Monday, April 1st, 2019
যে গল্পের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই
April 1st, 2019 at 4:44 pm
যে গল্পের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই

রিমি রুম্মান:

কয়েক বছর আগেও যখন ফোনকার্ড ছাড়া আমাদের প্রবাস জীবনের ছুটির দিনগুলো ভাবা যেত না। সেই সময়ে ফোনকার্ড কিনতে গিয়ে এক দাদা’র সাথে পরিচয়। মধ্যবয়স পেরিয়েছেন আরো আগেই। পরিচয়ের এক পর্যায়ে জানলাম তিনি আমার শহর চাঁদপুরের মানুষ। আমার শৈশব, কৈশোরের স্কুলের পিছনে যে পুকুর, সেদিকটায় তাদের বাসা ছিল একসময়। সেই থেকে দেশে কথা বলার জন্যে যাবতীয় ফোন কার্ড সেখান থেকে কেনা। সময়, সুযোগ হলে খানিক দাঁড়িয়ে গল্প করা। তিনি এদেশে এসেছিলেন তরুণ বয়সে। দেশে যাওয়া হয় না, বৈধ কাগজ পত্র নেই তাই। বিয়ে, সংসার কিছুই করা হয়নি। দেশের সবার খোঁজ রাখেন নিয়মিত। তার কাছ হতে আমি আমার শহরের, পাড়ার মানুষজনের খবর পেতাম। ভাল কিংবা মন্দ সব।

এক সন্ধ্যায় শহরের নিয়ন বাতিগুলো যখন একে একে জ্বলে উঠছিল সেই সময়ের কথা। গল্পচ্ছলে বলি, একটা জীবন তো পেরিয়েই গেলো, এমন একাকী এদেশে থেকে কী লাভ, দাদা? তিনি বলেন, ‘দেশে গিয়াই বা কী করমু?’ অমীমাংসিত এক প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকান। অতঃপর ছোট্ট শ্বাস নিয়ে বলেন,’তারচেয়ে এখানে কিছু আয় করে দেশে ভাই-বোন’দের পাঠাই, তারা ভালো থাকে, তাদের পুত্রকন্যা’রা ভালো স্কুল, কলেজে লেখাপড়া করে, এইডা-ই শান্তি, কী কন?’ ফোনকার্ড আমার হাতে তুলে দিতে দিতে তিনি আবারো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকান। এতো সহজ প্রশ্ন, সরল দৃষ্টি! পারিবারিক মায়া’র বন্ধনের সুবিশাল এক প্রাচীর হয়ে আগলে থাকা একজন মানুষ। এই শহরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া অনেকের কাছে তিনি হয়তো তুচ্ছ একজন। কিংবা এই শহরে হয়তো তিনি একজন অবৈধ অভিবাসী মাত্র। কিন্তু বাংলাদেশ নামক দেশের একটি মফঃস্বল শহরের অনেকগুলো মানুষের জীবনে তিনি অনেক কিছু। বছরের পর বছর জুড়ে জীবনের কঠিন যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে, নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তিনি ভাল রাখেন অনেকগুলো মানুষকে। অনেকগুলো মানুষের জীবনের গতিপথ আংশিক পরিবর্তন করেন। আমি জানি, এমন মানুষ এই শহরে একজন, দু’জন নয়। অনেকেই। সবাই-ই কোন না কোনভাবে নিজ নিজ পরিবার, আত্মীয় পরিজনদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। শুধু পিছনের গল্পগুলো জানা হয় না অনেকেরই।

নিউইয়র্ক

মাঝে মাঝেই আমরা জ্যাকসন হাইট্‌স এর বাঙালী রেস্তোরাঁয় খাই, আড্ডা দেই। সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি আপুরা এগিয়ে আসেন, কী লাগবে জানতে চান। কখনো বা খাবার দিতে এসে আড় চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে মালিকের অবস্থান দেখে নেয়। অতঃপর, দেশে রেখে আসা পরিবারের গল্প করে। সেখানে সুখের গল্প নেই। শুধুই সমস্যা, হাহাকার; আর চাই চাই এর গল্প। তারপরও সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ভেতরে কষ্ট পুষে হাসি মুখে একের পর এক টেবিলে ছুটে চলেছেন। কারো কিছু লাগবে কিনা জানতে চাইছেন। ছোট বড় ওদের সবাইকেই আপু ডাকি। মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘আপনি খেয়েছেন? বসেন, একসাথে খাই’। ক্যাশ কাউণ্টারের ওপাশে কারো রক্তচক্ষু দেখে তড়িঘড়ি চলে যায় অন্য টেবিলে, কার কী লাগবে দেখতে। গল্প করলে তো আর ওদের জীবনের চাকা চলবে না। নিজেকে চালাতে, দেশে রেখে আসা পরিবারকে চালাতে দু’পা, দু’হাত চালাতে হয় তাদের দিনভর। বৈধ কাগজপত্রহীন রুমা (ছদ্মনাম) আপা তাদের একজন। এক সকালে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে দেখি রুমা আপা ছুটছেন। খুব তাড়া তার। রেস্তোরাঁর বাইরে এই প্রথম দেখি তাকে। জানালেন, এক প্রতিবন্ধী শিশুকে দেখাশোনা করেন সপ্তাহের তিনদিন। বাকি চারদিন রেস্তোরাঁয় চাকুরি করেন। সাতদিনই ব্যস্ত। কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। স্বামী বাড়ির কাজে হাত দিয়েছেন। চারতলার ছাদ ঢালাই দিয়েছে। বাড়িটি কমপ্লিট হলেই দেশে ফিরে যাবেন। স্বামী, সন্তানদের নিয়ে বাকি জীবন ভালো থাকবেন। ভালো লাগে শুনে। কতো গুছানো সুন্দর পরিকল্পনা। গাড়িতে গান শুনতে শুনতে বাসায় ফেরার সময় চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো, পরবাস থেকে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া সংগ্রামী এক নারী, যিনি পরিবারের অনেকগুলো মানুষের সুখের জন্যে অনেকটা সময় হারিয়েছেন জীবন থেকে। আমি নিশ্চিত, নিজ পরিবারে নতুন গৃহে তার প্রত্যাবর্তন দৃশ্য হবে পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দরতম দৃশ্য। সবচাইতে সুখকর গল্প। যে গল্প একজীবনে একবারই হয়।

বেশ কয়েক বছর আগে ডিভি লটারি পেয়ে আমার নিউইয়র্কের বাসায় আসে ২০/২১ বছরের একটি ছেলে। আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় বিধায় তাকে একটি চাকুরি ঠিক করে দেয়া, বাসা খুঁজে দেয়া আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। চেনা এক স্প্যানিশ ম্যানেজারকে বলে কেএফসিতে চাকুরি ঠিক করে দেই। রোজ সকালের আলো ফোটার আগেই কাজে যেত, ক’দিন আগেও মায়ের গভীর আদরের গণ্ডীর ভেতরে থাকা ছেলেটি। কাজ থেকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়তো আমার ড্রইং রুমের সোফায়। রাত গভীরে তার গোঙানির শব্দ ভেসে আসতো! আচমকা এমন হাড়ভাঙ্গা খাটুনিতে প্রচণ্ড জ্বর আর ব্যথার গোঙানি! সকালে আমি ব্যথার ওষুধ দেই। সে খায়। আবার কাজে নেমে পড়ে। এভাবে প্রায় এক বছর আমার অতিথি ছিল সে। আয়ের পুরোটাই দেশে পাঠাতে লাগলো। উপরন্ত ধার দেনা করেও পাঠাচ্ছিলো, যদিও তার পরিবার মোটামুটি সচ্ছল। একবছর বাদে আমি দেশে গেলে পরিবারটি সীমাহীন কৃতজ্ঞতায় নিমন্ত্রন করে আমায়। দুপুরে খাবারের টেবিলে গল্প হচ্ছিল নানান বিষয়ে। একপর্যায়ে জানলাম তাদের বাসার টিভি, ফার্নিচার সব নতুন অর্ডার করা হয়েছে। দু’দিন পরেই ডেলিভারি দিবে। বাড়িটির চারদিকে চোখ বুলালাম। বললাম, ‘এগুলোই তো অনেক সুন্দর। বদলাচ্ছেন কেন? ‘ছেলেটির মায়ের মুখ বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললেন, ‘ছেলে টাকা পাঠাচ্ছে নিয়মিত, তাই এই রদবদল’। ছোট ভাইগুলোর অন্যায় আবদার, মায়ের আবদার, সব মিলে সে এক হুলুস্থুল অবস্থা পরিবারটিতে।

এলোমেলো ভাবনা আর হৃদয় বিদীর্ণ করা দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসবার পথটুকুতে ছেলেটির প্রতিদিনকার কাজ শেষে বাড়ী ফেরার সময়কার করুণ, মায়াময়, বিষাদমাখা ক্লান্তিকর মুখখানা ভেসে উঠছিল। রাতে ঘুমাবার সময় গোঙানির সেইসব শব্দ কর্ণকুহরে সুঁইয়ের মত বিঁধছিল।  ঘুমাতে দিচ্ছিল না আমায়। কুরে কুরে খাচ্ছিল একরাশ কষ্ট ! অবচেতন মনে ভেবেছি, আমার কেন এমন লাগছে! মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি হয়ে যাচ্ছে না? নিজেকে নিজেই প্রবোধ দিয়েছি, অনেক বছর আগে দেশ ছেড়ে আসবার সময় ছেলেটিকে কতো ছোট দেখেছিলাম! এখন আমার ছেলেটি যতটুকু, ঠিক ততটুকু! এই যে অল্প বয়সী ছেলেটি পড়াশুনা শেষ করলো না, অসময়ে সব আনন্দ বিসর্জন দিয়ে জীবন সংগ্রামে লেগে গেলো। পরিবার থেকে ছিটকে গেলো দূরে, হাজার মাইল দূরে, কোন কিছুর বিনিময়েই কী আর সেইসব ফিরে পাবে?

যে কারণে এতো কথা, বিদেশ থেকে যে রেমিট্যান্স পাঠায় প্রবাসী’রা এই রেমিট্যান্সের অপর পিঠে কতো গোপন হৃদয় ক্ষরণ, নির্ঘুম রাত, দীর্ঘশ্বাস, ঘাম ঝরা দুর্বিষহ কষ্ট জড়িয়ে থাকে তা দেশে থাকা প্রিয়জনদের কেউ জানতেও পারে না। কেউ না। জানা হয় না কারো। পরিবারের একমুঠো সুখের পেছনের গল্প, গল্পই থেকে যায়। যে গল্পের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই।

রিমি রুম্মান ,
প্রবাসী লেখক; নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র


সর্বশেষ

আরও খবর

সবকিছুর সঙ্গে ‘রাজনীতি’ মেশানোর ঘৃণাজীবীরা

সবকিছুর সঙ্গে ‘রাজনীতি’ মেশানোর ঘৃণাজীবীরা


রাঙ্গা-ভাষার পাতকূয়া প্রদাহ

রাঙ্গা-ভাষার পাতকূয়া প্রদাহ


মুক্তচিন্তা প্রকাশের ভীতি কাটাবে লিট ফেস্ট!

মুক্তচিন্তা প্রকাশের ভীতি কাটাবে লিট ফেস্ট!


মুক্তিযোদ্ধা বাদল-খোকার চলে যাওয়াঃ মিলনই মৌলিক

মুক্তিযোদ্ধা বাদল-খোকার চলে যাওয়াঃ মিলনই মৌলিক


চার বছরে ভারতে প্রশিক্ষণ পেয়েছে এক ডজন বাংলাদেশী জঙ্গি: পুলিশ

চার বছরে ভারতে প্রশিক্ষণ পেয়েছে এক ডজন বাংলাদেশী জঙ্গি: পুলিশ


ঠগীদের সাথে বসবাস

ঠগীদের সাথে বসবাস


ক্যাসিনো অনেস্টি

ক্যাসিনো অনেস্টি


পলিথিন দিয়ে জ্বালানী তেল তৈরী করছে বগুড়ার ৫ যুবক

পলিথিন দিয়ে জ্বালানী তেল তৈরী করছে বগুড়ার ৫ যুবক


পাবলিক পাঞ্চিং ব্যাগ

পাবলিক পাঞ্চিং ব্যাগ


ফুট ওভার ব্রীজ ব্যবহারে অনীহা

ফুট ওভার ব্রীজ ব্যবহারে অনীহা