Sunday, September 11th, 2016
শৈশব-গরুরহাট, আত্মহত্যা-জঙ্গীবাদ
September 11th, 2016 at 11:11 pm
শৈশব-গরুরহাট, আত্মহত্যা-জঙ্গীবাদ

রহিম আব্দুর রহিম: সম্প্রতি সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি পত্র পাঠানো হয়েছিল বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, যে পত্রে উল্লেখ ছিল, ‘শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করণ, শিক্ষার মান-উন্নয়ন এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ বিরোধী প্রচারণায় অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সমাজের সুধিজনদের নিয়ে একটি সমাবেশ করার।’ যে সমাবেশটি একযোগে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ওই পত্রে ক্রীড়া ও সাংষ্কৃতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করার তাগিদও দেয়া হয়েছে। এই পত্রটি প্রতিষ্ঠানে আসার পর, শিক্ষকদের মাঝে পুরাতন ভাবনায় নতুনত্ব যোগ হয়েছে; চিন্তা-চেতনায়, আলোচনায় আসছে ‘শৈশব কি, কেমন হওয়া দরকার, কেমন আছে? আইনুন নিশাত খান হিমু, কোন এক সরকারি কলেজের অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় দল বেঁধে মজা করেছি, দৌড়-ঝাঁপ, খেলাধুলা, একসাথে চলাফেরা সে কি আনন্দ! আজও সেদিনের উল্লাস, বন্ধুদের হাসি-কান্না, আবেগ-অনুরাগ, নিগুড় ভালোবাসার কথা মনে পড়ে।

আর এখনকার শিশু-কিশোররা শিক্ষা নামের আজব খাঁচায় বন্দি।’ কোন এক সরকারি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম (বিসিএস-শিক্ষা) বলেন, ‘শৈশবের শিক্ষা জীবন মনে পড়লে আবেগ ধরে রাখতে পারি না, স্কুল মানেই স্বর্গীয় আনন্দের ছোঁয়া, দলবেঁধে পথ চলা, ক্লাসের ফাঁকে দুষ্টুমি, স্যারদের আদর-সোহাগ, শাসন-পঠন, খেলাধুলা, মঞ্চ নাটক সেকি অনুভূতি! এখনকার শিশু-কিশোররা, শিক্ষা নামক প্রতিযোগিতার ঘোড়-দৌড়ে ক্লান্ত নিথর।’

অর্থাৎ তারা বোঝাতে চেয়েছেন, আমরা শিক্ষক অভিভাবক, সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলরা যদি যৌথ প্রচেষ্টায় শিশু-কিশোরদের শৈশব নিশ্চিত করতে পারি, তবে সমাজ রাষ্ট্রের যথেষ্ট দুষ্টক্ষত দূর করা সম্ভব। সরকারের প্রেরিত পত্রটি ‘মৌসুমী’ কোন পত্র বা প্রজ্ঞাপন হিসেবে নয়, এই নির্দেশনার স্থায়ী এবং দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা’র বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবী। আমরা জানি, রাষ্ট্র এবং জীববিজ্ঞানের জনক, বিশিষ্ট্য দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘তুমি যদি মাসব্যাপী ফল ভোগ করতে চাও, তবে ফসলের চাষ কর, যদি বছরব্যাপী ফল ভোগ করতে চাও, তবে বৃক্ষরোপণ কর, আর যদি শতাব্দী ব্যাপী ফল ভোগ করতে চাও তবে মানবের চাষ কর।’ অর্থাৎ এই মানব চাষারাই হলেন শিক্ষক সমাজ। চাষক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আদর্শ একজন শিক্ষক জাতির শতাব্দীব্যাপী ফল ভোগের চাষাবাদ করতে, তিনি যেমন সুস্থ থাকবেন মানসিক এবং শারিরীকভাবে, তেমনি তিনি উৎপাদন করবেন সুস্থ মন এবং মানের শিক্ষার্থী। যা গঠন করতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিককালের এই গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটির সফল বাস্তবায়ন।

সম্প্রতি বহুল প্রচারিত একটি জাতীয় অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘স্কুল মাঠে গরুর হাট।’ রংপুর বিভাগের ঠাকুরগাঁও থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সংবাদ শিরোনাম ছিল, ‘স্কুল মাঠে গরু-ছাগলের হাট, পাঠদান ব্যাহত।’ শিরোনাম দু’টির প্রথমটির নিউজ বর্ডির সার-সংক্ষেপ; ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলার পুর্বধলা উপজেলা খলিশাপুর স্কুল এন্ড কলেজ, পুটিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ইচুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাপাসিয়া দাখিল মাদ্রাসা, হিরনপুর উচ্চ বিদ্যালয়, আগিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, জালশোকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নিয়মিত পশুরহাট বসানো হচ্ছে।

দ্বিতীয় শিরোনামটির সার সংক্ষেপ; ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার কাতিহার দবিরউদ্দিন চৌধুরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় বন্ধ রেখে সপ্তাহের প্রতি শনিবার মাঠজুড়ে বিশাল গরু ছাগলের হাট বসানো হয়। স্কুলের অফিসকক্ষটি ইজারাদাররা ‘ইজারা অফিস’ হিসেবে ব্যবহার করে। প্রকাশিত সংবাদ দুটির বাইরে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানের মাঠে চড়ানো হয় গরু-ছাগল, মাড়ানো হয় ধান-গম, শুকানো হয় খড়-গোবর, আবার মৌসুমী ফসল সংরক্ষণে মাঠ ভাড়া দেওয়ার নজিরও রয়েছে। এত গেল গ্রাম অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা, দেশের বিভিন্ন শহরের নামি দামি অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে খেলার মাঠ নেই। বিশাল দালানের ইট পাথরের চোরাগলিতে চলছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

এরপরও দেয়া হয়েছে পাঠদানের অনুমতি, আজব শিক্ষাঙ্গণ! বর্তমান সরকার যেখানে শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়ন, শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে স্কুল মাঠে গরু ছাগলের হাট কিংবা খেলার মাঠ নেই, তবু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের ভুতুড়ে পরিবেশ আদৌ যুক্তিযুক্ত বা গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করণে প্রতিষ্ঠান অঙ্গন শিক্ষা বান্ধব হওয়া অত্যন্ত আবশ্যক। বর্তমান সরকারের ২০১০ খ্রিস্টাব্দের শিক্ষানীতি এবং ২০১২ খ্রিস্টাব্দের জাতীয় শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষার পরিবেশ সুনিশ্চিত করতেই হবে। অন্যথায় বিষয়টি ‘ছাগল দিয়ে হাল চাষে’র নামান্তর হবে বলে অনেকেই মনে করেন। এক্ষেত্রে সরকারের আইনী পদক্ষেপ জরুরী হয়ে পড়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা আইনের একটি খসড়া চুড়ান্ত করেছেন, যা আগামী সংসদে পাশ করানো হবে বলে শিক্ষক সমাজ জানতে পেরেছেন।

এই আইনে সরকারি এবং বে-সরকারি বলে কিছু শব্দ রয়েছে, যা বর্তমান সরকার বিলুপ্ত করে বৈষম্য দূর করে এমন একটি আইন পাশ করবেন, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থীর মান-মর্যাদা, বেতন-ভাতা, সম্মানী যাই হোক না কেন? ‘আইন সবার জন্য সমান’ এই নীতি বলবৎ থাকবে এবং তা পাশ হয়ে গোটা জাতির শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। অন্যথায় সময়ে ব্যবধানে শুধু সরকার নয়, গোটা জাতি বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য।

গত ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘দেশে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে, আত্মহত্যায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম, যা ২০১১ সালে ছিল ৩৮ তম।’ শিরোনামের সার সংক্ষেপ; দেশে ক্রমাগত বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা এর মধ্যে তরুণদের সংখ্যা বেশি। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী গত ছয় বছরে দেশে ৫৯ হাজার ৭শত ৬০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী আত্মহত্যায় বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম, যা ২০১১ সালে ছিল ৩৮ তম। বিশেষজ্ঞরা আত্মহত্যার কারণ হিসেবে যে সমস্ত সূচক দাঁড় করিয়েছেন, এর মধ্যে দারিদ্রতা, পারিবারিক অশান্তি, সহনশীলতার অভাব, সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতা।

প্রতিবেদক এক পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে বলেছেন, ‘২০১৪ সালে সারা দেশে যেখানে আত্মহত্যা করেছে ১২ হাজার জন, সেখানে ২০১৫ সালে সেই সংখ্যা এসে দাঁড়ায়  ১৪ হাজার জনে; আর ২০১৬ সালের প্রথম মাসেই এর সংখ্যা আড়াই হাজার। এর মধ্যে তরুণ ও কিশোর বয়সীদের এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আত্মহত্যা প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হিসেবে, সমাজ বিজ্ঞানীরা মতামত দিয়েছেন, ‘বর্তমানে কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এক ধরণের বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হচ্ছে। এর জন্য দায়ী পারিবারিক কলহ, অতিরিক্ত ভোগ বিলাসের মানসিকতা এবং সামাজিক বন্ধনগুলো শিথিল হয়ে যাওয়া।

লেখাটির বিশ্লেষণ পর্বে বলা যায়, কারা আত্মহত্যা করছে? কারা সন্ত্রাসী বা জঙ্গীবাদের মত জঘন্ন কাজে সম্পৃক্ত হচ্ছে? এ ধরনের বিকৃত কাজের বিপরীতে কি ধরণের কর্মকান্ড সচল রাখা প্রয়োজন? অধ্যাপক আইনুন নিশাত খান হিমুর শৈশব স্মৃতি আর এ কালের শৈশবের বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, শৈশবের আড্ডা, খেলাধুলা, মানবিক মুল্যবোধ সু-দৃঢ় করে। এখনকার শিশু-কিশোর, তরুণরা তাদের শৈশব থেকে বিচ্যুত হওয়ায় তারা বিকৃত রুচির কর্মকাণ্ড এবং নানাবিধ জীবন ধ্বংসী কাজে জড়িয়ে পড়ছে। আত্মহত্যা কিংবা জঙ্গীবাদের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। দু’টো অপকর্মই অসুস্থ চিন্তা-চেতনা এবং বিকৃত মানসিকতার ফলাফল।

মো. রফিকুল ইসলামের সেদিনের ছাত্রজীবন, আর আজকের ছাত্র জীবন পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, অতিরিক্ত পড়ালেখার চাপ শিক্ষা প্রতিযোগিতার ঘোড়-দৌড় একজন কোমলমতি শিশু কিশোরেদের চিন্তা চেতনায় স্থিতিশীলতার ব্যাঘাত ঘটায়, তারা বিপদগামী, পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ছে। যা সামাল দিতে আনন্দঘন পরিবার, সমাজ ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিশু কিশোরদের মাঝে শৈশব ফিরিয়ে দেওয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আত্মহত্যা বা জঙ্গীবাদের মত বিকৃত কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণ যদি, ‘সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতা অথবা বিচ্ছিন্নতাবোধ হয়ে থাকে; তবে তার সমাধানে ক্রীড়া ও সাংষ্কৃতিক বিনোদনের বিকল্প নেই। মানুষে মানুষে প্রীতি, সামাজিকবন্ধন, দেশপ্রেমিক জাতি গঠনে খেলার মাঠ, নাড়ীপোতা সাংষ্কৃতিক পরিবেশ, আনন্দঘন শিক্ষাঙ্গন, বাবা-মা সন্তানের মধ্যে নিয়মিত সু-সম্পর্ক ও যোগাযোগ, ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে অটুট বন্ধন স্থায়ী করণ এবং শিশু-কিশোরদের শৈশব নিশ্চিত করতে; ব্যক্তি-পরিবার, শিক্ষক-অভিভাবক এবং রাষ্ট্রীয় সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবী। আমরা এমনটাই চাচ্ছি।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট


সর্বশেষ

আরও খবর

রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!

রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!


গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা

গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা


ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!

ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!


সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত  বন্ধুত্ব

সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত বন্ধুত্ব


প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ

প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ


ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান

ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান


কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ

কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ


করোনাকালের খোলা চিঠি

করোনাকালের খোলা চিঠি


সিগেরেট স্মৃতি!

সিগেরেট স্মৃতি!


পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট

পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট