Monday, July 4th, 2022
মানিকগঞ্জে অজ্ঞাত রোগাক্রান্ত এক পরিবারের গল্প
October 16th, 2016 at 9:32 pm
মানিকগঞ্জে অজ্ঞাত রোগাক্রান্ত এক পরিবারের গল্প

শাহজাহান বিশ্বাস, মানিকগঞ্জ: জেলায় অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে একই পরিবারের দুই জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আট জন চিকিৎসার অভাবে অচল ও পঙ্গু হয়ে এখন মৃত্যু পথযাত্রী। খাবার নেই, পরনে নেই কাপড়, চিকিৎসা করার মতো নেই কোনো সামর্থ। বিনা চিকিৎসায় মড়তে বসেছে তারা।

অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে স্থানীয় একাধিক মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন সিভিল সার্জন। সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক, ইসলামী ব্যাংক কমিউনিটি হাসাপাতল ও শিবালয় উপজেলা চেয়ারম্যান।

জানা গেছে, মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার মহাদেবপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের মৃত আলতামুদ্দিনের দিন মুজুর ছেলেদের পরিবারে একদিকে অভাব-অনটন, অপরদিকে রোগব্যধী লেগেই আছে। ফলে একবেলা খেয়ে দু’বেলা না খেয়ে চরম মানবেতর জীবন-যাপন করছে তারা। কোনো আশা বা ভরসা নেই তাদের সামনে বরং তাদের সামনে অপেক্ষা করছিল  বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু। একটি পরিবারের আট সদস্য প্রতিবন্ধী হলেও কপালে জোটেনি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড। এছাড়া সরকারি -বেসরকারী কোনো সাহায্যই জোটেনি তাদের ভাগ্যে।

manikganj-photo৪ ছেলে ১ মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে এক সময় আলতামুদ্দিনের ছিল সুখের সংসার। আবাদ করতেন নিজেদের আট পাখি কৃষি জমি এবং গোয়ালে ছিল গরু। জোয়ান ছেলেরা সবাই ছিল খুব কর্মঠ। কৃষি কাজ, গরুর গাড়ি চালানো, কাঠকাটা ছাড়াও বিভিন্ন গ্রামীণ মেলায় মিষ্টির দোকান সাজিয়ে ব্যবসা করা ছিল তাদের খণ্ডকালিন আয়ের আর একটি উৎস। রসগোল্লা, চমচম, জিলাপী, বাদামী টানা, কাপি টানা সহ মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য সামগ্রী তৈরিতে পুরো পরিবার ছিল সিদ্ধহস্ত। কার্তিক-অগ্রায়ন মাসে গ্রামে নতুন ধান ওঠা শুরু হলেই পুরো গ্রাম-বাংলায় শুরু হতো নব্বান্ন উৎসব। পুরো দুই মাস ঔসব মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য সামগ্রীর ঝুড়ি (বাইক) নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন। গায়ের শিশু-বৃদ্ধ-বধুরা। নতুন ধানের বিনিময়ে রাখতেন এসব মিষ্টি সামগ্রী। এ সময় আলতামুদ্দিনের পুরো পরিবার ব্যবসার পাশাপাশি নিজেরাও মেতে থাকতেন উৎসবে। গলা ফাটিয়ে ডাকতেন লাগবে জিলাপী, আর্মিতী, টানা ইত্যাদি। তাদের ডাকে গায়ের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ছুটে আসতো এবং অনেক দুর পর্যন্ত তাদের সঙ্গে সঙ্গে হেটে চলতো। মনে হতো এ যেন সেই রূপকথার হেমিলনের বাঁশিওয়ালার গল্প। মনের সুখে গলায় গান তুলে ঘুরতেন গ্রাম-গ্রামান্তরে। এসব এখন এ পরিবারের কাছে শুধুই স্মৃতি।

১৯৯৮ সালে আলতামুদ্দিন মারা যান। তার ১৩ বছর পূর্বেই মারা যান তার স্ত্রী। আলতামুদ্দিনের মৃত্যুর দুই বছর পূর্বে তার ৩য় ছেলে জামাল অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ওই সময় থেকেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও ওই রোগে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারাতে থাকে। জামালের ২ বছরের ১টি মেয়েও মারা যায় অজ্ঞাত রোগে। পরে তার স্ত্রী স্বামীর বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়িতে চলে যায়। এর পর থেকে পর্যায়ক্রমে আক্রান্ত হয় আলতামুদ্দিনের বড় ছেলে আনছার আলী (৭০), ছোট ছেলে হেকমত আলী (৪৭), আনছার আলীর বড় ছেলে মনোয়ার হোসেন (৩২) , ছোট ছেলে বাবুল (২৭), হেকমতের বড় ছেলে জহিরুল (১৬) ও ছোট ছেলে জাহিদুল (৮)। আলতামুদ্দিনের দ্বিতীয় ছেলে মো. আ. রহমান (রহম) রোগের ভয়ে একটু দূরে গিয়ে বাড়ি করলেও তার ২ মেয়ে রিনা (২০)ও রুমা (১৮) রোগের হাত হতে রেহাই পায়নি বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।

manikganj-photo-1-15-10-2016আনছারের স্ত্রী ময়ুর জান (৬০) বলেন, প্রথমে আমার স্বামী, দেবর ও ছেলেরা ভালোই ছিল। একটু করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোগে আক্রান্ত হতে থাকে। টাকার অভাবে কি হয়েছে তা জানতে পারি নাই। আমার ছোট দেবর হেকমত অসুস্থ্য হয়ে ঘরে পড়ে গেলে তার স্ত্রী জহুরা পাগল হয়ে বাবার বাড়িতে চলে যায় এবং এখনও সে পাগল। দুই ছেলের এক ছেলে আমার কাছে থাকে আর অপর জন নানার বাড়িতে থাকে আবার মাঝে মধ্যে আসে। ছেলে দুটিও অসুস্থ্য। আমার বড় ছেলে মনোয়ার হোসেনের দুই মেয়ে মুক্তা (৮) ও রিক্তা (৫) এখনও সুস্থ্য আছে কিন্তু তাদের মুখে এক মুঠ ভাত তুলে দেবার কেউ নেই। ছোট ছেলে বাবুল ২০০৬ সালে বিয়ে করার পর পরই অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। তার পর ২০১০ সালে তার স্ত্রী শেফালি বেগম স্বামীর অসুস্থ্যতা ও অভাবের কারণে বাবার বাড়িতে চলে যায়।

ময়ুর জান আরো বলেন, জমি-জমা যা ছিল তা বিক্রি করতে করতে আমাদের এখন সবই শেষ। আয়ের কোনো পথ নেই। বাড়িতে একটি গরু পালন করি এবং গরুর ঘাস আমি ও আমার বড় ছেলের স্ত্রী চায়না মিলে সংগ্রহ করি। আমাদের কোনো প্রতিবন্ধী ভাতা দেয়া হয়নি।

চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে তিনি বলেন, মা মরা দেবরদের আমি পেয়েছি ছোট ছোট। নিজের সন্তানদের যেমন কোলে পিঠে মানুষ করেছি ওদেরও তেমনি করেছি। তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে কিন্তু আমি ওদের কোথায় ফেলে দিব। এখন তার ছেলেকেও আমারই দেখতে হয়। চকে চকে ধান কুড়িয়ে, একটু আধটু কাজ করে আমি আর বড় ছেলের বৌ যা পাই তাই সবার মুখে তুলে দেই। কোনো বেলা খাবার দিতে পারি আবার কোনো বেলা দিতে পারি না। বড় ছেলের বৌর নামে একটি মাসিক কার্ড আছে,তা থেকে ৩০ কেজি করে চাল পাই। শুনেছি সরকার অনেক সাহায্য দেয়, চিকিৎসা করে কিন্তু আমাদের দিকে কি একটুও তাকাবে না?

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, এই পরিবারের চেয়ে আর কোনো অসহায় পরিবার এলাকায় নেই। আমি নতুন নির্বাচিত হয়েছি তবে আমি সাধ্যমত তাদের সাহায্য করবো। কিন্তু চিকিৎসা করা তো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

শিবালয় উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আলী আকবরের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। অতি দ্রুতই তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।

একই পরিবারের আট জন অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু পথযাত্রী শিরোনামে স্থানীয় একাধিক মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশের পর সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ ইমরান আলী বৃহস্পতিবার দুপুরে ছুটে যান প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল রঘুনাথপুর আলতামুদ্দিনের বাড়িতে। সিভিল সার্জন তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। বৃহস্পতিবারই তিনি পাঁচজন ডাক্তারের সমন্বয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করেন। মেডিকেল বোর্ডে সদস্যরা হলেন সিনিয়র কনসালটেন্ট সার্জারি ডা. জাহাঙ্গীর মো. সরোয়ারকে সভাপতি, হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. লুৎফর রহমানকে সদস্য সচিব করা হয়। বোর্ডের অন্যান্য সদস্যরা হলেন, সিনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন ডা. সাকিনা আনোয়ার,  সিনিয়র কনসালটেন্ট অর্থো-সার্জারি ডা. মো. আমিনুর রহমান ও  সিনিয়র কনসালটেন্ট গাইনী ডা. হাজেরা শিরিন হক।

শনিবার সকাল ৯টার দিকে মানিকগঞ্জ ইসলামী ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালের নিজস্ব এ্যাম্বুলেন্সে রোগীদের গ্রামের বাড়ি থেকে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে আনা হয়।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মেডিকেল বোর্ড বসে সরকারি হাসপাতালেই তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষার ফলাফল ও রোগ সম্পর্কে কখন জানা যাবে ? এমন প্রশ্নের জবাবে বোর্ডের সদস্য সচিব ডা. মো. লুৎফর রহমান বলেন, আগামী ৩দিনের মধ্যেই আমরা বলতে পারবো।

এদিকে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস তাদের দেখতে আসেন সদর হাসপাতালে। মেডিকেল বোর্ডের সদস্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সিভিল সার্জন, রোগী, প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের এমডি, সাংবাদিকসহ সবাইকে নিয়ে আলোচনা করেন জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস।

তিনি বলেন, আজ থেকে এই পরিবারের সংসার চালানোর দায়িত্ব আমি নিলাম। আমার মনে হয়,তাদের পুষ্টিরও মারত্মক অভাব রয়েছে। তাদের প্রতি দিন ১টি করে ডিম ও দুধ দেয়া হবে। তাদের অন্যান্য চাহিদাও পূরন করা হবে।

সম্পাদনা: জাহিদ

 


সর্বশেষ

আরও খবর

সংসদে ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব

সংসদে ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব


আ’লীগ নেতা বিএম ডিপোর একক মালিক নন

আ’লীগ নেতা বিএম ডিপোর একক মালিক নন


চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় বাংলাদেশ

চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় বাংলাদেশ


ভোজ্যতেল ও খাদ্য নিয়ে যা ভাবছে সরকার

ভোজ্যতেল ও খাদ্য নিয়ে যা ভাবছে সরকার


তৎপর মন্ত্রীগণ, সীতাকুণ্ডে থামেনি দহন

তৎপর মন্ত্রীগণ, সীতাকুণ্ডে থামেনি দহন


অত আগুন, এত মৃত্যু, দায় কার?

অত আগুন, এত মৃত্যু, দায় কার?


যে গল্প এক অদম্য যোদ্ধার

যে গল্প এক অদম্য যোদ্ধার


আফগান ও ভারতীয় অনুপ্রবেশ: মে মাসে আটক ১০

আফগান ও ভারতীয় অনুপ্রবেশ: মে মাসে আটক ১০


সীমান্ত কাঁটাতারে বিদ্যুৎ: আলোচনায় বিজিবি-বিজিপি

সীমান্ত কাঁটাতারে বিদ্যুৎ: আলোচনায় বিজিবি-বিজিপি


চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার