Tuesday, June 21st, 2016
ভারতীয় সঙ্গীতের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ
June 21st, 2016 at 1:21 am
ভারতীয় সঙ্গীতের  উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ

শুভ কর্মকারঃ ৬৪ কলার মধ্যে সঙ্গীতকে বলা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ কলা বিদ্যা। সঙ্গীত সম্পর্কিত প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ “সঙ্গীত পারিজাত” গ্রন্থের রচয়িতা অহোবল সঙ্গীতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “গীতং, বাদ্যং, নৃত্যং ত্রয়ং সঙ্গীত মূচ্যতে” অর্থাৎ গান, বাদ্য ও নাচ এই তিনটির সম্মিলিত রূপকেই সঙ্গীত বলে। কিন্তু শাস্ত্র যাই বলুক মনের কথা সুর দিয়ে প্রকাশ করাকেই সঙ্গীত বলে মনে করি আমি; সে হোক যন্ত্র, মন্ত্র, কণ্ঠ কিংবা নৃত্যের মাধ্যমে। সঙ্গীতের উৎপত্তি মানব সৃষ্টির মতই অজানা। কখন ও কোথায় এ রহস্য কিন্তু আজও উন্মোচিত হয়নি। কোনটা কার আগে সৃষ্টি তার সঠিক তথ্য আজও মেলেনি। কিন্তু সৃষ্টিতত্ত্ব অজ্ঞাত থাকলেও রয়েছে এর ধারাবাহিকতা। ধারাবাহিকতার আদলে উদ্ভব হয়েছিল সঙ্গীতের নতুন নতুন ধারা ও রূপ, আবার পালাক্রমে তা হয়েছে লুপ্ত।

সঙ্গীতের উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কিত আলোচনা বিশ্ব সঙ্গীতের আলোকে করা বেশ গবেষণা ও সমন্বয়ের বিষয়। অন্যদিকে বিশ্বসঙ্গীতে ভারতীয় উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রয়েছে বিপুল প্রভাব বিস্তারকরনের ক্ষমতা। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বলতে যদি কেউ বুঝে থাকেন বর্তমান ভারত নামক দেশের সঙ্গীতকে তাহলে বিরাট ভুল হবে। ৪০০০ বছর পুরানো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দাবীদার ও চর্চার ক্ষেত্র শুধু বর্তমান ভারত নয়, বৈদিক যুগ হতেই সমগ্র উপমহাদেশ(বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ) এ সমৃদ্ধ সংস্কৃতির গর্বিত ধারক ও বাহক। ভারতীয় উপমহাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ এমনকি পশ্চিমা দেশগুলোতে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্থানে থাকার প্রেক্ষিতে ভারতীয় সঙ্গীতের আলোকে সঙ্গীতের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে গবেষণা করা উপযুক্ত মনে করেছি আমি।

ভারতীয় সঙ্গীতের ভিত্তি গড়া এবং পর্যায়ক্রমে বেড়ে উঠতে লেগেছে হাজার যুগ ও মনিষীদের অবদান। ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীতের উদ্ভব ও বিকাশকে নিন্মোক্ত ৫টি যুগ ভেদে ভাগ করে তুলে ধরা যায়:

১। সিন্ধু সভ্যতা যুগ(খ্রিষ্টপূর্ব৩০০০-২০০০)

২। বৈদিক যুগ (খ্রিষ্টপূর্ব২০০০-১০০০)

৩। বৈদিকত্তর যুগ (খ্রিষ্টপূর্ব১০০০-খ্রিষ্টাব্দ১২০৬)

৪। মধ্যযুগ (১২০৭-১৭৫৭খ্রিঃ)

৫। আধুনিক যুগ (১৭৫৭- বর্তমান)


১। সিন্ধু সভ্যতা যুগ – খ্রিষ্টপূর্ব(৩০০০-২০০০)

সিন্ধু নদের তীরে গড়ে উঠা সিন্ধু সভ্যতায় প্রকৃতি পূজারী মুনি-ঋষিদের কাছে ভারতীয় সঙ্গীত হল দেবদেবী হতে প্রাপ্ত ঐশ্বরিক জ্ঞান। সে সময় সাম বেদের মন্ত্র গুলি সাধারণভাবে গাওয়া হত, তাই প্রথম অবস্থায় ৩ টি নোট(সা, রে, গা) দিয়েই কাজ চলে যেত। মন্ত্র উচ্চারণের স্বরাগমও ছিল সহজ।যেমন – গা গা -রে রে -সা সা সা । উপমহাদেশের প্রাচীন সঙ্গীতের পরিচয় পাওয়া যায় সিন্ধু সভ্যতা যুগে(খ্রিষ্টপূর্ব৩০০০-২০০০) পাওয়া মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার  অনেক মূল্যবান নিদর্শনের পাশাপাশি নানা প্রকার চামড়ার বাদ্যযন্ত্র, তন্ত্রীযুক্ত বীণা, বাঁশী, মৃদঙ্গ, করতাল ও নৃত্যশীলা নারীমূর্তি ইত্যাদির মাধ্যমে। এ যুগের শিক্ষাব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত ছিল বলে জানা যায়।

২। বৈদিক যুগখ্রিষ্টপূর্ব (২০০০-১০০০):

বৈদিক যুগে খ্রিষ্টপূর্ব(২০০০-১০০০) গড়ে উঠাসামগ নামে আচার্যদের তত্ত্বাবধানে তিনটি স্বরকে(স ম গ) নিয়ে সামবেদের মন্ত্রগুলোকে সুর করে গাওয়া হত। তাছাড়া, বেদের মন্ত্রগুলোকে সুর দিয়ে গাওয়ার জন্য সাম বেদ নামে আলাদা একটি অংশ ভাগ করা হয়। সামবেদের সঙ্গীতকে আবার চার ভাগে ভাগ করা হয়, যার মধ্যে দু ধরণের গান ছিল; সমবেত সঙ্গীত, আর বাকি দু ধরণের ছিল একক সঙ্গীত। একপর্যায়ে ঋষিরা লক্ষ্য করেন তিনটি নোট দিয়ে কাজ চলছিল না। প্রকৃতি পূজারী ছিলেন বিধায় সবকিছুতেই প্রকৃতি নির্ভর ছিলেন প্রাচীন ঋষিরা। বিভিন্ন পশুপাখির আওয়াজ শুনে তাঁরা তৈরি করলেন সাতটি স্বর বা নোট। যথাক্রমেঃ

ষড়জ (সা), ঋষভ (রি), গান্ধার (গা), মধ্যম (মা), পঞ্চম (পা), ধৈবত (ধা), নিষাদ (নি)

সামবেদে মোট ৪৯ রকমের তাল, ২১ রকমের মূর্ছনা আর ৭ টি মূল স্বর এর উল্লেখ আছে। ভিন্ন ভিন্ন দেবতা হতে প্রাপ্ত জ্ঞান হিসেবে বিভিন্ন প্রাণীর ডাকের সাথে মিলিয়ে প্রাচীন ঋষিরা স্বরগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ রেখে দেহের অভ্যন্তরীণ যোগশাস্ত্রের আধ্যাত্মিক চক্রে প্রতিস্থাপন করে স্বরগুলোকে প্রচলন করেন। নিচের ছবিটি দেখলে পুরো ব্যাপারটি ভালভাবে বোঝা যাবে।

1 swar

স্বরের উৎপত্তি, অর্থ, যোগচক্রানুযায়ী অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট দেবতা

বৃটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক স্টুয়ার্ট পিগট বৈদিক যুগের গানে সাত সুরের ব্যবহার নিয়ে বলেছিলেন, “There are some interesting evidence for Aryan Music. Cymbals were used to accompanying dancing, and in addition to this and the drum there were reed flutes or pipes, a stringed instrument of the lute class, and sharp of lyre which is mentioned as having seven tones or notes. This last piece of information is important for our knowledge of ancient music.”1

৩। বৈদিকত্তর যুগ – খ্রিষ্টপূর্ব(১০০০-খ্রিষ্টাব্দ১২০৬)

ইতিমধ্যেই প্রাচীন সাতটি স্বর থেকে আরো পাঁচটি উপস্বর জন্ম নিয়ে স্বরের সংখ্যা দাঁড়ালো ১২ টি। বৈদিকত্তর যুগ(খ্রিষ্টপূর্ব১০০০-খ্রিষ্টাব্দ১২০৬) ও পরবর্তী সময়ের প্রামাণ্য সঙ্গীত গ্রন্থ নামে পরিচিত ভরত রচিত “নাট্যশাস্ত্র” ও মতন্নগ রচিত “বৃহাদ্দেশী” গ্রন্থগুলোতে সঙ্গীত এবং এর শ্রুতি, স্বর,মূর্ছনা, নৃত্য, নাট্য ইত্যাদির বর্ণনা পাওয়া যায়। ভরত ছাড়াও মতঙ্গ, বিট্ঠল, দামোদর, সোমনাথ, অহোবল, ব্যাঙ্কটমুখী, হৃদয়নারায়ন দেব, পণ্ডিত ভাবভট্ট, শ্রীনিবাস, মহাকবি কালিদাস ইত্যাদির সংগীত শাস্ত্রবিদের নাম ও তাদের রচিত নানা পুস্তকের সন্ধান পাওয়া যায়। তৎকালীন সমাজ ও সভ্যতা গড়ে ওঠা সাংগীতিক মহলের বড় প্রমাণ হল সংস্কৃত সাহিত্যের মহাভারত, রামায়ণ ও বৈষ্ণবদের সঙ্গীত বিষয়ক তথ্য উপাত্তগুলো ।

2 Corja

চর্যাপদের গীতি

একাদশ শতাব্দীতে বৌদ্ধ শাসনামলে গড়ে উঠা প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজ ব্যবস্থায়ও সংগীতের ছাপ সুস্পষ্ট। সম্রাট সমুদ্র গুপ্তকেও তাঁর আমলের স্বর্ণমুদ্রায় বীণা হাতে দেখা যায়। সন্ধ্যা ভাষায় বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য কর্তৃক রচিত “চর্যাগীতি” এবং বিভিন্ন তত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদকে জোর দিয়ে রচিত বজ্র গীতি, গীত গোবিন্দ”  গুলো তৎকালীন নানা উৎসবে গাওয়া হত।

৪। মধ্যযুগ (১২০৭-১৭৫৭খ্রিঃ)

সংগীতের স্বর্ণযুগ বলায় হয় মধ্যযুগকে(১২০৭-১৭৫৭খ্রিঃ)। মধ্যযুগের পূর্ব পর্যন্ত ভারতীয় সঙ্গীত শুধু তৎকালীন হিন্দু ও বৌদ্ধদের আয়ত্তে ছিল। এ সময় ভারতীয় সঙ্গীতে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বিভিন্ন গায়কী, ঘরানা বা স্টাইলের প্রভাবে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়ে বিকাশ ঘটতে থাকে সঙ্গীতের নতুন নতুন ধারার। তৎকালীন সময়ে বড়ু চণ্ডিদাস রচিত ‘শ্রী কৃষ্ণ কীর্তন’  গ্রন্থে দেব দেবীর পূজার্চনায় কীর্তনের প্রমাণ মেলে। এ সময়কালের রাজা,সুলতান, শাসকেরা সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যযুগে সঙ্গীত আসে আমূল পরিবর্তন। ভারতবর্ষের সংগীতে পারস্যের ছোঁয়া লেগে দুটি ধারায় বিভক্ত হয় ভারতীয় সঙ্গীতঃ

ক. হিন্দুস্তানি

খ. কর্ণাটকি

ক. হিন্দুস্তানি:

পারস্য ও আরবের সংগীতের সাথে মিশ্রিত হয়ে ভারতীয় সঙ্গীতে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত  নামে নতুন রূপ সৃষ্টি হয়। বৈদিক দর্শন, ভারতের দেশজ শব্দ-সুর এবং পারস্যের সাংগীতিক প্রভাবে হিন্দুস্তানি সঙ্গীত ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠে এর বিমোহন ক্ষমতার জন্য। সাতটি সুর ও ২২টি শ্রুতির সমন্বয়ে আরোহণ-অবরোহণ বিন্যাস, বাদী-সমবাদী স্বরের প্রয়োগ, মীড়, গমক ও অন্যান্য সাংগীতিক কৌশলের মাধ্যমে উচ্চাঙ্গ বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত রাগসমূহ পরিবেশন করা হয়। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারা সমসাময়িক ধর্মীয়, লোকগীতি এবং নাট্যকলার সাঙ্গীতিক প্রকাশ হতে স্বতন্ত্র রূপ লাভ করে। খেয়াল, ধ্রুপদ, ধামার, ঠুমরী, তারানা, ইত্যাদি সাংগীতিক ফর্মগুলো এসময় উৎকর্ষতা লাভ করে।

সুলতান আলাউদ্দিন খলজীর সভা গায়ক আমীর খসরু, জৌনপুরের শাসক সুলতান হুসেন শর্কী, ধ্রুপদের আবিষ্কর্তা গোয়ালিয়রের রাজা মানসিংহ তোমর, তাঁর সভা গায়ক বখশ, রাণী মৃগনয়নী ছিলেন সঙ্গীতের মধ্যযুগের দিকপাল। মোগল আমলে সম্রাট আকবরে সংগীতের অনেক কদর ছিল। অবাক করার মত হলেও সত্যি যে, আবুল ফজলের “আইন-ই-আকবরী” গ্রন্থে সম্রাট আকবরের ৩৬ জন সংগীতজ্ঞের নাম পাওয়া যায়। সম্রাট আকবরের পর সম্রাট জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, এবং আওরঙ্গজেবের আমলেও সংগীতের জয়যাত্রা অব্যাহত ছিল। “সদা-রঙ্গিলা বা চির প্রফুল্ল” খ্যাত সংগীতজ্ঞ সর্বশেষ মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের আমলে সঙ্গীত চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। তাঁর দরবার সঙ্গীতবিদদের পুণ্যস্থান বলে প্রচলিত ছিল। শ্রেষ্ঠ সংগীত কলাকার; প্রসিদ্ধ খেয়াল গানের রচয়িতা সদারঙ্গ ও অদারঙ্গ তাঁর দরবার অলংকৃত করেছিলেন, যাদের নাম ভারতীয় সঙ্গীত তাঁর অস্তিত্বের ইতিহাসে চিরজীবন মনে রাখবে।

3 artworkmain

রাজদরবারে সঙ্গীত পরিবেশন

খ. কর্ণাটকিঃ

দক্ষিণ ভারতে উদ্ভূত কর্ণাটকি সঙ্গীত বৈদিক সংস্কৃতি মেনে নিয়ে অপরিবর্তিত থেকে যায় বলে একে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আদি রূপ বলা হয়। কর্ণাটকি সঙ্গীতে ৭২টি শ্রুতি(মেলোডিক কোড) রয়েছে যেগুলোকে মেলাকারটা রাগ বলা হয়। এর সাথে সঙ্গত করবার জন্য রয়েছে ১০৮ ধরনের তাল।

4 Melakarta.katapayadi.sankhya.72

মেলাকারটা রাগঃ কর্ণাটকি ৭২টি শ্রুতি

দক্ষিণ ভারতীয় পদ্ধতিতে স্বরগুলোর ভিন্ন কম্পাঙ্কের অস্তিত্ব ও প্রয়োজনীয়তা, রাগসঙ্গীতে একই স্বরের আলাদা আলাদা শ্রুতি (আলাদা আলাদা কম্পাঙ্কের শব্দ) রাগ অনুযায়ী ব্যবহার তত্ত্বগতভাবে স্বীকার করা আছে। সাধারণতঃ শিল্পীরা চেষ্টা করেন সেই ভিন্নতা বজায় রাখার। যদিও এই আলাদা শ্রুতিগুলোর কম্পাঙ্ক একেবারে অনড় বা অপরিবর্তনীয়ভাবে বলে বেঁধে দেওয়া নেই। এ কারণেই সব রাগের স্বর দক্ষিণ ভারতীয় পদ্ধতিতে ঐরকম রে১,রে২, নি১, নি২ ইত্যাদি লিখে স্বরের শ্রুতিস্থান বোঝানো হয়। বেশ কয়েক দশক ধরেই পাশ্চাত্য স্কেলের পূর্ণ অনুকরণে সা থেকে নি পর্যন্ত মাত্র ১২টি অনড় স্বর বা শ্রুতিস্থান ব্যবহার করেই প্রাচীন ভারতীয় শ্রুতি-নির্ভর স্বরগুলির পরিবর্তে উত্তর ভারতীয় বা হিন্দুস্তানী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত পরিবেশন করা হচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী শিল্পী অবশ্যই আছেন যারা মূলপদ্ধতি অনুসরন করে চলেন।

কর্ণাটকি সঙ্গীতে অবদানের জন্য যিনি “পিতামহ” বা কর্ণাটকি সঙ্গীতের “পিতা” নামে খ্যাত তিঁনি Purandara Dasa (1480–1564) প্রায় ৪,৭৫,০০০ সঙ্গীত রচনা করেছেন যার বেশীর ভাগই হারিয়ে গেছে। পরবর্তী যুগের কর্ণাটকী সঙ্গীতের রচয়িতাদের প্রেরণা ছিলেন তিঁনি। এরপরেই রয়েছেন কর্নাটকি সঙ্গীতের ত্রিবর্গ  (Trinity of Carnatic music) নামে পরিচিত Tyagaraja(1759? – 1847), Muthuswami Dikshitar(1776–1827)এবং Syama Sastri(1762–1827)

কর্ণাটকি রচয়িতারা মূলত ধার্মিক। তাঁরা কন্নড, মালায়ালাম, সংস্কৃত, তামিল, তেলেগু প্রভৃতি ভাষায় জ্ঞানী ছিলেন। নিজেদের রচনায় তাঁরা নিজ পরিচয় জুড়ে দিতেন। যেমনঃ Tyagaraja তেলেগু ভাষায় রচনা করে মুদ্রা (নিজ নাম) বন্দীশে জুড়ে দিতেন, ঠিক তেমনি Muthuswami Dikshitar সংস্কৃত ভাষায় রচনা করে Guruguha  মুদ্রা ব্যবহার করতেন, Purandaradasa কন্নড ভাষায় রচনা করে Purandara Vittala, Gopalakrishna Bharathiতামিল  ভাষায় রচনা করে Gopalakrishnan, এছাড়াও কর্ণাটকী সঙ্গীতের ত্যাগরাজা(Tamil Tyagaraja of Carnatic music) হিসেবে পরিচিতPapanasam Sivan তামিল ও সংস্কৃত ভাষায় রচনা করে Ramadasan মুদ্রা ব্যবহার করতেন।

৫। আধুনিক যুগঃ

আধুনিক যুগে অর্থাৎ ১৭৫৭ সালের প্রথম কয়েকটি দশক সঙ্গীতের যাত্রা কিছুটা স্তিমিত থাকলেও বন্ধ ছিল না। জয়পুরের মহারাজা প্রতাপ সিংহ সঙ্গীত সম্মেলনের মাধ্যমে মিলিত করেন ভারতবর্ষের সেরা সংগীতজ্ঞদেরকে। সেখান থেকে রচিত হয়য় “সঙ্গীতসার” নামে মূল্যবান একটি গ্রন্থ।বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বিষ্ণু দিগম্বর পালুসকর ও পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ন ভাতখন্ডে ভারতীয় সঙ্গীতে বিপুল সংস্কার আনেন। পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ন ভাতখন্ডে ৬০,০০০ রাগ-রাগিনীকে ১০ টি ঠাটে অন্তর্ভুক্ত করে রাগের আবিষ্কার ও প্রচলনের ক্ষেত্রে সংস্কার সাধন করেন।

6 13624

সঙ্গীত সম্মেলন

এ সময়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত(হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটকি) ও পশ্চিমা উপমহাদেশের সঙ্গীত পরষ্পর পরস্পরের সাথে তাল মিলিয়ে গড়ে তোলে এক মেলবন্ধন। অদ্ভূতভাবে এই দুই ধরণের সঙ্গীতের স্বর বা নোটে পুরো মিল দেখে মনে হতে পারে কেউ কারোরটা নকল করেছে। ছবিতে ওয়েস্টার্ন নোট সাথে ভারতীয় নোট এর সম্পর্ক দেখলে পুরোপুরি বোঝা যাবে।

comparison
ভারতীয় সঙ্গীতের সাথে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সামঞ্জস্যতা

এ সময় সমগ্র ভারতবর্ষে সঙ্গীত ও সঙ্গীতবিজ্ঞদের আলোকের বেগে বিচ্ছুরন ঘটতে থাকে। পাটনায় রইস মোহাম্মদ রাজা, দিল্লীতে ওস্তাদ ওয়াজীর খাঁ, বোম্বাইয়ের পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ন ভাতখন্ডে,  মহারাষ্ট্রের পণ্ডিত ভি.জি. যোগ, উত্তর প্রদেশের ওস্তাদ মসিত খাঁ, বাকুড়ায় গোকুলচন্দ্র নাগ,যদুভট্ট, লৌখনৌর খলিফা ওয়াজেদ হোসেন খাঁ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সব্দর হোসেন খাঁ, ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ, আলী আকবর খাঁ, আফতাবউদ্দীন খাঁ,বারণাসীতে পণ্ডিত কিষেন মহারাজ,পন্ডিত রবিশংকর, পাঞ্জাবে ওস্তাদ আল্লারাখা, রাজশাহীতে রাধিকামোহন মিত্র, বরিশালে শীতলচন্দ্র মুখোপাধায়,বিহারে ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ, গৌরীপুরে বীরেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, জোড়াসাঁকোর তিমির বরন ভট্টাচার্য, গোয়ালিয়রে ওস্তাদ হাফেজ আলী খাঁ,কলকাতায় কৃষ্ণানন্দ ব্যাস, স্বামী প্রজ্ঞানন্দ, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ সহ অসংখ্য সঙ্গীতবিশারদের জন্মদাত্রী ভারতবর্ষীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরম ছায়ায় বেড়ে উঠে আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও সঙ্গীতের নানা বিভাগ। হাজারো পীর, ফকির, দরবেশ, বাউল, ও লোককবির পূণ্যভূমির এ উপমহাদেশে শাস্ত্রীয় সংগীতের নানা বিভাগের পাশাপাশি লোকগানের উত্তরণ কখনো স্থিরতো ছিলই না বরঞ্চ অনেক গতিশীল ছিল। ভজন, কীর্তন,কবিগান, তরজা, ঝুমুর, যাত্রাগান, রামায়ণের গান, গাজীর পালা, পাঁচালী, মনসা মঙ্গল, মহুয়ার পালা, রামপ্রসাদী, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, ধুয়া, জারি,সারি, মারফতি, মুরশিদি, মরশিয়া, বারাশিয়াসহ নানা ধরনের পালাগান, ব্রম্মসংগীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলসংগীত, জাগরণী, অতুল প্রসাদের গান,রজনীকান্তের গান, আধুনিক গান ও শ্যামাসংগীতসহ নানা রূপ ও ভাগে সমৃদ্ধ হয়ে আছে বাংলাগান।

অনেক পপ, রক, আধুনিক, রবীন্দ্র, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে শুধু গলা সাধার যন্ত্র মনে করেন যা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারনা। ধ্রুপদ, খেয়াল, তারানা, ত্রিবট, চতুরঙ্গ শুনলে হয়ত বুঝবেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কোন ব্যাকরন বা ব্যায়াম নয়, গানের মত করে উপভোগ কিংবা চর্চার মতই একটি বিষয়। কোন দেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সে দেশের কোন সঙ্গীত ধারার জননী বা ‘বেসিক’ ভাবাটা ভুল। অন্যদিকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে দখল থাকলেই যে সকল ধরনের গান গাওয়া সম্ভব সেটিও ঠিক নয়। উদারণস্বরুপ বলা যায়, নজরুল সঙ্গীতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব অত্যন্ত প্রবল বলে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পারদর্শী কোন শিল্পী নজরুল সঙ্গীতে অত্যন্ত পারঙ্গম হবেন সেটা ভিত্তিহীন। এজন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গানগুলো রচনার সময় সনাতনী ধারাকে এড়িয়ে ক্লাসিক পর্যায়ের না করে আধুনিক ঘরানার গান হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইতেন।

বর্তমানে ভারত সরকার ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রসারে সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা প্রদান করে যাচ্ছেন। সেখানকার স্কুল কলেজে পাঠ্যসূচীর মধ্যে সঙ্গীত অন্যতম শিক্ষণীয় বিষয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পাটনা, বারাণসী, আগ্রা, নাগপুর, কাশ্মীর, পাঞ্জাব, বরোদা, রবীন্দ্রভারতী, বিশ্বভারতী প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীত পাঠক্রম হিসাবে গৃহীত হয়েছে। প্রয়াগ, লখ্নৌ, কানপুর, বারাণসী, মুম্বাই, কলকাতাতে নিয়মিত আয়োজিত হচ্ছে সঙ্গীত সম্মেলন।

স্বাধীন বাংলাদেশে দেশের বিভিন্ন স্থানে সঙ্গীত শিক্ষা দানের জন্য উচ্চ শ্রেণীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জনসাধারণের মধ্যে সঙ্গীত বিষয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। ওস্তাদ মুন্‌শি রইসউদ্দীন, বারীন মজুমদার, অধ্যক্ষ সুরেশ চক্রবর্তী, ওস্তাদ ফজলে হক, পণ্ডিত জগদানন্দ বড়ুয়া, নীরদবরণ বড়ুয়া, ওস্তাদ মিহির লালা, পণ্ডিত রামকানাই দাস, সুধীন দাশ, সনজিদা খাতুন প্রমুখগণ অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ব্যক্তিপর্যায়ে গড়ে তোলেন সঙ্গীত বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়। ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলায় গড়ে উঠে শিল্পকলা একাডেমী। আজকাল নিয়মিত সঙ্গীত সম্মেলন হচ্ছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ,বরিশাল, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট প্রভৃতি শহরে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এসকল যুগ ও কীর্তিমান সঙ্গীতজ্ঞগণ শুধু এ উপমহাদেশ নয়, সমৃদ্ধ করেছেন বিশ্বসঙ্গীতের ভাণ্ডারকে।

আধুনিক সময়কাল অবধি ভারতীয় উপমহাদেশে তিন গোত্র(বীণা, তত, আনদ্ধ-ঘন-শুষির গোত্র) মিলিয়ে মোট ১৫৯টি ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র, অর্ধশত সঙ্গীতধারা ও নানান সাংগীতিক ঘরানার প্রচলন পাওয়া গেছে। পাশ্চাত্যের সকল কন্ঠ ও যন্ত্রসঙ্গীত ধারার ভিত্তি ধরা হয় ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিকে। সেজন্য অনেক সংগীতবিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন যে সংগীতের আদিভূমি ভারতীয় উপমহাদেশ।

শুভ কর্মকার (1)

লেখকঃ সঙ্গীত শিল্পী ও শিক্ষার্থী


সর্বশেষ

আরও খবর

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?


প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ

প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ


দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন

দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন


দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন

দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ