Friday, June 1st, 2018
মাও সে তুং ও ক্র্যাবের জাতিস্মর
June 1st, 2018 at 11:33 pm
মাও সে তুং ও ক্র্যাবের জাতিস্মর

মাসকাওয়াথ আহসান:

মাও সে তুং বলছিলেন, আমাদের সফল হতে হবে; আরো সফল হতে হবে।

মাওয়ের স্ত্রী জিয়াং কিং ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বলে, তুমি যতই সাফল্য লাভ করো না কেন, এই দেশের সুশীলদের এতটুকু প্রশংসা পাবে না। এই যে গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড বলে সবাইকে ধানক্ষেত থেকে তুলে ইস্পাত কারখানায় নিয়ে গেলে; ইস্পাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলো দেশ; যেটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়া সাফল্য। আর এদেশের কুলাঙ্গার সুশীলরা কী বলছে জানো, এই ইস্পাত নাকি নিম্নমানের! আমরা নাকি টেকসই কিছু বানাতে পারবো না কোনদিন! ভাবতে পারো এই দেশদ্রোহী সুশীলদের সমালোচনার সাহসের দিকটা; ভালো কিছু চোখেই পড়ে না তাদের।

মাওয়ের সহযোগী ওয়াং ডংজিং আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যাকে বলে, সূর্যের চেয়ে বালি গরম। ডংজিং আর্তনাদ করে, এরা থাকে দেশে, অথচ ছাতা ধরে ব্রিটেনের। ব্রিটপ্রেমীরা বৃটেনে চইলা গেলেই পারে। এদের দমন না করলে আমরা কখনোই আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো না।

মাও ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। আজকাল কোনটা যে লক্ষ্য তা ঠাহর করতে অসুবিধা হয়। মাও জানেন কোথাও একটা যেতে হবে; কিন্তু ঠিক কোথায় যেতে হবে তা স্পষ্ট নয় তার কাছে।

স্ত্রী জিয়াং কিং বলে,চুপ করে আছো কেন; কিছু একটা বলো! আমি কিন্তু আমাদের পক্ষে অনেক বুদ্ধিজীবী জোগাড় করেছি। তারা দেশপ্রেমিক; তুমি তাদের কাছে ঈশ্বরের মতো। তারা তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। আর আমি বলি কী; দেশদ্রোহী সুশীলদের কারাদণ্ড দাও; যারা পশ্চিমা পোষাক পরে; তাদের কাপড় খুলে নাও।

মাও সে তুং অবাক হয়ে তাকান। জিয়াং কিং বলে, কিছু একটা করো। আমি কালই আমাদের সাংস্কৃতিক জোট নিয়ে আসবো। এবার সাংস্কৃতিক বিপ্লব চাই। দেশকে বিশুদ্ধ করার বিপ্লব। দেশের শরীর থেকে বাজে রক্ত বের করে দেবার লাল বিপ্লব।

ওয়াং ডং জিং উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে, ঈশ্বর মাও আদেশ করুন।

মাও নির্দেশ দেন, আমার চেতনার রঙ –এ সাফল্য হোক লাল।

স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ছাত্রীদের মাওয়ের লাল চেতনার পক্ষে জড়ো করার কাজ শুরু হয়ে যায়। ছাত্রলালের ক্যাডার ব্রিগেড দিয়ে শিক্ষকদের প্রহার ও অপমান করার মহানব্রতকেই দেশপ্রেমের কর্তব্য বলে সবাইকে বোঝায় ডং জিং।

এক শিক্ষককে শার্টের কলার ধরে ডং জিং বলে, তুই বইলা বেড়াস কৃষিনির্ভর দেশে এতো দ্রুত শিল্পায়ন নাকি সমাজের জন্য ক্ষতিকর। যে কৃষক সবুজ ক্ষেতে কাজ করতো তাকে ইস্পাত কারখানার শ্রমিক করে নিয়ে আসলে তার জীবন মানের কোন উন্নতি হয় না। এতোই যখন বোঝো তখন বাপের দেশে গিয়ে থাকলেই পারো। এইখানে যেন তরে দেহিনা আর; যা ভাগ; সুশীল কুনহানকার। সুশীল দেকলেই আমার ঘিন্না লাগে।

ছাত্রলাল রেড ব্রিগেডের ক্যাডাররা হিড়হিড় করে শিক্ষককে টেনে নিয়ে যায়।

জিয়াং কিং দেবী বিশ্ববিদ্যালয় সফরে এলে, ঠিক সামনের সারিতে খুব ফ্যাশানেবল পোষাক পরে বসে থাকা এক শিক্ষিকাকে খুব অপছন্দ করে বসে। তার দিকে আঙ্গুল তাক করে বলে, এই দেশে থাকতে গেলে এই দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী চলতে হবে। পশ্চিমা অপসংস্কৃতি আমরা সহ্য করবো না।

জিয়াং দেবী বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে চলে যাবার কয়েকঘন্টার মধ্যে তার অপছন্দের ঐ শিক্ষিকার বাড়িতে হামলা করে ছাত্র লাল ব্রিগেডের ক্যাডারেরা। তার চুল কেটে দেয়া হয়। তাকে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। এই ব্রিগেডেরই এক ছাত্র কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। উনি তো একটু শখের পোষাকই পরেন। এটা দেশদ্রোহিতা হয় কী করে! ছাত্রটি রাতে ঘুমাতে পারে না। মাও কী তবে ঈশ্বর নন; উন্নয়নের ভূত! নিজেকে খুব পরাধীন মনে হয়; যার সামর্থ্য হয়নি নিজের শিক্ষিকার সম্ভ্রম বাঁচানোর। নিঃশব্দে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় ছেলেটা। এক টুকরো স্বাধীনতার খোঁজে।

মাও সে তুং-কে লাল সৈনিকদের প্রধান কাং সেং তার এলিট ফোর্স ক্রসফায়ার একশান ব্যাটালিয়ান (ক্র্যাব) দপ্তরে নিয়ে যায়। ঈশ্বরের আগমনে ক্র্যাব সদস্যরা পুলকিত হয়। তাকে কথা দেয়, আপনার স্বপ্ন ও চেতনার বাস্তবায়নে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

ক্র্যাব প্রধানকে দেখে মাওয়ের প্রথমে মনে হয় উনি ভুল দেখছেন কীনা! খুব পরিচিত মুখ। অথচ মাওয়ের জানামতে লোকটা অনেক আগেই মারা গেছে।

ক্র্যাব প্রধান বেন জিং বলে, ওপিয়াম ওয়ার এখনো শেষ হয়নি ঈশ্বর। ওপিয়ামে তারুণ্য ঘুমিয়ে থাকায় আপনার উন্নয়ন বার্তা তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না। তারা লাল চেতনার রঙ আত্মস্থ করতে পারে না। তাই শেষ ওপিয়াম ওয়ারটা আমি লড়তে চাই। নইলে বিদ্রোহির সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়বে।

মাও বলেন, আমার সাফল্য চাই; স্বপ্নের লাল দেশ গড়তে চাই।

বেন জিং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে, যারাই আপনার স্বপ্নের বিরোধিতা করেছে; তাদেরকে আমরা শায়েস্তা করেছি। বলে দিয়েছি, দেশপ্রেমের চেতনায় বিশ্বাস না থাকলে দেশত্যাগ করুন। আপনার সমালোচক সুশীলদের চুপ করিয়ে দিয়েছি। কিন্তু জিয়াং দেবীর বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক জোট এতো দেশপ্রেম ও উন্নয়নের গান গাওয়ার পরেও তরুণরা অনেকেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাদের জাগাতে হলে, ওয়ার এগেইন্সট ওপিয়াম আবশ্যক। মানচিত্র লাল রঙ –এ ছেয়ে দিলে তবেই যদি নেশায় বুঁদ প্রজন্মের ঘুম ভাঙ্গে। আর নেশা থাকবে শুধু একটা দেশপ্রেমের নেশা; নইলে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো না ঈশ্বর।

মাও মুগ্ধ হন। বলেন, জীবনের প্রায় সূর্যাস্ত ঘনিয়ে এসেছে; অথচ এখনো স্বপ্নের সূর্যোদয় দেখতে পাচ্ছি না; মাঝে মাঝে নৈরাশ্য এসে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোমার উন্নয়নের লং-মার্চ শেষ হবে কবে মাও!

বেন জিং ফিস ফিস করে বলে, স্বপ্নের মৃত্যু নেই। জার্মান ফ্রুয়েরার আডলফ হিটলার উন্নয়নের লং মার্চে মারা গেলেন। কিন্তু ঠিকই জাতিস্মর হয়ে যোগ দিলেন আপনার রেড আর্মিতে!

মাও বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, কোথায় সে জাতিস্মর; তাকেই খুঁজছি আমি।

বেন জিং রহস্যময় হাসি হেসে বলে, ঠিক আপনার সামনে দাঁড়িয়ে।

মাসকাওয়াথ আহসান

মাসকাওয়াথ আহসান: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক


সর্বশেষ

আরও খবর

ফেসবুক ভেরিফাইড হলেন আলতামিশ নাবিল

ফেসবুক ভেরিফাইড হলেন আলতামিশ নাবিল


জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আলতামিশ নাবিলের ‘লুমিয়ের থেকে হীরালাল’

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আলতামিশ নাবিলের ‘লুমিয়ের থেকে হীরালাল’


দ্য ডেইলি হিলারিয়াস বাস্টার্ডস

দ্য ডেইলি হিলারিয়াস বাস্টার্ডস


করোনা নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের কবিতা

করোনা নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের কবিতা


পাথর সময় ও অচেনা বৈশাখ

পাথর সময় ও অচেনা বৈশাখ


৭২-এর ঝর্ণাধারা

৭২-এর ঝর্ণাধারা


বইমেলায় আলতামিশ নাবিলের ‘লেট দেয়ার বি লাইট’

বইমেলায় আলতামিশ নাবিলের ‘লেট দেয়ার বি লাইট’


নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


ক্রোকোডাইল ফার্ম

ক্রোকোডাইল ফার্ম


সামার অফ সানশাইন

সামার অফ সানশাইন