Thursday, October 13th, 2016
মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে ঢাবি শিক্ষার্থীদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া
October 13th, 2016 at 1:13 pm
মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে ঢাবি শিক্ষার্থীদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া

মিশুক মনির. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: তৎকালীন পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) এর অধীনে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ থেকে ৮ শতাংশ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে সুযোগ দেয়া হত। পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, এবং সামাজিক ভাবে শোষণ করতে থাকলে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে পূর্ব বাংলার (বাংলাদেশের) জনগন। ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে তারা অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে উঠে এবং ন্যায্য দাবি আদায়ে তারা তখন জীবন দিতেও পিছপা হয়নি।

ওই সময় যদি পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) সমতা বিরাজ করত তাহলে হয়তো স্বাধীনতার এই প্রেক্ষাপট তৈরী হতো না। তারপরও তখন বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করার কারণ ছিল একটাই, আর তা হচ্ছে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সম অধিকার পাওয়া। তা কি আজ বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে?

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সেক্টর বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)। তাই বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের এই সেক্টরে সমান অধিকার রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিসিএস পরীক্ষায় ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা রয়েছে। মেধাবীদের পদচারণায় প্রানবন্ত দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জানতে পেরেছি তা তুলে ধরার চেষ্টা মাত্র। মূলত মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়েই তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন ঢাবি শিক্ষার্থীরা।

তারা মনে করেন, বাংলাদেশ ছাড়া কোন দেশেই মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবস্থা নেই। এদেশে এই কোটা ব্যবস্থা আছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটার মাধ্যমে বিশাল জনবল নিয়োগ হওয়ায় বিসিএস এ মেধাবী শিক্ষার্থীদের জায়গা হচ্ছে না। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুখোড় মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও ঝড়ে পড়ছে। ফলে বিসিএস নামক কাঙ্খিত স্বপ্নের কবর রচিত হচ্ছে। এর জন্য দায়ী আমাদের দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা বলেও জানান ঢাবি শিক্ষার্থীরা।

du-admission

কোটা সিস্টেম প্রচলিত থাকায় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। কোটা ব্যবস্থার কারণে তুলনামূলক কম মেধা সম্পন্ন জনবল বিসিএস এ নিয়োগ পাচ্ছে। কিন্তু তার পরেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এই কোটা ব্যবস্থাকে। তারা আরোও জানান, আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে। এদেশের জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়ে স্বাধীনতা এনেছে এদেশের মুক্তিযোদ্ধারা। তাই মুক্তিযোদ্ধা পরিবার থেকে কমপক্ষে একজনকে এই কোটার মাধ্যমে সুযোগ দেয়া যেতে পারে। সে সুযোগটি পরিবারের স্বচ্ছলতা আনতে অগ্রণী ভুমিকা পালন করবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সন্তান থেকে শুরু করে নাতি-নাতনিদেরও এই কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে সুযোগ দেযা হচ্ছে। যা মেধাবীদের জন্য শুধু দুঃখের বার্তাই বয়ে আনে।

বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের দিকটি উল্লেখ করে শিক্ষার্থীরা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি আরো তরান্বিত হতো যদি প্রকৃত মেধাবীরা প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতো। উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডকে গতিশীল করতে হলে কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের ব্যবস্থা কিছুটা হলেও কমানো উচিত বলে মনে করেন এই শিক্ষার্থীরা। স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে দু একটা ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি দেখলে হতবাক হয়ে যাই । যেখানে কিনা মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা ছাড়া অন্য কোন শিক্ষাথীর্রা আবেদনই করতে পারবে না। তাহলে এখানে মেধার মূল্যায়নটা কোথায়? তিনি আরো বলেন, ‘২০১৪ সালে সোনালী ব্যাংকের এক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল ৯০০জন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান নিয়োগ দেয়া হবে। কিন্তু পরিশেষে সেখানে দেখা গেছে মাত্র ৪০০ জন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের আবেদনপত্র জমা পড়ে। এ থেকেও কি বুঝা যায় না মেধার মূল্যায়নটা হচ্ছে কি?’

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ মনজুরুল ইসলাম এ ব্যাপারে বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করতে চাই না। দেশের স্বাধীনতা রক্ষা যারা করেছে তাদেরকে জন্য সরকার পর্যাপ্ত সুবিধার ব্যবস্থা করুক। তাদের মাসিক সম্মানি দশ হাজার টাকার পরিবর্তে বিশ হাজার টাকা করুক আমাদেও কোন আপত্তি নেই। সরকার তাদেরকে ফ্ল্যাট, গাড়ি, বাড়ি করে দিয়ে তাদের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনুক তাতেও আমরা এর বিপক্ষে কথা বলবো না।

মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং নাতি নাতনিদের জন্য কোটা ব্যবস্থা রেখে তাদের জন্য আলাদা ভাবে চাকরি দিলে তো প্রশাসন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। জাতি অগ্রসর হবে অনিশ্চয়তা, এবং অন্ধকারের এক অজানা গন্তব্যে।

আমরা পত্রিকার পাতা মেললেই দেখতে পাই মুক্তিযোদ্ধাদের করুণ অবহেলার কষ্টের চিত্র। অনেক মুক্তিযোদ্ধা অনাদর অবহেলায় দিন যাপন করছে। আজ একজন মুক্তিযোদ্ধা কেন ভ্যান চালাবে? কেন রিক্সা চালাবে? কেন ভিক্ষা করে দিনাতিপাত করবে? জবাব চাই। আর অন্যদিকে কম মেধাবীদের সুযোগ দিয়ে এদেশের তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্নকে কোণঠাসা কওে রাখা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটে ২২৯৬ টি আসনের মধ্যে একজন শিক্ষার্থী ২৪০০ তম হয়েও ভর্তি হতে পারেনা অপরপক্ষে ২৮০০তম হয়েও একজন শিক্ষার্থী কম মেধা সম্পন্ন হয়েও মুক্তিযোদ্ধা কোটার বলে চান্স পেয়ে যাচ্ছে। এভাবে যদি চলতে থাকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে ঠেকবে?

6-gurdiiuns-are-waiting-when-student-enteir-exam-hall-in-du-addmisison-by-rkjan

ইতিহাস বিভাগের ফিরোজ হাসান নামের একজন শিক্ষার্থী জানান,  প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যখন একজন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায় তখন তার মনে রঙিন স্বপ্ন দানা বাঁধতে থাকে। সে যদি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেতো তাহলে তার ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই রয়ে যেত। এখন এত কষ্ট করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পরও যোগ্যতা থাকা স্বত্তেও বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও মুক্তিযোদ্ধা কোটার ব্যবস্থা থাকায় তার রঙিন স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারছে না। অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করার পর আমাদের দেশের সকল পালিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এমনকি মেডিকেলসহ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভালো ক্যারিয়ার গড়তে বিসিএস দিতে চায়। এ সময় তাদের সামনে পড়ে কোটা নামের এক প্রাচীর। যা টপকিয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের লক্ষ অর্জন করতে পারে না। এ কোটা ব্যবস্থা টপকিয়ে জাতি কতটুকু এগোতে পারে তার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরো জানান, বিসিএস এ ৫৬ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী, নারী, উপজাতিসহ জেলা কোটা মিলিয়ে ২৬% রয়েছে যেগুলো মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করি। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবস্থাকে আমি অযৌক্তিক বলছি না তাই বলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখাটা কি যৌক্তিক আপনারাই বলুন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহমুদ নুরুদ্দীন আহমেদ নামের একজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে শুধু হতাশার কথাই শোনা গেলো। তিনি বলেন, ‘কত স্বপ্ন নিয়ে অথৈ সাগর পারি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হযেছি। বন্ধুরা মিলে এক সঙ্গে গণরুমে থেকেছি। তাদের সাথে দেখা হতো সব সময়। এখন তাদের সাথে দেখা হয় কালে-ভদ্রে  কারণ একটাই বিসিএস দিব। রাত-দিন পড়াশুনা করি। তাই বন্ধুদের সাথে কম দেখা হয়। মা বাবার স্বপ্নকে পূরণ এবং এলাকার মানুষের মুখে হাসি ফোঁটানোর জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছি। বিসিএস এর প্রস্তুতি নিতে গিয়ে পরিবারের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। আবার সামনে কোটা নামক বৈষম্যের শিকার দুইদিক থেকে জীবনটাকে ওষ্ঠাগত মনে হচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা আছেন তারা সব জেনেও চুপ রয়েছেন কেন?’

প্রকাশ: লুফিআস


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় ৩৭ জনের মৃত্যু

করোনায় ৩৭ জনের মৃত্যু


শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে যাত্রী ও গাড়ির প্রচণ্ড চাপ, উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি

শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে যাত্রী ও গাড়ির প্রচণ্ড চাপ, উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি


দাম বাড়ল মুরগি ও চিনির

দাম বাড়ল মুরগি ও চিনির


ভারতে আবার সংক্রমণের রেকর্ড, একদিনে মৃত্যু প্রায় ৪০০০

ভারতে আবার সংক্রমণের রেকর্ড, একদিনে মৃত্যু প্রায় ৪০০০


দেশে করোনায় আরও ৪১ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৮২২

দেশে করোনায় আরও ৪১ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৮২২


খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত শিগগিরই: আইনমন্ত্রী

খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত শিগগিরই: আইনমন্ত্রী


যে যেখানে আছেন সেখানেই সবাইকে ঈদ উদযাপন করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

যে যেখানে আছেন সেখানেই সবাইকে ঈদ উদযাপন করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর


ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে নারীর মৃত্যু

ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে নারীর মৃত্যু


করোনায় কমলো মৃত্যু ও শনাক্তের হার; মৃত্যু ৫০ আর শনাক্ত ১ হাজার ৭৪২

করোনায় কমলো মৃত্যু ও শনাক্তের হার; মৃত্যু ৫০ আর শনাক্ত ১ হাজার ৭৪২


১৬ মে পর্যন্ত লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি

১৬ মে পর্যন্ত লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি