Thursday, August 18th, 2016
শামসুর রাহমান, কবিতার দেবতা
August 18th, 2016 at 5:43 pm
শামসুর রাহমান, কবিতার দেবতা

সাইফুল ইসলাম সৌরভ:

বিবিধ শিল্প মাধ্যমের মধ্যে বাংলায় কবিতার মতো উন্নত আর কোন মাধ্যমে হয়নি। মধুসুদনের প্রত্যাগমনী অবদান, রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরণীয় ঐশ্বর্য্য, জীবনানন্দের ঐন্দ্রজালিক শৈলী আর তিরিশের পঞ্চকবির পর সুবিশাল ক্যানভাস ধারণ করেন শামসুর রাহমান । নানান জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সপ্রতিভ শামসুর রাহমান তার বিপুল শিল্প সাধনায় আশাব্যাঞ্জক স্বর হয়ে ওঠেন।

‘কেবল কয়েক ছত্র কবিতার জন্যে
এই বৃক্ষ, জরাজীর্ণ দেয়াল এবং
বৃদ্ধের সম্মুখে নতজানু আমি থাকবো কতোকাল?’

—একটি কবিতার জন্য

কবিতার জন্য সর্বচারী হয়ে আজীবন ধ্যানমগ্ন হেঁটে যান বন্দর থেকে গ্রামে, মিছিল থেকে ঘরে। রবীন্দ্রনাথের কাব্যোক্তি ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া/ বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া’র যথাযথ রূপকার যেন তিনি। জীবনানন্দের ‘অদ্ভুত আঁধার’কে প্রত্যক্ষ করে পরবর্তী যোগ্যসূরী হয়ে সমহারে আধুনিকায়নে উত্তোরণ ঘটান বাংলা কবিতাকে। সুধীন্দ্রনাথের বাস্তব দর্শনে আলোকিত মেটালকোর কাব্যপনা, নজরুলের উচ্চকন্ঠ, বুদ্ধদেবের জটিলতার জাল উন্মোচন, বিষ্ণু দে’র সদর্প পথ চলা ও অমিয় চক্রবর্তীর শুদ্ধাচারী শুভ্রতার পর কবিতা ভুবনে স্বমহিমা উন্মোচন করেন যিনি, তিনি শামসুর রাহমান। তার সমকালে এক আল মাহমুদ ও আরেক শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সাথে তার নাম উচ্চারিত হতে পারে।

‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০) কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে অর্কেস্ট্রা বাজিয়ে বাংলা কবিতায় তার মহাপদার্পণ। আজীবন কবিতা চর্চায় ব্রত থেকে অতুল্য অবস্থানে আদিম দেবতাদের সাথে উঠে যান শামসুর রাহমান। সমগ্র পৃথিবী তার মনোলোকের বিচরণ ক্ষেত্র, তীব্র ইন্দিয়গ্রাহ্য অনুভূতি ও তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী দৃষ্টি তাকে সম্রাটের মত সর্বজ্ঞ করে তোলে । ‘আমাকে গ্রহণ করো তোমাদের নিকানো উঠোনে/ নারী আর শিশুর ছায়া আঁকা রক্তকরবীতে’ যেন তার সনির্বেদ নিবেদন। মানুষের জন্য থরো থরো আবেগ এবং মানবমুক্তির জন্য বলিষ্ঠ বাতাবরণ যেন তার আগমনীর ফুলেল বার্তা পাঠায় সুদূর ভবিষ্যৎকেও। প্রত্যেক মানুষের পূর্বসূরীর মত তার পূর্বসূরী জীবনানন্দ, বোদলেয়ার, কীটস, আঁরাগ, ফ্রস্ট । নেরুদা, এলিয়ট বা টেনেসি উইলিয়ামকে বলা যায় তার সতীর্থ। মাবিস, পিকাসো, কাত্তিনস্কি তার প্রিয় চিত্রকর। শিল্পের কাছে আজীবন বন্দী হয়ে তিনি নিরবিচ্ছিন্ন আত্মত্যাগী। বিচ্ছিন্নতা, বিষাদাক্রান্তি তাকে দিয়ে বলায়— ‘নির্জনতার কারাগারে সঁপে প্রাণ/ আত্মদানের মহৎ দুর্গ গড়ি’ (নির্জন দুর্গের গাঁথা)।

সাতচল্লিশের পর উপমহাদেশের দ্রুত পট পরিবর্তনের সময় তার কাব্য প্রতিভার উত্থান। শাসকগোষ্ঠির লোভাতুর দখলদারিত্বকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে তিনি বারবার কলম ধরেন মানবতার পক্ষে। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯’ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১’ এর মুক্তিযুদ্ধসহ স্বাধীনোত্তোর স্বৈরাচার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন কবিতায়।

‘আমাকে করেছে বাধ্য যারা
আমার জনক জননীর রক্তে পা ডুবিয়ে দ্রুত
সিড়ি ভেঙ্গে যেতে আসতে
নদীতে আর বনে বাদাড়ে শয্যা পেতে নিতে
অভিশাপ দিচ্ছি আজ সেইখানে দজ্জালদের ।’

—অভিশাপ দিচ্ছি

সমকালীন পৃথিবী ও বিশ্বমানবতার প্রতি তার অন্তরাত্মা প্রগাঢ় ভাবনার দুয়ারকে প্রসারিত করে। যখন তিনি প্রণয়ীর কাছে সঁপে দেন প্রেম, তখনও ভাবেন—

‘আমরা যখন ঘড়ির দুটো কাঁটার মতো
মিলি রাতের গভীর যামে
তখন জানি ইতিহাসের ঘুরছে কাঁটা
পড়ছে বোমা ভিয়েতনামে।’

—প্রেমের কবিতা 

এ ভূ-খন্ডের অখন্ড ইতিহাস যেন তার কবিতার পাতা। ‘রৌদ্র করোটিতে’ (১৯৬৩) কাব্যগ্রন্থে দেখা যায় ঝাঁঝালো রূঢ় পৃথিবীর প্রতিবেশ। নগরের কর্কশ বাস্তবতা তাকে বিমর্ষ করে যেমন, সৌন্দর্য অনুসন্ধানে করে সুচারু সন্ধানী। বোদলেয়ারে বিতৃষ্ণার উত্তরসূরী হয়ে ওঠেন যেন। উচ্চারণ করেন—

‘অতল গহ্বরে সেই আছে শুধু পাঁক, পুঞ্জীভূত
আবর্তিত ক্রন্ধে স্ফীত ক্রুঢ় অন্ধ পাঁক, শুধু পাঁক।
আকাঙ্ক্ষিত ফুলদল, লতাগুল্ম, পদ্মের মৃণাল
অথবা অপ্রতিরোধ্য পিচ্ছিল শৈবাল, এমনকি
গলিত শবের কীট, কৃমিপুঞ্জ-ঘৃণিত, জটিল-
কিছুই জন্মে না তাতে, মৃত্যু ছাড়া জন্মে না কিছুই।’

—খাদ

নিজের ভেতর যেন এক গভীর গর্ত। সেখানে আসে-যায় প্রাণবায়ু, তবে ভাসে না আনন্দে।

‘ভাস্করের অসম্পূর্ণ মূর্তির মতন ঘুরে ফিরি
উল্লোল নগরে কতো বিলোল উৎসবে, কিন্তু তবু
পারি না মেলাতে আপনাকে প্রমোদের মোহময়
বিচিত্র বিকট স্বর্গে।’

—প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে

বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সংযুক্ত থাকায় বৈষয়িক রচনা ও কবিতার
মাধ্যমে জনপ্রিয়তা ধরা দেয় তাকে। অনেকের মতে, মাত্রাতিরিক্ত রচনা তাকে সহজলভ্য করে তোলে। সে বিষয়েও কবির দৃষ্টি অগোচরে থাকে না।

‘বাচাল প্রিন্টিংপ্রেস সোৎসাহে দিচ্ছে জন্ম আজ
যে উচ্ছিষ্ট সভ্যতাকে আমি তার ম্লান, স্বরহীন
ক্রীড়ানক হবো শুধু?’

—অপচয়ের স্মৃতি

‘নিরালোকে দিব্যরথ’ (১৯৬৮), কাব্যগ্রন্থে ধরা পড়ে প্রেমহীনতার বেদনা। ব্যক্তির অসফল প্রণয়ে ডুব দেন কাব্যের আশ্রয়ে।

‘যেন আমি চোরাবালি, সেখানে পা দিলে
ভীষণ তলিয়ে যাবে ভেবে তুমি
স্থির ভূভাগের দিকে প্রাণপনে পালালে সুদূরে।’

—একটি প্রস্থান, তার অনুষঙ্গ

কর্মজীবনের প্রথমভাগে ১৯৫৭ তে তিনি সাংবাদিকতায় যোগ দেন। পরে ষাটের দশকে বেতারে কাজ নিলেও কবিতা রচনাই তার মূখ্য কাজে পরিণত হয়। উত্তাল সময়ের ত্রাণকর্তা রূপে আবির্ভাব হওয়াই তার একমাত্র অভিধা হয়ে ওঠে। ‘নিজবাসভূমে’ (১৯৭০) কাব্যগ্রন্থটির নাম জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’র একটা আদলে নেয়া। এ কাব্যগ্রন্থ নানান ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে রয়। অনেক ব্যক্তিত্বের স্মরণ আর শ্রদ্মার্ঘ অর্পণও দেখা যায় তাতে। ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯’, ‘পুলিশ রিপোর্ট’, ‘ফিরে যাচ্ছি’, ‘হরতাল’, ‘আসাদের শার্ট’ ইত্যাদি সমকালজয়ী কবিতা এ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। ‘গ্রন্থে আছেন শহীদুল্লাহ’, ‘কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি’, ‘ছেলেটা পাগল নাকি’, ‘রাজকাহিনী’, ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?’, ‘বর্ণ নিয়ে বিড়ম্বনা’, ‘পক্ষপাত’, ‘এ শহর’, ‘আমি কথা বলতে চাই’ এ গ্রন্থেরই কবিতা । কবিতার ভাষাশৈলী ও সপ্রতিভা এ গ্রন্থে প্রকট আকারে উদ্ভাসিত হয়। শাসনতন্ত্রের অনিয়মের প্রতি বিদ্রুপ করে বলেন ‘বোনাস ভাউচারের খেলা’। দখলদারিত্বের নাম দেন ‘গোল টেবিলের মায়া’ ও ‘সার্কাসের কসরৎ’।

‘সড়কের দুকূল-ছাপানো
লোক, শুধু লোক
লোক, আমাদের চোখের পাতায়
লোক, পাঁজরের প্রতিটি সিঁড়িতে
লোক, ধুকপুকে বুকের স্কোয়ারে
লোক’

পুলিশ রিপোর্ট

মূলত এই কবিতার নাম পুলিশ রিপোর্ট হলেও এটা কবির ব্যক্তিগত রিপোর্ট। এখানে গণমানুষের অংশগ্রহণের চিত্র ফুটে ওঠে। যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের সামগ্রিক সমাজ ও জাতীয় চিত্র তার কাব্যে বারবার প্রস্ফুটিত হয়। ‘বন্দী শিবির থেকে’ (১৯৭২), ‘দুঃসময়ের মুখোমুখী’ (১৯৭৪), ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ (১৯৭৫) এ সময়ের প্রতিনিধি। তখন তিনি গভীর জীবনবোধ ও নিঃসঙ্গতায় পতিত হন। যা বারবার তার কবিতায় ফিরে আসে। প্রীতিহীন, মৃত্যুবৎ উন্মাদ সময় ঝেঁকে বসে তার মাঝে। তবু তিনি স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন বুনতে ভোলেন না কবিতায়। নিঃসঙ্গতাকে সাথি করে, বেদনাকে পুঁজি করে তারপর আসে বহু কাব্যগ্রন্থ। ‘প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে’ (১৯৭৮), ‘ইকারুসের আকাশ’ (১৯৮২), ‘মাতাল ঋত্বিক’ (১৯৮২), ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ’ (১৯৮২) উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধপরবর্তী বিধ্বস্ততা, অনিয়ম, উশৃংখলতা এ সময় তার লেখায় ফুটে ওঠে।

‘কে নৃমুন্ডধারী অশ্ব এসে বলে
শোনো হে তোমায়
নিজের শহরে আজ আমাদের রাজ
পাকাপোক্ত হল’

—কবির অশ্রুর চেয়ে দামী

বাস্তব পরিবেশের জর্জর রূঢ়তার মাঝেও প্রেম ও সংগ্রাম হয় বেঁচে থাকার রসদ। বেঁচে থাকা বর্তায় তাকে প্রেমের উষ্ণতার পথ।

‘বুকে, নাভীমূলে, থুতনিতে
অথবা গ্রীবায় লেগে থাকে থরো থরো চুম্বনের
ম্যাজেন্টা স্বাক্ষর’

—বিন্যাসের সপক্ষে

উপমা ও অনুপ্রাসের ঝংকার পরতে পরতে মহীহান থেকে উচ্চাসনে আসীন করে তাকে ।

‘দুর্লভ মনির মতো স্তন’— (সুন্দরের গাঁথা)

‘খুপরিতে ভোর আসে
ব্যালেরিনার মতো নিপুন বিন্যাসে’— (যদি ইচ্ছে হয়)

‘তিনটি সাদা ঘোড়া
বাতাসে দ্যায় লাফ,
বাতাসে তলোয়ার, তিনটি তলোয়ার
হঠাৎ ঝলসায়’— (তিনটি সাদা ঘোড়া)

কবিতার পরতে, অনুতে মিশে যাওয়া মানুষ কবি শামসুর রাহমান। শব্দের সংস্থানে প্রকৃতি প্রদত্ত শক্তির পরিচয় পাই তার কবিতায়। প্রতিটি বিষয়ে তার অবাধ, গভীর বক্তব্য প্রমাণ করে তার অধিষ্ঠান। কখনো ঘরকুনো থেকে, কখনো রাজপথে থেকে মানুষের পক্ষে অবস্থান করে গণমানুষের মনে তার মর্যাদাকে পোক্ত করে। তাকে নিয়ে কোন পরিশিষ্ট টানা দুস্কর। তার পাহাড় প্রমাণ সৃষ্টিশীলতা, সমৃদ্ধ শিল্পের সামনে পড়লে সমুদ্র বলে ভ্রম হয়।

Saiful Islam Souravলেখক: কবি

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/তুসা


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা