Saturday, May 16th, 2020
ভয়ের রাজ্য!
May 16th, 2020 at 3:27 pm
ভয়ের রাজ্য!

মাসকাওয়াথ আহসান: 

“I have no problem with god – it’s his fan club that scares me.” ― A.B. Potts

এই উদ্ধৃতিটি আমাদের যাপিত জীবনে প্রায়ই মনে পড়ে। সবুজ গাছপালা ছায়া ঢাকা মসজিদে গিয়ে প্রার্থনা করার মাঝে আনন্দ আছে। আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার; কিংবা এই আমার সঙ্গে আমার গভীরে ঘুমিয়ে থাকা সত্য-সুন্দর কল্যাণের যোগাযোগ তৈরির আদর্শ জায়গা হলো মসজিদ। আল্লাহর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়ার এই প্রার্থনার মাঝে; তৃতীয় পক্ষের অনধিকার চর্চাটি আমার ভালো লাগে না। কেউ উপযাচক হয়ে আল্লাহর ম্যানেজার হিসেবে উপস্থিত হয়ে কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক; আমার কী করা উচিত; কী করলে আমি বেহেশতে যেতে পারবো; এসব জ্ঞান কেউ দিতে এলে তাকে আমার ভয় লাগে।

ধর্মের এই ম্যানেজার ভীতির মতোই রাজনীতির ও দেশপ্রেমের ম্যানেজারদের দেশপ্রেম পরীক্ষা; কী করলে “আসল” দেশপ্রেমিক হওয়া যাবে; এইসব অনধিকার চর্চাকে ভীষণ অপছন্দ করি।

প্রেমিকার সঙ্গে প্রেম করার জন্য; প্রেমিকার মায়ের কাছে “বাণী চিরন্তনী” শোনা যেমন বিরক্তিকর। আসল কথা হচ্ছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে যে কোন হস্তক্ষেপই ভীতিপ্রদ।

আবার আমি কোন কবির কবিতা পড়ার কালে সাহিত্যের ম্যানেজার যখন বলেন, উনি অমুক পার্টির সমর্থক; আপনি তার কবিতা পড়বেন না; পড়লে ঐ পার্টির লোক হিসেবে পরিগণিত হবেন।

আমার কাছে নির্মলেন্দু গুণের কবিতার টেক্সট জরুরি; বিবেচ্য আল-মাহমুদের কবিতা; উনারা কী লিখেছেন; তা আমার চর্চার জায়গা। উনারা কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক; তা আমি দেখতে যাবো কোন দুঃখে! শেক্সপীয়ার বা টি এস এলিয়ট কোন রাজনৈতিক দল সমর্থন করতেন; তাতে আমার কী! আমি পড়ি শিখি তাদের রেখে যাওয়া সৃষ্টিকর্ম থেকে।

বাংলাদেশে শিল্প-সাহিত্যের জগতে যারা কাজ করেন; তারা সমাজের কাছে শিশুকাল থেকেই শোনেন, এসব ছাইপাশ লিখে কী হবে! বই লিখে পেটের ভাত জোটাতে পেরেছে কে কবে?

সমাজের এ তিক্ত মনোভাবের কারণ রয়েছে; তারা অনেক শিল্পীকে না খেয়ে বা বিনা চিকিতসায় মরতে দেখেছে। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের মতো প্রবাদ প্রতিম লেখক হুঁশিয়ার করে গেছেন, আগে পেটের ভাতের বন্দোবস্ত করে তারপর সাহিত্য করতে এসো।

উপমহাদেশের এই বোধহীন সমাজে বিদ্রোহী কবি নজরুল কিংবা বিদ্রোহী গল্পকার সাদাত হাসান মান্টোর ট্র্যাজেডি দেখার পরেও তরুণেরা কবিতা লেখে আজো; আজো তারা শিল্প-সাহিত্য নিয়ে স্বপ্ন দেখে।

এর কারণ হচ্ছে; যাপিত জীবনের সবচেয়ে আনন্দের জায়গা এই কবিতা ও গান আর গল্প। বাকিটা একটা রুটিন ব্যাপার।

বাংলাদেশ গানের দেশ-কবিতার দেশ বলে, কৃষক-মাঝি থেকে শহুরে ব্যাংকার-রসায়নবিদ কবিতা লিখতে পারেন; গান গাইতে পারেন।

বাংলাদেশের ষাটের ও সত্তরের দশক দুটি ফ্রান্সের রেনেসাঁ-র সময়ের মতো শিল্প-সাহিত্যে নবজাগরণের সময়। এই সময়ে কবিতা-গল্প-গান-চলচ্চিত্র-চিত্রকলা; শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখায় ফুল ফুটেছে। সংস্কৃতির এই বসন্তে বিউটি বোর্ডিং-এ একদল সৃজনশীল মানুষ বাংলাদেশ মনীষার স্বরূপ সন্ধান করেছেন।

শিল্প-সাহিত্যের জগত এক ঘোর লাগা আনন্দের জগত। সে কারণে প্যারিসে কিংবা ঢাকায় নব্বুই দশক পর্যন্ত বোহেমিয়ান তরুণদের জীবনের “ঘুড্ডি” ওড়াতে দেখা যায়। ১৯৬০-১৯৯০ এই হচ্ছে বাংলাদেশের সোনালী যুগ। এসময়ে বাংলাদেশের কবিতা পৌঁছে গেছে এর হিরণ্ময় গন্তব্যে।

এরপর বোহেমিয়ান তরুণরা নিষিদ্ধ হয় এ শহরে। শার্ট ইন করে কোমরে বেল্ট বেঁধে স্যু শাইনার দিকে ঝকঝকে করে তোলা জুতা পরে মচ মচ করে হেঁটে যাওয়া কালচার শুরু হয়। শিল্প-সাহিত্য ভয় পেয়ে এ শহর ছেড়ে পালায়।

যেহেতু ষাটের-সত্তরের দশকের কবিতার মিনারটি অতিক্রম করার শক্তি নাই; তাই শুরু হয় কবিতার মিনার ভাঙ্গা। আইকন ভাঙ্গার খেলা। ষাটের-সত্তরের দশকের কোন শিল্প-সাহিত্যের গুণী মানুষের মৃত্যু হলেই; লিলিপুটিয়ান আর ব্লেফুসকুডিয়ানরা কেউ মৃত ব্যক্তিকে দেবতা বানিয়ে পূজা করে; কেউ তাকে দানব বানাতে উঠে পড়ে লেগে যায়।

লিলিপুটিয়ান আর ব্লেফুসকুডিয়ানরা ধর্মীয় ও দলীয় অনুভূতির লোক। লোকটা কী লিখেছেন; কী গেয়েছেন; সে নিয়ে কথা নেই; লোকটা কোন দলকে সমর্থন করেছিলেন সেটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়।

সোনালি যুগের মানুষের চলে যাওয়ায় তাকে যে নিভৃতে একটু স্মরণ করবেন; সে সুযোগ নেই। ক্যানিবালদের নর-মাংস ভক্ষণের কৃত্যটি আজকাল আরো বেশি দেখা যায়; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে।

ক্যানিবাল নিজে সৃষ্টিশীল মানুষ নয়; সৃষ্টির চেষ্টা করে ব্যর্থ অনেকেই। তাই তারা এখন শিল্প-সাহিত্যের ম্যানেজার। সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে আমার কোন সমস্যা নেই। সমস্যা স্বঘোষিত ম্যানেজারদের নিয়ে; তাদের নৃশংসতা আর কর্কশতাকে ভয় পাই ।

মাসকাওয়াথ আহসান: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক

সর্বশেষ

আরও খবর

করোনার শহর

করোনার শহর


প্রকৃতির স্থিতি আর আমাদের অস্থিরতা: কোভিড-১৯ পরবর্তী ভাবনা

প্রকৃতির স্থিতি আর আমাদের অস্থিরতা: কোভিড-১৯ পরবর্তী ভাবনা


“পার্টি পোয়েট রেপিড টেস্টিং কিট”

“পার্টি পোয়েট রেপিড টেস্টিং কিট”


করোনার ক্রান্তিলগ্নে দাড়িয়ে বিশ্ব, আসলে দায় কার?

করোনার ক্রান্তিলগ্নে দাড়িয়ে বিশ্ব, আসলে দায় কার?


করোনা গদ্য

করোনা গদ্য


শাড়ি

শাড়ি


করোনার ডিটেনশন ক্যাম্প

করোনার ডিটেনশন ক্যাম্প


লেমিনেটেড পোস্টার: কেউ কিছু বলছে না দেখেই আদালতের রুল

লেমিনেটেড পোস্টার: কেউ কিছু বলছে না দেখেই আদালতের রুল


গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকবে বইমেলা

গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকবে বইমেলা


সিটি নির্বাচনে পেছালো গ্রন্থমেলাও, শেষ হবে ২৯ ফ্রেব্রুয়ারি!

সিটি নির্বাচনে পেছালো গ্রন্থমেলাও, শেষ হবে ২৯ ফ্রেব্রুয়ারি!