Friday, August 12th, 2016
ধূমকেতু: সাংবাদিক নজরুল
August 12th, 2016 at 9:45 pm
ধূমকেতু: সাংবাদিক নজরুল

শাকেরা তাসনীম ইরা, ঢাকা:

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। কিন্তু তাকে আমরা কবি হিসেবে যতটা জানি, তার সাংবাদিক পরিচয় ততটা জানি না অনেকেই। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১৭ সালের শেষ দিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সৈনিক থাকা অবস্থায় ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের হয়ে তিনি অংশ নেন প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে। ১৯২০ সালে যুদ্ধ শেষে রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয়া হলে তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।

যুদ্ধ শেষে কলকাতায় ফিরে নজরুল কলকাতার ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটের ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন নজরুল। মূলত এখান থেকেই শুরু হয় তার সাংবাদিকতার পথচলা। ১৯২০ সালের ১২ জুলাই ‘নবযুগ’ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া শুরু করে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক; এই পত্রিকার মাধ্যমেই নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। সাংবাদিকতায় পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও অত্যন্ত প্রখরতার সাথে তিনি লিখতে শুরু করেন নবযুগ পত্রিকায়।

তবে ১৯২২ সাল ছিল নজরুল সাহিত্য জীবনের স্মরণীয় বছর। তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এ বছরই প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এ বছরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল এ বছরের নজরুল সম্পাদিত জনপ্রিয় পত্রিকা ‘ধূমকেতু’ প্রকাশিত হয়। কবি নজরুলের মত সাংবাদিক নজরুলও অত্যন্ত প্রখর ছিলেন। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাই ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। কবি গুরু ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যাতেই কাজী নজরুল ইসলামকে কল্যাণীয়েষু’ সম্বোধন করে আট লাইনের একটি কবিতা পাঠান।

‘আয় চলে আয়রে ধূমকেতু
আঁধার বাঁধ অগ্নিসেতু
দুর্দিনে এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালো হোক না লেখা
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে
আছে যারা অর্ধ চেতন।’ 

ধূমকেতুতে আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, সরোজিনী ঘোষ, প্রমুখ খ্যাতনামা ব্যক্তিরাও। ধূমকেতুর মোট বত্রিশটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচটি ছিল বিশেষ সংখ্যা, লিখতেন খ্যাত-অখ্যাত অনেক লেখক-লেখিকা। গদ্য লেখকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, শৈলজা মুখোপাধ্যায়, মিসেস আর এস হোসেন, হুমায়ুন কবির, শৈলবালা, ঘোষ জয়া, প্রবোধ চন্দ্র সেন প্রমুখ। কবিতা লিখেছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শিবরাম চক্রবর্তী, জিতেন্দ্রনাথ লাহিড়ী এবং আরো অনেকে, তবে দুয়েকজন ছাড়া এরা কেউই ধূমকেতুর নিয়মিত লেখক ছিলেন না।

নজরুলের প্রচেষ্টায় ধূমকেতু পত্রিকার কয়েকটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলির মধ্যে ২০ পৃষ্ঠার ‘মোহররম সংখ্যা’ (৭ম সংখ্যা, ১৬ ভাদ্র ১৩২৯/ আগস্ট ১৯২২), ১২ পৃষ্ঠার ‘আগমনী সংখ্যা’ (১২শ সংখ্যা, ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২), ১২ পৃষ্ঠার ‘দেওয়ালী সংখ্যা’ (১৫শ সংখ্যা, ২০ অক্টোবর ১৯২২) এবং ‘কংগ্রেস সংখ্যা’ (৩০তম সংখ্যা, ২৭ ডিসেম্বর ১৯২২) ছিল উল্লেখযোগ্য।

ধূমকেতু পত্রিকার ছিল নানা বিভাগ। সেগুলোতে ব্যাঙ্গাত্মক টিপ্পনিতে সম্পাদকের কৌতুকপূর্ণ মন্তব্যসহ সংবাদ প্রকাশিত হতো। মূলত নজরুলের আবেগ রঞ্জিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ, দুঃসাহসী সংবাদ এবং সংবাদ পরিবেশনের বিশেষ রসাত্মক ভঙ্গির জন্যই আলাদা জনপ্রিয়তা পেয়েছিল পত্রিকাটি। ধূমকেতু একটি নতুন রীতির প্রবর্তন করেছিল।

১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর নজরুলের আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা এবং এগারো বছরের বালিকা লীনা মিত্রের একটি ক্ষুদ্র গদ্য রচনা ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’-এর উপর রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে ধূমকেতু বাজেয়াপ্ত করা হয়। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ৭ জানুয়ারি নজরুল বিচারাধীন বন্দী হিসেবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে এক জবানবন্দি প্রদান করেন। চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে এই জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তার এই জবানবন্দি বাংলা সাহিত্যে রাজবন্দীর জবানবন্দী নামে বিশেষ সাহিত্যিক মর্যাদা লাভ করেছে। এই জবানবন্দীতে নজরুল বলেছেন:

‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত। … আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে…।’ 

রাজদ্রোহীতার অভিযোগে ১৬ জানুয়ারি বিচারের পর নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় এবং তাকে আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে করে বন্ধ হয়ে যায় পত্রিকাটি।

ধূমকেতু ছিল একটি রাজনৈতিক পত্রিকা। আয়ুষ্কাল স্বল্প হওয়ায় একে ঘিরে কোনো সাহিত্যিক গোষ্ঠী গড়ে না ঊঠলেও নজরুলের লেখায় যে বজ্রকণ্ঠের বেপরোয়া আহ্বান ধ্বনিত হয়েছিল তা বাঙালি জাতীয়তাবোধকে আরো জোরালো করে তোলে। ধূমকেতু খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করার অন্যতম কারণ ছিল নজরুলের লেখা আবেগতপ্ত সম্পাদকীয় নিবন্ধ। সব আবরণ আবেগ ও রূপক দূরে সরিয়ে স্পষ্ট ভাষায় সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/টিএস


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা