Friday, October 26th, 2018
মধ্যরাতে হেনস্থা, নারী স্বাধীনতা এবং কিছু প্রসঙ্গকথা
October 26th, 2018 at 6:54 pm
মধ্যরাতে হেনস্থা, নারী স্বাধীনতা এবং কিছু প্রসঙ্গকথা

কনক হায়দার:

স্বাধীণ বাংলাদেশের সংবিধান প্রনয়নের সময়টিতে ভারতীয় উপমহাদেশে সংবিধান বিশেষজ্ঞ মহলে সুনাম কুড়িয়েছিল, প্রশংসিত হয়েছিল। সংবিধানটি একজন নাগরিকের দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে আমরা নাগরিকের মৌলিক এবং মানবিক অধিকার সংক্রান্তে অনুচ্ছেদগুলো পাঠ করলে কোথাও লিঙ্গ বৈষম্য সমর্থন করে, এমন কোন ইঙ্গিত বা নির্দেশনা কোথাও খুঁজে পাই না। সে অর্থে আমরা এটা জোর দিয়েই বলতে পারি, আমাদের সংবিধান একজন নারীকে “নাগরিক” হিসেবেই গণ্য করে, একজন মানুষের মৌলিক-মানবিক পরিচয়েই নারীকে তুলে ধরেছে বারবার। তবে, স্বাধীণতা উত্তর বাঙালী সমাজে নারীর অনগ্রসরতার কারণ হিসেবে সবাই ধর্মীয় গোড়ামী, শিক্ষা ক্ষেত্রে অনগ্রসরতা আর সমাজে বহুযুগ ধরে প্রচলিত কিছু কুসংস্কারকে দায়ী করবার ক্ষেত্রে একমত হবেন, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ক্লিপটি আমাকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দিয়েছে। ডেমরায় নিজ বাসায় সিএনজিতে করে ফিরে চলা তরুণীকে থামিয়ে, জিজ্ঞাসাবাদ বা ‘চেকিং’ এর নামে, দুই পুলিশ সদস্যের অসভ্যতা, অশোভন ইঙ্গিত করা, সার্বিক অর্থে “চরিত্রহীন” বানানোর অপচেষ্টা নারীর স্বাধীণ চলাফেরায়, আত্ম-ক্ষমতায়ন অর্জনের পথে এখনও যে প্রতিবন্ধকতা সামাজিক-রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে রয়ে গেছে, সেটাই স্পষ্ট করে দিল।

অথচ, ২০১৭ সালে “গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ” এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিঙ্গ সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়বারের মত শীর্ষে (৪৭তম) যেখানে ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, ভূটান এবং পাকিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ১০৮, ১০৯, ১১১, ১২৪ এবং ১৪৩। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের এই অর্জন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। এই ক্ষেত্রে, উন্নয়নের দীর্ঘ ও বন্ধুর পথে, বাংলাদেশ ‘নারীর অগ্রগতি’র ক্ষেত্রে আজ সমগ্র বিশ্বের কাছে একটি রোল মডেল ।

নতুন সহস্রাব্দের এই সময়টিতে ও বিচারিক আদালতে একটি ধর্ষণের মামলায়, অভিযুক্তের বা বিবাদী পক্ষের আইনজীবী তার মোয়াক্কেলকে বাঁচানোর কৌশল হিসেবে ধর্ষিতাকে “চরিত্রহীণ” বানাবার অপচেষ্টা করে থাকেন, ক্ষেত্রবিশেষে ‘বেশ্যা’ বানিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। যখন প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা, আদালতের সংশ্লিষ্ট বিচারক, ন্যায় বিচারের প্রতিবন্ধক এই অযাচিত, অনাকাঙ্খিত অপচেষ্টার বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে অপারগ হন, তখন আমাদের সমাজে নারীর অবস্থানের দূর্বল দিকগুলো আরও স্পষ্ট হয়, মিথ্যে মনে হয় নারীর ক্ষমতায়নে আমাদের সব অর্জনের গল্প।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ এর (২) নং অনুচ্ছেদে, একজন নাগরিকের প্রতি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কর্তব্য বিষয়ে বলা আছে –

“সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য”; প্রশ্ন থেকে যায়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কি আদৌ তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন?

অসুস্থ সামাজিক-রাজনৈতিক সাংষ্কৃতিক আবহের ছায়াতলে ‘নিয়োগ বাণিজ্যে’র অসুস্থ চর্চার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত (সংবিধানে বর্ণিত) প্রজাতন্ত্রের সেই কর্মচারীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেবার খোঁজে ছুটে যাওয়া নাগরিক হয়ে যায় দূর্ণীতিগ্রস্ততা আর অসুস্থ মানসিকতার এক মোক্ষম শিকার। সমাজ আবার পিছিয়ে পড়ে আরও বহু ক্রোশ দূরত্বে।

অভিনন্দন রইল আমাদের নতুন প্রজন্মের (নাম না জানা) নাগরিক এই সহযোদ্ধাকে, নিরাপদে ঘরে ফিরতে, সরব হয়ে নিজেকে রক্ষার জন্য। নাগরিকের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ আর অপারগ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এই ‘সরব চিৎকার’ হয়ে উঠুক এক সুতীব্র প্রতিবাদ.

 

৯ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ।


সর্বশেষ

আরও খবর

সভ্যতার সংকট!

সভ্যতার সংকট!


হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না


পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা

পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা


একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন

একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন


অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প

অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প


বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে

বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে


দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি

দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি


কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না

কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না


আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী

আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী


শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত

শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত