Monday, October 16th, 2017
রবিদাস জনগোষ্ঠীর জীবনধারা
October 16th, 2017 at 5:33 pm
রবিদাস জনগোষ্ঠীর জীবনধারা

শিপন রবিদাস প্রাণকৃষ্ণ: রবিদাস। স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, বিশ্বাস, সমাজ-ব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এক স্বয়ংসম্পূর্ন জাতিসত্ত্বা। বাংলাদেশের অবহেলিত, অনুন্নত, মূল স্রোত থেকে পিছিয়েপড়া রবিদাস জাতিগোষ্ঠীকে শুরু থেকেই পদে পদে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে।

নিষাদ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত, সুপরিচিত এ জাতিগোষ্ঠীই ভারতে মূল নিবাসী হিসেবে স্বীকৃত। নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, বিশ্বাস, সমাজ-ব্যবস্থা নিয়ে গর্ব করার মত অনেক কিছু থাকলেও দারিদ্রতা, শিক্ষার অভাব ও যথোপযুক্ত পৃষ্টপোষকতার অভাবে দিন দিন রবিদাসরা তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। মূল স্রোতে সংস্কৃতির সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে একরকম বাধ্য হয়েই নিজ সংস্কৃতির চর্চার প্রতি নিরুৎসাহিত হচ্ছে দিনকে দিন। বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে একটি সমৃদ্ধ জাতিসত্ত্বার সবকিছু।

নামকরনের ইতিহাস: রবিদাস জাতির নামকরন হয়েছে তাদের আদি ধর্মগুরু সন্ত রবিদাসজীর নামানুসারেই। তাকে ব্যক্তিবিশেষে রুহিদাস, রৌদাস, ঋষি নামে ডাকা হলেও মূলত ব্যক্তি হিসেবে তিনি এক। ঐতিহাসিক বুকানন পূর্নিয়ায় “ঋষি” নামে একদল উপজাতির সাক্ষাত পেয়েছিলেন। বুকানন এর মতে, এরা মিথিলার একটি উপজাতি। বঙ্গদেশের চর্মকাররা (চামার) আসল পরিচয় গোপন রেখে নিজেদের ঋষি (ঋষির সন্তান) নামে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। ১৮৭২ সালের লোক গণনায় ঋষিদের চামার বা মুচি হিসেবে উল্লেখ করে ফেলা হয় আধা-হিন্দু উপজাতির পর্যায়ে। ঋষি জাতের উদ্ভব সম্পর্কে জানা যায়: প্রজাপতি বা ব্রহ্মার মানস পুত্রের অভ্যাস ছিল যে, দেবতাদের উদ্দেশ্যে ঘৃতাহৃতি দেবার সময় তিনি গো-মাংস দিতেন। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী বলি দেয়া মাংস কিছুটা খেলেই বলি দেয়া পশুটি পুনরুজ্জীবিত হয়ে অরন্যে ফিরে যেত। হঠাৎ একবার প্রজাপতি বলিদান করা পশুটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যর্থ হলেন। ভীতবিহ্বল প্রজাপতি অনেক চেষ্টার পর বুঝতে সক্ষম হলেন যে, তার গর্ভবতী স্ত্রী চুপিসারে গো-মাংসের একাংশ সরিয়ে রেখেছে। পরে শাস্তিস্বরুপ প্রজাপতির স্ত্রীকে সমাজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে প্রজাপতির গর্ভবতী স্ত্রী যে সন্তান প্রসব করল সেই হলো মনুষ্যকূলের  মধ্যে সর্বপ্রথম ঋষি, চামার বা মুচি। মূলত রবিদাসদেরই পূর্বে বিকৃতভাবে মুচি বা চামার নামে ডাকা হতো। চামড়ার কাজের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে এদের চর্মশিল্পী, চর্মকার (চামার), মুচি নামে অভিহিত করা হলেও রবিদাসরা চামার বা মুচি শব্দটিকে ব্যপকভাবে অসম্মানজনক মনে করে।

প্রচলিত কাহিনী: রবিদাস জাতিগোষ্ঠীর চামড়ার কাজের প্রসঙ্গে তাদের সমাজে একটি “মিথ” চালু আছে। একদিন ভগবান শ্রীনারায়ন বিভিন্ন জাতির লোকদের ডেকে জিজ্ঞেস করে তাদের নিজ নিজ পছন্দমতো বিভিন্ন পেশা ভাগ করে দিচ্ছিলেন। সবশেষে রবিদাস জাতি সেখানে দেরীতে উপস্থিত হলে শ্রীনারায়ন বললেন, ‘সবাইকে তো পেশা ভাগ করে শেষ করে দেয়া হয়ে গেছে। তোমাদের আর কি দেবো? এই লোহার সূচ আর সূতাটুকু নিয়ে যাও। রাস্তায় বসে এটা দিয়ে চামড়া দিয়ে পাদুকা তৈরী ও মেরামতের কাজ আর আমার নাম জপ করবে। তাতেই তোমাদের দিন চলে যাবে’। সেই থেকে তারা জুতা সেলাই আর চামড়ার কাজ শুরু করে বলে লোকজন তাদের মুচি বা চামার নামে ডাকতে শুরু করে। এই মুচি বা চামার জাতিতেই সন্তগুরু রবিদাসজীর জন্ম হয়। আর তার নামানুসারেই পরে জাতির নামকরন হয় “রবিদাস”। অবশ্য সন্তগুরু রবিদাসজীর জন্মের পূর্বেও এরা নিজেদের রবিদাস হিসেবেই পরিচয় দিতো। এরা মূলত নিজেদের রবির (সূর্য) দাস মনে করে ভক্তিভরে সূর্যদেবের পূজা করতো বলে নিজেদের রবিদাস বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো বলেও রবিদাসদের মাঝে বিশ্বাস প্রচলিত আছে।

আদিনিবাস: উৎপত্তির দিক থেকে রবিদাস জাতি অনার্য বলেই বিবেচিত। রবিদাসরা মনে করে, তাদের আদি নিবাস অবিভক্ত বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দারভাঙ্গা, মুজাফ্ফরপুর, বালিয়া, ছাপড়া, আরে, কনৌজ, পাটনা, মুঙ্গের, ভজনপুর জেলাগুলোতে। ব্রিটিশ শাসনামলে কর্মসূত্রে রবিদাসরা এদেশে আসে এবং বাংলার বিভিন্ন্ স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। ধারনা করা হয়, দেশের প্রত্যেকটি জেলা, উপজেলায় এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে রবিদাসদের অবস্থান রয়েছে। মূলত ভবিষ্যতে পেশাগত কাজ যাতে হুমকির সম্মুখিন না হয় এজন্যই এরা সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করেন। একসাথে বড় রবিদাসপাড়া খুব কম চোখে পড়ে যাতে করে তাদের পেশা হুমকির সম্মুখিন না হয়। সঙ্গত কারণেই এরা একেবারে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করতে একরকম বাধ্য হয়। তাই অন্যান্য পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের ন্যায় নির্দিষ্ট একটি ভূখন্ডে সংঘবদ্ধ হয়ে থাকাটা তাদের জীবিকার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা। পূর্বে রবিদাস সম্প্রদায় রাজদরবারে পালকি বহনের কাজে নিযুক্ত ছিল। পালকিগুলো এখনও তারা স্মৃতি স্বরূপ রেখে দিয়েছে। পরবর্তীতে এরা জুতা তৈরী, মেরামত, চামড়ার কাজ (চামড়ার জুতা, সেন্ডেল, ব্যাগ, বেল্ট) সহ কৃষিকাজ করতো। বর্তমানে এরা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত।

নৃতাত্ত্বিক পরিচয়: উৎপত্তির দিক থেকে রবিদাস জাতি অনার্য বলেই বিবেচিত। এদের অধিকাংশের মাথা গোল, নাক মধ্যমাকৃতি থেকে চওড়া, মুখের গড়ন লম্বাটে, গায়ের রং শ্যামলা, কালো ও পীতাভ বর্ণের, চোখ কালো, চুলের রং কালো ও হালকা কোঁকড়ানো, মেদহীন হালকা পাতলা গড়নের শরীর এদের।

ভাষা: রবিদাসরা নিজেদের মধ্যে নাগরী ভাষায় কথা বলে। যা স্থানভেদে ভোজপুরিয়া, দেবনাগরী, ভূতনাগরী বা দেশওয়ালী ভাষা নামেও পরিচিত। এর বর্ণমালা পুরোপুরি হিন্দি বর্ণমালার মত হলেও উচ্চারনের সময় তা হিন্দী ভাষাকে পুরোপুরি অনুসরণ করে না। নিজস্ব ভাষা/ভূত নাগরীতে হাতে লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ যা রবিদাস জনগোষ্ঠীর অনেক গুরুজনের নিকট সংরক্ষণ রয়েছে।

ধর্ম: রবিদাসদের ধর্মের নাম “রবিদাসীয়া”। এরা পূজা নিজস্ব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সহিত পালন করে থাকেন। ধর্মগুরুরা “সন্ত” বা “মহন্ত” নামে পরিচিত। পূজা-পার্বণ, বিবাহ, মৃত-সৎকারসহ যাবতীয় ধর্মীয় কার্যাদি মহন্তরাই পরিচালনা করে থাকেন। রবিদাস সম্প্রদায়ের সমাজে নিজস্ব সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে দুই-চার জন সমাজের মান্যগণ্য ব্যক্তি ও মহন্ত সাহেবরা মিলে সেই সমস্যার সমাধান দেন। এতে কারো শাস্তি বা জরিমানা হলে তা ঐ ব্যক্তি মানতে বাধ্য থাকবে। রবিদাস সমাজের মহন্ত (রবিদাস সমাজের ব্রাহ্মণ) সামাজিক পূজাপার্বণ ও অনুষ্ঠান করে থাকেন। এছাড়াও রবিদাস সম্প্রদায়দের নিজস্ব পুথী সাহিত্য রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে সোরঠী বীরজাভার, সোনকেশিয়া রাণী, বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হাতে লেখা ধর্মগ্রন্থগুলো হলো – গুরুআন্যাস (মূলগ্রন্থ ও জ্ঞান দীপক), বিলাস, শব্দাবলী, সন্তাক্ষরী, সন্তসুন্দর, সন্তমহিমা, লও পারয়ানা, বারহ্ বাণী, জবাব সওয়াল, ব্রহ্মবিচার, মন্ত্রাওলী, মূলসাগর, জ্ঞাণচাচারী, রুপসার।

খাদ্য: সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে রবিদাসদের খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। পূর্বে তারা শামুক, ঝিনুক, কাকড়া, শাকালু, শুয়োআলু, বেতফল ইত্যাদি খেয়ে জীবন ধারন করতেন। কিন্তু বর্তমানে সাধারণ বাঙালিদের মতই ভাত, মাছ, সবজি, রুটি, মাংস ইত্যাদি খায়। এদের একাংশ শুকুরের মাংস খেলেও আরেকটি অংশ স্বযত্নে এড়িয়ে চলেন। ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে বিশেষ খাবার যেমন: ঠেকুয়া, মনভোগ, শানকা ইত্যাদি তৈরী করা হয়ে থাকে।

মদ্যপান: অন্যান্য আদিবাসীদের ন্যায় রবিদাসদের মধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে (বিশেষকরে নবজাতকের অনুষ্ঠানে/বিয়েতে/মৃত সৎকারের সময়) মদ (দারু/তাপাওন) পানের রেওয়াজ আছে। তবে শিক্ষার প্রসারের ফলে দিন দিন মাদকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত হতে শুরু করেছে।

পোশাক: পূর্বে রবিদাস পূরুষরা ধুতি, পাজ্ঞাবী পরলেও এমন পোশাকে তাদের শুধু ধর্মীয় পার্বনের দিনেই দেখা যায়। রবিদাস নারীরা একটু ভিন্ন কায়দায় শাড়ির আঁচল বামদিকে না নিয়ে ডান দিকে টেনে পড়েন। ইদানীং রবিদাসদের পোশাকেও বাঙালিদের পোশাকের প্রভাব লক্ষ্যনীয়।

বিবাহের পোশাক: রবিদাসদের বিবাহের পূর্বে গায়ে-হলুদের অনুষ্ঠানে কনে লাল পাড়ের হলুদ শাড়ি ও লাল ব্লাউজ পরেন। বিয়ের সময় বর ধুতি, পাজ্ঞাবি ও একধরনের টোপর বা মুকুট পরেন যার দুইপাশে চারটি লম্বামালা হাটুঁর নিচ পর্যন্ত ঝুলানো থাকে। বিয়েতে কনেরা লাল শাড়ি পরিধান করেন।

অলংকার: রবিদাস বিবাহিত মেয়েরা হাতে চুড়ি জাতীয় ধাতব খাড় পরেন। শাখা, সিঁদুর, নাকফুল পড়ার পাশাপাশি “হামলি” নামক এক প্রকার গহনা পরিধান করেন, কপালের উপর শিরবানী বা টায়রা পড়েন। বিধবা রবিদাস মহিলাদের বেল বা তুলসী গাছের শুকনো ডাল কুচি-কুচি করে কেটে সুতোয় গেথে পড়তে দেখা যায়। বর্তমানে পরিবর্তন হলেও পূর্বে সিলেট অঞ্চলের রবিদাস মহিলারা কানে তারকি, বাহুতে মোটা বাজু, গলায় হাইকল, পায়ে গরমল ও কোমরে কোমরদড়ি নামে বিভিন্ন আকারের অলংকার পরতেন।

আসবাবপত্র: রবিদাসদের মাঝে বেত, বাঁশ ও কাঠের আসবাবপত্র ব্যবহারের প্রবণতা বেশী। পানি খাওয়ার জন্য অনেকে কাসার ঘটি ও লোটা ব্যবহার করেন। তবে বিয়ের মারোয়া (বিয়েতে সাজানো মন্ডপ)তে কাসার থালা ও লোটা ব্যবহার ব্যপকভাবে প্রচলিত।

পরিবার: রবিদাস পরিবার পিতৃতান্ত্রিক। পারিবারিক সকল দায়িত্ব স্বামী বা বয়স্ক পুরুষের হাতে ন্যস্ত থাকে। পারিবারিক সম্পত্তি বা বংশ পরিচয় পিতা থেকে পূত্রে বর্তায়। মেয়েরা বাবার সম্পত্তি না পেলেও মায়ের সম্পত্তির অধিকারী হন। রবিদাসদের মধ্য যৌথ পরিবার থাকলেও দিনদিন একক পরিবার বেশী পরিলক্ষিত হচ্ছে।

জন্ম: রবিদাসদের মাঝে নবজাতকের জন্মের বিষয়টা অধিক আনন্দের সহিত পালিত হয়। জন্মের ছয় দিনের দিন “ছাটিয়ার” ১২ দিনে “বরাইয়া” ও ২১ দিনে “একুশা” নামে অনুষ্ঠান করে পর্যায়ক্রমে নবজাতকের নামকরন, পাড়া-প্রতিবেশীকে নিমন্ত্রন ও সবাই মিলে আনন্দ উল্লাস করে উদযাপন করে থাকেন।

বিবাহ: রবিদাসদের নিজ বংশের মধ্য বিয়ে হয়না। তবে বিবাহ চালু প্রচলিত। বহুবিবাহ নেই তবে কোনো কারনে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সমাজের লোকদের খাওয়াতে হয়। সমাজের অনুমতি ছাড়া অন্যত্র ধর্ম ও জাতি পরিবর্তন করে বা প্রনয়ঘটিত হঠাৎ বিয়ে করলে জরিমানা অথবা সমাজে আটক (সমাজচ্যুত/একঘরে) করে রাখা হয়। পূর্বের তুলনায় যৌতুকপ্রথার দিকে ঝুকছে এরা। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ডেকে দোষী পক্ষকে আর্থিক জরিমানা করা হয়।

মৃত্যু: মৃত্যুকে রবিদাসদের ভাষায় “বিলাপ” বলা হয়। মৃত্যুর পর সমাজের সকলে একত্রিত হয়ে মৃত ব্যক্তিকে উদ্দ্যেশ্য করে বন্দেগী বাজায় (গুরুমন্ত্র জপ) করে। মৃত ব্যক্তিকে স্নানশেষে সাদা কাফনের কাপড় পরিয়ে আতর ও গোলাপ জল ছিটিয়ে দেয়া হয়। এরপর মৃত ব্যক্তিকে সামনে রেখে পূনরায় বন্দেগী বা গুরুমন্ত্র জপ করে ৫টি ভজন (মৃত্যু-সংগীত) গাওয়া হয়। এরপর সামাজিক প্রথানুযায়ী জেষ্ঠ্যপূত্র বা কনিষ্ঠপূত্র মুখাগ্নি করে এসময় মৃত ব্যক্তির মুখে আতপ চাল, ঘি, মধু, কর্পূর, তৈল ইত্যদি একত্রিত করে দেয়া হয়। মুখাগ্নি শেষে সিন্ধুক কবরে সূর্যমূখী করে কবর দেয়া হয়।

প্রচলিত বিশ্বাস: রবিদাসরা পূনর্জন্মে বিশ্বাসী। তারা মনে করেন, যে পৃথিবীতে পূন্যের কাজ করে সে গুরুর সান্নিধ্য লাভ করে ফলে তাকে আর পূনর্জন্ম নিতে হয়না। তবে যারা কম-বেশী পাপ কাজ করে তারাই পূনরায় পৃথিবীতে বিভিন্ন জীবজন্তুও বেশে জন্ম নেয়।

বাসস্থান ব্যবস্থা: রবিদাসরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রাম বা পাড়ার এক প্রান্তে বিশেষকরে পুকুর পাড়ে, নদীর ধারে, দীঘির ধারে অথবা মাঠের কর্নারে বাস করে। মনে করা হয়, তার্ গ্রামের একপাশে বাস করে যাতে করে চামড়ার কাজ করার কারণে অন্য জাতির লোকেদের অসুবিধা না হয়। একসাথে বড় রবিদাসপাড়া খুব কম চোখে পড়ে যাতে করে তাদের পেশা হুমকির সম্মুখিন না হয়। সঙ্গত কারণেই এরা একেবারে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করতে একরকম বাধ্য হয়। তাই অন্যান্য আদিবাসী জাতির ন্যায় নির্দিষ্ট একটি ভূখন্ডে সংঘবদ্ধ হয়ে থাকাটা তাদের জীবিকার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা। পূর্বে মাটির ঘরে বসবাস করলেও ইদানিং টিনের ঘর দৃশ্যমান।

পূজার স্থান: পূজার জন্য রবিদাসরা শোবার ঘরের একপার্শে চৌকি রেখে অথবা সিরহানী/দেউকুড়িয়া (মাটির শিবলিঙ্গ সমেত) বানিয়ে পূজা করে। সমাজের সবার জন্য ধামঘর/গাদীঘর (মন্দির) থাকে।

ধর্মীয় উৎসব: রবিদাসদের ধর্মগুরু রবিদাসজীর জন্মজয়ন্তীর দিন মাঘী পূর্নিমা হলো তাদের প্রধান উৎসব। এদিন নানা আয়োজনে তার জন্ম ও দর্শন নিয়ে আলোচনা এবং সব রবিদাস সমাজে গাদীপূজা সারারাতব্যাপী ভজনকীর্ত্তনসহ ভক্তিসহকারে উদযাপিত হয়।

এছাড়াও কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাতে “দেওয়ালী পূজা”, “ভূতপূজা” ভাদ্রমাসের পূর্নিমায় “ঝুমুর নৃত্যগীত” ফাল্গুন মাসে ফাগুয়া, কালীপূজার পর ছটপবনী (সূর্যপূজা), বটপূজা, নারায়নীপূজা, শীতলা মায়ের পূজা, নওমী (রামনবমী), চৈত নওমী, নবান্ন উৎসব, পুষরা (পৌষপার্বন), পদ্মামাইকে পূজা (মনসাপূজা) ইত্যাদি পালন করে থাকে। চা বাগানের রবিদাসরা বনশক্তিমা, শিবরাত্রী, বাসন্তী, হোলীয়া উদযাপন করে থাকে। ফাগুয়াতে রবিদাসরা সবাইকে রং ও কাদা মাখিয়ে আনন্দ করে।

গোত্র: রবিদাসরা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত। যেমন: ১.  ধূসিয়া: ধুসিয়ারা মূলত চামড়া দ্বারা বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরী করেন। তারা পাদুকা তৈরী করেন এবং বিভিন্ন বিবাহ অনুষ্ঠানে বাদকের কাজ করেন।

২.গুরিয়া: গুরিয়ারা নিজেদের জমিতে কৃষিকাজ করেন। যাদের জমি নাই তারা অন্যের জমিতে ক্ষেত-মজুর হিসেবে কাজ করেন।

৩.ধার: ধাররা অতীতে পালকি বহনের কাজ করতেন।

৪.দোহার: দোহাররা চামড়া দিয়ে পাদুকা সেলাই করেন। সূতা দিয়ে তারা পাদুকা সেলাই করেন না।

৫.জয়সুরিয়া: জয়সুরিয়ারা সহিসের কাজ করেন।

৬.তাঁতী: তাঁতী গোত্রের রবিদাসরা বস্ত্র বয়নের কাজ করেন, তারা মৃত পশু-পাখির মাংস স্পর্শ করেন না।

৭.সারকী: সারকীরা কসাইয়ের কাজ এবং চামড়া খসানোর কাজ করেন।

৮.চুনিহার: চুনিহাররা চুন প্রস্তুতের কাজ করেন।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে রবিদাস সম্প্রদায়ের লোকেরা মূলত ইউনিয়ন পরিষদে চৌকিদারের কাজ করতেন। অদ্যবধি অনেকেই গ্রাম্য চৌকিদারের চাকরিতে নিয়োজিত।

উপগোত্র: বঙ্গীয় রবিদাসরা মোট তেরোটি উপগোত্রে বিভক্ত। যেমন: ১. চর্মশিল্পী ২. অস্তি ৩. ধার ৪. ধুলিয়া ৫. দোহার ৬. গোরিয়া ৭. জৈমব্র ৮. জনকপুরী ৯. মৌনপুরী ১০. খাটি সাহার ১১. কোরার ১২. লোরকের ১৩. মগ-হিয়া পাচ্ছিয়ান।

সিলেটে বসবাসকারী রবিদাসরা পূর্বে তাদের অনেক গোত্র ছিল বলে জানিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে কচ্ছপ ও নাগ এ দুটি গোত্রের তথ্য পাওয়া গেছে।

লেখক: মহাসচিব, বাংলাদেশ রবিদাস ফোরাম (বিআরএফ), কেন্দ্রীয় কমিটি।


সর্বশেষ

আরও খবর

ওয়েডিং ফটোগ্রাফার এলেন খান, যার শিডিউল পাবার পর ঠিক হয় বিয়ের তারিখ

ওয়েডিং ফটোগ্রাফার এলেন খান, যার শিডিউল পাবার পর ঠিক হয় বিয়ের তারিখ


কেউ পড়ে না বরকত পাঠাগারে!

কেউ পড়ে না বরকত পাঠাগারে!


ড্যান্ডির নেশায় নষ্ট হচ্ছে হাজারো পথশিশুর জীবন

ড্যান্ডির নেশায় নষ্ট হচ্ছে হাজারো পথশিশুর জীবন


দুস্থদের মাঝে ইফতার বিতরণ করবে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন

দুস্থদের মাঝে ইফতার বিতরণ করবে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন


নারীদের জন্য বিপদজনক বিশ্বের সাতটি শহর

নারীদের জন্য বিপদজনক বিশ্বের সাতটি শহর


দেখে আসুন মিরপুরের টাকার গাছ

দেখে আসুন মিরপুরের টাকার গাছ


ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন কী?

ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন কী?


জেনে নিন বিশ্বের দামী ১০টি গাড়ির নাম ও তার দাম

জেনে নিন বিশ্বের দামী ১০টি গাড়ির নাম ও তার দাম


সুখী হতে চাইলে মানুন এই ২০টি জিনিস

সুখী হতে চাইলে মানুন এই ২০টি জিনিস


যেভাবে হয়েছিল বিশ্বের প্রথম পারমানবিক বোমার পরীক্ষা

যেভাবে হয়েছিল বিশ্বের প্রথম পারমানবিক বোমার পরীক্ষা