Monday, February 20th, 2017
যেভাবে গাঁথা হলো একুশের গান
February 20th, 2017 at 10:19 pm
যেভাবে গাঁথা হলো একুশের গান

ঢাকা: আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি…। এটি শুধু অমর গানের পঙ্ক্তিই নয় বরং বাঙালির অস্তিত্বেরও স্মারক। মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার আদায়ে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে রক্ত দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, শফিকের মতো সূর্যসন্তানরা। বুকের রক্ত দিয়ে তারা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানে পাকিস্তানি শাসকদের বাধ্য করেছিল। এ গান তাদেরই আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি।

ওই দিন মিছিলে রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতদের উপর পাকিস্তানি পুলিশের নির্বিচারে গুলিবর্ষণের সাক্ষী ছিলেন সাংবাদিক ও লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী। তিনি তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। বর্বরোচিত ওই ঘটনা নিজ চোখে দেখার পর তাৎক্ষনিকভাবে তিনি গানের প্রথম দুটি লাইন লিখেছিলেন।

গণমাধ্যমে গাফফার চৌধুরীর দেয়া সাক্ষাতকার থেকে জানা যায়, একুশে ফেব্রুয়ারির ওই মিছিলে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন রফিক। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ গুলি করলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আউটডোর কক্ষের বারান্দায় লুটিয়ে পড়ে রফিক। মাথার খুলিটা উড়ে যায়। রফিকের মরদেহ দেখে গাফফার চৌধুরীর মনে হয়েছিল, যেন তার নিজের ভাইয়ের লাশ পড়ে আছে৷

তখনই তার মনে গুনগুনিয়ে ওঠে একটি কবিতা, ‘‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”৷ কয়েকদিনের মধ্যে তিনি কবিতাটি লিখে ফেলেন। ভাষা আন্দোলনে প্রথম প্রকাশিত লিফলেটে এটি ‘একুশের গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে সংকলনে’ও এটি প্রকাশিত হয়।

তৎকালীন যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক সেটি আব্দুল লতিফকে দিলে তিনি এতে সুরারোপ করেন। আব্দুল লতিফ তখন এটি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাওয়া শুরু করেন। ঢাকা কলেজের কিছু ছাত্র কলেজ প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার স্থাপনের চেষ্টা করার সময়ও তিনি গানটি গান। গানটি গাওয়া ও লেখার অপরাধে ঢাকা কলেজ থেকে ১১জন ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়।

১৯৫৪ সালে তখনকার নামকরা সুরকার আলতাফ মাহমুদ গানটিতে ফের সুরারোপ করেন। ১৯৫৪ সালে আলতাফ মাহমুদের সুরে প্রভাতফেরিতে গানটি প্রথম গাওয়া হয়। ১৯৬৯ সালে জহির রায়হান তার ‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্রে সেটি ব্যবহার করেন। বর্তমানে এটিই গানটির প্রাতিষ্ঠানিক সুর হিসেবে স্বীকৃত।

প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সব অঞ্চল থেকে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শ’ শ’ মানুষ এই গান গেয়ে শহীদ মিনার অভিমুখে খালি পায়ে হেঁটে যান। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এদিন প্রভাতফেরিতে গানটি গেয়ে সবাই শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ১৯৯৯ সালে অমর একুশে পায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি। বর্তমানে কালজয়ী এ গানটি হিন্দি, মালয়, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, সুইডিশ, জাপানিসহ ১২টি ভাষায় গাওয়া হয়। বিবিসি শ্রোতা জরিপে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ গানের তালিকায় এটি তৃতীয় স্থান লাভ করেছে।

যদিও একুশে ফেব্রুয়ারির অনেক আগে থেকেই ভাষার গান রচনা শুরু হয়।

১৯৪৮-এ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনের সর্বপ্রথম গানটি রচনা করেন কবি ও গীতিকার অধ্যাপক আনিসুল হক চৌধুরী। এতে সুরারোপ করেন প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী শেখ লুৎফর রহমান। গানটির একাংশ এমন: ‘শোনেন হুজুর—/ বাঘের জাত—এই বাঙালেরা—/ জান দিতে ডরায় না তারা/ তাদের দাবি বাংলা ভাষা/ আদায় করে নেবে তাই’।

তিনি পরবর্তীকালে আরো গান রচনা করেন। যার পটভূমি বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। দুটি গানের কয়েকটি চরণ: ১. ‘বাংলার বুকের রক্তে রাঙানো আটই ফাল্গুন/ভুলতে কি পারি শিমুলে পলাশে হেরি লালে লাল খুন’। ২. ‘বাংলাদেশ আর বাংলা ভাষা যখন একই নামের সুতোয় বাঁধা’।

১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের ঘটনা সারা দেশকে কাঁপিয়ে দেয়ার পর তা নিয়ে প্রথম গান লেখেন ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক। ‘ভুলব না, ভুলব না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গানটিতে সুরারোপ করেছিলেন তারই অনুজ নিজাম উল হক। তিনি ‘দূর হাঁটো দূর হাঁটো/ঐ দুনিয়াওয়ালে, হিন্দুস্তান হামারা হায়’— জনপ্রিয় এই হিন্দি গানটির সুর অনুসরণ করেছিলেন। অমর একুশের সূচনাপর্বের গান হিসেবে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

১৯৫৩ সালে একুশের প্রথম বার্ষিকী ও প্রথম শহীদ দিবসে প্রভাতফেরিতে ভাষাসংগ্রামী প্রকৌশলী মোশারেফ উদ্দিন আহমদের (১৯২০-১৯৫৬) ‘মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল/ ভাষা বাঁচাবার তরে/ আজিকে স্মরিও তারে’ গানটি গাওয়া হয়। এটি প্রভাতফেরির প্রথম গান। সুর আলতাফ মাহমুদের।

১৯৫৩ সালের পর বাংলা ভাষা সংগ্রাম ও ভাষাপ্রেম নিয়ে কত গান রচিত হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সঠিক তথ্য খুঁজে পাওয়াই কঠিন। তবে বেশকিছু গান শিল্পগুণে মানুষের অন্তরে চিরস্থায়ী আসন গেড়েছে। যেমন আবদুল লতিফের ‘ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়।’ গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গান। হাসান হাফিজুর রহমান রচনা করেছিলেন ‘শহীদ মুখের স্তব্ধ ভাষা, আজ অযুত মনের বুকের আশা।’

কবিয়াল রমেশ শীল ১৯৫৪ সালে ঢাকায় বসে রচনা করেছিলেন ‘বাংলা ভাষায় হাসি কাঁদি স্বপন দেখি দিবানিশি, চিরদিন বাংলার আশা, বাংলাদেশে করি বাসা, বাংলা আমার মাতৃভাষা, বাংলায় প্রত্যাশী।’ লোকমান ফকির লিখেছিলেন ‘একুশে আসে জানাতে বিশ্বে ভাষার কতটা মূল্য, ভাষার দাবিতে নেই কোনো জাতি বাঙালির সমতুল্য।’

প্রতিবেদন: প্রীতম সাহা সুদীপ, সম্পাদনা: সজিব ঘোষ


সর্বশেষ

আরও খবর

উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শাবি শিক্ষার্থীদের আমরণ অনশন

উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শাবি শিক্ষার্থীদের আমরণ অনশন


দেশে আরও ৯৫০০ জনের করোনা শনাক্ত, হার ২৫ ছাড়াল

দেশে আরও ৯৫০০ জনের করোনা শনাক্ত, হার ২৫ ছাড়াল


টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হলেন আইভী

টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হলেন আইভী


অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে বাস চলার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন

অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে বাস চলার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন


আগুনে পুড়ল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১২০০ ঘর

আগুনে পুড়ল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১২০০ ঘর


এবারের বিজয় দিবসে দেশবাসীকে শপথ পড়াবেন প্রধানমন্ত্রী

এবারের বিজয় দিবসে দেশবাসীকে শপথ পড়াবেন প্রধানমন্ত্রী


কমলো এলপিজির দাম

কমলো এলপিজির দাম


উন্নয়নশীল দেশ নিয়ে খুশি না হয়ে, উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

উন্নয়নশীল দেশ নিয়ে খুশি না হয়ে, উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির


জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম মারা গেছেন

জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম মারা গেছেন


ডিআরইউর নতুন সভাপতি মিঠু, সাধারণ সম্পাদক হাসিব

ডিআরইউর নতুন সভাপতি মিঠু, সাধারণ সম্পাদক হাসিব