Tuesday, December 27th, 2016
মামলার জালে আটকা বিএনপি
December 27th, 2016 at 8:19 pm
মামলার জালে আটকা বিএনপি

শেখ রিয়াল, ঢাকা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও মামলার জালে আটকা। ওয়ান এলিভেন এবং আওয়ামী  লীগ সরকারের আমলে দলের এমন কোনো নেতা নেই যার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। তবে নেতাদের নামে মামলা মিথ্যা, বানোয়াট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে বরাবরই মন্তব্য করেছেন বিএনপির একাধিক নেতা।

দলের নেতারা মনে করেন, সরকার বিএনপির নেতাকর্মীদের রাজনীতি থেকে দূরে সরে রাখার জন্যই একের পর এক মিথ্যা মামলা দিচ্ছে। শুধু মামলা দিয়েই এ সরকার ক্ষান্ত থাকছে না। গুম, খুন, গ্রেফতার এবং কারাগারে পাঠানোর মতো বিবেক বহিভূত কাজও করছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো এলাকা থেকে বিএনপির নেতাদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার করা হচ্ছে।

বিএনপি সরকার বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নামার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে তবে  গ্রেফতার, গুম, গুলি করে হত্যার পরিমাণ এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে দলটি কর্মী শূন্যতায় ভুগছেন বলে জানান দলের একজন সিনিয়র নেতা। তিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছা সত্ত্বে বলেন, ‘বিএনপি আন্দোলন করার মতো শক্তি পাচ্ছে না। সরকার একের পর এক প্রস্তাব প্রত্যাখান করার পরেও দলের নেতারা কিছুই করতে পারছে না। রাজপথে আন্দোলন করার মতো নেতা এখন আর বিএনপিতে নেই। যারা আছে তারাও সাহস করে এগুতে পারছে না। তার উপর এখনও বিএনপি জেলা কমিটি গুলো ঘোষণা করা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির কাছে যে প্রস্তাবনা বিএনপি দিয়েছে সেটি যদি না মানা হয় তবে বিএনপির আন্দোলন করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা থাকবে না। সরকারের নির্ধারণ করা নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন চলাকালীন সরকার যদি আওয়ামী লীগ থাকে তবে কখনই নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসবে না এটা দলের সিনিয়র নেতারা ভালো করেই জানে।’

মামলার বেরাজাল থেকে খোদ খালেদা জিয়াও রেহায় পাননি। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেই রয়েছে পাঁচটি দুর্নীতির মামলাসহ ২৫টি মামলা। সবগুলোই বর্তমানে বিচারাধীন আছে। এরমধ্যে দুর্নীতির মামলা পাঁচটি। বাকিগুলো হত্যা- সহিংসতা, নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির মামলা।

খালেদা জিয়ার মামলা সম্পর্কে বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মোট ২৫টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি দুদকের করা মামলা, বাকি মামলাগুলোর মধ্যে হত্যা, নাশকতা ও পুলিশের কাজে বাধা দেয়াসহ রাষ্ট্রদ্রোহের অভিয়োগও রয়েছে। সবগুলো মামলাই এখন বিচারাধীন।’

এছাড়া দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে সারা দেশে ৮৪টি মামলা হয়েছে। ফখরুলের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৫টির অভিযোগপত্র আদালতে দেয়া হয়েছে। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে রফিকুল ইসলাম মিয়ার বিরুদ্ধে ৮৩, মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ৫৩, মওদুদ আহমদের বিরুদ্ধে ২৩, শমসের মবিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৬ ও সাদেক হোসেন খোকার বিরুদ্ধে ৩৪টি মামলা হয়েছে। দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ও কেন্দ্রীয় বেশির ভাগ নেতার বিরুদ্ধেও নাশকতার মামলা রয়েছে।

সারা দেশে নাশকতার অভিযোগে জোটের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলার সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। আসামি করা হয়েছে জোটের প্রায় সাড়ে চার লাখ নেতা-কর্মীকে। প্রতিদিনই এই মামলা সংখ্যা এবং গ্রেফতার হয়ে কারাগারে পাঠানো সংখ্যা বাড়ছে।

বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া সম্পর্কে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীদের রাজনীতি থেকে দূরে সরে রাখার জন্যই একের পর এক মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে। মামলার কারণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। সব মামলাই সাজানো। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত হয়ে এসব মামলা করা হচ্ছে।’

এবছরের বিএনপির হত্যা, গুম, মামলা, গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের সংখ্যা জানান দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি বলেন, ‘দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এ পর্যন্ত গুম হয়েছে ৪২২ জন, নিহতের সংখ্যা ৫০০’র উপরে, গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন এক হাজারেরও বেশি, মিথ্যা মামলার আসামী হয়ে কারাগারে এবং আত্মগোপনে আছে হাজার-হাজার বিএনপি নেতাকর্মী।

তবে কারাগারে আসা-যাওয়ার মধ্যেই রাজনীতির বেশিরভাগ সময় পার করছেন বিএনপির বেশিরভাগ নেতা। পাশাপাশি দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদেরকেও নিয়মিত কারাগারে-আসা যাওয়া করতে হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত আট বছর ধরেই দেখা গেছে এই চিত্র।

বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর সূত্র জানায়, গাজীপুরের মেয়র আব্দুল মান্নান, সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জিকে গউস, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন্নবী সোহেল, কেন্দ্রীয়নেতা আসলাম চৌধুরী ও লুৎফুজ্জামান বাবর, ঢাকা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল কবির পল কারাগারে আছেন। এছাড়া বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মী মিথ্যা মামলার আসামী হয়ে কারাগারে আছেন।

দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে ‘নিখোঁজ’ হওয়া বিএনপির ৪২২ জন নেতার খোঁজ এখনও মেলেনি। তাদের পরিবারের সদস্যরা পথ চেয়ে বসে থাকে হয়তো তাদের প্রিয় মানুষটি ফিরে আসবে সেই আশায়।

এ নিয়ে দলটির পক্ষ থেকে একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। নিখোঁজ নেতা-কর্মীদের পরিবারের অভিযোগ, সাদা পোশাকে ‘ডিবি’ কিংবা ‘র‌্যাব’ পরিচয়ে অধিকাংশ নেতা-কর্মীকেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সন্ধান দিতে পারেননি।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী এবং এরও অনেক আগে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর চৌধুরী আলমসহ নীলফামারীর আশরাফ আলী, আবদুর রহমান, বাবুল হোসেন, আজিজুল ইসলাম, ছকিন উদ্দিন মেম্বার, মহিদুল ইসলাম, আবদুল মালেক কাজী, আবদুল মালেক ও রাহেদুল ইসলাম দোলন; গাইবান্ধার নাজমুল হাসান শাকিব, মতিয়ার পারভেজ, মুসা আহম্মেদ, শাখাওয়াত, নুরুন্নবী, নবীন মিয়া, ঝিনাইদহের নজরুল ইসলাম ও নাসির উদ্দিন; খুলনার ইসলাম; সাতক্ষীরার কাজী হাসান উদ্দিন, হাফেজ কাজী হেলাল উদ্দিন, হাফেজ কাজী আরাফাত, আনোয়ারুল হক ও আনু হানিফ ছুটন মিয়া।

সিলেটের ইফতেখার আহম্মেদ দীনার, জুনেদ আহম্মেদ ও আনসার আলী; লক্ষ্মীপুরে ইকবাল হোসেন জুয়েল, বেলাল হোসেন, আলমগীর হোসেন, রাজু, ওমর ফারুক ও আবদুল কাদের। ঢাকা মহানগর বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছেন, ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন, সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সভাপতি সেলিম রেজা পিন্টু, সাংগঠনিক সম্পাদক সম্রাট মোল্লা, ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল নেতা খালিদ হোসেন সোহেল, সবুজবাগ থানার ছাত্রদল সভাপতি মাহবুবুল হক সুজন, ২৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি ফরহাদ হোসেন, লিটন, তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম-সম্পাদক তরিকুল ইসলাম জন্টু, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা আসাদুজ্জামান রানা, মাজহারুল ইসলাম রাসেল, আল আমিন, জিয়াউর রহমান শাহীন, সোহেল, রানা, তানভীর, পারভেজ, আবুল হালিম, জসিম, মো. সোহেল ও কাশেম রয়েছেন।

সম্পাদনা: সজিব ঘোষ


সর্বশেষ

আরও খবর

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


বঙ্গবন্ধুর মুক্তির নেপথ্যে

বঙ্গবন্ধুর মুক্তির নেপথ্যে


সামরিক ডাইজেষ্ট: আকাশে উড়ছে কমব্যাট ঘাস ফড়িং

সামরিক ডাইজেষ্ট: আকাশে উড়ছে কমব্যাট ঘাস ফড়িং


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


ঢাকার ১৫ মাইলের মধ্যে মিত্রবাহিনী

ঢাকার ১৫ মাইলের মধ্যে মিত্রবাহিনী


যুক্তরাষ্ট্রের হুমকীর মুখেও অটল ভারত

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকীর মুখেও অটল ভারত


বেসামাল প্রেসিডেন্ট, গভর্নর দিশেহারা

বেসামাল প্রেসিডেন্ট, গভর্নর দিশেহারা


পালানোর চেষ্টা ব্যর্থ নিয়াজির

পালানোর চেষ্টা ব্যর্থ নিয়াজির


জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারে ধাপ্পার অভিযোগ ভারতীয় লেখকের!

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারে ধাপ্পার অভিযোগ ভারতীয় লেখকের!


চীন-ভারত বৈরিতা নতুন করে জঙ্গিবাদ  উত্থানের সম্ভাবনা তৈরী করেছে

চীন-ভারত বৈরিতা নতুন করে জঙ্গিবাদ উত্থানের সম্ভাবনা তৈরী করেছে