Monday, September 12th, 2016
‘মানুষ মরতাছে আর তুই ছবি তুলস?’
September 12th, 2016 at 9:41 pm
‘মানুষ মরতাছে আর তুই ছবি তুলস?’

এস. কে. সিদ্দিকী, ঢাকা: প্রিয় পাঠকদের হয় তো মনে আছে, অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৫ চলছিল তখন। ফেব্রুয়ারি মাসের ২৬ তারিখ। মেলা প্রাঙ্গণে মুক্তমনা সাইটের প্রতিষ্ঠাতা ড. অভিজিৎ রায়কে সস্ত্রীক ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ফেলে রাখার পর তখন পুলিশ সদস্যরাও গা বাঁচিয়ে চলা পথচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। তখন দেবদূতের মত একজন সাংবাদিক এগিয়ে আসেন সেই রক্তাক্ত দম্পতিকে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়ার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে; প্রায় সবক’টি শিরোনামের বর্ণনায় এমনটাই লেখা ছিলো।

jibon-ahmed-profile

ফটোসাংবাদিক জীবন আহমেদ

ফটো সাংবাদিক জীবন আহমেদ- চায়ের কাপ হাতে আড্ডা দেয়ার বন্ধু, বাইকের পেছনে চেপে লিফট নেয়ার বড়ভাই, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার অকুতোভয় সহকর্মী। সদা হাস্যোজ্জল, প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর, ক্লান্তিহীন মিডিয়া কর্মী।

সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবনের শুরুতে তাকে শুধুই একজন ফটোসাংবাদিক হিসেবেই জানতাম। নিউজনেক্সটবিডি ডটকম প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় তাকে চিনলাম সহকর্মী হিসেবে। তা ছাড়াও যে জীবন আহমেদ’র আরো একটি পরিচয় আছে, তা জানতে বেশ সময় লেগে গিয়েছিলো।

জীবন আহমেদ’র অপারগতা একটিই- কর্তব্যের ব্যাপারে গাফিলতি করতে পারেন না; আর তার এই অপারগতাই তার জীবনকে বিপন্ন করে রেখেছে বছর খানেক। না-নাস্তিক, না-ব্লগার হওয়া সত্যেও মৌলবাদীদের হিট লিস্টে জায়গা পেয়ে গিয়েছেন তিনি।

চলুন তার মুখ থেকেই শুনে নেয়া যাক সেই সেদিনের গল্প, সেসবের গল্প।

[জীবন আহমেদের বাসা মোহাম্মদপুর। ইন্টারভিউ নিতে সেখানেই নিশিযাপন করতে হয় আমাকে, দিনে দু’জনই ভীষণ ব্যস্ত। যাই হোক, কর্মস্থলের সামনে থেকে তার বাইকেই লিফট নেই। রাতের খাওয়া সেরে আমরা গল্প করতে বসি।]

.

এনএনবিডি : কি করছিলেন সেদিন টিএসসি তে?

জীবন আহমেদ : আমি তখন একটা সংবাদ মাধ্যমের হয়ে বইমেলা কভার করছিলাম।

এনএনবিডি : কিভাবে জড়িয়ে পড়লেন?

জীবন আহমেদ : আমার কাজ ছিলো ছবি তোলা, আমি ছবি তুলছিলাম। হঠাৎ একজন নারীর আর্ত চীৎকার আমার সমস্ত মনযোগ আকর্ষণ করে। আমি সেদিকে ছুটে গিয়ে যা দেখি… [বলতে বলতে থেমে যান জীবন আহমেদ]

এনএনবিডি : আপনি কি তখন অভিজিৎ রায়কে চিনতেন?

জীবন আহমেদ : না, ওনার সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কখনোই ছিলো না। লেখক হিসেবে দু’একবার নাম শুনে থাকলেও ওনার লেখা পড়া হয়নি কখনোই।

এনএনবিডি : সম্পূর্ণ অচেনা দু’জন মানুষের জন্য আপনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন?

জীবন আহমেদ : কেউ এগিয়ে আসছিলো না, ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ লজ্জাজনক মনে হচ্ছিলো। তা ছাড়াও, মৃত্যুভয় আমি কেন যেন কখনোই অনুভব করি না। এটা আমার পেশাগত অভ্যাস কি না জানা নেই।

এনএনবিডি : আপনি যদি জানতেন আপনি একজন নাস্তিক ব্লগার ও তার নাস্তিক স্ত্রী’কে সাহায্য করতে যাচ্ছেন, তাহলে কি আপনি এগিয়ে যেতেন?

জীবন আহমেদ : দেখেন ভাই, প্রত্যেক মানুষই অপরাধী। আর নাস্তিক্য কোন অপরাধ না। তাদের জায়গায় যদি কোন খুনী মানুষও থাকতো, আমি একই কাজ করতাম; শুধুমাত্র তারা মানুষ, সেই জন্য।

এনএনবিডি : তারপর বলুন।

জীবন আহমেদ : আমি চীৎকার শুনে ভীড় ঠেলে এগিয়ে যাই। তখন আমি চাকরিজীবি, অফিসের কাজ করছি। আমার কাজ ছিলো ছবি তোলা। আমি ফটাফট দু’টো ছবি তুলি। তৃতীয়বার শাটার চাপার সময় আমার চোখ ভিউ ফাইন্ডারে, আমি ফোকাস করার চেষ্টা করছিলাম, হঠাৎ আমার চোখ বন্ধ হয়ে যায়। আমি আর নিতে পারছিলাম না সেই দৃশ্য।

এনএনবিডি : আপনি কি করলেন?

জীবন আহমেদ : আমি চোখ বন্ধ করেই শাটার চাপি। ততক্ষণে আমার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেছে। আমি ক্যামেরা গুছিয়ে ফেলি। মানুষজন যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো মনে হচ্ছিলো সিনেমার শ্যুটিং চলছে, আমি তার ক্যামেরাম্যান। আমি পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি। আমার ভেতর থেকে কে যেন জিজ্ঞেস করছিলো- ‘মানুষ মরতাছে আর তুই ছবি তুলস?’

এনএনবিডি : এটা নিয়ে কি আপনি এখনো অপরাধবোধে ভোগেন?

জীবন আহমেদ : না, ভুগি না। তবে আমি এখনো রাতে দু:স্বপ্নে দেখি সেদিনের ঘটনা।

এনএনবিডি : অভিজিৎদা’কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় কি ঘুরছিলো মনে?

জীবন আহমেদ : আমি কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। ঢাকা মেডিকেলের চেনা রাস্তাটাও গুলিয়ে যাচ্ছিলো। চাপাতির আঘাতে ওনার মাথার খুলি ফাঁক হয়ে গিয়েছিলো, প্রচুর রক্তপাত হচ্ছিলো, আমি সেদিকটা হাত দিয়ে চেপে ধরে রেখেছিলাম, যাতে ঘিলু না বেরিয়ে যায়। আমার হাতে আমি গরম রক্ত অনুভব করছিলাম। মগজের কিছু অংশ বেরিয়ে আমার হাতে এসে লাগছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো এই মানুষটাকে বাঁচাতে পারবো না। আমার শরীর একটু পরপর শক্ত হয়ে আসছিলো।

এনএনবিডি : থাক সেসব কথা। সেদিন মানবতার খাতিয়ে এগিয়ে আসার হুট করে নেয়া সিদ্ধান্তে আপনার জীবনে কি পরিবর্তন আসলো?

জীবন আহমেদ : কাজে গাফিলতি করার অভিযোগে আমার চাকরিটা চলে যায়। মানুষজন আমার সাথে এমন আচরণ শুরু করে, নিজেকে মনে হতে থাকে বাদুর। পাখিরা বলে, তুই মায়ের দুধ খাস, আর স্তন্যপায়ীরা বলে তোর পাখনা আছে, তুই উড়স। র‍্যাব, পুলিশ, এফবিআই, কে  না আমায় ফোনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে? বারবার নিজেকে জিজ্ঞেস করছিলাম, একজন মুমূর্ষু মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করা কি অপরাধ? আমি কি তাহলে দোষী?

এনএনবিডি :   আপনাকেও হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে?

জীবন আহমেদ :  আমি সাংবাদিক। কাজের প্রয়োজনে বাইক চালাই। সে সুযোগে সাজানো সড়ক দূর্ঘটনার শিকার হয়েছি বেশ কয়েকবার। তা ছাড়াও ফোনে হুমকিদাতা’র অভাব নেই। এ ব্যাপারে কোথাও কোন অভিযোগ করেও কাজ হয় না কখনো।

এনএনবিডি :  আপনার ভয় করে না?

জীবন আহমেদ : আমার কোন ভয় নেই। মনে হয়, যদি এখন মরে যাই, গেলাম! তাতে কি হলো? মরতে তো হবেই! তবে আমি একটা অজানা অস্বস্তিতে ভুগি।

এনএনবিডি : দশ বছর পর ফটোগ্রাফার হিসেবে নিজেকে কোন পর্যায়ে দেখতে চান?

জীবন আহমেদ : ফটোগ্রাফি আসলে বিসনেস প্ল্যান না যে টার্গেট থাকবে। তবে, আমার নিজের একটা একক এক্সিবিশন করার ইচ্ছা আছে, সেটা আমি শীঘ্রই করবো।

এনএনবিডি : তরুণ ফটোজার্নালিস্টদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চান?

জীবন আহমেদ : হ্যাঁ, বলতে চাই। কোন বিপদগ্রস্থ মানুষের ছবি তুলে তাকে সাহায্য না করে আড়ালে গিয়ে মেইল করাটা সাংবাদিকতা হতে পারে, মানবিকতা নয়। সাংবাদিক হওয়ার আগে মানুষ হয়ে নিলে ভালো হয়।

এনএনবিডি : ধন্যবাদ, জীবনদা। শুভরাত্রি।

জীবন আহমেদ : নিউজনেক্সটবিডি ডটকম’কে আমার পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ, শুভরাত্রি।

[আমরা সবক’টা জানালা খুলে দিয়ে, মেঝেতে পাটি বিছিয়ে, শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।]

 


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত


ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড


মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী


আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার

আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার


পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি

পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি


দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির

দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির


বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে

বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে


অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ

অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ


মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার

মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার


অবশেষে গ্রেফতার হলো এসআই আকবর

অবশেষে গ্রেফতার হলো এসআই আকবর