Friday, June 24th, 2016
রিকশা বিলাস
June 24th, 2016 at 1:11 am
রিকশা বিলাস

অনার্য তাপস: বিলাস শব্দটার সাথে ধনদৌলতের যোগাযোগ আছে। নাহলে ‘বিলাস’ ঠিক জমে না। তখন এটা আছে তো সেটা নাই, সেটা আছে তো এটা নাই অবস্থা। বিলাস করতে গিয়া আর যাই হোক এই নাই নাই অবস্থাটা শোভা পায় না। কাজেই বিলাস মানেই বড়লোকদের ব্যাপার। আমরা ছাপোষা মধ্যবিত্ত বিলাসের নামে বেসনে বেগুন চুবিয়ে ভেজে খেয়ে আত্মরতিতে ভুগি। যাকগে সব। বলছি রিকশা বিলাসের কথা।

‘রিকশায় চড়ে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মহাপ্রতাপশালী সম্রাট। আর রাস্তার দু’ধারে সার বেঁধে লোকজন নত হয়ে কুর্নিশ করছে!’

রিকশা কিন্তু মোটেও ছোটলোকি জিনিস নয়। বিশ্বাস হয় না? শুনুন তাহলে। রিকশার জন্মভূমি হলো জাপান। এটা বহুজনে কয়, বহুজনে বিশ্বাসও করে। আমরাও করি। তো সেই জাপানের মেইজি সম্রাটরা এই রিকশা ব্যবহার করতেন শহরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য। এবার ভাবুন। রিকশায় চড়ে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মহাপ্রতাপশালী সম্রাট। আর রাস্তার দু’ধারে সার বেঁধে লোকজন নত হয়ে কুর্নিশ করছে! জাপান যাবার দরকার নাই। এই খোদ ঢাকা শহরে প্রথম রিকশা কিনেছিলেন ওয়ারি এলাকার একজন মারোয়াড়ি ভদ্রলোক। সেটাও একই কারণে মানে তিনি নিজের রিকশায় চড়ে ঘুরে বেড়াবেন শহরে। আর মারোয়াড়িদের বিষয়ে নতুন করে কিছু লিখতে হবে? এই পুরো ভূভারতে এক নামে চেনা যায় এমন একটা পরিবার হচ্ছে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। সোজা কথায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার। দামু মুখোপাধ্যায় নামে একজন লেখক জানাচ্ছেন,“ জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির ছাদে টানা রিকশা চড়ে হাওয়া খেতেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়ছেলে দ্বিজেন্দ্রনাথ।” বুঝুন! বিলাসের কোন লেভেলে বসবাস করতেন এইসব মানুষ।

Rikshaw 2

আলোকচিত্রঃ জীবন আহম্মেদ

‘এখন গ্রাম থেকে শহর সবখানেই রিকশার জয় জয়কার’

এই বিলাসি বস্তুখানি ধিরে ধিরে নিম্ন আর মধ্যবিত্তদের হয়ে গেল সময়ের মহাপ্রতাপে। এখন গ্রাম থেকে শহর সবখানেই রিকশার জয় জয়কার। তবে তার সেই বিলাসি চরিত্র আর নেই । আছে প্রয়োজন। অল্প রাস্তা একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে, রিকশা নাও। বাচ্চাকে পরীক্ষা সেন্টারে দিতে হবে, রিকশা নাও। রাস্তায় কেউ অসুস্থ্য হয়ে পরেছে লোকজন ধরাধরি করে তুলি দিলো রিকশায় ইত্যকার নানাবিধ প্রয়োজন মিটিয়ে চলেছে রিকশা।

‘বিশ টাকা ভাড়া নাকি?’ 

‘হ মামা। না দিলে যাইতাম না।’  

মেজাজ খিচরে যাওয়া এইসব কথার বাইরেও একবার ভাবুন, ঝুম বৃষ্টিতে আপনার ভিজতে ইচ্ছা করলো। টুক করে উঠে গেলেন রিকশায়। তারপর চাইলে জামা খুলে বসলেন। আর রিকশাচালক মামাটি যদি আপনারই মতো রোমান্টিক মনের হয় তাহলে তো যাত্রাটা জমে ক্ষীর। মনের গভীরতম প্রদেশ থেকে তার কণ্ঠে ভেসে এলো গান। আপনি চুপচাপ বসে আছেন। আর রাস্তার দু’পাশের মানুষ আপনাকে দেখছে। এবার ভাবুন সম্রাট মেইজির চাইতে কোন অংশে আপনি কম? কিংবা কোন কারণে আপনার মনটা ভালো। প্রিয় মানুষটিকে সাথে নিয়ে বেড়িয়ে পরলেন। আকাশে ধরুন জোৎস্না আছে। আপনি ভাড়ার কথা ভুলেই যাবেন। এই রোমান্টিকতাই হচ্ছে বাঙালী শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বেশিরভাগের বিলাসীতা।

Rikshaw 3

আলোকচিত্রঃ জীবন আহম্মেদ

এবার সেই স্মৃতির কথা মনে করুন। সেই যে, হু হু মনে পরছে… প্রিয় মানুষের সাথে প্রথম রিকশায় চড়ার সেই মহেন্দ্রক্ষণ! মনে পরেছে তো? ক্যাম্পাসের বা একটু মফস্বলের ছায়াঢাকা রাস্তায় আপনারা দু’জন। রিকশা চলেকের ‘ভর’ উপেক্ষাই করে সবাই এইসব সময়। তাই দু’জন। একটু লজ্জা, একটু ভয়। একটু কাছে আসা। একটু উষ্ণতা। মনে পরছে না? সেই যে রিকশায় বসে বসে হাতে একটু হাত লেগে যাওয়া। অযথাই হুড তুলে দেওয়া। তখন কিন্তু আপনি রাজা। সম্রাট মেইজির চাইতেও বড় সম্রাট। আসমুদ্রহিমাচল আপনার পায়ের নিচে। ভাবুন তো তখন আপনার মনে কোন ভয় ছিলো কি না? চাপাতির ভয়, কল্লা পরে যাবার ভয়, ধর্ম-বর্ণ-জাতের অনুভূতির ভয়, বাপ-মা-কাকা-ভাইবেরাদারের ভয়, টাকা না থাকার ভয়, একটু দুঃসাহসি হলে কী হবে তার ভয়, বন্দুক-পিস্তল-গ্রেনেড কিংবা জম্বির ভয় ছিলো কি? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো। আমি বিশ্বাস করি ছিলো না। ইয়ে, মানে আমার তো ছিলো না। তাহলে এত ভয় কিসের? রিকশা বিলাসে মানুষের ভয় থাকে না। চলুন এই বর্ষায় রিকশাবিলাস করি।

anarja taposhলেখকঃ গবেষক

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/টিএস


সর্বশেষ

আরও খবর

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?


প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ

প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ


দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন

দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন


দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন

দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ