Monday, August 29th, 2016
‘বিশ্ব থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন করতে গুলশান হামলা’
August 29th, 2016 at 9:35 pm
‘বিশ্ব থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন করতে গুলশান হামলা’

সানাউল কবীর সিদ্দিকী, ঢাকা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, আল কায়েদা এবং দায়েশের (আইএস) মতো পরস্পর সংযুক্ত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে পরাভূত করার জন্য বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশের প্রতিটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র।

তিনি বলেন, ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলাটি নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বহির্বিশ্বের সঙ্গে এই সুন্দর দেশকে বিচ্ছিন্ন করাই এর মূল লক্ষ্য ছিলো। তাছাড়াও গত কয়েক বছর যাবৎ বহু ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিদেশী নাগরিক, ব্লগার ও নিরাপত্তা কর্মী এসব সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন। ঢাকায় নয় ঘণ্টার ঝটিকা সফরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

জন কেরি বলেন, হামলাকারীদের উদ্দেশ্যই ছিলো মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করা, অভ্যন্তরীণ শত্রুতা সৃষ্টি করার জন্যই তারা এসব ঘৃণিত কাজ করেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাপী এহেন ন্যাক্কারজনক নৃশংসতা আমাদের নিশ্চিত হতে বাধ্য করে যে, যারা এসব হামলার পেছনে ইন্ধন যোগায়। জাতীয়তার প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। অন্যের অধিকার সম্পর্কে তারা কখনোই অবগত নয়। আইনের প্রতি তাদের কোনো সম্মান নেই। বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের নাগরিকদের মতো মূল্যবোধ তারা ধারণ করে না। আর এসব মুখ ফুটে বলাটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, দায়েশের(আইএস) হাতে ইরাকের নাগরিক খুন হয়, তাদের পরিচয়ই তাদের অপরাধ। ইয়াজিদিরা খুন হয়, কারণ তারা ইয়াজিদি। শিয়ারা খুন হয় তারা শিয়া বলে। খ্রিস্টানদেরও ওই একই অপরাধ, তাদের সাম্প্রদায়িক পরিচয়। তারা নিজেদের যা বলে দাবি করে, তারা তা নয় বলেই মানুষকে জোরপূর্বক আরোপিত পরিচয় প্রদান করতে চায়, সেকারণেই তাদের হত্যা করার প্রয়োজন পড়ে। তারা সংস্কৃতিকে, ইতিহাসকে আক্রমণ করে, এবং সে কারণেই এমন নৃশংস চরম্পন্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধকে আমি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মনে করি। হয়তো বর্তমান প্রজন্মসহ আরো কয়েকটি প্রজন্মকে এ সমস্যা নিরসনে কাজ করতে হবে, কিন্তু একটা কথা জেনে রাখুন, আমরা দায়েশকে পরাভূত করছি, আমরা দায়েশকে পরাভূত করবো, আমরা আল শাবাব এবং বোকো হারামকে পরাস্ত করবো, আমরা সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্বের পথেই হাঁটছি, কিন্তু আমাদের এই যাত্রা চালিয়ে যেতে হবে।

কেরি বলেন, শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, আমাদের লড়তে হবে মানসিকভাবে। বিশ্বের বহু কোমলমতি স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না, চাকরির অভাবে, কাজের অভাবে যুবসমাজ হয়ে পড়ে হতাশাগ্রস্ত। চরমপন্থী সংগঠনসমূহ এই হতাশ যুবসমাজকে ব্যবহার করে। আমরা যদি তাদের হতাশায় ডুবে থাকতে দেই তাহলে চরমপন্থী সংগঠনগুলো নিঃসন্দেহে তাদের দলে ভেড়াবে, আর আমাদের জীবন ব্যাহত হবে বারবার। এটা মনে রাখা দরকার, কোনো দেশই সম্পূর্ণরূপে সন্ত্রাসমুক্ত নয়, আর সন্ত্রাস সৃষ্টি করাও বেশ সহজ।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, সরকার এবং আইন প্রণয়নকারী সংস্থাগুলোকে সবসময় তটস্থ থাকতে হয়, নিখুঁত হতে হয়, প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা, সপ্তাহে সাত দিন, বছরে ৩৬৫ দিন। কিন্তু কেউ যদি জীবনে সন্ত্রাসী হতে চায়, আত্মহননের পথ বেঁছে নেয়, তাহলে তার জন্য সেটি বেশ সহজ কাজ। সে চাইলেই কিছু মানুষকে খুন করে আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারবে। গণমাধ্যমগুলো নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে, বিশ্বব্যাপী মানুষ জানতে পারবে কি ঘটছে। মূল ব্যাপারটি হলো আমাদের পরস্পরের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে রয়েছে।

জন কেরি বলেন, আমাদের এটা বোঝা উচিৎ যে, সন্ত্রাসকে পরাভূত করতে হলে গণতন্ত্রের মূলনীতি অবলম্বন করতে হবে শক্ত হাতে। কেন একজন মানুষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়? এ প্রশ্নের কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই, এর পেছনে অনেক কারণ থাকে। কিন্তু ভুল করলে চলবে না, এ ধরনের চরমপন্থী সন্ত্রাস কার্যক্রম রোধ ও দমনে গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। কেন? কারণ, যখন কোনো ব্যক্তি জেলে যাওয়ার ভয় ছাড়াই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে, নিজের অধিকার রক্ষায় তর্ক করতে পারে, সত্য তুলে ধরতে পারে, তখনই সমাজ বিকশিত হয়; আর তখন ইসলামের মতো শান্তিপূর্ণ কোনো ধর্মের মিথ্যা প্রতিবিম্ব দেখিয়ে কারো চিন্তাকে বিকৃত করে দেয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, সমাজ বিকাশে রাষ্ট্রের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হয়, সমাজ ধ্বংস করার লক্ষ্যে নৃশংসতার আশ্রয় নেয়া বোকামি। কেউ কেউ তর্ক করতে পারেন, যখন কোনো রাষ্ট্র সত্যি সত্যি কোনো বিশাল হুমকির সম্মুখীন হয়, গণতন্ত্রের মূলমন্ত্রে বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আমিও তা বুঝি। কিন্তু সবসময়ই দুটো রাস্তা খোলা থাকে। আমার মতে, হুমকির সম্মুখীন কোনো রাষ্ট্র যদি গণতন্ত্রের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে তাহলে হুমকিদাতার উদ্দেশ্য হাসিলে তা বেশ সহায়ক হয়।

আমি ও আমার সহকর্মীরা আজ এখান থেকে বিশ্বাসের এক নতুন ধারণা নিয়ে দেশে ফিরবো যা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের আন্তঃসম্পর্কের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে বলে আমার বিশ্বাস।

যদিও আমি এখানে এসে আরো কিছুদিন সময় কাটিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বেশ কঠিন হয়ে উঠছে। আমার স্ত্রী আর সন্তানকে জিজ্ঞেস করুন, তারাও এ সম্পর্কে একমত হবে। কিন্তু আপনাদের এই রঙিন ও বৈচিত্রময় সমাজ থেকে বিচ্ছুরিত প্রাণশক্তি আমি অনুভব করতে পারি, আমি বুঝতে পারি। আমাদের রাষ্ট্রদূত আমাকে এ ব্যাপারে সবসময় বলে, আমার সহকারি সচিবও আমাকে বলেছিলো আপনাদের অতিথিপরায়ণতা সম্পর্কে; এখন আমি বুজতেপারছি, তারা ঠিকই বলেছিলো, উল্লেখ করেন তিনি।

জন কেরি বলেন, আমি এই দুই দেশের মধ্যবর্তী সম্পর্কের ওপর একটি জোরদার বিশ্বাস নিয়ে ফিরবো। কেউ হয়তো এক দশক আগে ভাবতেও পারেনি, এই দুই দেশ অঞ্চলভিত্তিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একে অপরের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে অথবা বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান কাটার ব্যবহার করবে অথবা সন্ত্রাস দমন থেকে শুরু করে পরিবেশ ও সমুদ্র সংরক্ষণে তারা একে অপরের পাশে থাকবে। একই সঙ্গে এও জেনে রাখা ভালো যে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিজেদের সাধারণ স্বার্থ অন্বেষণে একে অপরের পাশে নেই, এরা বন্ধু রাষ্ট্র, এদের বন্ধুত্ব অনেক পুরনো। ১৯৭১ সালে যখন আমি যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলাম, আমার মনে আছে, বাংলাদেশের নির্যাতিত মানুষের প্রতি বহু রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি এখনকার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলো।

তিনি বলেন, তখন সময়টা ছিলো আন্দোলনের, নাগরিক অধিকার আন্দোলন, নারী জাগরণ আন্দোলন, শান্তি আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন; নতুন পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়নের সময় ছিল এটা। তখন সিনেটর টেড কেনেডি বাংলাদেশের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন, এ ভূ-খণ্ডে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বিপক্ষে লড়েছিলেন তিনি। নৃশংসতার সীমা অতিক্রম করলে কেনেডি উড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন এ ভূ খণ্ডে। শরণার্থী ক্যাম্পগুলো ঘুরে দেখেন তিনি। দেশে ফিরে তিনি এই নৃশংসতাকে ‘সিস্টেমেটিক ক্যাম্পেইন অফ টেরর’ বলে আখ্যা দেন।পরের বছরের শুরুর দিকে তিনি আবার এদেশে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বট গাছটির বদলে তিনি নতুন একটি বটগাছ রোপন করেন। তৎকালীন ছাত্রদের সাথে কথা বলার সময় তিনি কোনোভাবেই অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা না উল্লেখ করে আরো বৃহৎ পরিসরে তাদের সাথে আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন পলিসি শুধু সরকারের সাথে সরকারের সম্পর্ক নয়, নাগরিকের সাথে নাগরিকের, বন্ধুর সাথে বন্ধুর, জনতার সাথে জনতার, কারণ এক দিক থেকে আমরা সবাই বাংলাদেশি, আবার আমরা সবাই আমেরিকান, আমরা সবাই মনুষ্য প্রজাতির গর্বিত সদস্য।

জন কেরি বলেন, যে বটগাছটি আমার সাবেক সহকর্মী রোপন করেছিলো, সেটি এখনো উৎসর্গকৃত রক্তের প্রতীক হয়ে আছে। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশিদের চরম উদ্যম ও দুই দেশের মধ্যবর্তী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতীক। আমার আজকের ঢাকা সফর সেই বন্ধুত্বকে নতুন করে রূপ দেয়ার প্রয়াস, দুই রাষ্ট্রের আন্তঃবন্ধন দৃঢ় করার প্রচেষ্টা। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে আমাদের এই উদ্দেশ্য সফল হবে, এতে লাভবান হবে বাংলাদেশ, এতে লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র; আর আমরা লাভবান হলে সমগ্র বিশ্ব তার ফল ভোগ করতে পারবে।

সম্পাদনা- জাহিদুল ইসলাম

 


সর্বশেষ

আরও খবর

সাগরে ৪ নম্বর সংকেত, বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে আরও দুই দিন

সাগরে ৪ নম্বর সংকেত, বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে আরও দুই দিন


দু-তিন দিনের মধ্যে আলুর দাম কমবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

দু-তিন দিনের মধ্যে আলুর দাম কমবে: বাণিজ্যমন্ত্রী


সারা দেশের নৌ ধর্মঘট প্রত্যাহার

সারা দেশের নৌ ধর্মঘট প্রত্যাহার


অতিরিক্ত মূল্যে আলু বিক্রির দায়ে বরিশালে চার ব্যবসায়ীকে জরিমানা

অতিরিক্ত মূল্যে আলু বিক্রির দায়ে বরিশালে চার ব্যবসায়ীকে জরিমানা


করোনায় প্রাণ গেল আরও ২১ জনের

করোনায় প্রাণ গেল আরও ২১ জনের


শিশু ধর্ষণের মামলায় দ্রুততম রায়ে আসামির যাবজ্জীবন

শিশু ধর্ষণের মামলায় দ্রুততম রায়ে আসামির যাবজ্জীবন


মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে নির্দেশ মন্ত্রিসভার

মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে নির্দেশ মন্ত্রিসভার


দেশে করোনায় আরও ২৩ জনের মৃত্যু

দেশে করোনায় আরও ২৩ জনের মৃত্যু


ভোট সুষ্ঠু হয়েছে; দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের

ভোট সুষ্ঠু হয়েছে; দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার খসড়া তালিকায় গ্লোব বায়োটেকের ভ্যাকসিন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার খসড়া তালিকায় গ্লোব বায়োটেকের ভ্যাকসিন