Friday, September 30th, 2016
শিক্ষা, দুর্নীতি এবং পরীক্ষা 
September 30th, 2016 at 5:15 pm
শিক্ষা, দুর্নীতি এবং পরীক্ষা 

রহিম আব্দুর রহিম: শিক্ষা কোন আপেক্ষিক বিষয় নয়। শিক্ষা এমন একটি অর্জন, যা মানুষের চলনে-বলনে, আচার-আচরণে, কর্মে-ধর্মে, ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটিয়ে সামনের দিকে নিয়ে যায়। এই অর্জনের মানদণ্ড নির্ণয়ের জন্য ‘পরীক্ষা’ নামক একটি পরিমাপক থাকার অবশ্যই দরকার রয়েছে। নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ‘পরিমাপকপত্র’ টি (সার্টিফিকেট) শিক্ষার্থীদের হাতে আসবে, যা প্রদান করবেন সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। তবে শিক্ষার্থীদের অর্জন থাকবে আপেক্ষিক, যা চর্মচোক্ষে দেখা না গেলেও, কর্মে তা অবশ্যই প্রকাশ পাবে।

শিক্ষার্থীর প্রকাশ্য অর্জনের জন্য পাঠ্যসূচির বিষয়বস্তুর সাথে বাস্তবতা মিলিয়ে দিতে না পারলে, ওই শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন কোন কাজেই আসবে না। অথচ বিষয়ের সাথে বাস্তবতা মিলানোর শিক্ষা পদ্ধতি উপেক্ষা করে, ‘পরীক্ষা’ নামক যে শিক্ষা প্রতিযোগিতার ঘোড়-দৌড় শুরু হয়েছে, তা আদৌ যুক্তিযুক্ত নয়।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কোন এক শিক্ষা সংক্রান্ত সভায় স্পষ্ট করেছিলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বাস্তব শিক্ষা প্রদানে তাদেরকে কৃষিমাঠে যেতে হবে।’ আমরা চলছি উল্টো পথে। একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে শ্রেণি পরীক্ষার বৈতরণী পার হতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে হচ্ছে ১০টি। এরপর ২০০৯ সালের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পাবলিক পরীক্ষার আদলে শুরু হয়েছে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা (পিইসি)। এক বছর পর ২০১০ সালে এবতেদায়ী শিক্ষার্থীদের মাঝে এর বিস্তার ঘটেছে।

ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিন বছরে একজন শিশু শিক্ষার্থীকে অভ্যন্তরীণ ছয়টি পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। শেষে পাবলিক পরীক্ষার আদলে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট বা জুনিয়র দাখিল পরীক্ষা (জেএসসি/জেডিসি)। দুই বছরের ব্যবধানে ওই শিক্ষার্থীকে নবম ও দশম শ্রেণিতে আরো চারটি অভ্যন্তরীণ এবং একটি পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে। এটি সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষা নামে পরিচিত। অর্থাৎ প্রথম শ্র্রেণি থেকে দশম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীকে তিনটি পাবলিক পরীক্ষা, ২০টি অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা ও ৮০টি অনুশীলন বা টিউটোরিয়াল পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়।

বাংলাদেশের তথাকথিত বিখ্যাত এমনসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, টিউটোরিয়াল, অভ্যন্তরীণ মিলে বছরের ব্যবধানে ৮৪টি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এই সমস্ত পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য দিবারাত্রি, ‘শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রাইভেট শিক্ষক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকরা’ ব্যস্ত থাকেন। গুণতে হয় শ’ থেকে হাজার, হাজার থেকে লাখো টাকা। অথচ ওই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির কাদামাটি, ধুলাবালি, দুর্বাঘাস পায়ে মাড়ায়নি।

এমনও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানকার শিক্ষার্থীরা এসি কক্ষে ক্লাস করে, অনর্গল ইংরেজি বলে, ভুলেও কোনদিন গায়নি জাতীয় সঙ্গীত, উচ্চারণ করেনি শপথ বাক্য। বলতে পারে না দেশ-দশের সাধারণ খবরা খবর, জানে না ৫২ কিংবা ৭১ এর ইতিকথা। আমরাই তাদের শিক্ষিত করছি, শিক্ষিত বলছি।

সম্প্রতি বেশ কিছু শিশু শিক্ষার্থী এবং শিশু নাট্যকর্মীদের নিয়ে এক ঘন্টা ধরে আলোচনা করেছি, দুর্নীতি কি? কেন হয়? কারা করে? এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছে চেয়েছি। দীর্ঘ আলোচনার এক পর্যায়ে ওরা আমাকে জানাল, একজন শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণি থেকে শিক্ষা জীবনের শেষ প্রান্তে আসতে, তার পরিবারের কত টাকা, কোন খাতে কিভাবে ব্যয় হয়েছে। শিক্ষা শেষে তার সর্বসাকুল্যে ব্যয় কত? এবার তার কর্ম জীবনে প্রবেশ।এক্ষেত্রে তার আপেক্ষিক শিক্ষায় মূল্যবোধ থাকলেও ব্যয়ের তাড়না, তাকে দুর্নীতি করতে বাধ্য করছে। অর্থাৎ ওই শিক্ষার্থীরা বলতে চেয়েছে, সহজ এবং স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষা অর্জন করতে পারলে সমাজ, রাষ্ট্রের দুর্নীতি দুরীকরণ সম্ভব। অথচ প্রাইভেট, কোচিং, প্রতিষ্ঠানের ‘পরীক্ষা’ নামক পরিমাপ যন্ত্রের যাতনায় পিষ্ট শিক্ষার্থীদের অর্জনের খাত শুণ্য হলেও ব্যয়ের খাত ভারী।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় গুরুত্ব সহকারে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, যার শিরোনাম ছিল, ‘জেএসসি পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা’ শিরোনামের সার সংক্ষেপ, ‘গত ৩১ আগস্ট পাবলিক পরীক্ষা হিসেবে  জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট((জেএসসি) পরীক্ষা, কেনো অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। রিট আবেদনটি করেছেন, রাজধানী ভিকারুন নিসা নুন স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি ইউনুস আলী আকন্দ। রিট আবেদনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ১০ শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে। আদালত চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলেছেন।’

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে যার জবাব দিতে হবে। আবেদনে, ‘জেএসসি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মেধাশূন্য করছে বলে উল্লেখ করা হয়।’  শিক্ষার্থীরা মেধাশূন্য হচ্ছে কি না, তা দিব্বি করে বলা যাচ্ছে না। তবে শিক্ষা অর্জনের আনন্দঘন সময়, পরিবেশ, সমসাময়িক অর্থের যোগান এবং শিশু শিক্ষার্থীদের মনজাগতিক বিষয়ে ব্যাপক চাপের সৃষ্টি হচ্ছে এটা দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করা যায়। মহামান্য আদালত কি সিদ্ধান্ত দেবেন, তা বিচারিক বিষয়।

তবে ১৯৬১ সালের শিক্ষা অধ্যাদেশ অনুযায়ী, পাবলিক পরীক্ষা বলতে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) এবং উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) এবং সমমানের পরীক্ষা সমূহকে বোঝায়। ওই অধ্যাদেশে (পিইসি) প্রাথমিক সমাপনী এবং (জেএসসি/জেডিসি) জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট বলে কিছু নেই। কিন্তু বর্তমানে যা হচ্ছে তা পাবলিক পরীক্ষার আদলে হচ্ছে।

বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী ক্ষুধামুক্ত জাতিগঠনে শিক্ষা খাতের গুরুত্ব এবং অগ্রাধিকার অনুধাবন করে সামনের দিকে এগুচ্ছেন।তার সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু বহুজাতিক পাণ্ডিত্য, বুদ্ধিজীবী এবং শিক্ষাবিদদের নানাবিধ চিন্তা-চেতনার হ-য-ব-র-ল অবস্থায় পড়ে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ‘ভয়ঙ্কর’ একটি সময় পার করছে। আন্তর্জাতিক মানদন্ডে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আনা যায় কি না? কিংবা আনতে হলে সময়োপযোগী কি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে?  এসব চিন্তাভাবনা করে দ্রুত সময়ের মধ্যে গবেষণালব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে শিক্ষা সংস্কারে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন- এমনটি কামনা করছি। তবে শিশু শিক্ষার্থীদের ঘন-ঘন পরীক্ষার মুখোমুখি করা কখনো মেধা বিকাশে সহায়ক হতে পারে না। বরং শিশুদের মেধা বিকাশে অন্যতম অন্তরায় ঘন-ঘন পরীক্ষা, যা বর্জন করা এখন সময়ে দাবি। শিশুদের প্রতিবছর একটি অভ্যন্তরীণ, পাঁচ বছর পর একটি পাবলিক পরীক্ষাই যথেষ্ট। ঘন ঘন পরীক্ষা আদৌ শিক্ষার্থী মূল্যায়নের পন্থা হতে পারে না। শিক্ষা, ক্রীড়া,সংস্কৃতি, আচার-আচরণ এবং সামাজিকতার ইতিবাচক পরিমাপই একজন শিশু শিক্ষার্থীর (প্রথম থেকে দশম শ্র্রেণি) মূল্যায়ন প্রক্রিয়া হওয়া উচিৎ। যা আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বা পদ্ধতি কিংবা কৌশল থেকে তিরোহিত।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

 


সর্বশেষ

আরও খবর

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন


নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!


তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!

তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!


সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?


আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি