Monday, August 29th, 2016
সংকট
August 29th, 2016 at 12:58 am
সংকট

সানাউল কবির সিদ্দিকী :

মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে অন্যতম কারন হলো হাতে টাকা-পয়সা না থাকা। শুন্য পকেটে বাইরে বের হলে চেনা রাস্তাগুলোও কেমন অচেনা লাগে। আত্মবিশ্বাস কমে যায়। চারপাশের মানুষগুলোও পাল্টে যায়। সবাই কিভাবে যেন বুঝে ফেলে― এই মানুষটার কাছে টাকা নেই। মনে হয়, দিন দুপুরেও কপালে এলইডি সাইন জ্বলজ্বল করে, তাতে লেখা থাকে― ‘আমার কাছে টাকা নেই!’ তাই টং দোকানে চা-সিগারেট আড্ডার ক্ষুদ্র অভিলাষও জ্যান্ত পুঁতে ফেলতে হয় এ সময়।

পকেটে টাকাশূণ্যতা অনেকটা দেহে রক্তশূন্যতার মতই প্রভাব ফেলে। নানান মানসিক চাপে শরীর ভেঙ্গে পড়ে। দেহকে তরতাজা করে তুলতে হলে আরো টাকা প্রয়োজন হয়― ডাক্তার, প্রেস্ক্রিপশান, ওষুধ, পথ্য, সেবিকা ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই ‘ফাঁকা অ্যাকাউন্ট’ নিয়ে একা থাকাই ভালো।

কিন্তু ঘরে বসে থাকলে তো টাকা নিজ পায়ে হেঁটে হেঁটে দেখা করতে চলে আসে না। বাইরে বেড়িয়ে তাকে তোয়াজ করে ঘরে নিয়ে আসতে হয়― লোকাল বাসে ধাক্কা খেতে হয়, ভীড় ঠেলে ঠেলে নিজের জন্য জায়গা করে নিতে হয়, কন্ডাক্টারের সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করতে হয়, ফুটপাথে পদপিষ্ট হতে হয়।

‘মন খারাপ নাকি, ভাই?’

হাবিব ভাই অনেকক্ষণ ধরেই ঘ্যানঘ্যান করছে।

আমার ভুরু কুঁচকে আছে। দাতের দু’পাটি শক্ত হয়ে একটু পর পর লেগে যাচ্ছে। নাক ফুলে উঠছে, নিয়মিত বিরতি দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছি। মাথা-কপাল-ঘাড়ে অসহ্য ব্যথা অনুভব করছি। হাবীব ভাই এতক্ষণ কি বলেছে, কিছুই শুনিনি; শুধু তার ঠোঁট নড়তে দেখেছি। কোন শব্দ যে কানে যায়নি, তা নয়; কিন্তু শব্দগুলো কান হয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছে কোন অর্থপূর্ণতা সৃষ্টি করতে পারেনি। নিজের অন্যমনস্কতা ও অপারগতা ঢাকতে আমি সিগারেটে কষে একটা টান দিলাম। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললাম―

‘দেখেন ভাই, আমার উপরের ঠোঁটটা ঠিক মাঝখানে ফেটে গেছে। হাসতেও পারছিনা, কথাও বলতে পারছি না। মন-টন খারাপ না, তবে মেজাজটাও ভালো না।’

বহুক্ষণ চুপ থাকার পর, একদমে কথাগুলো বলে শেষ করলাম। আর্থিক অনটন যে মুখেও তালা লাগিয়ে দেয়, তা জানা ছিল। তবে আমার অল্প কথায় এবারে কাজ হয়ে গেলো। হাবিব ভাই চুপ মেরে গেছে। প্যাকেট থেকে কৌটায় চা পাতা ঢালছে।

হাবিব ভাই বেশী বকলেও মানুষটা ভালো। অল্প যে ক’জন কাস্টমার তার দোকান থেকে বাকীতে চা-সিগারেট নিতে পারে, তাদের মধ্যে আমি একজন। বহু কষ্টের রাত পার করেছি আমি এই দোকানের বনরুটি কলা খেয়ে।

‘নেন ভাই, এইটা ঠোঁটে মাখেন।’

হাবিব ভাই একটা পেট্রোলিয়াম জেলীর কৌটা এগিয়ে দেয়। গতরাতে টাকা ছিলো, ভেবেছিলাম একটা ভালো কোল্ড ক্রিম কিনবো। এ বছর ঠান্ডাও বেশী পড়েছে, চামড়ার অবস্থাও ভালো না। কিন্তু নানাবিধ দেনা শোধ করার পর আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, আধপেটা শরীরে চামড়ার যত্ন নেয়া আমার জন্য বিলাসিতা। তাই আর কোল্ড ক্রীম কেনা হয়নি। আচ্ছা, এই লোকটা কি কোনভাবে বুঝে ফেলেছে আমার গুপ্ত বাসনার কথা? আমার অভাবের কথা? সে কি আমার সাথে মশকরা করছে? আমাকে দেখে কি এতটাই দুস্থ লাগছে?

সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে বুঝলাম ওতে আর তামাক নেই। ফিল্টার পুড়ছে। ফেলে দিলাম। বললাম― ‘আমি ওসব মাখি না। গন্ধ সহ্য হয় না। ঠোঁটে মেখে রাখলে গলায় চলে যায়, অসহ্য লাগে।

কথাগুলো আমার কাছেই কেমন যেন কাটকাট শোনালো।

চায়ের কাপের তলানী ঘুঁটে এক চুমুকে সবটা গিলে নিলাম। তলানীতে যে চিনিটুকু থাকে, ওটা আমার দরকার। এখন অভাবের দিন। আমি চায়ের কাপটা দোকানের ট্রে-তে রেখে হাঁটা দেই। আচ্ছা, বিলের জন্য কি হাবীব ভাই পেছন থেকে ডাক দেবে? যদি না ডাকে, তাহলে আবার পেছন ফিরে একটা সিগারেট নিতে হবে। মুখটা মিষ্টি-মিষ্টি হয়ে আছে, সিগারেটের ধোঁয়া জিহ্বায় একটা তেঁতো স্বাদ আনবে। মুখের রুচির সাথে সাথে ক্ষুধাও কমবে কিছুটা।

হাবীব ভাই ডাক দিলো না। তাই পেছনে ফিরে আবার একটা সিগারেট চাইলাম।

কোনটা দিমু, ভাই?

আমি একটা সস্তা সিগারেটের প্যাকেট দেখিয়ে দিই আঙুলের ইশারায়। মুখ দিয়ে নাম উচ্চারন করতে সংকোচ হয়। তাছাড়াও, যেকোন রকম কথাবার্তা এড়িয়ে চলাই ভালো। হাবীব ভাইয়ের মুখটা খুব গোমড়া দেখাচ্ছে। আমার ব্যবহার বা কথায় আঘাত পেয়েছে হয়তো। ওনার ব্যাপারটাও বুঝি, এমন একটা দোকানে দেড়-দু’হাজার টাকা বাকী বিক্রি করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যায় না। এই শহরে কার না অভাব আছে? তার উপর আমার রুক্ষ আচরণ; শ্রেণী বৈষম্যের হতাশা গোটা শহরটাকেই পেয়ে বসেছে।

হাবীব ভাই আমাকে সবচেয়ে দামী সিগারেটটাই দিলো। অপমান করলো কিনা বুঝলাম না। সিগারেট ধরিয়ে হাঁটা ধরলাম। কিন্তু ভিতরের ভয়টাই এবার সত্যি হয়ে উঠলো। হাবীব ভাই শেষবেলা ডাক দিয়েই বসলেন―

‘ভাই, তাইলে…’

‘হিসেব করে রাখেন, কালকে দিয়ে দিবো।’

আমি কথা শেষ হতে দিলাম না। চলন্ত অবস্থায় মুখ ঘুরিয়ে হড়বড় করে আউরে গেলাম― মুখস্থ বুলি।

‘কই যান, ভাই? শুনেন!’

ভালো বিপদে পড়া গেলো। কড়া কিছু কথাবার্তা শোনার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আমি আবার বেঞ্চে বসলাম। হাবীব ভাইয়ের মুখটা এবার আরো বিষন্ন লাগছে। ওখানে ক্ষোভ নেই, তবে লুকোনো অভিমান আছে।

― ভাই, আমি কি কখনো বিপদ-আপদ ছাড়া আপনার কাছে টাকা চাইছি?
― না।
― চাইলেও ধার চাইছি, বাকীর টাকা কখনোই চাই নাই। আপনার কাছে টাকা থাকলে তো আপনি পকেটে লুকায় রাখবেন না, আমাকেই দিবেন। এইটা আমি জানি।

লজ্জায় মাথাটা বাস্তবিকই নিচু হয়ে গেলো। গতরাতে ঠিক এই কাজটাই আমি করেছি, পকেটে টাকা লুকিয়ে রেখেছি। অনেক অবান্তর খরচ করেছি। ওনার ন্যায্য পাওনা শোধ করিনি।

আমি হঠাৎ নম্র হয়ে গেলাম― যে মোটা চামড়ায় সুঁই ফোটে না, তাতে কথাটা ঠিকই ফুটে গেলো। একটু চুপ থেকে হাবীব ভাই আবার বললেন,

― আপনার সময় থাকলে একটু কথা বলতাম।
― সময় আছে, আপনি বলেন।
― আপনার তো আজকে কোন কাজ নাই, আছে কি?

সাধারনত একজন বেকারের হাতে কোন কাজ থাকে না, তাদের কাজ ‘পড়ে যায়’। তারপরও আমি ভাবতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলাম।

― না, নেই।
― হ্যাঁ, গতকালকে বলছিলেন। তাইলে রাত্রে তো অবশ্যই আসতেছেন?

আমি কিছু না বুঝেই মাথা নাড়লাম। হাবীব ভাই কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। হালকা গলায় বললেন, ‘আটটার আগেই আইসেন। আপনে তো বলছিলেন সারাদিনই থাকবেন, তদারকি করবেন। আর গিফটের টেবিলে আপনে ছাড়া তো কাউরে বসানো যাইবো না― সব শালা অশিক্ষিৎ আর চোর।’

রাতে উপস্থিত থাকবো জানিয়ে আমি তাড়াহুড়ো করে চলে আসি। হাবীব ভাইয়ের ছেলের খৎনা উপলক্ষে আজ তাদের বস্তিতে ‘ডাল-ভাত’ এর আয়োজন; আমি যে ভুলে গেছিলাম, এটা বুঝতে দেয়া যাবে না কোনভাবেই।

হাবীব ভাইয়ের ছেলের নামটাও ভুলে গেছি। সন্ধ্যার পর দোকানে বসে প্রায়ই। খুব মিষ্টি ছেলেটা, হাবীব ভাইয়ের একমাত্র সন্তান। ক্লাস থ্রিতে পড়ে, এটা মনে আছে। ওকে কিছু একটা উপহার দিতে হবে। গল্পের বই বা ফুটবল টাইপ কিছু। অথবা কিছু টাকা হাতে তুলে দিতে পারলেও উপকার হতো― এত মানুষের জন্য নৈশভোজের আয়োজন― বেশ ব্যয়বহুল।

আজ কারো কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করতে হবে। আমার জন্য খালি হাতে ওখানে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব। কিন্তু কার কাছে ধার চাইবো?

হাঁটতে হাঁটতে আমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি। ‘মুসলমানি’ নামক প্রথার অপ্রয়োজনীয়তা বা ভিত্তিভীনতা নিয়ে অজস্র্য যুক্তি দাঁড় করাই মনে মনে। শেষে, কোন কাজের উছিলায় গা ঢাকা দিয়ে থাকার ব্যাক-আপ প্ল্যান করি। হাবীব ভাই কিছু মনে করলে করবে। দুইদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে। বহমান সময়ের সাথে সাথে মানুষ সব ভুলে যায়।

নিজের দুর্বল স্মরণশক্তি ও ভঙ্গুর মনসংযোগ ক্ষমতার জন্য টাকাশুন্যতাকে দোষারোপ করে আমি মেসে ফিরে যাই।

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/তুসা


সর্বশেষ

আরও খবর

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা