Friday, July 1st, 2022
বাংলাদেশে সাঁওতাল নিধন: মাতৃভূমে আদিবাসীর পরবাস
November 19th, 2016 at 8:58 am
বাংলাদেশে সাঁওতাল নিধন: মাতৃভূমে আদিবাসীর পরবাস

তুহিন দাস: ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেয়া প্রথম জনগোষ্ঠী হল সাঁওতাল জনগোষ্ঠী। ১৭৭০ থেকে ১৭৮৪ সালের ভারতবর্ষের কথা। তখন ভাগলপুর-ঝাড়খন্ডে বসবাসরত সাঁওতালদের ওপর চলছে ব্রিটিশদের নির্যাতন, একদিকে অনাবৃষ্টি অন্যদিকে চাষের জমি কেড়ে নেয়া হতে থাকল। তখন যে সংগ্রামী মানুষটির নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে বসলেন সাঁওতালরা তার নাম তিলকা মাঝি। পরে ব্রিটিশ সৈন্যরা অন্যান্যদের সহ তাকে গ্রেফতার করে ফাঁসিতে ঝুলায়। আজ সে স্থানে আছে তার নামে তিলকা মাঝি বিশ্ববিদ্যালয়। সেসব সংগ্রামী মানুষদের উত্তরসূরীরা গত ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের সাঁততালদের নিয়ে কথা বলার আগে একটা সাঁওতাল গান দিয়ে শুরু করি। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ওপরে বাংলাদেশের চরমতম রাষ্ট্রীয় নির্যাতন সংঘটিত পরে এখন গানটি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে–

আমায় সানতাল করেছে ভগবান গো
আমায় মানুষ করেনি ভগবান
আমি যদি মাস্টার হতাম
কত ছেলহা পড়াইতাম
কেউ একটু খানি ভুল করলে
মুলহে দিতাম কান গো
আমায় সানতাল করেছে ভগবান গো
আমি যদি ডাক্তার হতাম
কত লোককে ফুড় হে দিতাম
পচিস টাকা ভিজিট নিতাম
বারত কত মান গো
আমি যদি বাবু হতাম
মোটর গাড়ি চড়হে যেতাম
কেউ হাত পাতলে দুটু টাকা
করে দিতাম দান গো
আমায় সানতাল করেছে ভগবান গো
আমায় মানুষ করেনি ভগবান।

ছোটবেলায় যখন এ গানটি শুনতাম অবাক হতাম। ভাবতাম এ আবার কেমন গান? তখন অতকিছু বুঝতাম না। এখন বুঝি দু’পায়ে হেঁটে চলা সকল জীব আসলে মানুষ না। মানুষ হতে হলে মানবিক গুণাবলী থাকতে হয়। আর সাঁওতালরা কোন ধরনের নাগরিক সুবিধা পায়নি কখনো, সে কারণে এমন গানের অবতারণা।

বাংলাদেশে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী যেমন নির্যাতনের শিকার হয়েছে তেমনি সাঁওতালরাও কম নির্যাতিত হয়নি, তারা এক অর্থে পরিত্যক্ত হয়েছে রাষ্ট্র দ্বারা, তারা পড়ে থেকেছে অন্ধকারে। গত ৬ নভেম্বরে তাদের ওপর এ নির্যাতনের মূল লক্ষ্য হল তাদের অধিকৃত বাপদাদার স্মৃতিবিজড়িত জমি দখল, বহু বছর ধরে বাস করে আসছে।

 3

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাতের ‘পলিটক্যিাল ইকোনমি অব আনপিপলিং অব ইন্ডিজিনাস পিপলস: দ্য কেইস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে তথ্যপ্রমাণ সহ উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশে ১৯৪৭ সাল থেকে ২০১৪ এই ৬৭ বছরে সাঁওতালদের ১,১৬,৪০০ একর জমি দখল করা হয়েছে, ২০১৪ সালে যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫,১৯০ কোটি টাকা। প্রতিবারই এই উচ্ছেদের নেতৃত্বে ছিলেন সরকারি ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা, নেপথ্যে ছিলেন রাজনৈতিক নেতারা। তাদের ‍ উচ্ছেদ করা হয়েছে শত্রু সম্পত্তি আইন প্রয়োগ করে, ভুয়া দলিল দেখিয়ে, গুজব ছড়িয়ে, হত্যার হুমকি দিয়ে, সরকারি বনায়ন ও খাস সম্পত্তি রক্ষার নামে, ন্যাশনাল পার্ক বা জাতীয় উদ্যানের নামে, সামাজিক বনায়ন, ট্যুরিস্ট সেন্টার ও ইকো পার্ক তৈরির নামে। কাগজে কলমে থাকলেও কখনো সবার জন্য এক নীতি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে পালিত হয়নি। অন্যসব নাগরিকের মতো তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়নি। অথচ সাঁওতালদের প্রধান পেশা ছিল পশুপালন ও কৃষি। বনজঙ্গল পরিষ্কার করে এ দেশের অধিকাংশ জমি চাষ উপযোগী করেছে তারা। এভাবে করে বর্তমানে বাংলাদেশে বসবাসরত সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ৭৫ শতাংশ বর্তমানে ভূমিহীন এবং ৫১.৩ শতাংশ গৃহহীন। ১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে সাঁওতালদের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ, ১৯৯১ সালের শুমারিতে ছিল ২,০২,১৬২ জন, ২০১১ সালের শুমারিতে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১,৪৩,৪২৫-এ। অন্য উল্লেখযোগ্য বৈষম্যগুলো হলো: সরকারি সেবা পেতে সাধারণ মানুষের চেয়ে আদিবাসীদের অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হয়, সাহেবগঞ্জ গ্রামের ৪০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ পেলেও একই গ্রামে বসবাসকারী সাঁওতাল আদিবাসীদের বিদ্যুত সংযোগ দেয়া হয়নি। সরকার নারীর ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নিলেও আদিবাসী নারীদের জীবনযাত্রার মানের কোন উন্নয়ন হয়নি। মাত্র ১০ শতাংশ সাঁওতাল লিখতে ও পড়তে পারেন।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রংপুর চিনিকলের আওতাধীন সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারে সাঁওতাল পল্লীর জমির মালিক দাবীকারী রংপুর চিনিকল একটি সরকারী প্রতিষ্ঠান। তারা পুলিশ ও তথাকথিত চিনিকল শ্রমিক নামের সন্ত্রাসীদের নিয়ে আখ কাটার নামে পুলিশ নিয়ে গিয়ে সাঁওতালদের জমি দখল করতে গিয়ে যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হলে তীরধনুক নিয়ে প্রতিবাদকারী সাঁওতালদের পুলিশ গুলি করে, নিহত হয় ৩ সাঁওতাল। তাদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়, লুটপাট করা হয়। নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাংসদ ও স্থানীয় নেতাকর্মীবৃন্দ। অথচ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের ভোট পেয়েছিল ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার পাশাপাশি তাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার কথা বলে।

জানা গেছে, চিনিকলের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ মেটাতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাংসদ আবুল কালাম আজাদ ও ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আলম ‍বুলবুল সহযোগিতায় তারা চার বছর আগে আন্দোলন শুরু করেন। কিন্তু সাংসদ ও চেয়ারম্যান মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সহিংস ঘটনায় ইন্ধন জুগিয়েছেন, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছেন। ঘটনার সময়ও তারা উপস্থিত ছিলেন। হামলায় প্রত্যক্ষ নাম উঠে এসেছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিল আলম বুলবুলের নাম, যিনি সাংসদ আজাদের স্নেহধন্য। তার নেতৃত্বে সন্ত্রাসী-পুলিশ সাঁওতাল পল্লীতে সেদিন ৬শ’ ঘর ও স্কুলে অগ্নিসংযোগ করে। অথচ ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে জয় পেয়েছিলেন। সেসময় স্থানীয় সাংসদ তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তার সহায়তায় আদিবাসীদের বসতি স্থাপনের কথা বলে ওই জমিতে ঘর তুলতে সহায়তা করেছিলেন। ফলে প্রায় সব আদিবাসীই তাকে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু এই জমিতে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত থাকায় অনুগত লোকজন নিয়ে বুলবুল এ উচ্ছেদের নেতৃত্ব দেন।

1

সাঁওতাল নেতাদের অভিযোগ, তাদের বাপ-দাদার ১ হাজার ৮৪২.৩০ একর সম্পত্তি ফিরে পাবার জন্য বরাবরই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম করে এসেছে। কিন্তু প্রশাসন কখনই তাদের এ দাবি আমলে নেয়নি। বরং গায়ের জোরে বারবার আদিবাসীদের উচ্ছেদের চেষ্টা করে যাচ্ছে। ১৯৫৬ গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জ চিনি কলের জন্য প্রায় দুই হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে তৎকালীন সরকার। সেখানে তখন ২০টি গ্রামের মধ্যে ১৫টিতে সাঁওতালদের বসবাস ছিল। বাকি পাঁচটি গ্রামে বাঙালিদের বসবাস ছিল। কিন্তু ২০০৪ সালে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে গেলে সাঁওতালরা সে জমিতে আবারো ফেরত আসার চেষ্টা করে। জমি অধিগ্রহণের চুক্তিতে কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, অধিগ্রহণ করা জমিতে আখ চাষ ছাড়া অন্য কিছু করা যাবে না। যদি এখানে আখ চাষ ছাড়া অন্যকিছু করা হয় তাহলে সে জমি পূর্বের অবস্থায় ফেরত নেবার শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০৪ সালে চিনিকল বন্ধ হয়ে যাবার পর সেখানকার জমি অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে শর্তানুযায়ী সেই জমির মালিক এখন সাঁওতালরাই। সে যুক্তির ভিত্তিতেই সাঁওতালরা তাদের পূর্ব-পুরুষের জমিতে ফিরে আসার চেষ্টা করে।

শুধুমাত্র ৩জন সাঁওতাল যে নিহত হয়েছে তা নয়, মারাত্মক আহত অনেকে, যেমন তাদের একজন দ্বিজেন টুডু। তার চোখে পুলিশের ছোঁড়া ছররা বুলেট ঢুকেছে। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে তার চিকিৎসক জানিয়েছেন ‘দ্বিজেন টুডু আর কখনও বাম চোখে দেখতে পাবেন না।’ তার চোখের ভেতরে রয়ে গেছে বুলেট। দ্বিজেন বলেছেন, “বাম চোখ দিয়ে কিছুই দেখি না। শরীরেও রক্ত নেই। হাঁটতে গেলে পড়ে যাই। বাড়িঘর ছাই করে দিয়েছে, আমাদের এখন আর কিছু নাই। ক্যামনে বাঁচবো আমি। শরীরের ভেতরে জ্বালা-পোড়া করে। কপালে গুলি, মাথায় গুলি। শরীরের ভেতরে জ্বালা-পোড়া করে, মাথার যন্ত্রণায় জ্বর আসে, কিন্তু এখানে কোনও চিকিৎসা পাচ্ছি না।” তার ছোট বোন মার্থা টুডু বলেন, “সারা শরীরে গুলি নিয়ে সেই কবে থেকে আমরা এখানে আছি। অথচ কোনও চিকিৎসা শুরু হয়নি। সিটিস্ক্যান, এমআরআই, রক্ত পরীক্ষাসহ সব পরীক্ষা করিয়েছি হাসপাতালের বাইরে থেকে। সরকারি হাসপাতাল, অথচ আমাদের মতো মানুষের জন্য এখানে কিছুই নাই। ডাক্তাররা আমাদের সঙ্গে স্পষ্ট করে কিছু বলে নাই। অপারেশন কবে হবে, নাকি হবেই না, সেসব কিছুই জানি না। ভাইয়ের শরীরের ভেতরে থাকা গুলিতো বের করতে হবে।” এমনিতে সে নড়তে পারে না, উল্টো তার হাতে হাতকড়া লাগানো হয়েছিল। দ্বিজেন টুডু বলেন, “আমরা বেঁচে আছি এখনও? আমরাতো মরেই গেছি।’ তার মতো কমবেশি আহত আরো ৩০ জন। নিহত ৩। অথচ তাদের নামে মামলা করল পুলিশ, ৩৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত প্রায় ৩০০ জনের নামে। এর মাঝে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দ্বিজেন টুডু, চরণ সরেন, বিমল কিশকু ও মাঝিয়া হেমভ্রমকে হাসপাতালের বিছানায় হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়। পরে উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা আসলে তাদের হাতকড়া খুলে দেয়া হয়। অথচ দ্বিজেন টুডু ছাড়া অন্যদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসা সম্পূর্ণ হতে না হতে।

dijen-2

সেদিন ৬ নভেম্বরের পর সাঁতালরা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিনযাপন করছে। আগেও দিনযাপন করতো, তারা এখন পথে বসে গেছে। পালিয়ে গেছে বৃষ্টির মতো গুলির মুখে পূর্বপুরুষের ভিটে ছেড়ে। যদিও গ্রাম ঘিরে রেখেছে পুলিশ, পুলিশের ভয়ে মাঠে কাজে যেতে পারছেন না পুরুষরা। আর বাসস্থানে মানে সাঁওতাল পল্লীতে যেখান থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে তিনজনকে হত্যা করে সে জমি কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। পাশেই তৈরি করা হয়েছে পুলিশ ক্যাম্প। সেখানে রংপুর চিনিকলের তরফ থেকে ট্রাক্টর চালিয়ে আখ চাষের জন্য চষাক্ষেত বানানো হয়েছে, তাদের ভিটের চিহ্নটুকু মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে। বাধ্য হয়ে পাশে মাদারপুর গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে সাহেবগঞ্জের সাঁওতালরা দল বেঁধে। নেই কোন বাসনকোসন, দশ পরিবারকে এক পাতিলে রান্না করছে। কলাপাতা ব্যবহৃত হচ্ছে প্লেট হিসেবে। অনেকের ঘরে খাবার নেই। তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছে মাদারপুর গ্রামটিও। তরুণ ও মধ্যবয়স্করা দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষুধা সহ্য করতে পারলেও ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্নায় থমকে আছে পুরো পল্লী। এখনো অনেকেই নিখোঁজ, তাদেরকে গুম করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সাঁওতালরা। আতঙ্কে এখানকার অনেক পুরুষও বাড়িছাড়া। সরকারি ত্রাণ দেয়ার প্রস্তাব হয়েছিল, সে ত্রাণ আক্রমণের শিকার সাঁওতালরা ফিরিয়ে দিয়েছেন। সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমন বাস্কে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রশাসন একমুখে দুই কথা বলছে। তারা একদিকে ত্রাণ দিতে চাইছে, অন্যদিকে তারকাঁটার বেড়া দিয়ে আমাদের জমি নষ্ট করছে। তাই আমরা প্রশাসনের কোনো ত্রাণ নিইনি। ৪৫ বছর বয়স্ক মিনতি কিসকু জানিয়েছেন, ‘তিনদিন ধরে খেতে পাই না। বাইরেও যেতে পারি না। না খেয়ে এখানে আমরা মরে যাব। আমার ৮ ছাওয়াল খালি পেটের লাইগ্যা কাঁদে।’ ৫৬ বছর বয়স্ক মেরি টুডু জানান, ‘ক্ষুধার জ্বালা সইতে পারি নারে বাপু। বেঁচে আছি না মরে গেছি, বুঝছি না। বের হতে গেলেই ওরা মারে। বের না হলে কাজ না করলে খাব কী? পুলিশ, ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) অরা তো শাকিলেরই। এমপি সাব কয়া দিসে শাকিলের কথা শুনতে। আমরা মরি-বাঁচি সরকারের কী আসে যায়। এখন তো আর নির্বাচন নাই।’

প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা, স্কুলের শিক্ষক এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ওই এলাকায় গিয়ে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাবার জন্য তাগাদা দিয়েছেন। জবাবে তাদের অভিভাবকরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। অথচ হামলাকারীরা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পুলিশ আদিবাসী নেতাদের খুঁজছে, কার নাম বসায় মামলায় অজ্ঞাত স্থানে তা বলা যায় না। গুলিবিদ্ধ সাঁওতালদের কোমড়ে দড়ি বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। যন্ত্রণায় কাতর এ মানুষগুলোর এমন দশা দেখে হতবাক হয়েছেন হাসপাতালে আসা অন্যান্য রোগীদের স্বজনরা। এদের চিকিৎসার কোনো টাকাও নেই। ধারদেনা করে কোনোমতে চিকিৎসা চলছে। যখন পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত সাঁওতাল চরন সরেং এর চিকিৎসা চলছিল তিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, তার কোমড়ের রশিটি হাসপাতালের বেডের সঙ্গে বাঁধা ছিল, আবার হাতে ছিল হাতকড়া। পাশেই দুই পুলিশ সদস্য তাকে পাহারা দিচ্ছিল। অন্যদিকে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আদিবাসী বিমল কিসকোকে তীব্র যন্ত্রণার কারণে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুমিয়ে রাখা হয়েছিল, তার কোমরে রশি দিয়ে বেঁধে জানালার গ্রিলের সঙ্গে লাগিয়ে রেখে পাহারা দিচ্ছিল পুলিশের এএসআই আসাদ। হাতে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে। বিমলের দুই পায়ে গুলি করেছে পুলিশ। তার দুই পায়ের অবস্থা ভালো নয়। চিকিৎসার জন্য অনেক সময় লাগবে। এই পরিবারের সেই সামর্থ্য নাই।

এর আগেও তাদের এখান থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা হয়, এ নিয়ে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হয় আগেও, ৬ নভেম্বর রোববার সাহেবগঞ্জ থেকে দ্বিতীয়বারের মতো উচ্ছেদ হন সাঁওতালরা। এদিন কাঁথা-বালিশ পর্যন্ত লুটে নেওয়া হয়। এ ঘটনার পর বাঙালি পরিবারগুলো নিজ গ্রাম থেকে বের হতে পারলেও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন সাঁওতালরা। দ্বিতীয়বার উচ্ছেদ হওয়ার পর জীবন বাঁচাতে এখন তারা দেশ ছেড়েই চলে যেতে চাচ্ছেন। ৫৮ বছর বয়স্ক জয়পুরের রবিন টুডু জানান, ‘ক্ষুধার জ্বালা খুব বেশি সইতে পারছি না। আমরা এখন কী করে বাঁচব রে বাপু! তিনদিন ধরে খেতে পাই না। বাইরেও যেতে পারি না। না খেয়ে এখানে আমরা মরে যাব। বের হতে দাও। আমরা ভারত চলে যাব।’

tuhin-das

লেখক: কবি

দ্বিজেন টুডু’র সাক্ষাতকার পড়ুন: ‘গুলি করলো, ঘর পোড়ালো, মামলার আসামিও করলো’


সর্বশেষ

আরও খবর

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সংবিধান এবং আশাজাগানিয়া মুরাদ হাসান

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সংবিধান এবং আশাজাগানিয়া মুরাদ হাসান


গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার

গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার


মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন


নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!


তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!

তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!


সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?