Sunday, July 3rd, 2022
মসুলে আইএস’র পরাজয়ের পরিণতি
October 24th, 2016 at 9:55 pm
মসুলে আইএস’র পরাজয়ের পরিণতি

ফারহানা করিম চৌধুরী, ডেস্ক: ১৭ অক্টোবর ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর ১৮ হাজার সদস্য, ১০ হাজার কুর্দি যোদ্ধা, কয়েক হাজার পুলিশ সদস্য, সুন্নি এবং শিয়া মিলিশিয়া যোদ্ধাদের গ্রুপ, মার্কিনীদের সহায়তায় বহুল প্রতীক্ষিত ইরাকি শহর মসুল উদ্ধার অভিযানে অংশ গ্রহণ করে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের কবল থেকে শহরটিকে মুক্ত করার জন্য এই অভিযান পরিচালিত হয়। এর আগে ইরাকি প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি টেলিভিশনে ইরাকি জনগণের উদ্দেশ্য দেয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আইএসের নির্মমতা এবং সন্ত্রাসের কবল থেকে আপনাদের মুক্ত করার জন্য আমি আজকে আপনাদের সামনে বীরত্বপূর্ণ এক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিচ্ছি।’

তিনি বলেন, আল্লাহর ইচ্ছায়, শিগগিরই মসুলে আমাদের সাক্ষাৎ হবে। যেখানে আমরা সবাই স্বাধীনতা এবং আপনাদের মুক্তি উদযাপন করবো।’  

মার্কিন অর্থায়ন এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইরাকি সামরিক বাহিনীকে নাকাল করে দিয়ে ২০১৪ সালের জুনে আইএস মসুল দখল করে নেয়। আইএস প্রধান আবু বকর আল বাগদাদি এখানে খিলাফতের ঘোষণা দেন। তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর এই প্রথম মুসলিম বিশ্বের কেউ খিলাফতের ঘোষণা দেন। এবং মাসখানেকের ভিতরই সংগঠনটি তাদের দখল করা অঞ্চলের পরিসর আরো বিস্তৃত করে।

Peshmerga forces gather on the outskirt of Mosul during preparations to attack Mosul, Iraq

একটা সময়ে তারা সিরিয়া এবং ইরাকের বৃহত্তম অংশ নিজেদের কুক্ষিগত করে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে অগণিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে জঙ্গি এই সংগঠনটি। পশ্চিমা বিশ্বের হাজার হাজার তরুণ-তরুণী বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের তরুণ প্রজন্ম আইএসের প্রচারিত নৃশংস ভিডিও এবং প্রচারপত্র দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে সিরিয়া এবং ইরাক গমন করে। ২০১৪ এবং ১৫ সালে বিভিন্ন এলাকা দখল করে আইএসের রমরমা অবস্থা চললেও চলতি বছরে এসে সংগঠনটি প্রবল একটি ধাক্কা খায়। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে থাকা আইএস ইরাকে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার অর্ধেক এবং সিরিয়ায় শতকরা ২০ ভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

একসময়ের ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল বর্তমানে দেশটিতে আইএসের সর্বশেষ প্রধান ঘাঁটি। ফলে শিগগিরই মসুল পুনরুদ্ধার অভিযান শেষ হবে তা আশা করা যায় না। একজন ইরাকি কুর্দি জেনারেল জানিয়েছেন, এই অভিযান সফল হতে কমপক্ষে দুই মাস সময় লাগতে পারে। এবং জোট বাহিনী ব্যাপকভাবে বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন। এক্ষেত্রে আইএস যোদ্ধারা তাদের ঠেকাতে বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে, মসুলে এখনো তিন থেকে পাঁচ হাজার আইএস যোদ্ধা রয়েছে। এছাড়া বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে আইএসের অনেক সদস্যও লুকিয়ে থাকতে পারেন। এবং যুদ্ধের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শরণার্থীর সংখ্যাও বাড়তে পারে। ফলে সর্বোচ্চ এক দশমিক তিন মিলিয়ন শরণার্থী শহর ছেড়ে চলে যেতে পারে।

তবে এই ব্যাপারে খুব কম সন্দেহই আছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আগামি বছরে তার দায়িত্ব নেয়ার আগেই মসুলের নিয়ন্ত্রণ হারাবে আইএস। 

গত সপ্তাহে আইএসবিরোধী জোটের কমান্ডার লেঃ জেনারেল স্টিফেন টাউনসেন্ড এক বিবৃতিতে জানান, মসুল অভিযান কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে। এছাড়া আরো দীর্ঘ সময় ধরে চলার সম্ভাবনাও রয়েছে।

মসুলে আইএসের পতন ঘটলে ইরাক থেকে তাদের বহিস্কার করা হবে। সন্ত্রাসী এই গোষ্ঠীটি ইতিমধ্যেই ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ শহর বাইজি, ফালুজা, রামাদি, এবং তিরকিতের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। সুতরাং দুই বছর আগে তারা যে খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে তার বাস্তবায়ন করা ক্রমান্বয়ে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে।

গত সপ্তাহেই সিরিয়ার দাবিক শহরে বলতে গেলে বিনা যুদ্ধেই তাদের পতন ঘটে। এটিও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর ছিল। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল, এখানেই ইসলাম বনাম পশ্চিমাদের মধ্যে যুদ্ধ হবে। এবং তাদের বিজয় ঘটবে। এমনকি তাদের অনলাইন ম্যাগাজিনের নামও রেখেছিল দাবিক।

মসুলে আইএসের পতন ঘটলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব জিহাদী আইএসে যোগ দিয়েছিলেন তাদের ক্ষেত্রে কি ঘটবে? সম্ভবত তারা ইউরোপে প্রত্যাবর্তন করতে পারেন। ফলে ইউরোপে ব্যাপক পরিসরে সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটবে বলে আশংকা করছেন বিশ্লেষকরা। কিছুদিন আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা বিষয়ক প্রধান এই বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত বছরের নভেম্বরে প্যারিস হামলায় জড়িত ব্যক্তি সিরিয়া ফেরত আইএস সদস্য ছিলেন।

mosul-3

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আইএসের যোদ্ধাদের পুরো অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ইউরোপের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সন্ত্রাসী হামলা আরো বেড়ে যাওয়ার যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে।

তবে মসুলের পতন ঘটলেই আইএস নামক সন্ত্রাসী সংগঠনের পতন ঘটবে এই বিষয়ে ভাবার কোন অবকাশ নাই। মূলত মসুলে তাদের পরাজিত হওয়ার ঘটনাকে সুন্নি এই সংগঠনটির পতনের শুরু হবে বলে ভাবা যেতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে সুন্নি জঙ্গিদের লড়াই আরো কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে। কেন না বঞ্চনা থেকেই এই সন্ত্রাসবাদের উৎপত্তি। ইরাকে মার্কিনীরা শিয়াদের ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করার ফলেই বঞ্চিত সুন্নিদের মধ্য থেকে বিশেষ করে সাদ্দাম হোসেনের অনুগত বাহিনী থেকেই আইএসের সৃষ্টি। সিরিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ শিয়া বংশোদ্ভূত। সে দেশের বঞ্চিত সুন্নি সম্প্রদায় বাশারের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। আর এসব সুন্নিদের সমর্থন এবং আর্থিক সহায়তা করছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ধনী দেশ সৌদি আরব। অপরদিকে শিয়াদের অব্যাহত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ইরান। ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য মূলত শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের আড়ালে সৌদি আরব এবং ইরানের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই লড়াইয়ে আরো ইন্ধন যোগাচ্ছে পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলি। সূত্র: সিএনএন, দ্য আটলান্টিক

সম্পাদনা: সজিব ঘোষ


সর্বশেষ

আরও খবর

সংসদে ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব

সংসদে ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব


আ’লীগ নেতা বিএম ডিপোর একক মালিক নন

আ’লীগ নেতা বিএম ডিপোর একক মালিক নন


চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় বাংলাদেশ

চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় বাংলাদেশ


ভোজ্যতেল ও খাদ্য নিয়ে যা ভাবছে সরকার

ভোজ্যতেল ও খাদ্য নিয়ে যা ভাবছে সরকার


তৎপর মন্ত্রীগণ, সীতাকুণ্ডে থামেনি দহন

তৎপর মন্ত্রীগণ, সীতাকুণ্ডে থামেনি দহন


অত আগুন, এত মৃত্যু, দায় কার?

অত আগুন, এত মৃত্যু, দায় কার?


যে গল্প এক অদম্য যোদ্ধার

যে গল্প এক অদম্য যোদ্ধার


আফগান ও ভারতীয় অনুপ্রবেশ: মে মাসে আটক ১০

আফগান ও ভারতীয় অনুপ্রবেশ: মে মাসে আটক ১০


সীমান্ত কাঁটাতারে বিদ্যুৎ: আলোচনায় বিজিবি-বিজিপি

সীমান্ত কাঁটাতারে বিদ্যুৎ: আলোচনায় বিজিবি-বিজিপি


চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার