Wednesday, June 1st, 2016
বিস্ময়কর প্রতিভা ‘হেলেন কেলার’
June 1st, 2016 at 2:11 pm
বিস্ময়কর প্রতিভা ‘হেলেন কেলার’

সানাউল কবির, ঢাকা: মনের দৃষ্টিতে দেখুন- একজন সুন্দরী সাঁতার কাটছে নদীতে। নৌকা চালাচ্ছে। তাস খেলছে।দাবা খেলছে। রান্না করছে। সেলাই করছে কাঁথা। বই লিখছে, নিজেও পড়ছে, এমনকি পড়াচ্ছেও। রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নির্মাণ করছে চলচ্চিত্র।

এবার শুরু হোক আপনার কল্পনা শক্তির আসল পরীক্ষা। ধরে নিন, করিৎকর্মা সেই অপরূপ মেয়েটি মায়ের কোল থেকেই দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধী।

অসম্ভব বলে আপনি উড়িয়ে দিলেও ইতিহাস তা পারে না। কারণ হেলেন কেলারের নামটি সোনালী হরফে লেখা আছে এর পাতায় পাতায়।

১৮৮০ সালের ২৭ জুন, আমেরিকার অ্যালাবামা তাসকাম্বিয়া গ্রামের আর্থার কেলার ও কেটি অ্যাডামস কেলারের সংসার আলো করে পৃথিবীতে আসেন হেলেন অ্যাডামস কেলার। কিন্তু মাত্র দেড় বছর বয়সে গুরুতর অসুস্থতার দরুন জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে তার। বাবা- মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রচেষ্টায়, তৎকালীন জটিল ও অনুন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা তার জীবন ফিরিয়ে দিলেও কথা বলা, শোনা এবং দেখার ক্ষমতা চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। অন্ধকারাচ্ছন্ন, নিঃশব্দ জীবন যাপন করতে থাকে পরিবারটি।

হেলেনের বয়স যখন ছয় বছর, বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল (টেলিফোনের আবিস্কারক) প্রতিবন্ধী শিশুটির তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তায় অভিভূত হয়ে আর্থার ও কেটিকে হাল না ছাড়ার পরামর্শ দেন। বিজ্ঞানী জানান, দর্শন ও শ্রবণেন্দ্রিয়ের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার সম্ভব না হলেও গুরুত্বের সাথে পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি একটি সুন্দর জীবন লাভ করতে পারেন হেলেন। শুরু হয় হেলেন ও তার পরিবারের জীবন সংগ্রাম।

উদ্যমী পিতা মাতার প্রচেষ্টায় শুরু হয় হেলেন কিলারের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। এনি সুলিভান (যিনি নিজেও একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছিলেন) নামক গৃহ শিক্ষিকার সহায়তায় মাত্র ৮ বছর বয়সেই তিনি হাতের আঙ্গুল দিয়ে দাগ কেটে কেটে লেখা, ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়াসহ শব্দ ও বাক্য উচ্চারণ পর্যন্ত শিখে ফেলেন।

এনি প্রথমে আঙুল দিয়ে হেলেনের হাতে বিভিন্ন চিহ্ন এঁকে এবং এরপর বর্ণমালা কার্ড দিয়ে বর্ণমালা শেখান। ১০ বছর বয়সে নরওয়েতে উদ্ভাবিত এক পদ্ধতি অনুসরণ করে কথা বলা শেখেন হেলেন। ১৪ বছর বয়সে হেলেন আমেরিকার নিউইয়র্কের ‘রাইট হুমাসন’ নামক বধিরস্কুলে ভর্তি হন। তার ছয় বছর পর, ১৯০০ সালে উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনি রেডক্লিফ কলেজে ভর্তি হন যেখানে বিশ্ববিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। ১৯০৪ সালে হেলেন প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ডিগ্রি অর্জনের আগেই তার আত্মজীবনী ‘দ্যা স্টোরি অব মাই লাইফ’ প্রকাশিত হয়। নিজের প্রতিবন্ধকতার কথা উপলব্ধি করে তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের জন্য গড়ে তোলেন নতুন নতুন স্কুল এবং সমিতি।

১৯১৩ সালে, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকার জাতীয় লাইব্রেরী। হেলেন বই পড়তে ভালবাসতেন, ‘টুয়েন্টি টুয়েন্টি ভিশন’ সম্পন্ন বহু ব্যক্তির চেয়েও তার পড়া বইয়ের তালিকা লম্বা ছিল। বই পড়েই ক্ষান্ত হননি তিনি, বই লিখেছেনও। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা ১২।

এছাড়াও তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিশপ্ত বিড়ম্বনার জীবনের বিষাদের উপর ডেলিভারেন্স (১৯১৯) নামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রে তার নিজের ভূমিকায় তিনি নিজেই অভিনয় করেছেন। সঙ্গীত তাকে আপ্লুত করতো। তার সঙ্গীত উপভোগ করার পদ্ধতিও ছিলো অদ্ভুত। বাদ্য যন্ত্রের উপর হাত রেখেই বলে দিতে পারতেন তাতে কি ধরনের সুর বাজছে।

হাতের স্পর্শ দিয়ে তিনি শ্রবণের কাজ করতেন, কম্পাঙ্ক অনুভব করতেন। গায়ক-গায়িকার কন্ঠে অনায়াসে বলতে পারতেন কি সঙ্গীত গাইছে। এমনকি, বহু দিনের পরিচিত মানুষের সাথে করমর্দন করে বলে দিতে পারতেন তার পরিচয়।

১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট-এর অনুরোধে হেলেন কিলার বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধাহত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নাবিক ও সৈনিকদের দেখতে যেতেন এবং শান্তি ও আশার বাণী শুনাতেন। যুদ্ধ শেষ হলে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশ্বব্যাপী এক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়াস পান। ১৯৫৯ সালে হেলেন কেলার জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন।

রাজনীতি নিয়েও তার আগ্রহ ছিল অপরিসীম। হেলেন ছিলেন আমেরিকান সোশালিস্ট পার্টির সমর্থক। তিনি ১৯০৯ সালে পার্টিতে যোগদান করেন। আয়ের সুষম বণ্টন প্রতিষ্ঠা করে ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অসমতার শেষ দেখাই ছিল তার ইচ্ছা।

তার বই ‘আউট অফ দি ডার্ক’এ এই বিষয়ে আলাদা আলাদা রচনা ১৯১২ সালে তিনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অফ দি ওয়ার্ল্ড এ যোগদান করেন। একজন প্যাসিফিস্ট হিসেবে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়িত থাকার বিরুদ্ধে ছিলেন।

১৯৬৮ সালের এই দিনে, অর্থাৎ ০১ জুন, পৃথিবীর সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে বিদায় নেন হেলেন কেলার। ইতিহাসের পাতায় তাকে অম্লান করে রাখার জন্য এবং তার অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ১৯৭৭ সালে ‘আমেরিকান এসোসিয়েশন ফর দি ওভারসীজ ব্লাইন্ড’ (বর্তমানে‘হেলেন কিলার ইন্টারন্যাশনাল’) গঠন করা হয়েছে।

নিউজনেক্সটবিডিডটকম/এসকে/এসআই


সর্বশেষ

আরও খবর

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু


করোনা সংক্রমন ঠেকাতে ব্রিটিশ সরকারের নতুন আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ  ১০ হাজার পাউন্ড জরমিানা

করোনা সংক্রমন ঠেকাতে ব্রিটিশ সরকারের নতুন আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড জরমিানা


ভাইরাসের সাথে বসবাস

ভাইরাসের সাথে বসবাস


মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা

মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা


অস্ট্রিয়ায় চালু হলো করোনাভাইরাস ট্রাফিক লাইট ব্যবস্থা

অস্ট্রিয়ায় চালু হলো করোনাভাইরাস ট্রাফিক লাইট ব্যবস্থা


কটন টপ ট্যামারিন, খোঁজা বানর!

কটন টপ ট্যামারিন, খোঁজা বানর!


প্রকৃতির স্থিতি আর আমাদের অস্থিরতা: কোভিড-১৯ পরবর্তী ভাবনা

প্রকৃতির স্থিতি আর আমাদের অস্থিরতা: কোভিড-১৯ পরবর্তী ভাবনা


রানীর ভাষণ: খুঁটিনাটি

রানীর ভাষণ: খুঁটিনাটি


মুজিব বর্ষঃ স্মৃতিচারন করলেন মুক্তিযোদ্ধাদের দুই সহচর

মুজিব বর্ষঃ স্মৃতিচারন করলেন মুক্তিযোদ্ধাদের দুই সহচর


মুজিব বর্ষঃ আওরঙ্গজেব’র বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারন

মুজিব বর্ষঃ আওরঙ্গজেব’র বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারন