Wednesday, June 29th, 2022
বিচিত্র জাতির বৈচিত্র্যময় নিদর্শনে জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর
November 8th, 2016 at 11:20 am
বিচিত্র জাতির বৈচিত্র্যময় নিদর্শনে জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর

মাহতাব শফি

বিচিত্র জাতির বৈচিত্র্যময় নিদর্শন নিয়ে এশিয়া মহাদেশে জাতিতত্ত্ব বিষয়ক যে ক’টি জাদুঘর রয়েছে, তার মধ্যে সামগ্রিকভাবে উল্লেখযোগ্য চট্টগ্রাম জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর। দেশের বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রকৃতি ও আবহাওয়া সমৃদ্ধ পার্বত্য এলাকায় সূদুর অতীত কাল থেকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, বিচ্ছিন্ন ও নিভৃত জীবনযাপন করে আসছে। তাদের মধ্যে অনেকে আজও নিজ নিজ ঐতিহ্যগত জীবনধারা অব্যাহত রেখেছেন। দেশের মূল ভূখণ্ডের অধিবাসীদের জীবনধারার সঙ্গে এর রয়েছে যথেষ্ট পার্থক্য। পার্বত্য অঞ্চলে বৈচিত্র্যময় জীবনধারার অনেক ঐতিহ্যই এখন বিলীনের পথে। তেমনি মূল ভূখণ্ডে বসবাসকারী বাংলাভাষী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষ ও প্রতিবেশীদের ঐতিহ্য সম্পর্কে পুরোপুরিভাবে জানে না। বিচিত্র এ জীবনধারা সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রত্যেকেরই হয়। এদেশে বসবাসরত সেসব জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও মৌলগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি ও সম্প্রীতি নিবিড় করে তোলার উদ্দেশ্যে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এর পরিধি সেভাবে সম্প্রসারণ হয়নি। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে জাদুঘরটি আরো আধুনিকায়ন ও এর পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন।

dsc00034

নান্দনিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশে আগ্রাবাদের বাণিজ্যিক এলাকায় দাঁড়িয়ে রয়েছে জাতিতত্ত্ব বিষয়ক জাদুঘরটি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের জাগরণের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনের চাকা ক্রমেই দ্রুততর গতি লাভ করছে। ফলে নানা জনগোষ্ঠীর লোকায়ত বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরটি তা সংরক্ষণে যথাযথ ভূমিকা রেখে আসছে। যেখানে এমনসব নিদর্শন স্থান লাভ করেছে, যা সংশ্লিষ্ট জাতি, জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও মৌলগোষ্ঠীগুলোর একটা সামগ্রিক পরিচিতির প্রতিনিধিত্ব করে। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে রয়েছে মানচিত্র, আলোকচিত্র, মডেল, কৃত্রিম পরিবেশ, দেয়ালচিত্র, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ফলক ইত্যাদি।

dsc00016

জাদুঘরটি শুধু দেশি-বিদেশি দর্শকদের জ্ঞানানুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষাই পূর্ণ করে না, সব শ্রেণির দর্শনার্থীদের বিপুল আনন্দেরও খোরাক জোগায়। আয়তনের বিচারেও প্রতিষ্ঠানটি এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত এ ধরনের জাদুঘরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। জাদুঘরের প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবন প্রণালি। এর মধ্যে রয়েছে— চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, খুমি, চাক, তঞ্চঙ্গ্যা, রাখাইন, লুসাই, পাংখো, মণিপুরি, খাসিয়া, বোনা, পাওন, গারো, হাজং, দালু, কোচ, সাঁওতাল, ওরাং, রাজবংশী, বাগদি ইত্যাদি আদিবাসী।

dsc00022

জাদুঘরের প্রদর্শনীতে এ-যাবত্ দেশ-বিদেশের ১২টি জনগোষ্ঠী এবং ২৬টি মৌলগোষ্ঠী ও আদিবাসীর বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রার বিবিধ বৈশিষ্ট্য স্থান পেয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দৈহিক গড়ন, প্রাকৃতিক পরিবেশ, ঘরোয়া জীবন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য, উত্সব, নাচ-গান, অলঙ্কার, ধর্মীয় কার্যাবলি, শিকার, হস্তশিল্প ইত্যাদি অন্যতম। এগুলো প্রতিনিধিত্ব করছে যেসব জনগোষ্ঠী, তার মধ্যে বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলোর (বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম) এবং চট্টগ্রামের উত্তর ও পূর্বাংশের চাকমা (চাঙমা), মারমা (মগ), ত্রিপুরা (টিপরা); কক্সবাজার ও পটুয়াখালী জেলার রাইখান (রাখাইন); মৌলগোষ্ঠী ও আদিবাসী— চাক (শাক), তঞ্চঙ্গ্যা (টংচঙ্গাঁ/দৈনাক), মুরং (ম্রো), লুসাই (মিজো), পাঙেখা (পাংখো), বম (বনযোগী), খ্যাং (খিয়াং), খুমি (কুমি); ঢাকা বিভাগের উত্তরাংশের জনগোষ্ঠী গারো, মৌলগোষ্ঠী ও আদিবাসী— হাজং, কোচ, দালু, মান্দাই; উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মণিপুরি, খাসিয়া, বোনা, কুকী; পশ্চিমাঞ্চলের (রাজশাহী বিভাগ) সাঁওতাল, বাবুবলী, রাজবংশী, ওঁরাও, পলিয়া। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পাঠান, সিন্ধুর সিন্ধি, পাঞ্জাবের পাঞ্জাবি। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্ত অঞ্চলের (কাফিরিস্তান) কাফি, সোয়াত। ভারতের অরুণাচল ও মধ্য প্রদেশের আদি, ফুত্তয়া, মুরিয়া, মিজোরামের মিজো। রাশিয়ার কিরগিজ অঞ্চলের কিরগিজ এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অস্ট্রাল উল্লেখযোগ্য।

dsc00009

দেখা যায়— চাকমারা মাচাংঘর বানিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় বা ঢালে দলবদ্ধভাবে বসবাস করে; দ্রব্যাদির মধ্যে রয়েছে— বড়গি (চাদর), বিচন কাপড় (বিছানার চাদর), হেংগর (বাঁশি), মাখলা (মাথাল), কুরুম (ছোট ঝুড়ি), সাগা (জমির অধিকার চিহ্ন), কুল (ডালা), দুদুক  (বাদ্যযন্ত্র), হেনী (বাঁশি), ছেন্দা (বেহালা), চামপ্রং (সারিন্দা), বাল্লা (বাঁশি), ফি (বর্শা), কুরুল (কুঠার), আগল (দা,) ওয়াইতি (জঙ্গল পরিষ্কারের কাজে ব্যবহূত দা), হাইতি (দোল), ওগই (বড় হামানদিস্তা), মেঝাং (বেতের তৈরি খাবার ছোট টেবিল) ইত্যাদি।

জাদুঘরে প্রতিদিনই সমাগম ঘটে শত শত দর্শনার্থীর। নৃতত্ত্ব নিয়ে জাদুঘরে প্রায় প্রদর্শনী হয়।

dsc00028

এক তলাবিশিষ্ট এবং দক্ষিণমুখী এ জাদুঘরে বর্তমানে একটি কেন্দ্রীয় হলঘরসহ মোট চারটি গ্যালারি রয়েছে। প্রতিটি গ্যালারিতে দুটি করে জাদুঘরে মোট ১১টি কক্ষ রয়েছে। জাদুঘরে প্রবেশ করার উদ্দেশে বাম দিকের ফটকটি অতিক্রম করলে প্রথমেই পড়বে বুকিং কাউন্টার। টিকিটের হার ১০ টাকা। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনা, জাদুঘরের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অধিবাসী, জনগোষ্ঠী ও মৌলগোষ্ঠীর অবস্থান সম্পর্কে মানচিত্রের নির্দেশনা দেখতে পাওয়া যায়। প্রথমেই দেখা যায়, পৃথিবীর কয়েকটি দেশের কিছুসংখ্যক জনগোষ্ঠী ও বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর লোকায়ত জীবন ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী দ্রব্যাদি ও মডেল। যাতে রয়েছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া প্রভৃতি দেশের কয়েকটি জনগোষ্ঠীসহ মৌলগোষ্ঠীর স্বল্পসংখ্যক জাতিতাত্ত্বিক নিদর্শন। এছাড়া জার্মান প্রাচীরের কিছু ধ্বংসাবশেষ এবং পাকিস্তানে বসবাসকারী পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, সোয়াতি ও কাফিরদের জীবন ব্যবস্থার ধরন ও নিদর্শনাদি রয়েছে।

dsc00015

গ্যালারি দুইয়ের সম্মুখ ভাগের ‘ক’ কক্ষে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী মণিপুরি, খাসিয়া ও পাঙনদের পরিচিতি। ‘খ’ কক্ষটিতে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসকারী গারো, সাঁওতাল, রাজবংশী, ওঁরাও এবং ৩ নম্বর কক্ষে রয়েছে ম্রো, ত্রিপুরা, খ্যাং, বম, চাক, পাংখোদের জীবন ব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। ৪ নম্বর কক্ষে মারমা, চাক ও চাকমা জীবন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকসহ রয়েছে টেবিল আকৃতির আধার ও দুটি মাচাংঘর। কেন্দ্রীয় কক্ষে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, মৌলগোষ্ঠী ও অধিবাসীদের অলঙ্কারাদি। উত্তর দেয়ালে রয়েছে প্রাকৃতিক ও গৃহ পরিবেশের সান্নিধ্যে মুরং গোহত্যা উত্সবের মডেল।

dsc00030

 বিশ শতকের ষাটের দশকের গোড়ার দিকে জাদুঘর ভবনের প্রথম পর্বের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ওই সময় ভবনটির মধ্যবর্তী স্থানে দক্ষিণ দিক থেকে প্রবেশযোগ্য ও উত্তর-দক্ষিণে লম্বা একটি হলঘর এবং এর পশ্চিম ও পূর্বাংশে পাশাপাশি দুটি করে  মোট চারটি গ্যালারি নির্মাণ করা হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকে জাদুঘরের প্রদর্শনী ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন  হয়। নতুন কয়েকটি দেশের কিছু জনগোষ্ঠী ও মৌলগোষ্ঠীর বাংলাভাষী প্রতিনিধিত্বকারী কিছু লোকায়ত নিদর্শন প্রদর্শনী শুরু হয়।

dsc00033

তুলনামূলক জ্ঞানলাভ বা পর্যালোচনার সুবিধার্থে প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের জাতিতাত্ত্বিক নিদর্শনাবলির পাশাপাশি বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশের জাতিতাত্ত্বিক নিদর্শন স্থান লাভ করেছে। নৃতত্ত্ব-বিষয়ক জাদুঘরটির যথাযথ পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা আরো সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন জাদুঘরের আরো আধুনিকায়ন করা। যা সংরক্ষণ ও উপস্থাপনে আরো বেশি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। জাদুঘরটির অবস্থান চট্টগ্রাম শহরের বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদে হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই সহজ। চট্টগ্রাম রেলস্টেশন, বিমানবন্দর থেকে যে কোনো পরিবহনে খুব অল্প সময়ে পরিদর্শনের জন্য আসা যায়।

dsc00023

টিকেট প্রাপ্তিস্থান: জাদুঘরের গেটের পাশেই রয়েছে টিকেট কাউন্টার, জনপ্রতি টিকেট এর দাম  পনের টাকা করে, তবে পাঁচ বছরের কম কোন বাচ্চার জন্যে টিকেট এর দরকার পড়েনা। তবে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিশু-কিশোরদের জন্য প্রবেশ মুল্যে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ টাকা। সার্কভুক্ত বিদেশি দর্শনার্থীর জন্যে টিকেট মূল্য পঞ্চাশ  টাকা এবং অন্যান্য বিদেশি দর্শকদের জন্য টিকেটের মূল্য একশত টাকা করে।

dsc00018

সময়সূচী: গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। মাঝখানে দুপুর ১টা থেকে ১.৩০ পর্যন্ত আধ ঘণ্টার জন্যে বন্ধ থাকে। আর শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শীতকালেও দুপুর ১টা থেকে ১.৩০ পর্যন্ত বন্ধ থাকে। আর সবসময়ের জন্যেই শুক্রবারে জুম্মার নামাযের জন্যে সাড়ে বারোটা থেকে তিনটা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। রোববার সাধারণ ছুটি এবং সোমবার বেলা  ২.০০ থেকে   খোলা থাকে। এছাড়াও সরকারী কোন বিশেষ দিবসে জাদুঘর থাকে ।

dsc00017

 

ছবি: লেখক


সর্বশেষ

আরও খবর

সংসদে ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব

সংসদে ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব


আ’লীগ নেতা বিএম ডিপোর একক মালিক নন

আ’লীগ নেতা বিএম ডিপোর একক মালিক নন


চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় বাংলাদেশ

চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় বাংলাদেশ


ভোজ্যতেল ও খাদ্য নিয়ে যা ভাবছে সরকার

ভোজ্যতেল ও খাদ্য নিয়ে যা ভাবছে সরকার


তৎপর মন্ত্রীগণ, সীতাকুণ্ডে থামেনি দহন

তৎপর মন্ত্রীগণ, সীতাকুণ্ডে থামেনি দহন


অত আগুন, এত মৃত্যু, দায় কার?

অত আগুন, এত মৃত্যু, দায় কার?


যে গল্প এক অদম্য যোদ্ধার

যে গল্প এক অদম্য যোদ্ধার


আফগান ও ভারতীয় অনুপ্রবেশ: মে মাসে আটক ১০

আফগান ও ভারতীয় অনুপ্রবেশ: মে মাসে আটক ১০


সীমান্ত কাঁটাতারে বিদ্যুৎ: আলোচনায় বিজিবি-বিজিপি

সীমান্ত কাঁটাতারে বিদ্যুৎ: আলোচনায় বিজিবি-বিজিপি


চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার