Tuesday, September 15th, 2020
মুক্তিযুদ্ধে যোগদান
September 15th, 2020 at 9:29 pm
মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

(পূর্ব প্রকাশিতের পর – নাজমুল আহসান শেখ রচিত ১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে বইয়ের ধারাবাহিকের চতুর্থ পর্ব)

২৫ মার্চ ঢাকা : রাত্রে স্বচক্ষে ঢাকা শহরে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ দেখার একদিন পর জনাব এ কে খন্দকার সাহেব ২৭ মার্চ নিজে জিপ চালিয়ে আজিমপুর যান (পৃ. ৫১)। তার নিজের ভাষায়, ‘চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ’। সন্ধ্যায় নাখালপাড়ায় এয়ারফোর্স মেস থেকে তিনি আবারও গণহত্যা দেখেন আর দ্বিতীয়বারের মতো সিদ্ধান্ত নেন, ‘এদের সঙ্গে আমি এক মুহূর্তও থাকব না।’

ফিরে দেখা যাক সেই দুঃসময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপঞ্জি :

২৬ মার্চ ১৯৭১, তুলন, ফ্রান্স। তুলন ঘাঁটির মানগ্রো সাবমেরিনে ১৩ জন বাঙালি সাবমেরিনার স্বদেশ থেকে অনেক দূরে ইউরোপের নিরাপদ মাটিতে সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে বেশ সুখেই ছিলেন। ২৬ মার্চ সুদূর ফ্রান্সে বিবিসির সংবাদ বুলেটিনে বাংলাদেশের সর্বশেষ এবং চরম পরিস্থিতির ঘটনা শোনার পর তারা সিদ্ধান্ত নেন বিদ্রোহ করার। ফ্রান্স থেকে, সুইজারল্যান্ড, স্পেন হয়ে তারা ৮ এপ্রিল বোম্বে এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছান। (১)।
২৭ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থিত ৪ বেঙ্গল বিদ্রোহ করে তাদের সিওকে বন্দি করে। মার্চের শেষ সপ্তাহে লে কর্নেল সালাহউদ্দীন মোহম্মদ রেজা ঢাকা থেকে পায়ে হেঁটে সীমান্ত অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

২ এপ্রিল এম.এন.এ কর্নেল ওসমানী (অব.) ঢাকা থেকে পালিয়ে কুমিল্লার মতিনগর সীমান্ত পার হন।
৪ এপ্রিল হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে বাঙালি বিদ্রোহী অফিসারদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়, যার সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন এম.এন.এ কর্নেল ওসমানী (অব.)।
১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়।
১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করেন।
“১৮ এপ্রিল বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ আর বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল শহীদ হন।
২৫ এপ্রিল নাগাদ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আমাদের আর কোনো অবস্থান রইল না”। (২)
জনাব এ কে খন্দকার তার সমগ্র বইয়ে মেজর কাইয়ুম খানের (অব.) ‘বিটার সুইট ভিক্টরী, আ ফ্রিডম ফাইটারস টেইল’ বইয়ের অনেক উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে ১৯৭১ সালের ছাত্র কাইয়ুম (মেজর কাইয়ুম খান (অব.) মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং খালেদ মোশাররফ বীরউত্তমের নির্দেশে মতিনগরে ক্যাম্প থেকে ঢাকায় এসে মেজর শাফায়াত জামিল বীরবিক্রমের স্ত্রী এবং দুই ছেলেকে নিয়ে মতিনগর ক্যাম্পে ফিরেও আসেন। (‘বিটার সুইট ভিক্টরী, আ ফ্রিডম ফাইটারস টেইল’ মেজর কাইয়ুম খান (অব.) পৃ. ৬৯)
এই সম্পূর্ণ সময়ের মধ্যেও জনাব এ কে খন্দকার ঢাকা থেকে ১০০ মাইলের কম দূরত্বের সীমান্ত অতিক্রম করতে পারলেন না। ততদিনে প্রথমবার দেশ ত্যাগের চেষ্টার সহযাত্রী ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মারগুবকে পাকিস্তানে বদলি করে দেওয়া হয়। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৫ মে জনাব এ কে খন্দকার মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে আগরতলার কাছাকাছি মতিনগর ক্যাম্পে পৌঁছান! ভানুর কৌতুকের মতো, এই সম্পূর্ণ সময় ধরে জনাব এ কে খন্দকার সাহেব শুধু ভাবতেই থাকেন, ‘কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা যায়’! (পৃ. ৭১)


জনাব এ কে খন্দকারের ‘বস’ পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ঢাকা বেইস কমান্ডার এয়ার কমোডর মাসুদ পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ দেখার পর তিনি বেসামরিক জনগণের ওপর সরাসরি বিমান হামলা চালানোর বিরোধিতা করেন। যার ফলে ৩১ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানি এয়ার কমোডর মাসুদকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
লক্ষণীয় বিষয়, ১৯৭১ সালের ১৫ মে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত জনাব বাঙালি এ কে খন্দকার মধ্য মে পর্যান্ত বহাল তবিয়তে ঢাকা বেইসে কর্মরত ছিলেন, মার্চ এবং এপ্রিল মাসের ‘বেতন-ভাতা’ও গ্রহণ করেছিলেন! ২৮ মার্চ ছুটি চাওয়া মাত্রই পেয়েছিলেন। ছুটির পর কর্মস্থলে ফিরে এলেও কেউ তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করেনি তিনি পূর্ববর্তী দুই সপ্তাহ কোথায় ছিলেন!
তিনি তো শহীদ মতিউর রহমান বীরশ্রেষ্ঠ’র মতো কিছু করার চেষ্টা বা করতে বা করাতে পারতেন! অথবা বায়াফ্রার সেই সুইডিস নাগরিক কার্ল গুস্তাফের মতো। ১৯৬৯ সালের ২২ মে কার্ল গুস্তাফ নামের এক সুইডিশ মানবতাবাদী বৈমানিক বায়াফ্রায় নাইজেরীয় সরকারের অত্যাচার এবং হত্যাযজ্ঞ বন্ধের লক্ষ্যে কার্ল গুস্তাফ ও তার চার সহযোগী মিলে বেসামরিক বিমানে রকেট লাগিয়ে অতর্কিতে নাইজেরীয় কয়েকটি বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে নাইজেরীয় বিমান বাহিনীর অনেকগুলো বিমান মাটিতেই ধ্বংস করে দেন!

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ঢাকা বেইসের উপপ্রধান, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পরীক্ষিত সাহসী বৈমানিক জনাব এ কে খন্দকার সাহেরের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী ঢাকা বেইসের সবকিছু ছিল তার নখদর্পণে। ঢাকা বেইসে তার সঙ্গে ছিলেন আরো অনেক সাহসী বাঙালি বৈমানিক যেমন উইং কমান্ডার বাশার, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সুলতান মাহমুদ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সদরুদ্দীন (এই চারজনই পরবর্তী সময়ে বিমান বাহিনী প্রধান হয়েছিলেন) আর বিমান সেনা। কিন্তু তিনি সাহসী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া তো দূরের কথা, এই ধরনের চিন্তাও করেছেন বলে কোথাও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নাই।

বইটি রচনা করার সময় জনাব এ কে খন্দকারের মতো দায়িত্ববান ব্যক্তি (?) যে প্রয়োজনীয় গবেষণা বা ফ্যাক্ট চেক করেন নাই সেই বিষয়টি খুবই দৃষ্টিকটু হয়ে ধরা পড়বে সচেতন পাঠকের কাছে।

যেমন তিনি লিখেছেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মারগুব (প্রথমবার দেশত্যাগের চেষ্টার সহযাত্রী) ১৯৭২ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। ১৯৭২ সালে জনাব এ কে খন্দকার ছিলেন বিমান বাহিনী প্রধান। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মারগুব যদি ১৯৭২ সালে নিহত হতেন, তাহলে তৎকালীন বিমান বাহিনী প্রধান হিসেবে জনাব এ কে খন্দকার সাহেবের অবশ্যই মনে থাকার কথা।
মারগুব ভাই ছিলেন আমার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বুয়েটের সহপাঠী খোকনের (উত্তরার মাস্কাট প্লাজার অন্যতম স্বত্বাধিকারী জিয়াউল হক খোকন) দুলাভাই। ১৯৮২ সালে আমরা যখন বুয়েটের ছাত্র, সেই সময় মারগুব ভাই এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন।
সরাসরি জড়িত এই ধরনের ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর ঘটনার ব্যাপারেও জনাব এ কে খন্দকার সাহেবের যখন স্মৃতিভ্রম হয়, তখন বিচ্ছিন্ন না অথবা ব্যক্তিগতভাবে অনুপস্থিত বিভিন্ন বিষয়ে তার বক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য হবে বা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত তা ভেবে দেখার দরকার আছে।

তথ্যসূত্র :

১. চাঁদপুরে নৌ-মুক্তিযুদ্ধ, মো. শাহজাহান কবির বীরপ্রতীক ২. একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর, কর্নেল শাফায়াত
জামিল ৩. ‘বিটার সুইট ভিক্টরী, আ ফ্রিডম ফাইটারস টেইল’, মেজর কাইয়ুম খান (অব.) ৪. একাত্তর আমার, মোহম্মদ নুরুল কাদের
৫. বিদ্রোহী মার্চ ১৯৭১, মেজর রফিকুল ইসলাম (অব.) পিএসসি ৬.Count Carl Gustaf Ericsson von Rosen (August 19, 1909 – July 13, 1977))


সর্বশেষ

আরও খবর

ক্রোকোডাইল ফার্ম

ক্রোকোডাইল ফার্ম


সামার অফ সানশাইন

সামার অফ সানশাইন


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা