Saturday, June 25th, 2016
মাদকঃ নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অন্তরায়
June 25th, 2016 at 3:30 pm
মাদকঃ নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অন্তরায়

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল: ২৬ জুন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস বা মাদকবিরোধী দিবস। এই বছর আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘আগে শুনুন: শিশু ও যুবাদের প্রতি মনোযোগ দেয়াই হলো তাদের নিরাপদ বেড়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপ’।

জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো ১৯৮৮ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালন করে আসছে। মাদক সেবন, পরিবহন, পাচার ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবছর এই দিবসটি নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে পালন করা হয়।

জাতিসংঘের তথ্য মতে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের মাদক পাচার হয়। যার পুরোটাই অবৈধ উপায়ে। এছাড়া মাদকসেবীর সংখ্যা বিশ্বে প্রায় ৩৫ কোটি। প্রতিবছর মাদকসেবীর এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সরকারি হিসাবমতে বাংলাদেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ৬০ লাখের বেশী। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুকিতে রয়েছে শিশু ও যুব সমাজ।

মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। বাংলাদেশে মাদকাসক্তির প্রধান শিকার হচ্ছে যুব সমাজ। যা জাতির জন্যে বিশাল হুমকি স্বরূপ। কারণ যুব সমাজ জাতির প্রাণশক্তি এবং উন্নয়নের ধারক-বাহক। যুবসমাজকে মাদকের ছোবল থেকে বাঁচাতে হলে পরিবারসহ সকলকে সচেষ্ট হতে হবে। উঠতি বয়সী সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে কিনা অভিভাবকদেরকে এসকল বিষয়ে নজর দিতে হবে। হতাশা মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। তাই হতাশা রোধে যুব সমাজের জন্য নিয়মিত লেখাপড়া, খেলাধুলা, সংস্কৃতির চর্চা এবং পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

মাদক দেশের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা ও জাতীয় উন্নয়নের বড় অন্তরায়। মাদকের কারণে এদেশে প্রতিনিয়ত বহু পরিবার ধ্বংস হচ্ছে। অকালে ঝরে যাচ্ছে বহু তাজা প্রাণ। সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা। মাদকের ভয়ঙ্কর আগ্রাসন থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

মাদকবিরোধী ব্যাপক গণসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মাদকবিরোধী দিবস পালন এই আন্দোলনকে বেগবান করবে বলে আশা করি। আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে যেসব সচেতনতামূলক কর্মসূচী পালিত হচ্ছে তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সেই সঙ্গে দরকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি। মাদকসেবন থেকে সন্তানকে দূরে রাখার জন্য প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার। যে পরিবার যতটা শৃঙ্খলিত সে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মাদকসেবনের প্রবণতা ততই কম। এছাড়া মাদক থেকে দূরে থাকার জন্য ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে।

শিশুদের মধ্যে ছোটবেলা থেকে মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে তথ্য দিতে পারলে এবং তাদেরকে বেড়ে ওঠার পরিপূর্ণ সুযোগ দিলে শিশুরা মাদকের দিকে ঝুঁকবে না। আমাদের দেশে পথশিশু ও বস্তিবাসীদের মধ্যে মাদক গ্রহণ ও ব্যবসার প্রবণতা সবচেয়ে বেশী। মূলতঃ মাদক ব্যবসা টিকেই আছে এই শ্রেণীর মানুষের জন্যে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো সরকারের দায়িত্ব। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদক গ্রহণ খানিকটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। যে ভ্রান্ত ধারণার উপর দাঁড়িয়ে তারা এমন অভ্যাসে স্থায়ী হচ্ছে তা দূর করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী প্রচারাভিযান অব্যাহত রাখা দরকার।

মাদকসেবীরা শুধু নিজের শরীরের ক্ষতি করে তাই নয় তারা সমাজে নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত যারা তাদের মধ্যে অধিকাংশই মাদকাসেবী। কিন্তু এই মাদকাসেবীদের ঘৃণা করলেই যে সব সমস্যার সমাধান হবে তা নয়। মাদকসেবীদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করে তাদেরকে সুস্থ্য জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদেরকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড় করাতে পারলে অন্য মাদকসেবীরাও তাদের দেখে সুস্থ্য জীবনে ফিরে আসার স্বপ্ন দেখতে পারে।

অবশ্য যেসব কথা বলা হলো বাংলাদেশে তেমন কিছু কার্যক্রম সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চালু রয়েছে। কিন্তু মাদকের মূল হোতা যারা তারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাদক উৎপাদন, সরবরাহ, পরিবহন ও ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে নির্মূল করতে না পারলে প্রকৃতপক্ষে মাদক সমস্যার কোন সমাধান হবে না। এই বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও এগিয়ে আসতে হবে। যেন নতুন প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত হয়।

মাদক দ্রব্য সমাজ ও জাতির জন্য বিষাক্ত বিষবাষ্প। আমাদের দেশে প্রচলিত মাদকদ্রব্যগুলো হল -গাঁজা, ভাঙ, আফিম, তাড়ী, মদ, ঘুমের ঔষধ, হেরোইন, বুপ্রেরনফিন, পেথিডিন, ফেনসিডিল ও ইয়াবা ইত্যাদি। এই সকল মাদকদ্রব্যের প্রতি আসক্তি বা এর ওপর নির্ভরশীলতাই মাদকাসক্তি। মাদকাসক্তি এমন একটি মারাত্মক অবস্থা যেখানে ব্যবহৃত দ্রব্যের প্রতি ব্যবহারকারীর শারীরিক ও মানসিক নির্ভরশীলতার জন্ম নেয়। মাদকদ্রব্য ব্যবহারের মাত্রা দিন দিন বেড়ে যায় এবং মাদক গ্রহণ না করলে শরীরে ব্যথা, মাংসপেশীর খিঁচুনী, অস্থিরতা, বমি-বমি ভাব, সর্দি, কোষ্ঠকাঠিন্য, শ্বাসকষ্ট, মাথা ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়।

মাদক থেকে যুবসমাজের দূরে থাকার উপায়:

১। ব্যক্তিজীবনে মাদকদ্রব্য গ্রহণ না করা।

২। নেশা গ্রহণকারী বন্ধুদের সাথে মেলামেশা না করা।

৩। নিয়মিত কর্মব্যস্ত থাকা।

৪। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা।

৫। অবসর সময়ে খেলাধূলা ও সুস্থ বিনোদনের চর্চা করা।

৬। ব্যক্তি জীবনে কোন সমস্যা হলে সাথে সাথে তা অভিভাবক/ শিক্ষক/ অপরের সাথে পরামর্শ করা।

৭। জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য ধারাবাহিক পরিশ্রম করা।

৮। সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের সাথে জীবন যাপন করা।

মাদকমুক্ত যুব সমাজ গঠনে আমাদের করণীয়:

১। সমাজের সকল ধরনের মাদকবিরোধী অভিযানের সাথে ছাত্র ও যুবকদেরকে সম্পৃক্ত করা।

২। নিজে ধূমপান/মাদকদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা।

৩। সন্তানদের দিয়ে বিড়ি/সিগারেট ক্রয় না করানো।

৪। সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।

৫। সন্তানদের খেলাধূলা/সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহিত করা।

৬। অবসর সময় সন্তানদের সাথে কাটান।

৭। সন্তানদেরকে ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়া।

৮। নিজ নিজ এলাকায় মাদক চোরাচালান, বিক্রয় ও বিতরণের ঘাঁটি উচ্ছেদ কার্যক্রমের সক্রিয় অংশগ্রহণ করা।

৯। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদক বিরোধী সভা, সমাবেশ, র‌্যালি, রচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।

১০। চিকিৎসকদের চিকিৎসাপত্র ব্যতিরেকে কোন প্রকার নেশা জাতীয় ঔষধ বিক্রি না করা।

১১। ঔষধ বিক্রেতা কর্তৃক ক্রেতাদেরকে মাদক জাতীয় দ্রব্য ক্রয়ে নিরুৎসাহিত করা।

১২। স্থানীয় পত্রিকার মাধ্যমে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও কুফল সম্পর্কে তুলে ধরা।

১৩। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী আইন প্রয়োগে সচেষ্ট থাকা এবং মাদক সরবরাহকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা।

১৪। এনজিও প্রতিনিধিদের স্ব-স্ব এলাকায় মাদক বিরোধী প্রচার অভিযানে সংশ্লিষ্ট করা (যেমন: পোষ্টার, ব্যানার, র‌্যালি)

১৫। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মাদকের কুফল সম্পর্কে তুলে ধরা ও ধর্মীয় অনুশাসন পালনে উদ্বুদ্ধ করা।

১৬। ওয়ার্ড কমিশনারগণের নেতৃত্বে পরিবার ও এলাকার জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে মাদকাসক্তি প্রতিরোধে কমিটি গঠন করা।

১৭। গণমাধ্যমে মাদক বিরোধী প্রচারণা ও প্রতিবেদন বেশী বেশী প্রকাশ করা।

১৮। প্রত্যেক নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদি রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত করা।

১৯। সমাজে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

২০। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

২১। যুবসমাজের অনুকূল সুস্থ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

২২। মাদক এর ব্যাপারে নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকা ও মাদককে সর্বদা ‘না’ বলা।

মাদক একটি সামাজিক সমস্যা। তাই সামাজিকভাবে এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। শিক্ষক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, ডাক্তার, আইনজীবি, ব্যবসায়ী, ছাত্র সবাই এই সমাজের বাসিন্দা। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সকলের প্রচেষ্টায় মাদক দ্রব্যের ব্যবহার নির্মূল করার জন্যে আসুন  দৃঢ়  প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই।

goni

লেখক: চেয়ারম্যান, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, স্থায়ী পরিষদ।


সর্বশেষ

আরও খবর

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?


প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ

প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ


দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন

দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন


দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন

দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ