Wednesday, October 26th, 2016
লড়াইয়ের বাস্তবতায় আপনাকে স্বাগতম
October 26th, 2016 at 11:02 am
লড়াইয়ের বাস্তবতায় আপনাকে স্বাগতম

মীর মোশাররফ হোসেন : শুরুটা হোক, ঠিক ২৫ বছর আগে। ১৯৯১ সালের শেষ ঘনঘটা। সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে দেয়া হল। পুঁজিবাদী বিশ্বে তুমুল আলোড়ন, জয়-জয়কার। বলা হল- ইতিহাসের পরিসমাপ্তি। মানুষ পরাজিত, জয় হল অসম বন্টনের। জন্মসূত্রে মানুষের কোন মৌলিক চাহিদার প্রয়োজন আর স্বীকার করা হবে না, তাকে লড়তে হবে অসাম্যের মধ্যে, যদি ছিটেফোঁটা সৌভাগ্য তার কপালে জুটে!

না, ততদিনে পুঁজিও তার কাঠিন্য ত্যাগ করে হাজির হয়েছে উদারনৈতিকতার মোড়কে। দেখানো হচ্ছে- রাষ্ট্র পুঁজিবাদী হলেও তার মধ্যে মানবিক গুণ থাকতে পারে; এবং সে তার প্রজাবৎসল নাগরিকদের জন্য উন্নয়নের নানান বটিকা নিয়ে হাজির হচ্ছে, যেন চোয়ানো অর্থনীতির ছিটেফোঁটার পরিমাণ বাড়ে।

তবে লাভের গুড় যে প্রতিনিয়ত পিঁপড়ার পেটে যাচ্ছে, তা বুঝতে বোধ করি একদশকও সময় লাগেনি। ২০০০ এর পর থেকে পৃথিবীব্যাপী শুরু হয় পুঁজিবাদের বিরুদ্ধাচরণ।

টাল সামলাতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঝোলা থেকে বের হল- সন্ত্রাসবাদ। টুইন টাওয়ার হামলার পর দেশে দেশে যুদ্ধের ভুগোল বদলাতে থাকলো। শত্রু পেয়ে অর্থনীতির দ্বন্দ্ব থেকে খানিকটা দূরে সরে যাওয়ারও সুযোগ মিলল।

কিন্তু বিধিবাম, যুদ্ধ- যে কীনা পণ্য রাজনীতির আরেক বিনিময় দ্রব্য, সেও অতটা লাভজনক হয়ে উঠলো না। সম্ভবত, প্রযুক্তির উৎকর্ষ, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং তার ব্যবহারের সুযোগ (এটা নিয়েও যুদ্ধ চলছে, সেটা অন্যখানে তোলা থাক) ও বণিকের সমারোহ যুদ্ধকে আগের মত লাভজনক করতে পারল না।

নাই নাই করে ভাগ চায় সবাই। ইউরোপ চায়, সেখানকার হিস্যা নিয়ে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম সবার মনকষাকষি। রাশিয়া চায়, চীন চায়, ভারত চায়, আফ্রিকা চায়, ব্রিকস চায়.. সবাই চায়। ভোগের বাজার সম্প্রসারণে তেল ও সস্তা শ্রমের সুযোগে বড় হয়ে ওঠে অন্যরাও।

আঞ্চলিক আর বিশ্বসভায় খেলতে চাওয়া সবার এত চাহিদায় বেচারা যুদ্ধেরও বাজার পড়ে যায়। ফলে সন্ত্রাসবাদ যতই ম্যাক্রো থেকে মাইক্রোতে, লার্জ স্কেল থেকে ইউনিটে চলে আসুক না কেন; সেই লাভ আর সুদসহ ঘরে ওঠানো যায় না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদের যুগপৎ সন্ধির পুরনো গেইমেও তাই আর সুবিধা হয় না।

তাইতো আসে মন্দা; কৃষক-শ্রমিকের অভিশাপেই কী না বাড়তে থাকে প্রকৃতির রুদ্ররোষ; এজন্যই কী বড়দের নানান দাবা খেলার নিচে হারিয়ে যেতে যেতে ক্রমেই উঁচু হয়ে উঠছে ভাত-কাপড়-জমি-কাজের মত সেসব দাবিগুলো, দাবির আন্দোলনগুলো, যেগুলো নাকি ২৫ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল!

ইতিহাস কি তবে ফ্যাশনের মতই ২৫ বছর পর আবারও ফিরে আসছে প্রবল প্রতাপে?

ইা, ‘ফ্যাশনের’ চকমকি করিডরে কেবল এ বছরের জন্যই এ প্রপঞ্চ সত্যি নয়; সত্যিটা হচ্ছে- দুই হাজার পরবর্তী বিশ্ব বাস্তবতা কেবলই বদলাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে সিকি শতাব্দী পুরনো- ইতিহাসের পরিসমাপ্তির উচ্চস্বরও।

সমীকরণ বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। এমনিতেই আমাদের দেশের বাস্তবতায় ক্ষমতাই ছিল আইন। ব্যাপারটারও একটা তুমুল সন্ধিক্ষণ চলছে। চলছে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার নব নব সংযোজন। ঠিক যে সময়টা সোভিয়েতের পতন হয়েছে, একইসময়ে আমরা এনেছি তথাকথিত গণতন্ত্র। যার ঠিকাদারি নিয়ে দ্বিদলীয় পরিবারতন্ত্র চেপে বসেছে। এবং এরইমধ্যে চলেছে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রীক বাংলাদেশের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণের অসম লড়াই।

লড়াইটা এজন্যই অসম যে- যারা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তারা কেবল যুদ্ধাপরাধের বিচার, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের মুলা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানের তরিকায়। আক্ষরিক অর্থে নাই করে দিচ্ছে- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে তৈরি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে।

মুক্তিযুদ্ধের মত এই গণতন্ত্রের জন্যও বাংলাদেশিরা রক্ত দিয়েছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল- স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচার। কিন্তু কোনোটিই এই বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। লুটপাটের শাসন বাঙালির মানস থেকে এগুলোর বীজও নষ্ট করে দিচ্ছে, শেষ করে দিচ্ছে সম্ভাবনার অঙ্কুর।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করা অবশ্যই একটা বিরাট সাফল্য। স্বাধীনতার সাড়ে চার দশকের ব্যর্থতা পেরিয়ে এগুলো সম্পন্ন করা মোটেই ছোট কোনো কাজ নয়, সেটা স্বীকার করলেও উপরের কথাগুলো মিথ্যা হয়ে যায় না।

এ সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতির বিকাশও বেশ দৃশ্যমান হয়েছে। এই অগ্রগতির প্রধান কারিগর ও নায়ক হলো দেশের কৃষক-ক্ষেতমজুর, গার্মেন্টস শ্রমিকসহ শ্রমজীবী জনগণ, প্রবাসে কর্মরত মেহনতি মানুষ ও ক্ষুদে-মাঝারি উদ্যোক্তাগণ।

দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র ও শাসকগোষ্ঠীর গণবিরোধী কার্যকলাপ সত্ত্বেও এই অগ্রগতি যে সম্ভব হয়েছে, তা এ দেশের মজুর-কিষাণ ও আপামর জনগণের অপার সৃষ্টিক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের সাক্ষ্য বহন করে।

এবং এটাও বোঝায় যে, লুটপাটের শ্রেণিকে হটিয়ে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা কৃষক-মজুর-শ্রমিকদের হাতে আসলে, এ দেশ যে অসাধ্য সাধন করতে পারবে-এটি তারই প্রমাণ।

এই অগ্রগতি সত্ত্বেও শাসক শ্রেণির চরিত্রের কারণে দেশে আজ বিরাজ করছে রুগ্নতা ও সংকটের আবর্ত। কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। সবেচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এনেও মাসে পাঁচ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরি মিলছে না গার্মেন্টস শ্রমিকদের। সবক্ষেত্রে চলছে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তের পকেট কাটার মচ্ছব। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে দলীয়করণ করে অনিশ্চিত করে দেয়া হচ্ছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে।

উন্নয়নের নামে দেশি-বিদেশি চক্রের একের পর এক লুটপাটের কাহিনীর প্রমাণও সর্বত্র, কিন্তু তা নিয়ে কথা বলা যাবে না। বলতে গেলে সামনে এসে দাঁড়াবে উদ্ধত রাইফেল, মাস্তান আর পোশাকি বাহিনী। সব মিলিয়ে সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, লুটপাটতন্ত্র ও গণতন্ত্রহীনতা দেশের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ রূপে বিরাজ করছে।

আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে? প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক জঙ্গি অপশক্তি কিছুটা আঘাতপ্রাপ্ত হলেও, কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও দণ্ড কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও তাদের সামাজিক ভিত্তি তৃণমূলে প্রসারিত হয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িকীকরণ ঘটছে তুমুল গতিতে।

একইসঙ্গে ভোটাধিকারসহ জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোকে পরিকল্পিতভাবে খর্ব করায় রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ও কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

‘অবাধ বাজার অর্থনীতির’ দর্শন অনুসরণের ফলে রাজনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে পণ্যায়ন, বাণিজ্যিকীকরণ, ভোগবাদ, প্রদর্শনবাদ ইত্যাদি আরো গভীরে বিস্তার লাভ করছে। সম্পদ-বৈষম্য ও শ্রেণি-বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন-হামলা বাড়েছে। পরিবেশ-প্রকৃতির বিরুদ্ধে আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে।

এ বাস্তবতায় নতুন করে ভাবনার সময় হাজির হয়েছে। শুরু হয়েছে রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনার খোরাক। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, অবাধ পুঁজির সন্ত্রাস, যুদ্ধ আর শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইগুলো খবরের কাগজের এক কলাম থেকে লিড সংবাদে রূপান্তরিত হচ্ছে।

বাংলাদেশেও চলছে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উন্নয়নের নামে প্রাণ-পরিবেশ হত্যা রুখে দেয়ার মরনপণ লড়াই। বলা বাহুল্য, এ লড়াইয়েও বাম-প্রগতিশীল অংশই সামনের কাতারে হাঁটছে।

বামদের নিয়ে কথা বললে, সঙ্গত কারণেই আপনার চোখ কপালে উঠতে পারে। অনেকেই বলেন, বামপন্থীদের কেউ কেউ তো ক্ষমতারও অংশীদার, তাহলে কেন এ দ্বিমুখীনতা। এখানেও লড়াইয়ের বার্তা আছে, বামদের অনেক দলই দক্ষিণমুখী বিচ্যুতিতে ডুবে আছে, ধামা ধরে আছে ক্ষমতাসীন দলের। অনেকেই আবার নিজেদের কৌলিন্য নিয়ে দূরে সরে আছে জনগণেরও কাছ থেকে।

সমাজ-রাজনীতির অন্য সব বিষয়ের সঙ্গে এই দুই ত্রুটির বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে। ১৯২০ সালে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির এ উত্তরাধিকার এই অঞ্চলের সব শ্রেণি ও জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। তেভাগা, নানকা আর টঙ্ক আন্দোলনে কৃষক-শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে রক্ত দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু হত্যাসহ সব অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়েছে অকুতোভয় সাহস নিয়ে। রক্ত দিয়ে স্বৈরাচার হটিয়েছে।

এখনো তার লড়াই থামেনি। জাতীয় সম্পদ আর পরিবেশ, মানুষের অধিকার সবকিছুর জন্য এখনো অব্যাহত তার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আগামী ২৮-৩১ অক্টোবর তার একাদশ কংগ্রেস। যে কংগ্রেস থেকে কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ, প্রগতিশীল তারুণ্য নতুন বাংলাদেশের ঘোষণা তৈরি করবে।

বাস্তবতার নতুন এ রণক্ষেত্রে লড়াইরত যুথবদ্ধ ‘সর্বহারা’রা আগামী দিনের সাম্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, এ প্রত্যাশায় সবাইকে একাদশ কংগ্রেসের আমন্ত্রণ।

লেখক: সাংবাদিক ও সাবেক ছাত্র নেতা


সর্বশেষ

আরও খবর

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন


নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!


তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!

তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!


সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?


আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি