Tuesday, September 22nd, 2020
রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!
September 22nd, 2020 at 1:11 am
রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!

পুলক ঘটক

শুক্রবার তখন আমি আল্লামা আহমদ শফীর পদত্যাগ সংক্রান্ত নিউজ করার জন্য তাঁর দীর্ঘকালীন ছাত্র, সহকর্মী, অনুসারী ও সংগঠকদের টেলিফোন নাম্বার জোগাড় করে একে একে কথা বলছিলাম। দুপুর একটার দিকে একজন বলল, “পদত্যাগের নিউজ করবেন, না ইন্তেকালের সংবাদ দিবেন? অবস্থা ভাল নয়, মনে হয় টিকবেনা।” সন্ধ্যায় শেষপর্যন্ত মৃত্যু সংবাদই লিখতে হয়েছে,  কিন্তু মৃত্যুর আগে তাকে হাটহাজারীর বড় মাদ্রাসার মুহতারিম পদ থেকে অপসারণের  জন্য তাঁর অনুসারীরা যা করেছেন তা মর্মান্তিক।

বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাত ১টা পর্যন্ত প্রায় সম্বিতহীন একজন শতবর্ষী মানুষকে চেয়ারে বসিয়ে রেখে নানাভাবে চাপাচাপি এবং অপদস্ত করা হচ্ছিল। বিষয়টি আমাকে অনেকেই বলেছেন। কিন্তু সময় তখন এমন, যে তারা দালাল হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়েই হোক অথবা জুনায়েদ বাবুনগরীর অনুসারীদের কাছে বিরাগভাজন হওয়ার ভয়েই হোক, মিডিয়ায় নাম প্রকাশ করার সাহস পাচ্ছিলেন না। এমনই অবস্থা! আমি যে অ্যামেরিকান মিডিয়ায় কাজ করি সেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে সংবাদ পরিবেশনের সময় কোনো বেনামি সোর্স থেকে উদ্ধৃতি দেয়ার সুযোগ নেই। বাধ্য হয়েই প্রতিবেদনে বিবিসি’র রেফারেন্স দিয়েছিলাম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আল্লামা শফীর পক্ষের একজন শিক্ষককে উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা বলেছে, “শতবর্ষী আহমদ শফী খুবই অসুস্থ ছিলেন এবং তার কোন কিছু চিন্তা করার বা বোঝার মত পরিস্থিতি ছিল না।একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষকে বিক্ষোভের মুখে জোর করে বৈঠকে রেখে একতরফা সব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।” রাত ১টার পর মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির বৈঠক শেষ হলে শাহ শফীকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

প্রশ্ন হল, হাটহাজারীতে দেশের বৃহত্তম ঐ কওমি মাদ্রাসায় ছাত্রদের স্বার্থবিরোধী নতুন কি ঘটেছে যার জন্য তারা এতবড় বিক্ষোভ গড়ে তুললেন? দেশের মাদ্রাসাগুলোতে এই  ন্যাচারের ছাত্র বিক্ষোভের অতীত ইতিহাস নেই।তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, যিনি তাদের ‘বড় হুজুর’–যিনি কওমি মাদ্রাসার ইতিহাসে ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন। যার তৎপরতায় মাত্র ১৮/১৯ বছর বয়সে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করা একজন শিক্ষার্থী আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ পাশের সমমান স্বীকৃতি পেয়েছেন। হাটহাজারীর ঐ মাদ্রাসার জন্য রেলের জমি বরাদ্দসহ বহুবহু সুবিধা তিনি শেখ হাসিনার সরকারের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছেন, তার দাবিতে স্কুলের পাঠ্যবইয়ের ইসলামিকরণসহ কি -না করেছেন শেখ হাসিনা! যেসব কারণে আমরা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে  আদর্শচ্যুত বলে সমালোচনা করি। কিন্তু যাদের জন্য সরকার এসব করেছে, তারা কি কৃতজ্ঞ? “কওমি জননী” মারা গেলে তারা হয়তো একবার হলেও তাঁর অবদান কৃতজ্ঞতায় স্মরণ  করবে, কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় নয়। এখানেই রাজনীতি। ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানকে “ভেঙে ফেলা”র জন্য যে দলের প্রতি তারা মর্মে মর্মে ক্ষুব্ধ, ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালী জাতিয়তাবাদের ঐতিহাসিক লেগাসি যে দলের সঙ্গে মিশে আছে, যে দলকে তারা ভারতের দালাল হিসেবে আখ্যা দেয়, সেই দলের নেত্রীর কাছে তারা সুযোগ সুবিধা নিতে পারে – কিন্তু তা স্বীকার করতে তাদের মন কখনো সায় দিবেনা।

আমরা বারবার বলেছি, হেফাজতের সঙ্গে ঐক্য করা শুধু অনৈতিক নয়, এটা আওয়ামী  লীগের ভুল পলিসি। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতার স্বার্থে আপাত সুবিধাকেই বড় বিবেচনা করেছে, যদিও শেষ বিচারে লাভ হয়নি। শেখ হাসিনাকে “কওমি জননী” অবিধা দিয়ে শফী হুজুর তাঁর লোকজনের কাছে সমর্থন হারিয়েছেন। তিনি তাঁর লোকজনকে শেখ হাসিনার সমর্থক বানাতে পারেননি, এটা সম্ভব নয়। আওয়ামীলীগকে হেফাজত হতে হবে, হেফাজত কখনো আওয়ামীলীগ হবেনা। আবারও ”আওয়ামী মুসলিম লীগে” ফিরে যাওয়া আওয়ামীলীগের জন্য মুহুর্তের ব্যাপার। কিন্তু মুসলিম লীগের আওয়ামীলীগ হয়ে ওটা শতবর্ষেও সফল হয়না।

হাটহাজারীর বড় মাদ্রাসায় শফী হুজুর এবং তাঁর পুত্র মওলানা আনাস মাদানীকে সরানোর জন্য ছাত্ররা যে বিক্ষোভ করেছে, তা সেই মৌলিক রাজনীতির জায়গা থেকেই হয়েছে। নইলে মাদ্রাসার কর্তৃত্ব নিয়ে ম্যানেজমেন্ট লেভেলে যে বিরোধ তাতে ছাত্রদের এত বিপুলভাবে যুক্ত হওয়ার কারণ নেই। বাংলাদেশের বিদ্যমান সংস্কৃতিতে সরকারের সঙ্গে যার সম্পর্ক ভাল, যিনি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার জন্য সুযোগ সুবিধা এনে দিতে পারেন প্রতিষ্ঠানে তিনিই কর্তৃত্ব করেন। মাওলানা আনাস মাদানী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের সুবাদে অনেক সুবিধা এনে দিয়েছেন এবং এনে দিতে পারেন। উপরন্তু তিনি আল্লামা শফীর পুত্র। সব বিবেচনায় তার কর্তৃত্ব মেনে নিতে ঐ মাদ্রাসায় সংশ্লিষ্টদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কথা একটাই, “বড় হুজুর এবং তার পুত্রের আওয়ামীলীগের সঙ্গে মাখামাখি বেশি। এটা ভাল লাগেনা।” তাদের সম্পর্কটা যদি বিএনপি-জামায়তে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে হত, তাহলে তাদের অসন্মানিতভাবে বিদায় করার তৎপরতা দেখতে হতোনা। জীবনের শতবর্ষ পেরিয়ে নিজের শিষ্যদের কাছেই এতটা হতমর্যাদা হয়ে শেষবিদায়ে ঢলে পরতে হতোনা মওলানা শফীকে।

বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ শাহ আহমদ শফী মনে করতেন মেয়েদের ক্লাস থ্রি-ফোরের বেশি পড়ানোর দরকার নেই। হলি আর্টিজানে বর্বরোচিত জঙ্গি হামলার বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য দেখিনি। তবে চাপাতিবাহিনীর একের পর এক হামলার সময় তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “ব্লগারদের হত্যা করা ওয়াজিব।” সঙ্গত কারণেই তাঁর এবং তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে চিন্তাশীল প্রগতিশীল মানুষের লড়াই অনিবার্য। কিন্তু বাস্তবতা হল, এই বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ শফীকেই আদর্শ মনে করেন। তাদের কাছে পেতে বিএনপি, জামায়াত এবং জাতীয় পার্টি সবসময় প্রতিযোগীতায় লিপ্ত আছে। আওয়ামীলীগও তাদের হারাতে চাইবে বলে মনে হয়না। বহুমাত্রিক টানাটানিতে হেফাজত ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু তালেবানী চিন্তাধারা মৃয়মান হবেনা। বৃহত্তর তালেবানী প্লাটফর্ম গড়ে ওঠাও অসম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যত গন্তব্য অনিশ্চিত।

পুলক ঘটক

সর্বশেষ

আরও খবর

গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা

গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা


ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!

ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!


সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত  বন্ধুত্ব

সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত বন্ধুত্ব


প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ

প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ


ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান

ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান


কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ

কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ


করোনাকালের খোলা চিঠি

করোনাকালের খোলা চিঠি


সিগেরেট স্মৃতি!

সিগেরেট স্মৃতি!


পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট

পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট


দাদন ব্যাবসায়ী ও মধ্যস্বত্ত্বভোগী ঠেকাও

দাদন ব্যাবসায়ী ও মধ্যস্বত্ত্বভোগী ঠেকাও