Sunday, August 14th, 2016
যাযাবর বউ আর আমাদের গল্প
August 14th, 2016 at 8:59 pm
এ গল্প যিনি বলেছেন তার নাম শিবরাজ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। শৈশবে সিলেট শহরের সাথে ছিল তার সখ্যতা; কৈশোরে বন্ধু ভেবে হাত রেখেছেন তৃতীয় বিশ্বের ‘রোগাক্রান্ত শহর’ রংপুরের কাঁধে। লেখালেখির শুরুও সেই বিপর্যস্ত সময়ের ঘোর থেকেই। মুরাকামির মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, ‘রাইটিং ইজ আফটার অল আ মেইকশিফট থিং।’
যাযাবর বউ আর আমাদের গল্প

শিবরাজ চৌধুরী:

এই মেয়েটা ধান ভানত না, ঢেঁকির উপর তার পদতল বামনাবতারের মতো জগদ্দল ভার চাপায়ে দিত না, পাতাকুড়ানিও ছিল না সে। সে এমনকি ছিল না গৃহবধূ কোন আধো আধো বাঙালের। মাঝরাইতে কেবল দুই পা ফাঁক কইরা দেওয়া নিথর প্রস্তর বলেও তারে আমি জানি নাই। তারে দেখা যাইত ভেনিস বন্দর কিংবা হোয়াংহো’র তীরে, মস্কো, ব্রাসেলস, বুয়েনোস আয়ার্স তো নস্যি ছিল, তারে উগান্ডা মুগান্ডাতেও দেখা গেছে বইলা অনুমান। সে এইভাবে নানাবিধ পাহাড় পর্বত সমতল এবং নাইটক্লাবে ঘুইরা বেড়াইছে। ঘুরতে ঘুরতে সে একসময় বেশ ক্লান্ত হয়া পড়ে এবং ঢাকা শহরে থিতু হয়। কারণ সে তো আনামত্ বাঙাল, যদিও মুসলমান ছিল কিনা বলতে পারিনা। চিশতিয়া তরিকার কোন এক পীরসাহেবের মুরিদ ছিলেন তার মা, মাঝে সাঝে কালিমন্দিরেও নৈবেদ্য হাতে ঢুঁ দিতেন বইলা জনশ্রুতি আছে। এইসব নিয়া আমাদের খুব বেশি কথা হয় নাই। বয়স কেমন ছিল তার জানতাম না আমি অতসব— তবে সে আমার বৌ, আর তার স্বামী রিসকাআলা— এইটুকু জানতাম।

আমি মোটামুটি প্রলেতারিয়েত— যদিও সপ্তাহে একখান বেনসন খুব শখ কইরা খাই, তবুও পেশায় আমি রিসকাচালক, ঢাকা শহর কর্মস্থল আমার।

আমার রিসকা টানা শুরু করবার কাহিনী একটু ধোঁয়াটে। একবার ছবির হাটের সামনে থাইকা আমি তাঁতিবাজারের রিসকা খুঁজতেছিলাম। কেউ যাইতে রাজি হইতেছিল না। এরপর একজন আসল, তারে কইলাম, ‘তাঁতিবাজার যাইবা?’ সে মাথা উপর নিচে নাড়ল, তার মানে সম্মতি। আমি উঠতে গেলাম, অথচ সে আমারে না নিয়া রিসকা টাইনা চইলা গেল। আমি কিছুই বুঝলাম না। পরে অনেক ঝক্কি ঝামেলার পর হাঁইটা তাঁতিবাজার পৌঁছাইয়া সেই রিসকাআলারে দেখতে পাই। সে আমার কাছে ষাইট টাকা ভাড়া দাবী করে। আমার হতভম্ব মুখ দেইখা সে বলে, ‘আপনে জিগাইলেন না তাঁতিবাজার যামু কিনা? আইলাম তো! এইবার ভাড়া দেন।’ আমি আরো বেশী হতভম্ভ হয়া তার দিকে হা কইরা তাকায়ে থাকি, সে বিরক্ত হয়া আমার হাতে তার রিসকা আর ষাইট টাকা ধরায়ে দিয়া কই জানি চইলা যায়। আমি কিশোরীর প্রথম প্রেমের মতন মুগ্ধ বিস্ময়ে রিসকা টানতে শুরু করি। প্রথম দিন আয় হয় দুইশত সাতচল্লিশ টাকা, তিন টাকার ডার্বি সিগারেট খাইছিলাম, নাইলে আড়াইশই হইত।

পরদিন, ছবির হাটের সামনে দিয়া আমি রিসকা চালায়ে যাইতেছি, তারে দেখা গেল। সে তাঁতিবাজার যাইতে চায়, আমি উপর নীচ মাথা নাড়াই, তার মানে সম্মতিই বটে। সে উঠতে যায়, কিন্তু আমি তারে না নিয়া চইলা যাই। সে কোনভাবে তাঁতিবাজার আসে, আমি তার কাছে ষাইট টাকা ভাড়া চায়া বসি। তার মুখে কোন কথা সরে না। আমি তারে রিসকা আর ষাইট টাকা দিয়া চইলা যাই। সে বিরস মুখে রিসকা চালাইতে থাকে। এইভাবে প্রতিদিন অদলাবদলি হয়। এই কাহিনী এতদিন ধইরা চলে যে ভুইলা যাই শুরু কোথায় হইছিল। যেখান থাইকা অদলাবদলির এই গল্প শুরু হইল, হয়তো তার আগেই এইসব চলতেছিল, আমার এই মুহুর্তে মনে পড়তেছে না।

প্রথমে যে মেয়েটার কথা কইছিলাম, সে রিসকাআলার বৌ এই কথা আপনারা জানেন। আমি তো প্রতিদিন রিসকাআলা না। রিসকাটার মালিক প্রতিদিন অদল বদল হয়, একদিন আমি, একদিন সে। সেহেতু বৌটাও একদিন আমার, একদিন তার। ব্যাপারটা খুব ঝামেলার। বৌ আমারে চুমা খায় ছ্যাপ দিয়া, আমার ভাল্লাগে খুব। আমার গা জ্বলতে থাকে এইটা ভাবলে যে সে ঐ বেটারেও তো ছ্যাপ দিয়া চুমা খায়। এইসব ভাবলে আকাশে আষাঢ় রাইখাও আমি চৈত্রের সঙ্গে সহবাসে আছি বইলা বোধ হয়, কান্দি আমি সুন্দরবনের মতন। আবার দীর্ঘদিন ধইরা এমন চলতেছে বইলা সে প্রথমে আমার নাকি তার বৌ এই দ্বিধা যায়না। প্রথম হইবার একটা মাজেজা আছে, বাপে শিখাইছিল। কিন্তু মাইয়াটারে ভালবাসি আমি, সে তো বৃন্দাবন আমার, আমি তার গোপিনী যেন!

গত কয়দিন ধইরা মাঝরাইতে তারে জাপ্টায়ে ধরলে সে সাড়া দেয় না। তার মনে শান্তি নাই, অস্থির অস্থির লাগে তার। প্রতিদিন সে বিশ্রী সব স্বপ্ন দেখে, এর মাঝে একটা হইল সে দুইজন পুরুষরে, মাঝরাতে যাদের চেহারা বুঝা যায়না, গাট্টিবোঁচকাসহ টানারিসকায় টাইনা নিতাছে। ঘাম ক্লেদ রক্ত এবং বাতাসের ঘাটতি তার এই যাত্রারে দোযখের সন্নিকটে নিয়া আসলে ঘুম ভাইঙ্গা যায় তার। সে ঢকঢক কইরা পানি খায়, সেই শব্দে আমার ঘুম ভাঙলে আমরা পুরা রাইত কান্দি আর তাই ঘুমাইতে পারিনা। আমি বোধহয় একটু একটু অপদেবতার আবছায়া অনুমান করতে পারি। একই অভিজ্ঞতা যে আমার সতীনেরও হইতাছে, তাও আমার অজ্ঞাত নয়, কারণ আমার বৌটা দুইজন পুরুষের সাথে শুইলেও সে মিথ্যা বলে না কখনো।

এর কিছুদিন পর সকালে আমি ছবির হাটের সামনে দাঁড়ায়ে আছি। দেখলাম, শাহবাগের দিক থাইকা উন্নতবক্ষা বৌ আমার রিসকা টাইনা আসতেছে, রিসকায় বইসা সতীন আমার সিগারেট টানে। রাগে দুঃখে যখন আমি কানবার উপক্রম করতাছি, বৌ তখন আমার সামনে আইসা রিসকা থামায়, আমারে উইঠা বসতে কয়। আমি আর সতীন পাশাপাশি বসি, বৌ রিসকা চালায়, আমরা ডার্বি টানি, টিপ টিপ বৃষ্টি তাই বিড়িটা যাতে না মরে সেইদিক দৃষ্টি রাখতে হয়। আমি তার পাছায় নিবদ্ধ রাখি আমি আমার নজর, সুঠাম পিঠ তার নাগর নদীর মতো বাঁক খায় কেমন কেমন! মাঝারি বেগে আধঘন্টা মতো চলবার পর তাঁতিবাজার পৌঁছাই আমরা, সে তার দ্বিতীয়ার চান্দের মতন হাসি দিয়া ষাইট টাকা ভাড়া চায়। আমরা দুইজন বিনা বাক্যব্যয়ে তিরিশ তিরিশ কইরা দেই, এবং সে ক্রিং ক্রিং বেল বাজাইতে বাজাইতে নতুন ঢাকার দিকে চইলা যায়।

রিসকা আর বৌ- দুইই গেল, আমাদের এখন অদলাবদলির আর কিছুনাই। আমরা দুইজন একটা ডার্বি খাইলাম, সেই রাইতে একসাথেই থাকলাম। মাসখানেক এমনে গেল গা, বৌ আর আসলো না, সে কি আসবে কখনো আর? আমরা দুইজন একসাথেই থাকি এখন। বৌ বোধহয় ঢাকা শহরে আমাদের সহিত সংসারী স্থিতাবস্থা ছাইড়া আবার মার্শেই কিংবা বোগোতায় চইলা গেছে। কিংবা রংপুরেও যাইয়া থাকতে পারে, যে অস্থির মতি তার!

আমরা দুইজনে পরোটার দুকান দিছি, দুইজন মিলা পরোটা ডিম ইত্যাদি ভাজি, বৌটার অপেক্ষা করি, রাইত হইলে একসাথে বাংলা মদ খাই। সোডিয়াম আলোয় স্নাত ট্রাকের ঘর্ঘরে পিষ্ট শহর ঢাকারে আমাদের তখন কিছুটা প্যারিস, কিছুটা আগ্রা এবং কিছুটা নারী বইলা ভ্রম হয়…

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/টিএস


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা