Tuesday, December 20th, 2016
শ্রমিক অসন্তোষে ফের উত্তাল পোশাক খাত
December 20th, 2016 at 7:57 pm
শ্রমিক অসন্তোষে ফের উত্তাল পোশাক খাত

রিজাউল করিম, ঢাকা: ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো, শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, ছুটিকালীন বেতন বহাল রাখাসহ নানাবিধ দাবিতে আবারো ফুঁসে উঠেছে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক। অসন্তোষের জেরে একের পর এক চলছে তাদের আন্দোলন। কর্মবিরতি থেকে শুরু করে রাস্তা অবরোধ ও কারখানা ভাঙচুরের মতো বিক্ষোভও করছে শ্রমিকরা।

পরিস্থিতি শামালে এরই মধ্যে ১০টি কারখানা বন্ধও করে দেয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি অদৃশ্য ইন্ধন বলে চালিয়ে দেয়া হলেও স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেন না মালিক পক্ষ। মালিকদের আশঙ্কা ক্রমবর্ধমান আন্দোলনে নতুন এক সংকটের দিকে যাচ্ছে পোশাক খাত।

জানা গেছে, সর্বনিম্ন মজুরি ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে অষ্টম দিনের মতো চলছে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক বিক্ষোভ। মঙ্গলবার সকাল থেকে বিক্ষোভ শুরু করেছেন শ্রমিকদের একাংশ। পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকালে প্রতিদিনের মতো কারখানায় প্রবেশ করেন শ্রমিকরা। তবে কাজে যোগ না দিয়ে কর্মবিরতি পালন করতে শুরু করেন। এ সময় কারখানার মালিকপক্ষের লোকেরা শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে সমঝোতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তবে এরপরেও শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে কারখানা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামেন তারা।

শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে ১০টি কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা। এ বিষয়ে সাভার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান ফিরোজ বলেন, ‘পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে। কোথাও কোনো ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটেনি।’

আশুলিয়া থানা সংলগ্ন একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক আয়শা বলেন, ‘কারখানায় ছুটি দিলো, তাই চলে যাচ্ছি।’ সুজন নামে অপর এক শ্রমিক বলেন, ‘মালিকপক্ষ যে মজুরি দেয় তা দিয়ে চলা যায় না। বেতন বাড়লে কামে যামু নইলে আন্দোলন চলবে।’

পোশাক খাতে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া এ শ্রমিক আন্দোলন পোশাক খাতকে নতুন সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সেন্টার অব এক্সিলেন্স ফর বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রির (সিইবিএআই) প্রধান নির্বাহী এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম। সোমবার রাজধানীর গুলশানে লেকশোর হোটেলে ‘তৈরি পোশাকের রপ্তানি ৫০ বিলিয়নে নিয়ে যেতে সিইবিএআইয়ের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ অভিযোগ করেন।

আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আমাদের পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। আমাদের প্রত্যেকটি ফ্যাক্টরিকে গ্রিন ফ্যাক্টরি করা হচ্ছে। কিন্তু এ সময়ে শ্রমিক আন্দোলন পোশাক খাতকে নতুন সংকটে ফেলবে। বায়াররা এখন বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতের উত্তর প্রদেশে যাওয়ার কথা ভাবছে। সব কারখানাতেই শ্রমিক নেতা আছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে আমরা এগুলো সমাধান করতে পারি। তবে কাজ বন্ধ করা কোনো সমাধান হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো, পোশাক কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা, কর্মপরিবেশ উন্নত ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাসহ ২০২১ সালের মধ্যে তৈরি পোশাকের রপ্তানি ৫০ বিলিয়নে নিয়ে যেতে পাঁচটি বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে আমাদের। এগুলো হলো- পোর্ট (বন্দর), পপুলেশন (জনসংখ্যা বা শ্রমিক), পাওয়ার (শক্তি), প্লেস (জায়গা) এবং পলিটিক্স (রাজনীতি)। এখন যদি শ্রমিক অসন্তোষ জোরালো হয়, তবে আমাদের সব লক্ষ্য পূরণ হবে না।’

এদিকে শ্রমিকদের এ আন্দোলনে কোনো একটি চক্র পোশাক খাতে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। তবে ‘পেছনের রাস্তা’ দিয়ে কেউ কিছু করার চেষ্টা করলে বরদাস্ত করা হবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন তিনি। মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।

এ সময় শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো ষড়যন্ত্রে কান দেবেন না। এই মুহূর্তে কাজে যোগ দিন, অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, তারা কোনো কারণ বলতে পারেনি। তবে শ্রমিকরা লিখিত দাবি দাওয়া জানালে তা বিবেচনায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জানা যায়, পরিস্থিতি শামালে গত সোমবার আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু।

বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাভারের সংসদ সদস্য ডা. এনাম আহমেদ, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ, এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহ সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, সাবেক সভাপতি এ কে আযাদ, বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান এবং সংগঠনটির সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম।

বৈঠক শেষে সব শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম সুজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নিলাম। আমরা আগামীকাল (মঙ্গলবার) থেকে কাজে যোগ দিবো। কাল থেকে আশুলিয়ায় কোনো কারখানা বন্ধ থাকবে না।’ তবে মঙ্গলবারও আশুলিয়ায় বিক্ষোভ করেছেন আশুলিয়া শ্রমিকরা। একপর্যায়ে প্রায় শতাধিক কারখানা থেকে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। এ সময় টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

জানা যায়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও বাসাভাড়া বাড়ার কারণে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো, নানা অজুহাতে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, কোনো কারণে ছাঁটাই হলে নিয়ম অনুযায়ী প্রাপ্য পরিশোধ এবং ছুটিকালীন বেতন বহাল রাখার দাবিতে সোমবার থেকে আন্দোলন শুরু করেন ওই এলাকার তৈরি পোশাক শ্রমিকেরা। শুরুতে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার উইন্ডি গ্রুপের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে ওই এলাকার আরো কয়েকটি গার্মেন্টের শ্রমিকরা একই দাবিতে আন্দোলনে যোগ দেন। সবশেষ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে রোববার ১২টি কারখানার পোশাক শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আন্দোলনকারী জানান, ডিরোজ, পাইওনিয়ার, ওয়াশিং ডিজাইন, পলমল গ্রুপ, আইডিয়াজ, সাফা নিট, ডংজিয়ান, এনভয়সহ কমপক্ষে ১০টি কারখানার কাজ বন্ধ রয়েছে। সেতারা গ্রুপ, বান্দো ডিজাইন, স্টার লিংক ক্রিয়েশন কারখানায় কাজ বন্ধ রেখে ভেতরে অবস্থান করছেন শ্রমিকরা।

শ্রমিকদের মতে, ২০১৩ সালের সর্বশেষ মজুরি বোর্ডের বেতন অনুসারে তারা পান পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা। কিন্তু এ বেতনে তাদের সংসার চলে না। তাই ন্যূনতম  মজুরি পাঁচ হাজারের বদলে ১৫ হাজার টাকা করার দাবি জানান তারা। তাদের অভিযোগ, তারা নিয়ম অনুসারে গ্র্যাচুইটি পান না। প্রয়োজনে ছুটিও মেলে না। যদিও মেলে তাতে বেতন দেয়া হয় না।

ছবি: ফাইল ফটো

এছাড়া কথায় কথায় ছাঁটাই হলেও মিলে না নিয়ম অনুযায়ী ছাঁটাইয়ের প্রাপ্য। এছাড়া মালিকপক্ষ প্রায়ই তাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করে বলেও অভিযোগ করেন তারা। আশুলিয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহসিনুল কাদির শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

২০১৩ সালের এক ডিসেম্বর তৈরি পোশাকশিল্পে ন্যূনতম মজুরি পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা কার্যকর হয়। তার আগে ন্যূনতম মজুরি ছিল তিন হাজার টাকা। শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতিটি শিল্পের জন্য পাঁচ বছর পরপর ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠিত হবে। তবে সরকার চাইলে যেকোনো সময় মজুরি কাঠামো সংশোধন ও পরিবর্তনে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

তবে বিষয়টির সমাধানে আশার বাণী শুনিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। সোমবার রাতে রাজধানীর মিন্টু রোডে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের বাসায় আশুলিয়ায় আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি তিনি বলেন, ‘আগামী তিন বছর আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের বাড়িভাড়া বাড়ালে সেই মালিকের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবে।’

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকার শ্রমিকবান্ধব সরকার। তিনি শ্রমিকদের বেতন এক হাজার ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ হাজার করেছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম না বাড়লেও বাংলাদেশের গার্মেন্ট মালিকরা তাদের শ্রকিকদের বেতন বাড়িয়েছেন। তবে হ্যাঁ সবেচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কথায় কথায় বাড়িভাড়া বাড়ানো। শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী আগামী তিন বছর আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের বাড়ি ভাড়া না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এরপরেও যদি কেউ ভাড়া বাড়ায় তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সম্পাদনা: সজিব ঘোষ


সর্বশেষ

আরও খবর

একদিনেই সড়কে ঝড়ল ১৯ প্রাণ

একদিনেই সড়কে ঝড়ল ১৯ প্রাণ


শাহবাগে মশাল মিছিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আটক ৩

শাহবাগে মশাল মিছিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আটক ৩


গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক মারা যাওয়ার ৬০ ঘন্টা পরে পরিবারের মামলা

গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক মারা যাওয়ার ৬০ ঘন্টা পরে পরিবারের মামলা


করোনায় ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩২৭

করোনায় ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩২৭


নামাজ পড়ানোর সময় সিজদারত অবস্থায় ইমামের মৃত্যু

নামাজ পড়ানোর সময় সিজদারত অবস্থায় ইমামের মৃত্যু


ভাষার বৈচিত্র্য ধরে রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ভাষার বৈচিত্র্য ধরে রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর


করোনায় আরও জনের ১৫ মৃত্যু, শনাক্ত ৩৯১

করোনায় আরও জনের ১৫ মৃত্যু, শনাক্ত ৩৯১


৩ কোটি ২০ লাখ রুপিতে কেকেআরে সাকিব

৩ কোটি ২০ লাখ রুপিতে কেকেআরে সাকিব


খাদ্যে ভেজাল রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

খাদ্যে ভেজাল রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর


করোনায় আরও ১৩ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩৯৬

করোনায় আরও ১৩ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩৯৬