Saturday, September 24th, 2016
‘মালিককে জেলে নেয়া হোক তবুও কারখানা চলুক’
September 24th, 2016 at 10:10 pm
‘মালিককে জেলে নেয়া হোক তবুও কারখানা চলুক’

প্রীতম সাহা সুদীপ ও রেজাউল করিম, ঢাকা: টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডের আহত শ্রমিকরা চান কারখানাটি পুনরায় চালু হোক। এজন্য তারা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

তারা বলছেন, টাম্পাকো কারখানাটি চারশ পরিবারের জীবন ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। এটি পুনরায় চালু না হলে এই মানুষগুলোকে না খেয়ে মরতে হবে। কারণ যারা কারখানটিতে চাকরি করতেন তাদের বেশিরভাগই ২০-৩০ বছর ধরে এখানেই কাজ করছেন। কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও বয়স বেশি হওয়ায় এখন আর তারা অন্য কোথাও কাজ পাবেন না তারা। তাছাড়া টাম্পাকোতে তাদের যে বেতন দেয়া হতো সেই পরিমান পারিশ্রমিকও কেউ দেবেনা।

মনোয়ার হোসেন নিজের জীবনের দীর্ঘ ২০ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডের সাথে। ওই দুর্ঘটনায় তার দুই পাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই পা প্লাস্টার করা অবস্থায় পনেরো দিন ধরে পড়ে আছেন  টঙ্গীর ৫০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি হাসপাতালের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে।

tampaco-employe-monowar-hossen-at-tongi-medical-by-rkjan

তিনি নিউজনেক্সটবিডি ডটকমকে বলেন, ‘১৯৯৬ সালের ১৬ জুন টাম্পাকোতে চাকরি শুরু করি। সর্বশেষে ওই কারাখানা মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করতাম। এমন দুর্ঘটনা ঘটে যাবে কখনো ভাবতেও পারিনি।’

‘যে টাকা বেতন পেতাম তা দিয়ে পুরো সংসার চালিয়ে সঞ্চয়ের কোন সুযোগ ছিল না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আমিই। এখন আমার পরিবার কিভাবে চলবে, তিন মেয়ের কি হবে?’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মনোয়ার।

টাম্পাকো লিমিটেড পুনরায় চালু করা দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তদন্ত হোক, মালিকপক্ষকে জেলে নেয়া হোক, বিচার করা হোক। কিন্তু সরকার যাতে আমাদের দিকে একটু নজর দেয়। আমাদের তো কোন দোষ নেই। আমরা তো পেটের দায়ে সেখানে কাজ করতাম। এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের দিকে মুখ তুলে না তাকান তাহলে তো না খেয়ে মরতে হবে।’

ওই দিনের ঘটনা জানতে চাইলে মনোয়ারের কান্না আরো বেড়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘সেদিন আমার মর্নিং শিফট ছিল। সকালে কারখানায় গিয়ে দেখি ভেতরে পুরো অন্ধকার। তাই লাঞ্চবক্সটা রেখে আবার বাইরে আসি। শিফট ইনচার্জকে জিজ্ঞেস করি বিদ্যুৎ নেই কেন। তিনি বলেন গ্যাস লিকেজ, তাই বিদ্যুৎ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তখনই হঠাৎ বিকট শব্দ শোনা যায়। এরপর আর আমার কিছু মনে নেই।’

মনোয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ওই দিনের দুর্ঘটনায় তো মালিকপক্ষ বা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হননি। জীবন গেছে শ্রমিকদের, অনেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। এখন যদি কারখানাটাও বন্ধ হয়ে যায় তাহলে আমাদের বাঁচার তো কোন পথ খোলা থাকবেনা। বয়স হয়েছে অন্য কেউ কাজও দেবে না, আর এই কারখানার মতো পারিশ্রমিকও পাবো না।’

মনোয়ারের মতোই আরেক হতভাগ্য শ্রমিক জীবন হাওলাদার। ১৯৯৯ সালের ১ আগস্ট থেকে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে টাম্পাকো লিমিটেডে অপারেটর হিসেবে কাজ করেছেন। এখন গুরুতর আহত অবস্থায় টঙ্গীর ৫০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি হাসপাতালের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন।

দুর্ঘটনার আগের দিন জীবন টাম্পাকোতে নাইট শিফটে কাজ করেছেন। পরদিন সকালেও তিনি কারখানাতেই ছিলেন। তার সামনেই শিফট ইনচার্জ সুভাস দাস গ্যাস অফিসে টেলিফোন করে কারখানার গ্যাস লিকেজের কথা জানায়। ঠিক সে সময় বিকট আওয়াজে বিস্ফোরণ ঘটে, সুভাস ঘটনাস্থলেই মারা যায়।

ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা এই শ্রমিক নিউজনেক্সটবিডি ডটকমকে বলেন, ‘শব্দটা শোনার পর পুরো কারখানা কেঁপে উঠে। আমার মনে হয় ভূমিকম্প হয়েছে, যার কারণে আমি প্রাণ বাঁচাতে টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়ে দেই। কিছুক্ষন পর অন্যদের দৌড়ঝাঁপ দেখে বুঝতে পারি যে আগুন লেগেছে। তখন কারখানা থেকে খুব কষ্ট করে বেরিয়ে আসি।’

জীবন হাওলাদার বলেন, ‘টাম্পাকোতে চারশ শ্রমিক কাজ করতো। সেদিন কারখানাতে রাতের ও দিনের শিফটের যারা ছিল তারা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার নিহত ও আহতদের আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে, সেজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। তবে এই অনুদানে কি হয়? এই টাকায় না হয় আমরা চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হলাম, তারপর আমাদের সংসার চালাবো কিভাবে? তাই আমরা এই চারশ পরিবার রক্ষায় সরকারের হস্তক্ষেপ চাচ্ছি।’

tampaco-employe-jibon-with-his-wife-at-tongi-medical-by-rkjan

গত ১০ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টার দিকে টাম্পাকো ফয়েল কারখানায় বিস্ফোরণ ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচ তলা ভবনের পুরোটাই ধ্বসে পড়ে। এই ঘটনায় কারখানাটির মালিক ও বিএনপির সাবেক এমপি মকবুল আহমেদ লেচু মিয়া সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে টঙ্গি মডেল থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী মডেল থানার উপ-পরিদর্শক সুমন ভক্ত নিউজনেক্সটবিডি ডটকমকে বলেন,  ‘টাম্পাকোর ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩৬ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জনের লাশ শনাক্ত করে ইতোমধ্যে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শনাক্ত বিহীন রয়েছে ৬টি লাশ। এসব লাশের পরিচয় খুঁজে বের করার জন্য ১৮ জনের লালা ও রক্ত রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের ল্যাবে জমা নেয়া হয়েছে।’

সুমন ভক্ত আরো বলেন, ‘টাম্পাকো লিমিটেডের মালিক মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দু’টি মামলা হয়েছে। তদন্ত চলছে। একই সাথে মকবুল হোসেনসহ অন্যান্যদের গ্রেফতারে অভিযানও অব্যহত রয়েছে। তারা যাতে দেশত্যাগ না করতে পারে সেজন্য ইতিমধ্যেই পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আশাকরি শিগগিরই তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।’

সম্পাদনা: তুসা, জাহিদুল ইসলাম


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত


মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী


আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার

আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার


পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি

পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি


বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে

বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে


অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ

অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ


মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার

মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার


বিরোধী নেতাদের কটাক্ষ করতেন না বঙ্গবন্ধু: রাষ্ট্রপতি

বিরোধী নেতাদের কটাক্ষ করতেন না বঙ্গবন্ধু: রাষ্ট্রপতি


মসজিদ-মন্দিরে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করলো সরকার

মসজিদ-মন্দিরে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করলো সরকার


করোনায় একদিনে আরও ১৮ প্রাণহানি

করোনায় একদিনে আরও ১৮ প্রাণহানি