Monday, June 20th, 2016
বিলুপ্ত প্রায় সেইসব কাকা এবং ভাইবেরাদারগণ
June 20th, 2016 at 5:42 pm
বিলুপ্ত প্রায় সেইসব কাকা এবং ভাইবেরাদারগণ

অনার্য তাপস: যারা আমরা আশির দশকে জন্মেছি তারা কিছুটা হলেও ছোঁয়া পেয়েছি বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় এক প্রজাতির মানুষের যারা পাড়ায় বা মহল্লায় ‘কমন কাকা কিংবা ভাই’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাড়ার সবচাইতে বাজে লোকটার বাড়িতেও তাদের ছিলো অবাধে যাতায়াত। রক্তসম্পর্কিত না হলেও আমরা আমাদের শৈশবে কিছু মানুষ দেখেছি যারা রক্তসম্পর্কিত আত্মীয় পরিজনের চাইতে দূরের কেউ ছিলেন না। নানান কাজের কাজী এই কাকা কিংবা ভাইয়ের দল এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে এই এতদিন পর আমরা তাদের অভাববোধ করছি।

মূল কথা বলতে চাই, মানুষের সামাজিকিকরণ এককভাবে সম্ভব নয়। সেখানে নানারকম অণুঘটক প্রয়োজন। সেটা যেমন বাবামায়ের কিংবা পরিবারের ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা কিংবা নিরাপত্তা। তেমনি প্রয়োজন সেইসব কাকা কিংবা ভাইবেরাদারদের যারা বাইরের পৃথিবীর সাথে কিংবা ‘আউট বই’য়ের সাথে শৈশবে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেয়। সবচাইতে বড় বিষয় তারা শিশুদের প্রশ্ন করতে শেখায়। কিন্তু হায়! আমরা যখন আধুনিক হতে হতে একক হয়ে গেলাম, আমরা যখন সামাজিক, সাংসারিক সম্পর্কগুলোকে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম, কর্পুরের গন্ধের মতোই সেইসব কাকা কিংবা ভাইবেরাদারের দলও হারিয়ে গেল।

হ্যাঁ, পরম্পরা দরকার হয়। সেইসব কাকাতো বা ভাইবেরাদারি সম্পর্কগুলো তৈরি হতেও পরম্পরা দরকার হয়। আমরা সেই পরম্পরাটা হারিয়ে ফেলেছি মহাকালের হাতে। ফলে সেইসব কাকা কিংবা ভাইবেরাদারের দলও আর এখন জন্ম নেয় না। এই সম্পর্কগুলো হারিয়ে ফেলাতে আমাদের ক্ষতিটা কী হয়েছে? আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে কোনো ক্ষতিই হয়নি। কিন্তু একটু খুঁড়ে দেখলে? “সে ক্ষতি আর পুষিয়ে উঠবার নয়!” আমি আগেই বলেছি যে শিশুতোষ শৈষবের সাথে এই সম্পর্কগুলো জড়িত ছিলো। সেইসব কাকা কিংবা ভাইবেরাদাররা হুট করে এসে গল্প শোনাতো- শোন, আজ একটা বাঘ ধরার মন্ত্র শিখেছি। শিখবি? মা পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বলতো- শেখাতো। নিয়ে যা ওটাকে। সারাদিন খালি ঘরের ভেতরে। অমনি কাকা কিংবা ভাইটি খপ করে হাতটা ধরে টানতে টানতে চলতো বিলের মাঝে। নির্জনতায়। তারপর শুরু হতো গল্প। শুরু হতো বাইরের পৃথিবীর রং দেখার পালা।

আচ্ছা বলতো বাঘ দেখতে কেমন? তারপর নানান প্রশ্ন। কোন একটা সহজ প্রশ্নের উত্তর না পারলেই বলতো, না। তোকে মন্ত্রটা শেখাবো না। তুই আগে উত্তরটা জানবি তারপর শেখাবো। তারপর শুরু হতো বাপ মায়ের কাছে প্রশ্নে উত্তর জানার চেষ্টা। হয়তো একসময় উত্তরটাও পাওয়া যেত। কিন্তু ততদিনে অন্য কোন বিষয়ে আগ্রহটা তৈরি হয়ে গেছে তার কোন গল্পের সূত্রে।

আচ্ছা কাকা, তুমি মেলাদিন ছিলে না, কই গেছিলে?

শান্তাহার।

ওটা কই?

সে মেলা দূর। ট্রেনে যেতে হয়। ওটা একটা রেল স্টেশন। একেবারে বর্ডারের কাছে।

অনেক কিছু জানার ক্লু তৈরি হয়ে গেল। সেই সাথে বাড়তে শুরু করলো আইকিউ আর ভূগোলের পরিধি। আমরা আমাদের শৈশবে এরকম অসাধারণ প্রক্রিয়ায় অনেককিছু শিখেছি। প্রশ্ন করতে করতে শিখেছি। না, বলা যাবে না- যা শিখেছি সব ঠিক ছিলো। কিন্তু সেই বেঠিক শেখাটাও এখন বিবিত্র অভিজ্ঞতায় কখনো কখনো কাজে লেগে যায়।

হ্যাঁ, আর একটা বিষয় ছিলো। এইসব মানুষের কাছে সহবতটা শেখা যেত। কোন মানুষের সাথে কিভাবে কথা বলতে হবে, মেয়েদের সাথে কিভাবে কথা বলা উচিৎ তারা তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে বয়ান করে শেখাতেন। আমার মনে আছে, আমাদের শৈশবে ইভটিজিংয়ের হার ছিলো খুবই নগন্য। কারণ কোন পরিবারের কোন ছেলে রাস্তায় স্কুলগামী মেয়েদের সাথে অশোভন আচরণ করেছে সেটা ছিলো সেই পরিবারের জন্য সামাজিকভাবে একটা বিরাট অসম্মানের বিষয়। আমার মনেই হয়, পরিবারের পাশাপাশি এইসব কাকা কিংবা ভাইবেরাদারদেরও একটা বড় ভূমিকা ছিলো শিশুদের সামাজিক করে তোলার এবং সামাজিক অসুখগুলোকে সারিয়ে তোলার ক্ষেত্রেও। অন্তত আমাদের শৈশবে ফাইজুল্লাহ ফাহিমের মতো নতমুখ জিপিএ ফাইভ পাওয়া মেধাবী ছাত্র তেমন একটা ছিলো না যারা তাদের শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যকে মানুষ হত্যার জন্য উৎসর্গ করেছিলো। পরিবারের রাডারে ধরা না পরলেও শিশুদের অস্বাভাবিকত্ব বেশিরভাগ সময় ধরা পরতো সেইসব কাকা বা ভাইবেরাদারদের চোখে। তারা বাপমাকে নোটিশ করতেন বিষয়টা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রমাণসহ।

কী আর করা যাবে। এইসব অডরিলেশানশিপের প্রয়োজন নেই আমাদের।

anarja taposh

লেখক: সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষক


সর্বশেষ

আরও খবর

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?


প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ

প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ


দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন

দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন


দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন

দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ