Monday, December 26th, 2016
ব্যাংক খাতের আতঙ্ক ২০১৬
December 26th, 2016 at 8:41 am
ব্যাংক খাতের আতঙ্ক ২০১৬

রিজাউল করিম: চরম উৎকণ্ঠা আর আতঙ্কে বছর পার করলো দেশের সংবেদনশীল খাত হিসেবে পরিচিত ব্যাংক খাত। বিদায়ী ২০১৬ সালে খাতটিতে আগের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত হয় বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী রিজার্ভ চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনা। চুরিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে তফসিলি ব্যাংকগুলোতেও বছর জুড়ে ছিল বদলি, চাকরিচ্যুতি ও হ্যাকিং আতঙ্ক। ব্যাংকারদের এ আতঙ্ককে আরও বাড়িয়েছিল প্রকট হওয়া এটিএম কেলেঙ্কারি, সর্বনিম্ন সুদ হার, ঋণ নিতে ইচ্ছুক ভাল উদ্যোক্তা না পাওয়া, পুঞ্জিভূত অলস টাকার পাহাড় ও খেলাপি ঋণের বোঝা। এছাড়া বিচারিক দূর্বলতায় ব্যাংকগুলোতে ক্রমবর্ধমান অনিয়ম, লোক দেখানো গ্রেফতার, ব্যাংক এমডিদের দুদকে দৌড়ঝাঁপসহ পুঁজিবাজারের রক্তক্ষরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যর্থতা ও গভর্নরদের পদত্যাগ ছিল বছরের আলোচিত ঘটনা।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে ৩৫টি ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় এক বিলিয়ন ডলার সরানোর চেষ্টা হয়। এর মধ্যে চারটি মেসেজের মাধ্যমে ফিলিপিন্সের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকে (আরসিবিসি) সরিয়ে নেওয়া হয় ৮১ মিলিয়ন ডলার। আর একটি মেসেজের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার একটি ‘ভুয়া’ এনজিওর নামে ২০ মিলিয়ন ডলার সরিয়ে নেওয়া হলেও বানান ভুলের কারণে সন্দেহ হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়। রিজাল ব্যাংকে যাওয়া টাকার একটি বড় অংশ পরে ফিলিপিন্সের জুয়ার টেবিলে চলে যায়। এর মধ্যে ক্যাসিনো মালিকের ফেরত দেওয়া দেড় কোটি ডলার পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করতে আগস্টে ম্যানিলা গিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দল।

অবশ্য আইটি সিস্টেম হ্যাক করে চুরি হওয়া এ অর্থের বিষয়টি প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশ না করলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফিলিপাইনের ইনকোয়ারার পত্রিকা এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা জানাজানি হয়। মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনায় ফিলিপাইনের সরকার আন্তর্জাতিকভাবে বেশ চাপের মুখে পড়ে। তারপর ফিলিপাইন বেশ তৎপর হয়ে ওঠে। যার ধারাবাহিকতায় আইনের সকল বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে দীর্ঘ নয় মাস পর ৫১ মিলিয়ন ডলার ফেরত পায় বাংলাদেশ।

ঘটনার জেরে বাংলাদেশে পদত্যাগ: রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে পদত্যাগ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিয়ার রহমান। এরপর একে একে অব্যাহতি দেয়া হয় দুুই ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা ও আবুল কাশেমকে। চুরির ঘটনার ধাক্কায় ওএসডি করা হয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলামকে।

ফিলিপাইনে পদত্যাগ: বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লরেঞ্জো তান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ব্যাংকটির অাভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাংকের নিয়মনীতি না মানার তথ্য-প্রমাণ উঠে আসে। এর আগে রিজাল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখার ম্যানেজার মায়া দেগুইতি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িতদের ব্যাংক হিসাব খোলা ও রিজার্ভের অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে লরেঞ্জো তানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন। ব্যবসায়ী কিম উং-ও একই ধরনের অভিযোগ তোলেন তানের বিরুদ্ধে। তবে তান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দেগুইতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেন। পরবর্তীতে দেগুতো পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

ঘটনায় মামলা: রিজার্ভ চুরি ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়। পাশাপাশি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের গচ্ছিত ওই অর্থ কীভাবে লোপাট হল, তা খুঁজে বের করতে একটি তদন্ত কমিটি করে সরকার। সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিনকে প্রধান করে ওই তদন্ত কমিটি করা হয়। যদিও আজ পর্যন্ত সে তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। কয়েকবার প্রকাশের দিন ধার্য করেও শেষ পর্যন্ত তা প্রকাশ করেনি সরকার। অবশ্য এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছেন, আগে থেকে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করলে ফিলিপাইনের যে দেড় কোটি ডলার ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা নাও পেতে পারি। তাই ফিলিপাইনের অর্থ ফেরত পাওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

ঘটনা তদন্তে বিএনপির দাবি: বিশ্বব্যাপী চাঞ্চল্যকার এ চুরির ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেছিল দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি। এ ব্যাপারে গভর্নরের পর অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের পদত্যাগের দাবি করেছিল তারা।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টিকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় মূল হোতা হিসেবে খোদ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ চক্রকেই শনাক্ত করা হয়েছে। চক্রটি পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে ব্যাংকের সিস্টেমগুলো দুর্বল করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই আইননানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সিআইডি’র অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক শাহ আলম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তা সিস্টেম ছিল সুরক্ষিত। সেখানে ছিল না ইন্টারনেট কানেকশন। কিন্তু দিনের পর দিন বিদেশি হ্যাকারদের সঙ্গে একটি অভ্যন্তরীণ চক্র সেই সুরক্ষিত সিস্টেম হ্যাক করার অপতৎপরতা চালি
য়েছে। নিরাপত্তা সিস্টেম হ্যাক করতেই ইন্টারনেট কানেকশন দেয়া হয়েছিল।

ঋণ জালিয়াতি: সরকারি ব্যাংক থেকে বেসরকারি ব্যাংকেও বছর জুড়ে ছিল ঋণ জালিয়াতির ভয়াবহ ছোবল। সর্বশেষ সরকারি খাতের সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকে ৭২৪ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির তথ্য উদ্ঘাটন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকে ৪১১ কোটি টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকে ৩১৩ কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। এগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই ঘটেছে বেআইনিভাবে ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অনেক ক্ষেত্রেই পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ঋণপ্রস্তাব পর্ষদে পাঠানোর আগে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়নি। বেআইনিভাবে ঋণ নবায়ন হয়েছে ভূরি ভূরি, ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে যথেষ্ট জামানত নেই। ব্যাংক কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ছাড়াই ঋণ দেওয়ার নজিরও রয়েছে। অনেক গ্রাহকের ঋণপ্রস্তাবের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই।

সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকে গত বছর পরিচালিত বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত পরিদর্শনে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ওই প্রতিবেদন দুটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এতে ওই সব অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে ভবিষ্যতে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত অনিয়মগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

বিদায়ী বছরে রূপালী ব্যাংকে হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির তথ্যও গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। ব্যাংকটির গুলশান, রমনা, মতিঝিল ও স্থানীয় কার্যালয় থেকে এসব টাকা বেহাত হওয়ার অভিযোগ উঠে। অভিযোগ পাওয়া যায়, ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি চক্র নয়টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে যোগসাজশ করে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বেহাত করেছেন।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- মেসার্স ইনডেক্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি লিমিটেড, মেসার্স তুরাগ এগ্রিটেক লিমিটেড, গাজীপুর পেপার্স বোর্ড লিমিটেড, শফিক স্টিল, মাফিয়া শিপ ব্রেকার্স, ক্রিস্টাল শিপ ব্রেকার্স, নাসিব এন্টারপ্রাইজ, জেনারেটর হাউজ ও এসআরএস শিপ ব্রেকার্স।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের দুদক ভীতি: ব্যাংকের অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে বিদায়ী বছরে বেশ কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তাকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বছরটিতে রাষ্ট্রায়ত্ব সোনালী, জনতা, বেসিকসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করা হয়। যদিও বিভিন্ন প্রভাব বলয়ে গ্রেফতার হওয়া কর্মকর্তারা পার পেয়ে গেছেন। এ বছরেই দুর্নীতি মামলায় তিন ব্যাংক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন ওরিয়েন্টাল ব্যাংক লি. (বর্তমানে আইসিবি ইসলামী ব্যাংক লি.), কারওয়ান বাজার শাখার জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (বর্তমানে জিএম) হুমায়ুন কবির, একই শাখার সাবেক এক্সিকিউটিভ অফিসার আশফাকুল হাকিম এবং জনতা ব্যাংক লি. উত্তর খান শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মোজাহার আলী।

খেলাপী ঋণ ও মামলার বোঝা বেসরকারি ব্যাংকেও: বছর জুড়ে ব্যাংকগুলোতে ভারী হয়েছে খেলাপী ঋণের বোঝা। খেলাপি ঋণ আদায়ে হাজার হাজার মামলার বোঝা ব্যাংকগুলোর কাঁধে। যা এতোদিন সরকারি ব্যাংকগুলোতে জেঁকে বসলেও এখন বেসরকারি ব্যাংকের ওপরও ভর করেছে। বেসরকারি অন্তত ২৯টি ব্যাংকে অনিষ্পন্ন মামলা রয়েছে ২৮ হাজার ৬২৪টি। আর এসব মামলায় আটকে আছে ৫১ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সংখ্যার দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি মামলার বোঝা ইর্স্টান ব্যাংকের (ইবিএল) কাঁধে। ৬ হাজার ১২৬টি মামলার এই ব্যাংকের আটকে আছে ১ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা। শুধু যে টাকা আটকে আছে তা নয়, টাকা আদায়ের মামলা পরিচালনার জন্য লোকবল নিয়োগ ও পরিচালনায় ব্যয়ও হচ্ছে প্রচুর। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউসিবিএ, ব্যাংকটির ৫ হাজার ২৫টি মামলায় আটকে আছে ২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রাইম ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯ টি মামলায় ২ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১ হাজার ৪৪৫টি মামলায় ৬ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংকের ১ হাজার ৩৭০টি মামলায় ১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, উত্তরা ব্যাংকের ১ হাজার ২১৮টি মামলায় ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ১ হাজার ১৩৩ টি মামলায় ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা আটকে আছে। সোশ্যাল ইসলামীর ৯৮৯ টি মামলায় ২ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কর্মাসের (এনসিসি) ৮৯৬টি মামলায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইলের ৭৮৪টি মামলায় ২ হাজার ৫২ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংকের ৬৭৭ টি মামলায় ৩ হাজার ৩১১ কোটি টাকা, ওয়ান ব্যাংকের ৬৬৭টি মামলায় ৮১৬ কোটি টাকা, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৬৩৪টি মামলায় ১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা, এবি ব্যাংকের ৫১৮টি মামলায় ৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ৫৯০টি মামলায় ১ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা, সাউথ ইস্ট ব্যাংকের ৫২৯টি মামলায় ৪ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা, ইর্স্টান ব্যাংকের ৬ হাজার ১২৬টি মামলায় আটকে আছে ১ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা, ইউসিবির ৫ হাজার ২৫টি মামলায় আটকে আছে ২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা।

এটিএম কার্ড কেলেঙ্কারী: বছরটিতে এটিএম কার্ড কেলেঙ্কারি ছিল ভয়াবহ। যার নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত তদন্তে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক। বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকের গ্রাহকদের এটিএম কার্ডের তথ্য চুরি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা খতিয়ে দেখতে তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এটিএম বুথ থেকে কার্ড জালিয়াতের মাধ্যমে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনায় মামলা দায়ের করে বেসরকারী খাতের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। রাজধানী ঢাকার বনানী থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। ইউসিবির কর্মকর্তা মাহবুবুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। অভিযোগ মতে, ব্যাংকের এটিএম বুথের মধ্যে লুকানো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে এটিএম কার্ডের তথ্য জালিয়াত করে টাকা তুলে নেয়ার ঘটনা প্রথম ধরতে পারেন ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের কার্ডধারী এক গ্রাহক। ঘটনার একই দিনে ব্যাংকটির ২১জন গ্রাহক তাদের একাউন্ট থেকে অজ্ঞাতভাবে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে ইবিএলকে জানায়। অন্যদিকে ইউসিবিএল ও দ্যা সিটি ব্যাংকের এটিএম কার্ডধারী কিছু গ্রাহকের টাকাও জালিয়াত চক্র তুলে নেয়।

সর্ব নিম্ন সুদ হার: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে উঠে এসেছে, গত পাঁচ বছরে ব্যাংকগুলোতে গড় ঋণের সুদহার কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ। যদিও অনেক ব্যাংক বর্তমানে ৬ থেকে ৭ শতাংশ সুদেও ঋণ দিচ্ছে। তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর শেষে ব্যাংকগুলোর গড় ঋণের সুদহার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে। আগের বছর ২০১৫ সালে একই সময়ে ছিল ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ২০১৪ সালে ছিল ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ, ২০১৩ সালে ছিল ১৩ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ২০১২ সালে ঋণের সুদহার ছিল ১৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে এবিবির প্রেসিডেন্ট বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান বলেন, বর্তমানে দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে ঠিক আছে। কিন্তু বর্ধিত সেই কিছুটা গ্যাস-বিদ্যুৎ দিয়ে উদ্যোক্তাদের চাহিদা পূরণ সম্ভবপর হয়তো হচ্ছে না। আর অবকাঠামো সমস্যা তো উদ্যোক্তাদের পিছুই ছাড়েনি। এ গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত সমস্যায় উদ্যোক্তারা মূলত আটকে যাচ্ছেন বড় কোনো বিনিয়োগে। যার প্রভাবে ব্যাংকের সুদ হার কমিয়েও তাতে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এখন উদ্যোক্তাদের মূল সমস্যা দূর না করে তাদের পেছনে টাকা নিয়ে ছুটলে তো নিরর্থকই হবে।

ঋণ দিতে গ্রাহক না পাওয়া: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রথম তিন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে। তিন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরের এই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গত জুনে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।

অবশ্য ঋণ না নেয়া ও বিনিয়োগ কমার এ বিষয়টি আরও জোরালোভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে। রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটির তথ্যানুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার কয়েক বছর ধরে কমছে। বেসরকারি বিনিয়োগের নিম্নমুখী প্রবণতার কারণেই এমনটি হচ্ছে। বিবিএসের তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২ দশমিক ৭ শতাংশ থাকলেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা কমে ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়ায়।

অলস টাকার পাহাড়: নিয়মানুযায়ী দেশের ব্যাংকগুলোকে নগদ ও বিধিবদ্ধ (সিআরআর ও এসএলআর) বিভিন্ন উপকরণে অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। সব মিলিয়ে এ জন্য রাখতে হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য রাখতে হয় আরও কিছু নগদ অর্থ। অথচ বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে তারল্য রয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকার ওপরে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থ বেশি আছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ অবকাঠামো অসুবিধা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সুশাসনের অভাব ও যথাযথ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ না থাকায় সুদহার কমার পরও বিনিয়োগ বাড়ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। যে কারণে একদিকে ব্যাংকিং খাতে পুঞ্জীভূত তারল্য বা অলস টাকা বেড়েছে। অন্যদিকে ধারাবাহিকভাবে কমেছে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি।

পুঁজিবাজার রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যর্থতা: কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি পুঁজিবাজারের দায়িত্ব না নিলেও এর অনেক নীতি পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করে। ব্যাংকের বিভিন্ন নির্দেশনায় পুঁজিবাজারের উত্থান-পতনও ঘটে। কিন্তু বিগত ২০১০ সালে পুঁজিবাজারের ভয়াবহ ধ্বস ও কেলেঙ্কারির পর এমন কোন উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রহণ করেনি যা পুঁজিবাজারের ক্ষত মুছতে সহায়তা করে।

নিউজনিক্সটবিডি/ডেস্ক


সর্বশেষ

আরও খবর

বিমানের বহরে পঞ্চম বোয়িং

বিমানের বহরে পঞ্চম বোয়িং


অভিযুক্তদের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় নিল শোভন-রাব্বানী

অভিযুক্তদের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় নিল শোভন-রাব্বানী


‘সন্তানের জন্য যা যা করতে হয় প্রধানমন্ত্রী তাই আমার জন্য করেছেন’

‘সন্তানের জন্য যা যা করতে হয় প্রধানমন্ত্রী তাই আমার জন্য করেছেন’


দাঙ্গার পর দ্বিতীয় রাতেও শ্রীলঙ্কাজুড়ে কারফিউ, গ্রেফতার ৬০

দাঙ্গার পর দ্বিতীয় রাতেও শ্রীলঙ্কাজুড়ে কারফিউ, গ্রেফতার ৬০


নাটোরে মা ও প্রতিবন্ধি সন্তানের মরদেহ উদ্ধার

নাটোরে মা ও প্রতিবন্ধি সন্তানের মরদেহ উদ্ধার


ইগলু আইসক্রিমকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা

ইগলু আইসক্রিমকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা


বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশে ফিরছেন ওবায়দুল কাদের

বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশে ফিরছেন ওবায়দুল কাদের


খ্রিস্ট ধর্মীয় অনুভূতি: কবি ও সাংবাদিক হেনরী স্বপন গ্রেপ্তার

খ্রিস্ট ধর্মীয় অনুভূতি: কবি ও সাংবাদিক হেনরী স্বপন গ্রেপ্তার


কক্সবাজারে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৩

কক্সবাজারে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৩


ভূমধ্যসাগরে নিহত ২৭ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে

ভূমধ্যসাগরে নিহত ২৭ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে