Thursday, September 8th, 2016
মানুষের জন্য এতো ঘৃণা!
September 8th, 2016 at 10:59 pm
মানুষের জন্য এতো ঘৃণা!

কাজি ফৌজিয়া:

‘মানুষেরে ঘৃণা করি ও কারা কোরান বেদ বাইবেল চুমিছে মরি মরি’

প্রিয় বন্ধু,

কবিতার চরণ দিয়ে শুরু করলাম আজকের লেখা। কেমন আছ তুমি? আমি এবং আমরা খুব ভাল নেই। বাংলাদেশে যেমন প্রতিদিন কিছু কিছু ঘটেই চলছে তেমনি আমাদের নিউইয়র্কের জীবনেও অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে। মনে হচ্ছে এখানে, বাংলাদেশি সমাজে কোন এক শনির দশা দেখা দিয়েছে। একটা শোক কাটাতে না কাটাতে নতুন আরেকটা আঘাত হানছে। গত চিঠিতে তোমাকে লিখেছিলাম নিরাপত্তা শংকায় বাংলাদেশি সমাজ! আমি কল্পনাও করিনি এই কথা এই চিঠিতেও বলতে হবে।

বন্ধু, গত ৩১শে আগস্ট বুধবার রাতে একটা পারিবারিক দাওয়াত ছিল। সারাদিন কাজ শেষে হাসি খুশি পরিবেশে সময় কাটাবো বলে শাড়ী গয়না পরে হাজির হলাম অনুষ্ঠানে। ভালই চলছিল অনুষ্ঠান; গরম বেশি থাকায় পাশে একটি টিভি চ্যানেল অফিসে যাই কিছুক্ষণ ঠান্ডা মেশিনে হাওয়া খাব বলে। রাত ১২ টার কাছাকাছি সময় সাংবাদিক বন্ধুটির কাছে সংবাদ আসে জামাইকায় বাংলাদেশি মহিলা ছুরিকাহত। অনেক খোঁজ-খবর ও এখানে সেখানে ফোন করে জানা গেল জামাইকা নিবাসী ৬০ বছর বয়সের নাজমা খানম দুর্বিত্তের ছুরিকাহত হয়ে জামাইকা হসপিটালে মারা গেছেন।

নিহত নাজমা খানম শরিয়তপুর নিবাসী ও স্কুল শিক্ষক ছিলেন। নাজমা খানমকে যখন হত্যা করে তার মাথায় হিজাব ছিল। অবস্থা দেখে পরিষ্কার ধারণা হচ্ছে এটা ‘হেইট ক্রাইম’। যখন বাসায় ফিরার জন্য ট্রেন ধরি তখন রাত ২ টা। জামাইকা আসতে আসতে রাত ২টা ৩০। স্টেশন থেকে বাসায় আসতে ৭ থেকে ১০ মিনিট লাগে। কাজ থেকে বাসায় ফেরার সময় আমি ধীরে সুস্থে হেঁটে আসি কিন্তু সেই রাতে মনে একটা ভয় কাজ করছিল; মনে হচ্ছিল এই বুঝি কেউ পিছন থেকে আঘাত করবে, রীতিমত দৌড়ে বাসায় আসি। পরের দিন সকালে জানতে পারি নিহত নাজমা খানম আমাদের সংগঠনের এক মেম্বার নিশিদের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। পত্রিকায় ছবি দেখে বুঝলাম এক এলাকায় থাকার কারণে আমিও মুখ চেনা চিনি।

শুক্রবার জুম্মার পরে জামাইকা মুসলিম সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় নাজমা খানমের জানাজা ও সংবাদ সম্মেলন। আমাদের সমাজ থেকে সেদিন নাজমা খানমের খুনিকে ধরা সে সঙ্গে মুসলিম ও হিজাবী মহিলাদের রক্ষা করতে পুলিশকে আহ্বান জানানো হয়। আমাদের হাতে প্ল্যাকার্ড ছিল পুলিশ আমাদের রক্ষা কর, আমাদের নিরাপত্তা রক্ষা কর! বাংলাদেশি পুলিশ এসোসিয়েশন মেম্বাররা এসব সাধারণ মানুষের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। আমরা বিচার চাই, ন্যায় চাই বলে শ্লোগান দিয়েছি। আমাদের অর্গানাইজেশনের বন্ধু কালো সমাজের ইমাম আইয়ুব বাকী কে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসি কথা বলতে, কিন্তু আয়োজকরা তাকে কিছুতেই কথা বলতে দিবে না। উনি জোর করেই কথার অনুমতি আদায় করেন। ইমাম বাকী জনগণ কে বলছিলেন, পুলিশ কাউকে নিরাপত্তা দেয় না উল্টো বিপদে ফেলে। আমরা কালো সমাজের মানুষ নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিই। 

বন্ধু আমার, নিউইয়র্ক ওয়ান টিভি চ্যানেল ও স্থানীয় মিডিয়া আমার সাক্ষাতকার নেয় তাদের প্রশ্ন হিজাবী বাংলাদেশি মহিলা হিসাবে তুমি কি শংকায় আছো বা তোমার মনে কি ভয় কাজ করছে? আমি বললাম এই প্রথম ভয় না হলেও চিন্তা হচ্ছে, সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় বাংলাদেশিরাই কেন টার্গেট হচ্ছে? আমি পুলিশের নিরাপত্তা চাই না! যে পুলিশ মুসলিমদের টার্গেট বানায়, মুসলিম কমিউনিটিকে নজরদারিতে রাখে, মিথ্যা কেসে ফাঁসায় সে আমাকে কি নিরাপত্তা দিবে বা রক্ষা করবে! আমাদের সমাজের উচিত নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্বান্ত নেয়া যে কি করা যায়। অন্য সমাজের মানুষের কাছ থেকে শিখতে হবে কি করে তারা হেইট ক্রাইম এর মোকাবেলা করেছে।

গোয়েন্দা নজরদারি, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, বা হেইট ক্রাইম ভিকটিম তো প্রথম না। বাংলাদেশি সমাজ হয়ত এইসব প্রথম দেখছে। আরেকটা বিষয় না বললেই নয়, নাজমা খানমের ঘটনার পর পর মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলিতে সংবাদ আসে। আন্ট অফ এন ওয়াই পিডি খুন হয়েছে! নাজমা খানমের বোনের ছেলে ট্রাফিক পুলিশ অফিসার, তিনি মুসলিম পুলিশ অফিসার ক্লাব এর মেম্বার। তাই পুলিশ অফিসারের আন্টি হল তার এক মাত্র পরিচয়। আমরা বললাম ৬০ বছর বয়সের নাজমা খানমের নিজের নাম কই গেলো? তিনি একজন বাংলাদেশি, একজন নারী, একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক। তিনি এই দেশে একজন শ্রমিক ছিলেন, সব ছাড়িয়ে মূলধারার সংবাদ মাধ্যমে তার মুল পরিচয় তিনি পুলিশ অফিসারের আন্টি।

অবশেষে খবর পেলাম অপরাধী ধরা পড়েছে। একজন লাতিনো যুবক গ্লাভেজ মারিন আর সে টাকা ছিনতাই করতে এসে টাকা না পেয়ে খুন করেছে। একি পাড়ার বাসিন্দা মারিন টাকার কারণে বয়স্ক মানুষকে খুন করছে!  শুনলাম আমাদের এলাকার অনেক লোকজন বলছে, সে নাকি মুসলিম হওয়ার কারণে অনেক লোকজনকে অপমান করছে। তার কোন ক্রাইম রেকর্ড ও নাই তবুও নিউইয়র্ক পুলিশ তাকে ডাকাতি মামলা ২য় ডিগ্রি খুন হিসাবে মামলা করেছে। জামাইকবাসী আন্দোলন করছে হেইট ক্রাইম রেকর্ড করাতে।

সেদিন ছিল শনিবার, আমাদের সংগঠনের পিকনিক ছিল, সারাদিন ১০০ সদস্য এবং তাদের পরিবারের লোকজন নিয়ে আনন্দ করা, খাওয়া দাওয়া, একে অপরের সাথে সময় কাটানো এই ছিল উদ্দেশ্য। ভালই হয়েছে পিকনিক। উদ্যোক্তা হিসাবে কাজও করতে হয়েছে বেশ। রবিবার সকালে অলসতা কাট ছিল না; বিছানা না ছেড়েই মোবাইল এপস দিয়ে ফেইস বুকে ঢুকলাম। হঠাৎ ফরহাদ মজহার এর ফেইসবুক স্ট্যাটাসে নজর পড়ল। উনি লিখেছেন ‘বিদায় শহীদ’ কিছুটা চমকে উঠলাম। আমার জানামতে শহীদ কাদরী লং আইল্যান্ড হসপিটালে ভর্তি ছিলেন। দুইদিন পূর্বে ও জনৈক কবির ফেইসবুকে পোস্টে দেখলাম উনি হসপিটালে বসে সাক্ষাতকারীদের সাথে গল্প করছেন। উনার অসুস্থতার খবর শুনে দেখতে যাব যাব করছিলাম, ঐ ছবিটা দেখে কিছুটা সস্থি পেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম কবি বোধহয় এ যাত্রা বেঁচে যাবেন। আমার ভাবনাকে মিথ্যা প্রমাণ করে কবি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

বন্ধু, তুমি হয়ত ভাবছ সাহিত্যের ‘স’ বুঝি না, কবিতার ‘ক’ বুঝিনা টাইপের মানুষ আমি আমার কবির সাথে পরিচয় ছিল কিভাবে? গত ৪ বছর পূর্বে ফরহাদ মজহারের মাধ্যমেই পরিচয় হয়েছিল। আমাকে উনি পছন্দ করতেন কিনা জানিনা তবে আমার উনাকে ভাল লাগত। শরীরের কষ্ট আর অক্ষমতাকে পায়ে দুমরে ভাল লাগার জায়গা গুলিতে হাজির হত। আর কখনো দেখা যাবেনা নিউ ইয়র্ক বাঙালি সমাজের সেই প্রিয় মুখ। কবিকে অনেকেই ভালবাসেন, অনেক ভক্ত উনার নিউইয়র্কে। আমার কবিকে ভাল লাগত কিন্তু ভক্ত বলতে যা বুঝায় আমি তা ছিলাম না। আমি ভক্ত ছিলাম কবি পত্নী নীরার, অসাধারণ গুনের অধিকারী ত্যাগী এই মহিলা কবিকে ভালবেসে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা নিউইয়র্ক বাসী মনে রাখবে অনেকদিন। কবিপত্নীর ত্যাগ আর ভালবাসার কথা নিয়ে একটা লেখা লিখব ভাবছি। কবির জানাজা ২৮শে আগস্ট রবিবার বাদ মাগরিব অনুষ্ঠিত হয়। অনেক সময় অপেক্ষা করে এক নজর তাকে দেখে আসি পরের দিন। তাকে নিয়ে নীরা ভাবী ও ছেলে আদনান বাংলাদেশে চলে যান। কবি ফিরে গেলেন আপন নীড়ে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় তাকে পাঠানো হয় বাংলাদেশে।

বন্ধু, শহীদ কাদরীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কথা তুমি হয়ত ভাল জান। আর আজ তোমকে শুধু কষ্টের কথাই লিখতে হবে। গত সপ্তাহে আমরা বাংলাদেশিরা শুধু শোক সংবাদই পেয়েছি। সাফিনা ও সৌরভ নামে এক দম্পতি টেক্সাসে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। তারা নিউইয়র্কে এলমার্স্টে থাকত। আমাদের বাঙালী সমাজে খুব পরিচিত মুখ ছিল দুজনেই। তাদের দুজনকে এখানেই সমাহিত করা হয়।

গত ২রা সেপ্টেম্বর নাজমা খানমের জানাজা হয় সেই রাতেই তাকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। পরের দিন খুব সকালে আমি টরেন্টোতে আছি ছোটবেলার বন্ধু পিয়াল এর বাসায়। আমার ছোটবেলার বন্ধু পিয়াল ও তার বোন রীমা, রীমার স্বামী শাহিন ও রীমার ভাশুর শামিম ও আমি সব এক ক্লাসে পড়তাম। শামিম বাদে আমরা সব টরেন্টোতে পিয়ালের বাড়ীতে জমা হয়েছি আগামী কাল নায়াগ্রা জলপ্রপাত যাব বলে। তোমাকে লিখতে লিখতে নায়াগ্রা দেখে এলাম, সারাক্ষণ তোমাকে মনে পড়ছিল, ভাবছিলাম ভয়ঙ্কর এই সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, একহাত ধরে আছে আমার খুব কাছের বন্ধু রীমা, আরেকটা হাত যদি তোমার হত!

ভাল থাকো বন্ধু। ভাল থাকুক দেশ ও দেশের মানুষ।

ইতি
তোমার বন্ধু, যাকে তুমি কোন নামেই ডাকো না।


সর্বশেষ

আরও খবর

মানবিক হও!

মানবিক হও!


সহমর্মিতার জয় হোক

সহমর্মিতার জয় হোক


মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন

মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন


আসছে শুভদিন!

আসছে শুভদিন!


আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম


জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি