Saturday, November 9th, 2019
মুক্তচিন্তা প্রকাশের ভীতি কাটাবে লিট ফেস্ট!
November 9th, 2019 at 7:54 pm
মুক্তচিন্তা প্রকাশের ভীতি কাটাবে লিট ফেস্ট!

শরীফ খিয়াম;

ঢাকা: চলতি দশকে উগ্রবাদীদের হাতে লেখক-প্রকাশক খুন, রাষ্ট্রীয় চাপসহ সামাজিক নানা কারণে বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতাচর্চা ও মুক্তচিন্তা প্রকাশের ক্ষেত্রে যে ভীতি তৈরী হয়েছে তা কাটাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে ঢাকা লিটার‌্যারি ফেস্টিভ্যাল (ঢাকা লিট ফেস্ট); এমনটাই মনে করছেন আয়োজকরা। 

রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এই উৎসবের দ্বিতীয় দিনে বিষয়টি নিয়ে আলাপ হয় ঢাকা লিট ফেস্টের অন্যতম উদ্যোক্তা ও পরিচালক কবি সাদাফ সায্‌ সিদ্দিকীর সাথে।

“এ রকম আয়োজন নিয়মিত করতে পারলে ওই (শঙ্কামুক্ত) জায়গায় অবশ্যই পৌঁছানে যাবে,” উল্লেখ করে এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, “আশাকরি, আমরা এই উৎসব অব্যাহত রাখতে পারবো।” 

নবমবারের মতো আয়োজিত এই উৎসবের শতাধিক অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন পাঁচ মহাদেশের ১৮ দেশের প্রায় তিনশ লেখক-সাহিত্যিক-চিন্তাবিদ, যার মধ্যে কমপক্ষে একশজন ভিন্নভাষী। বাক স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ, রাজনীতির বিভিন্ন প্রেক্ষাপট ও মুক্তচিন্তাকে গুরুত্ব নিয়ে সাজানো হয়েছে এর বিভিন্ন অধিবেশন।

“এই উৎসবে আমরা বিভিন্ন ধরনের মতামত তুলে ধরার চেষ্টা করি। নির্দিষ্ট একটি বিষয়কে এখানে বিভিন্ন দিক থেকে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এটি একটি নিরপেক্ষ মঞ্চ। এখানে স্বাধীনভাবে কথা বলা যায়,” নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন সাদাফ।

“যখন আমরা মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারবো, তখনই আমাদের নিজস্ব মতামত তৈরী হবে,” উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, বাংলাভাষী বুদ্ধিজীবীরা এই আয়োজনের সুফল পাচ্ছেন।

যদিও বাংলাদেশী কবি ব্রাত্য রাইসু মনে করেন, বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এমন বার্তা দেওয়ার সরকারি উদ্দেশ্যই বাস্তবায়ন করছে লিট ফেস্ট।  

উৎসব প্রাঙ্গণেই নিউজনেক্সটবিডিকে তিনি বলেন, “এ ধরনের আয়োজনের মধ্যে যখন আপনি বাকস্বাধীনতার চর্চা করেন, তখন এর অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে সরকার কারো বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে না। এই বার্তাটিই আন্তর্জাতিকভাবে পৌঁছানো হচ্ছে।”

“সরকারের সংস্থাগুলো আরো শক্তিশালী এবং কৌশলী হয়েছে। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে বিদ্রোহী বা লেখকরা খুব বেশী আগাতে পারেনি। সরকার এক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গিয়েছে,” বলেন তিনি। 

“বাকস্বাধীনতাচর্চার কোনো জায়গাতো তৈরী করছেই না, বরং দেশে বাকস্বাধীনতা যে কম আছে, সেটাও বুঝতে দিচ্ছে না এই লিট ফেস্ট,” উল্লেখ করেন রাইসু।

তিনি বলেন, “যে রাষ্ট্রে ক্রসফায়ারে হত্যার উদাহরণ আছে, সেখানে একজন লেখক বা সাহিত্যিক যখন কথা বলতে পারেন না, তাঁর ভীতিকে অমূলক বা ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ বলা যায় না। এটা রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপেরই বহিঃপ্রকাশ।”

উৎসবে অংশ নেওয়া ইন্ডিয়ান স্টাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও ভাষা অধিকার আন্দোলনের কর্মী গর্গ চট্টোপাধ্যায় নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “আমি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, আবার এই যে ঢাকা লিট ফেস্টে কয়েকবছর ধরে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আসছি; তারই প্রেক্ষিতে বলতে পারি পূর্ণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোথাও নেই।”

“এর মধ্যে এটাই বীর বুদ্ধিজীবীর চ্যালেঞ্জ যে সে কোন রূপক ব্যবহার করবে, বা কোন প্রতিস্পর্ধা দেখাবে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতে রূপক আর প্রতিস্পর্ধা শানিত না করে যদি শুধু নালিশ ঠোকা হয়, সেটাও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্বকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একভাবে বৈধতা দেওয়া, যোগ করেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মস্তিষ্ক বিজ্ঞানে পিএইচডি করা এই তাত্ত্বিক।

পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে ‘জনসম্পৃক্ততাই প্রতিস্পর্ধিতার সবচেয়ে বড় অস্ত্র’ উল্লেখ করে গর্গ বলেন, “বর্তমানের সাহিত্যিকরা নিজেদের জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। তাদের লেখায় বাঙালী গণমানুষের ইস্যুগুলো ব্যাপকভাবে উঠে আসছে না।”

“মূলত বাংলা সাহিত্যের কার প্রতিনিধিত্ব করবে তার সাথেই জড়িত, এখানকার লেখক-সাহিত্যিক নানাভাবে আক্রান্ত হলে কে তাদের রক্ষা করবে,” বলেন বাংলা ও বাঙালীর অধিকার আদায়ে সক্রিয় অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন বাংলা পক্ষের এই অন্যতম নেতা। 

“পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সাহিত্য হেরে যাচ্ছে না, হারিয়ে দেওয়া হচ্ছে,” উল্লেখ করে তিনি এজন্য হিন্দী পুঁজির আগ্রাসনকে দায়ী করেন।

এদিকে লিট ফেস্টেও কোনঠাসাই ছিলেন বাংলার সাহিত্যিকরা। বরিশাল থেকে এই উৎসবে অংশ নিতে আসা কবি হেনরী স্বপন বলেন, “আমরা যারা বাংলায় লেখালেখি করি, এই উৎসবের আমাদের অবস্থানও আসলে খুবই গৌন। এখানে যারা আসেন, পাঠক বা উৎসুক দর্শক; তারা আমাদের ধারেকাছেও ঘেঁষে না।”

“এটা নিঃসন্দেহে ‘এলিটদের ফেস্ট’ নিঃসন্দেহে। ইংরেজী সাহিত্য আমরা কজনই-বা পড়তে চাই বা পড়ি। ইংরেজী মাধ্যমের স্কুলগুলোতেও আমাদের এলিটদের ছেলেমেয়েরাই পড়ে। যে কারণে এই উৎসবে ওদের আধিপাত্য থাকবে, এটাই স্বাভাবিক,” বলেন তিনি।

হেনরীর দাবি, “প্রতিনিয়ত এই আয়োজনের ব্যাপ্তি বাড়ছে। দেশী-বিদেশী লেখকদের সম্মিলন এবং উৎসাহী পাঠক, বিশেষ করে ইংরেজীমাধ্যমে পড়ুয়া অতি তরুণদের আগ্রহও বাড়ছে। তারা সাহিত্যের নানাকিছু জানতে বা বুঝতে চাচ্ছে।”

“ইংরেজী সাহিত্যের বড় বড় লেখকরা, যারা ইতিমধ্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, কিংবা আগামীতে পাঁচ বছরে পাবেন, এমন লেখকরাও এই উৎসবে এসেছেন। এর গ্রহণযোগ্যতাও দারূনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে,” যোগ করে তিনি বলেন, “বিভিন্ন দেশের উঁচুমাপের এই লেখক-সাহিত্যিকদের সাথে ভাববিনিময় আমাদের সমৃদ্ধ ও উজ্জীবিত করছে।” 

এবারের উৎসবে আমন্ত্রিত বিদেশিদের তালিকায় ‘ব্রিকলেন’ খ্যাত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক ও ঔপন্যাসিক মনিকা আলী ছাড়াও ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক শংকর, পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী লেখক জেফরি গেটলম্যান, ডিএসসি অ্যাওয়ার্ড ফর সাউথ এশিয়ান লিটেরেচার পুরস্কার বিজয়ী সাহিত্যিক এইচ এম নাকভি, ইতিহাসভিত্তিক লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পল, ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও লেখক শশী থারুর, কবি তিশানি দোশি, সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী, কবি ও সাংবাদিক মৃদুল দাশগুপ্ত, ভারতীয় সাংবাদিক প্রেয়াগ আকবর, ফিনিশ সাংবাদিক মিন্না লিন্ডগ্রেন, ব্রাজিলের কথাসাহিত্যিক ইয়ারা রড্রিগেজ প্রমুখ।

বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের মধ্যে ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী, কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ইমদাদুল হক মিলন, শাহীন আখতার, মোস্তফা কামাল, আসাদুজ্জামান নূর, ফখরুল আলম, ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের, আলী যাকের, সেলিনা হোসেন, শামসুজ্জামান খান, আনিসুল হক, কামাল চৌধুরী, আফসান চৌধুরী, কাইজার হক ও খাদেমুল ইসলামসহ আরো অনেকে।

বেজেছে বিদায়ের সুর

অবশেষে শনিবার শেষ হচ্ছে লিট ফেস্ট। বিশ্ব পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক, অনুসন্ধানী সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ, চিন্তাবিদ, শিল্পীসহ নানা শ্রেণি-পেশার গুণীজনেরা ছিলেন তিন দিনের এই উৎসবে  আমন্ত্রিতের তালিকায়। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত দেশি ও বিদেশি সাহিত্যকে তুলে ধরা হয়েছে।  

চার বছর ধরেই এই উৎসবের খবর সংগ্রহ করছেন ঢাকার সাংবাদিক দীপন নন্দী। নিউজনেক্সটবিডিকে তিনি বলেন, “প্রতিবারের মতো এবারও বিশ্বসাহিত্য, বাংলাদেশের সাহিত্যের পাশাপাশি চলমান বিশ্বের নানা সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে আলাপে বসছিলেন গুণীজনেরা।”

কথাসাহিত্যিক কাজী আনিস আহমেদ, কবি সাদাফ সায্ সিদ্দিকী ও কবি আহসান আকবরের পরিচালনায় ২০১১ সালে ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ নাম দিয়ে এ উৎসবের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০১৫ সাল থেকে এটি ঢাকা লিট ফেস্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিগত আট বছরে এ উৎসবে যোগ দিয়েছেন নোবেল, ম্যান বুকার, পুলিৎজার বিজয়ীরা।

এবার উৎসবের সহযোগিতায় ছিল সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ বলেন, “বাংলা সাহিত্যকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে ঢাকা লিট ফেস্টের আয়োজন। আমাদের আশা, একদিন লিট ফেস্ট বাংলাকে নিয়ে যাবে বিশ্বের কাছে।” বিদেশী অতিথিদের রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিষয়টি নিজ দেশের সরকারের কাছে লেখালেখির মাধ্যমে তুলে ধরার অনুরোধও করেন প্রতিমন্ত্রী।

এবারের উৎসবে অন্যতম আর্কষণ ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘হাসিনা: অ্যা ডটারস টেল’- এর বিশেষ প্রদর্শনী ও তা নিয়ে আলোচনা। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের আগাম আয়োজন হিসেবে ছিল আলোচনা ও তাকে নিবেদিত কবিতা পাঠের আসর।

এছাড়া উৎসবের প্রথম দিনেই দেওয়া হয়েছে জেমকন সাহিত্য পুরস্কার। উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছির ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউন, সহপৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছে সিটি ব্যাংক। #


সর্বশেষ

আরও খবর

আবরার হত্যা মামলার চার্জশিট, ছাত্রলীগের নেতাসহ আসামি ২৫

আবরার হত্যা মামলার চার্জশিট, ছাত্রলীগের নেতাসহ আসামি ২৫


ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৬, তদন্ত কমিটি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৬, তদন্ত কমিটি


রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে গাম্বিয়ার মামলা

রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে গাম্বিয়ার মামলা


রাঙ্গা-ভাষার পাতকূয়া প্রদাহ

রাঙ্গা-ভাষার পাতকূয়া প্রদাহ


বুলবুলের তাণ্ডবে ৪ জন নিহত

বুলবুলের তাণ্ডবে ৪ জন নিহত


জাবিতে অভিযোগ প্রমাণ করুন, অন্যথায় শাস্তি: প্রধানমন্ত্রী

জাবিতে অভিযোগ প্রমাণ করুন, অন্যথায় শাস্তি: প্রধানমন্ত্রী


মুক্তিযোদ্ধা বাদল-খোকার চলে যাওয়াঃ মিলনই মৌলিক

মুক্তিযোদ্ধা বাদল-খোকার চলে যাওয়াঃ মিলনই মৌলিক


এমপি মঈন উদ্দীন খান বাদল মারা গেছেন

এমপি মঈন উদ্দীন খান বাদল মারা গেছেন


খোকার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত, মরদেহ দেশে আসবে বৃহস্পতিবার

খোকার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত, মরদেহ দেশে আসবে বৃহস্পতিবার


বরগুনায় বিদ্যুৎস্পর্শে মা-ছেলেসহ ৩ জনের মৃত্যু

বরগুনায় বিদ্যুৎস্পর্শে মা-ছেলেসহ ৩ জনের মৃত্যু