Friday, September 30th, 2016
মানুষের গল্প— ইউভাল হারারি: এক কিস্তি এক
September 30th, 2016 at 10:44 pm
মানুষের গল্প— ইউভাল হারারি: এক কিস্তি এক

আশফাক আহমেদ, ফ্লোরিডা:

আমরা যখন নিজেদের মানুষ বা হোমো সেপিয়েন্স হিসেবে পরিচয় দিই, তখন নিজের অজান্তে আমরা স্বীকার করে নিই যে, আমরা ছাড়াও এ পৃথিবীর বুকে আরো নানা প্রজাতির মানুষ ছিল। কেননা, Homo মানে মানুষ আর Sapiens মানে জ্ঞানী। আমরা হলাম গিয়ে জ্ঞানী মানুষ। আমরা যদি জ্ঞানী মানুষ হই, তবে তো কিছু মূর্খ, জ্ঞানহীন মানুষের অস্তিত্ব্বও এ পৃথিবীর বুকে ছিল। তারা তবে কই?

এই গল্পের শুরু দেড় লাখ বছর আগে। পৃথিবীতে তখন রাজত্ব করছে কমছে কম ছয় রকমের মানুষ। এর মধ্যে তিন রকমের মানুষ সংখ্যায় ভারী। একদল— আমরা, মানে হোমো সেপিয়েন্সরা বসতি গড়েছি আফ্রিকার এক পূর্ব কোণে। নিয়েন্ডারথাল মানুষেরা ইউরোপে শীতের বিরুদ্ধে লড়ছে। আর এশিয়ার পূর্বকোণে হোমো ইরেক্টাস মানুষেরা সুখে শান্তিতে দিন গুজরান করে চলেছে।

আমরা মানে হোমো সেপিয়েন্সরা আর আমাদের ভাই-বেরাদররা প্রত্যেকেই তখন আগুন ব্যবহার করতে শিখেছি। আমাদের মস্তিষ্কের সাইজও বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। অথচ এই মস্তিষ্ক নিয়েই আমরা আফ্রিকার এক পূর্ব কোণে পড়ে রয়েছি। এই করে কেটে গেছে বহু বছর। সত্তর হাজার বছর আগে একদল হোমো সেপিয়েন্স প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যে, সেখান থেকে ইউরোপে ঢুকে পড়লো। এইখানে তাদের মোলাকাত হল নিয়েন্ডারথাল মানুষদের সাথে।

একে তো এরা ছিল আমাদের চেয়ে অধিক পেশীবহুল, অন্যদিকে এদের মস্তিষ্কও আমাদের চেয়ে সাইজে বড় ছিল। এমনকি টেকনোলজির দিক দিয়েও এরা এগিয়ে ছিল। এদের হাতিয়ার ছিল উন্নতমানের। কাজেই, এরা বেটার শিকারী ছিল।

সামাজিক মূল্যবোধের দিক দিয়েও এরা আমাদের চেয়ে উঁচু মেন্টালিটির ছিল। বৃদ্ধ, অথর্বদের সেবা-যত্নের কোনরকম ত্রুটি করতো না এরা। প্রত্নতাত্ত্বিকরা দিনরাত খোঁড়াখুঁড়ি করে এর সপক্ষে প্রমাণ হাজির করেছেন। তারা এমন কিছু নিয়েন্ডারথাল হাড়গোড় পেয়েছেন, যা কিনা ঐ লোকের শারীরিক ত্রুটিগ্রস্ত হবার এবং সেই সাথে ঐ ত্রুটি নিয়েই বহু দিন বেঁচে থাকার প্রমাণ বহন করে। যাই হোক, এরপর কী ঘটে? নিয়েন্ডারথালরা কি এই আগন্তুকদের সাদরে বরণ করে নেয় না বহিরাগত বলে যুদ্ধ ঘোষণা করে?

সত্যিকার অর্থে, এর উত্তর আমরা জানি না।

তবে পরবর্তী ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য দুটো হাইপোথেসিস আছে। একদল বলেন, সেপিয়েন্সরা আর নিয়েন্ডারথালরা একে অপরকে ভালবেসে সুখে-শান্তিতে বংশবৃদ্ধি করিতে লাগিলো। আজকে আমরা যে লালমুখো ইউরোপিয়ানদের দেখি, তারা এই সেপিয়েন্স আর নিয়েন্ডারথালদের ভালবাসারই ফসল।

সেপিয়েন্সরা যে খালি ইউরোপেই ভালবাসার বার্তা নিয়ে গেছে, তা কিন্তু নয়। এরা ছড়িয়ে পড়েছিল এশিয়ার পূর্বভাগেও। আজ আমরা যে চাইনিজ, কোরিয়ানদের দেখি তারা সেপিয়েন্স আর ঐ অঞ্চলে আগে থেকেই বসবাসরত হোমো ইরেক্টাসদের ভালবাসাবাসির ফল।

এটা যথেষ্ট অপ্টিমিস্ট থিওরি। এর বিপরীত থিওরিও আছে।

এই থিওরী বলে, নিয়েন্ডারথাল ‘রোমিও’ আর সেপিয়েন্স ‘জুলিয়েট’ যদি একে অপরের প্রেমে পড়েও, তাদের জেনেটিক দূরত্ব এতোই বেশি যে তাদের দ্বারা সন্তান উৎপাদন সম্ভব নয়। এই কারণেই হোক কিংবা অন্য কোন কারণেই হোক, দুই দলের মধ্যে এক রকম বৈরীভাব দেখা দিল। তার ফলস্বরূপ যুদ্ধ। যে যুদ্ধের মেয়াদ শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার আগ পর্যন্ত জারি থাকে।

মজার ব্যাপার হল, টেকনোলজিক্যালী নিয়েন্ডারথালরা এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও এই অস্তিত্বের যুদ্ধে তারা সেপিয়েন্সদের কাছে হেরে গেলো। এরপর থেকে ৭০ হাজার বছর ধরে সেপিয়েন্সরাই মানুষের নাম নিয়ে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াতে লাগলো।

এই প্যাটার্ণটা পৃথিবীর অন্য জায়গাতেও লক্ষ করা যায়। হোমো সেপিয়েন্সরা যেখানেই পৌঁছেছে, সেখানেই অন্য প্রজাতির মানুষেরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন এটা গণহত্যার কারণে হয়েছে না কোন অন্য কোন কারণে হয়েছে— সেটা গবেষণার বিষয়।

ইউরোপীয়রা যেমন আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ানদের কেবল কামান দেগেই হত্যা করেনি, ইউরোপীয়রা নিজেদের শরীরে যে রোগবালাই’র জীবাণু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল, রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে সেইসব জীবাণুর বিরুদ্ধে কোন রকম প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকাতেও এরা কাতারে কাতারে মরেছে। নিয়েন্ডারথাল আর হোমো ইরেক্টাসদের ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটা বিচিত্র নয়।

তবে যদি গণহত্যা থিওরী সত্যি হয়ে থাকে, তবে বলতে হয়— ইতিহাসের প্রথম গণহত্যার নায়ক চেঙ্গিস খান বা হালাকু খান নয়, নায়ক আমরা এই হোমো সেপিয়েন্সরা। যার জন্য আমাদের আজও কোন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। আমাদের মধ্যে যে হিংস্র, খুনে মানসিকতা বসত গেড়ে আছে, তা মধ্যযুগ বা কোন আধুনিক অস্ত্রের দান নয়। সত্তর হাজার বছর ধরে এই খুনে উল্লাস আমাদের ধমনীতে বয়ে চলেছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় ভয়ভীতি দিয়ে আমরা সেই খুনে সত্তাকে ঢেকে রাখি মাত্র।

একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। নিয়েন্ডারথালরা যদি হোমো সেপিয়েন্সদের তুলনায় টেকনোলজিক্যালী এগিয়েই থাকে, তবে ওরা কেন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল? নিশ্চিহ্ন তো হয়ে যাবার কথা আমাদের। পৃথিবীর ইতিহাস তো তাই বলে!

এই প্রশ্নের উত্তর না হয় আরেকদিন দেব।

প্রথম কিস্তি: 

মানুষের গল্প— ইউভাল হারারি: এক কিস্তি শূন্য

(চলবে)

ashfaq-galibলেখক: গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি


সর্বশেষ

আরও খবর

ইউরোপে মানবপাচার চক্রের তিনজনকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব

ইউরোপে মানবপাচার চক্রের তিনজনকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব


বিশ্বকাপের ধারাভাষ্যে আতহার আলি

বিশ্বকাপের ধারাভাষ্যে আতহার আলি


বাসের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু, উপচেপড়া ভিড়

বাসের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু, উপচেপড়া ভিড়


বিমানের বহরে পঞ্চম বোয়িং

বিমানের বহরে পঞ্চম বোয়িং


অভিযুক্তদের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় নিল শোভন-রাব্বানী

অভিযুক্তদের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় নিল শোভন-রাব্বানী


‘সন্তানের জন্য যা যা করতে হয় প্রধানমন্ত্রী তাই আমার জন্য করেছেন’

‘সন্তানের জন্য যা যা করতে হয় প্রধানমন্ত্রী তাই আমার জন্য করেছেন’


দাঙ্গার পর দ্বিতীয় রাতেও শ্রীলঙ্কাজুড়ে কারফিউ, গ্রেফতার ৬০

দাঙ্গার পর দ্বিতীয় রাতেও শ্রীলঙ্কাজুড়ে কারফিউ, গ্রেফতার ৬০


নাটোরে মা ও প্রতিবন্ধি সন্তানের মরদেহ উদ্ধার

নাটোরে মা ও প্রতিবন্ধি সন্তানের মরদেহ উদ্ধার


ইগলু আইসক্রিমকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা

ইগলু আইসক্রিমকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা


বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশে ফিরছেন ওবায়দুল কাদের

বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশে ফিরছেন ওবায়দুল কাদের