জানি। আমরা পারবই।

সম্পাদনা: তুসা


সর্বশেষ

আরও খবর

রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!

রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!


গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা

গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা


ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!

ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!


সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত  বন্ধুত্ব

সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত বন্ধুত্ব


প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ

প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ


ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান

ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান


কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ

কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ


করোনাকালের খোলা চিঠি

করোনাকালের খোলা চিঠি


সিগেরেট স্মৃতি!

সিগেরেট স্মৃতি!


পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট

পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট