Saturday, August 8th, 2020
লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!
August 8th, 2020 at 5:08 pm
লোভের বাইরের জীবন হচ্ছে ঐকান্তিক শ্রেণীহীনের জীবন। 'পাছে লোকে কিছু বলে না ভেবে' কেবল অন্যের আনন্দের জন্য বাঁচাই অর্থপূর্ণ জীবন।
লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

মাসকাওয়াথ আহসান:

“আমরা ভাবি, রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য “চাষাভূষোকে”কে ‘খ্যাপাবার’ দরকার ছিল, এখন যেহেতু স্বরাজ হয়ে গিয়েছে, তখন এদের দিয়ে আর কোনও দরকার নেই, এরা ফিরে যাক ক্ষেতে-খামারে, ফলাক ধানচাল, আর মধ্যবিত্তশ্রেণী, আমরা শহরে বসে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা করব আর তাই দিয়ে নবীন রাষ্ট্র গড়ে তুলব! তাই আমরা সে চর্চা ইংরেজীতে করব, বাংলায় করব, না বান্টু ভাষায় করব তাতে কিছু যায় আসে না, আমরা বুঝতে পারলেই হল, অরা অদের কম-জোর মাতৃভাষা নিয়ে পড়ে থাক। ভাবতেই আমার সর্বাঙ্গ ঘেন্নায় রী রী করে ওঠে”; এই মন্তব্যটি সৈয়দ মুজতবা আলীর।

যারা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এককালে “মাতৃভাষা” শেখো; আর সব ভাষাকে ঘৃণা করো; এরকম ঘৃণার কারখানার উগ্রভাষাজাতীয়তাবাদী ছিলেন; তারা নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংলিশ মিডিয়ামে বা বহু-ভাষা শেখা যায় এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছেন।

সেইসব উগ্রভাষাজাতীয়তাবাদীর ছেলে-মেয়ে-নাতি-নাতকুর আজ বাংলাদেশের ফেসবুক দেখে বিরক্ত হয়; হতাশ হয়; যুদ্ধাহত জার্মানি-জাপান, বাড়ির কাছের ভিয়েতনাম এতো সভ্য রাষ্ট্র হয়ে গেলো; আর আমরা হতে পারলাম না।

ধরুন করোনাকালের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুদিনে যারা “রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন”-এই আলাপ করছেন; রবীন্দ্রনাথ কট্টর হিন্দুত্ববাদকে প্রত্যাখ্যান করে ‘ব্রাহ্ম’ দর্শনের অনুসারী ছিলেন; এটা না বুঝে তাকে হিন্দু ভেবে তার দিকে গোবর ছুঁড়ে হিন্দু বিদ্বেষে তাপিত হচ্ছে; এরা সেই ‘চাষাভূষো’ যাদেরকে উগ্রজাতীয়তাবাদীরা তাদের ঘৃণার কারখানার বিদ্বেষ বালক-বালিকা করে গড়ে তুলেছে।

আবার ভয়াল বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের মৃত্যু উপত্যকায় বসে, ঘাতক ওসি প্রদীপ একজন সিরিয়াল কিলার; পুলিশ স্টেশনের কমান্ডিং অফিসার বলে ঐ এলাকার সব বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক দায় তার। অথচ ফেসবুকে যারা বলছে, প্রদীপ হিন্দু বলে তার এতো সমালোচনা; তারা হচ্ছে সেই ‘চাষাভূষো’ যাদেরকে উগ্রজাতীয়তাবাদীরা তাদের ঘৃণার কারখানার বিদ্বেষ বালক-বালিকা করে গড়ে তুলেছে।

এই যে কট্টর মুসলমান ও কট্টর হিন্দু হয়ে ওঠা জনগোষ্ঠী; এর দায় রাজনীতিক ও নীতি নির্ধারকদের; যারা নানান জাতীয়তাবাদী জজবা তুলে; “চাষাভূষোকে”কে ‘খ্যাপাবার’ কাজটি কৌশলে করে নিজেদের চেয়ার আর ক্ষমতা বাগিয়ে নিয়ে তাদের পাঠিয়েছে অজ্ঞানতার নিঃসীম অন্ধকারে।

কলকাতার কট্টর হিন্দুত্ববাদের কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মানুষেরা যারা মানুষকে ভালোবেসে অহিংস জীবন যাপন করেছিলেন; উগ্রজাতীয়তাবাদকে সতত অপছন্দ করতেন; তারা কট্টরতাকে প্রত্যাখ্যান করে ব্রাহ্ম চিন্তায় শামিল হয়েছিলেন; এ আর কিছুই নয়; সত্য-সুন্দর-মঙ্গলের আলোয় একটি জীবন কাটিয়ে দেবার অভিলাষ।

ঢাকায় কট্টর ইসলামপন্থার কারণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র মতো মানুষেরা যারা মানুষকে ভালোবেসে অহিংস জীবন যাপন করেছিলেন; ‘লাল সালু’র মাজারের উগ্র ভক্তিবাদ যারা সতত অপছন্দ করতেন; তারা কট্টরতাকে প্রত্যাখান করে সুশীল চিন্তায় শামিল হয়েছিলেন; সারাজীবন সত্য-সুন্দর-মঙ্গলের আলোয় স্নাত হতে।

সৈয়দ মুজতবা আলী কলকাতার ব্রাহ্মচিন্তা আর ঢাকার সুশীল চিন্তার আভা মনে মেখেছেন; জার্মানিতে তুলনামূলক ধর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন; ফলে জাতীয়তাবাদের জজবা তুলে চাষা ভূষোকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে তাদের ঘাড়ে চেপে ক্ষমতা দখল করে; চাষাভূষোকে অজ্ঞানতার অন্ধকারে জিইয়ে রাখার মারণ খেলাটিকে তিনি হাতে নাতে ধরে ফেলেছেন।

আজ যে মেয়েরা ভিনদেশী সংস্কৃতির ‘হিজাব’ পরে; তাদের মায়েরা হিজাব পরতেন না। কিন্তু বাংলার নারীর শালীনতা বোধ প্রশ্নাতীতভাবেই সুন্দর ছিলো। এই যে মায়ের চেয়ে এগিয়ে গিয়ে অতি ধার্মিকের যে লেবাস এরা পরে; তা আরব অঞ্চলে ইহুদী নারীদের পরিধেয় ছিলো। কিন্তু যে চাষাভূষোকে শুধু মাতৃভাষা শেখার ট্যাবলেট খাইয়ে একভাষী জ্ঞানের খণ্ড-মানুষ করে রাখা হয়েছে; সে তো গুগল সার্চ করে এটা খুঁজে বের করতে পারবে না; কুরানে নারীর শালীন পোশাকের যে পরামর্শ রাখা হয়েছে; তা হিজাব নয়। আবার একই নির্দেশ পুরুষের ‘নজর বা দৃষ্টি’-র শালীনতা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।

আজ যে মেয়েরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সিঁদুর কপালে মেখে; কিংবা মুখের চেয়ে বড়ো লাল টিপ পরে, তরুণ নেত্রী মনীষা কেন কোরবানি ঈদে পশু কুরবানী করে অধিকার বঞ্চিতদের মাঝে বিতরণ করলেন; এরকম ক্ষোভে ফেটে পড়ছে; এদের মায়েরা সিঁথিতে এক ফালি সিঁদুর দিতেন; তাদের কপালের টিপটিও ছিলো মুখের সঙ্গে মানানসই। এই যে মায়ের চেয়ে এগিয়ে গিয়ে অতি ধার্মিক হওয়া মেয়েরা; এরা সেই চাষাভূষো; যারা একভাষী শিক্ষা আর সীমাবদ্ধ জ্ঞানে এতোটাই ম্লান যে, ঋগবেদে সব মানুষকে ভালোবাসার; তাদের সেবা করার যে অনুপ্রেরণা রয়েছে; তা গ্রহণের ক্ষমতা তৈরি হয়নি এদের।

মানুষকে এই চাষাভূষো করে রাখার গ্যাঁড়াকলটি বন্ধ না করলে; সামাজিক বিশৃংখলার গ্যাঁড়াকলটি রয়ে যাবে।আওয়ামী লীগের “দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে” “কোরবানি’ দেয়া হচ্ছে কেবল সেই চাষা ভূষোর ছেলেমেয়েদের। আর এদেরকে পাকড়াও করে রিমান্ডে নিয়ে যাওয়ার কাজটিও করছে চাষা ভূষোর ছেলে-মেয়েরা।

এদেরকে যারা চাষা ভূষো করে রাখলো; সেই পুতুল নাচের ইতিকথার পাপেট মাস্টারদের ছেলে-মেয়েরা এখন সেকেন্ড হোমে থাকে। এই ছেলে-মেয়েরা বহু ভাষার বিদ্যা-অর্জন করে; অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় জীবন যাপন করে। তাই ফেসবুকে এসে অশান্তি দেখে দেশ ও সমাজ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে। অথচ এই নরভোজি সমাজটি তার বাবা-মা-দাদা-নানার কীর্তি এটা বুঝতে পারেন না।

এখন আবার ‘আমি তোমাদের লোক’ বলে সেই অবহেলিত চাষাভূষোর ছেলে-মেয়েকে সংসদ- সেনা-বিচার বিভাগ-পুলিশ-প্রশাসন-বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়িত করায়; আবার চাষাভূষোর জীবন ‘কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার’, ‘হেলমেট ও হাতুড়ি’ আঘাতে রক্তাক্ত হবার বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডে অজ্ঞাতনামা লাশ হবার।

এইরকম সমাজ দেখেই কবি শামসুর রাহমান ‘ঐকান্তিক শ্রেণীহীন’ হয়েছিলেন। ঐকান্তিক শ্রেণীহীন হলে আপনি মানুষের বেদনা উপলব্ধি করতে পারবেন তার ধর্ম-পরিচয়, পেশা-পরিচয়, গোত্র-পরিচয়ে তাকে বিখণ্ডিত না করে; কেবল মানুষ ভেবে।

ব্রাহ্ম ও সুশীল দর্শনটি এইরকম ঐকান্তিক শ্রেণীহীনতার চিন্তা; যেখানে আপনার পশ্চিমে পড়া সন্তানের তেলে মাথায় তেল না দিয়ে গৃহকর্মী-ড্রাইভার-মালির সন্তানটিকে কীকরে শিক্ষিত করে তোলা যায়; সে চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাবেন আপনি। এটা সেই সমান মর্যাদার সমাজের স্বপ্ন; যা আপনাকে ঘুমাতে দেয়না।

এই ঐকান্তিক শ্রেণীহীনতার চিন্তা হচ্ছে সেই চিন্তা; যে কারণে লন্ডন থেকে স্যুট পরে ফেরা ব্যারিস্টার ছেলেটি; এক প্রস্থ সাদা কাপড় পরে; সাহেবি শো-অফকে প্রত্যাখান করে। গান্ধীজী ভেবেছিলেন, পৃথিবীতে সব মানুষের প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য আছে; কিন্তু লোভ মেটানোর সামর্থ্য নেই।

লোভের বাইরের জীবন হচ্ছে ঐকান্তিক শ্রেণীহীনের জীবন। ‘পাছে লোকে কিছু বলে না ভেবে’ কেবল অন্যের আনন্দের জন্য বাঁচাই অর্থপূর্ণ জীবন।

আর রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে ফেলে যে চাষাভুষোকে অনগ্রসর জীবনে ঠেলে দেয়া হয়েছিলো; তাদের নিয়ে মাপামাপি বন্ধ করুন। তাকে তার মতো থাকতে দিন। ইন্টারনেট যুগে সচেতনতার আলো তারা নিজেরাই খুঁজে নেবে।

ঐকান্তিক শ্রেণীহীন মানুষ সূফিয়া কামাল একবার পুরান ঢাকার একটি স্কুলে গিয়ে দেখেন, একটি ছেলে বেঞ্চ থেকে দূরে একটা টুলে বসে ক্লাস করছে; এই ভন্ড সমাজ, শিশুকেও দলিত বলে টুলে বসিয়েছে। সূফিয়া কামাল তাকে কোলে তুলে নেন। এই কারণে ঐকান্তিক শ্রেণীহীনতার বোধ এ জীবন পূর্ণ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে একটি ছোট ছেলে লজেন্স বেচতো; আমি প্রতিদিন তার কাছ থেকে অনেক লজেন্স কিনতাম। একবার নাগরিক প্লাস্টিক জীবনে হাঁপিয়ে উঠে ঈশ্বরদীতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে শুনি ঐ ছেলেটি প্রতিদিন খুঁজে গেছে আমাকে। ছেলেটি আমি ফেরার দিনে এসে আনন্দে জড়িয়ে ধরে আমাকে। ঐদিন সে আর লজেন্স বিক্রি করতে চায়নি। আমাকে কিছু লজেন্স দিয়ে বলে, আপনাকে এমনিই দিলাম। ঐদিনের পরে আর কেউ যখন আমাকে বলে, তোমাকে মিস করি; এতে কোন হেলদোল হয় না আমার। ঐ শিশুটি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলো, মিস করা কাকে বলে।

ঠিক এ কারণেই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সমান্তরালে আমার আরেকটি ঐকান্তিক শ্রেণীহীন জীবন গড়ে ওঠে; যেখানে ‘চাষাভুষো”-দের মধ্যে মৌলিকত্বের আলো খুঁজি। এ কারণে শিবির-শিবসেনা-চাষা-ভুষো-গরীব-মিসকিন বলে আপনি যখন বিক্ষোভ প্রকাশ করেন; আমার তাতে হেলদোল হয়না। কারণ আমি তাদের চিনি; এদের সবার মধ্যে সম্পূর্ণ মানুষ হবার সম্ভাবনা আছে।

আপনি যাকে চাষাভুষো বলে অজ্ঞানতার অন্ধকারে রেখেছিলেন; আপনি এখন তাকে ধমক দিয়ে নানারকম আধুনিকতাবাদ শেখাচ্ছেন; কীরকম পরস্পরবিরোধী কাজ তাই না!

মাসকাওয়াথ আহসান:

সর্বশেষ

আরও খবর

৪২ ও ৪৩তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

৪২ ও ৪৩তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ


প্রয়াণের ২১ বছর…

প্রয়াণের ২১ বছর…


করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত


ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড


মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী


আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার

আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার


পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি

পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি


দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির

দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির


বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে

বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে


অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ

অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ