Sunday, July 3rd, 2016
সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে
July 3rd, 2016 at 2:47 pm
সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে

গোঁসাই পাহ্‌লভী: গুলশানে সন্ত্রাসী হামলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদের দিক থেকে দ্বিতীয় চেহারায় প্রবেশ করলো। কারণ, এর আগের সন্ত্রাসী হামলার চেহারা ছিলো দেশীয়। এবারকার আক্রমণের ধরণ আন্তর্জাতিক, অনেক দেশে একই কায়দায় এই ঘটনা ঘটেছে এবং এবারকার ঘটনাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ কাভারেজ পেয়েছে, গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়েছে।

যে সমস্ত চ্যানেল দেখিয়েছে তাদের আগ্রহের ক্ষেত্র আর আমরা যারা এই দেশে অবস্থান করছি উভয়ের অভিজ্ঞতা এক হবে না। সুতরাং এই বিষয়ে এখানকার জনগণের ভাবনা কিরকম, অগ্রসর বুদ্ধিজীবীদের ভাবনা, রাষ্ট্রখোদ এই বিষয়ে কি ভাবে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে অবশ্যই বিদেশিদের দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাহ্য করা যায় না যেহেতু কূটনৈতিক সম্পর্কে আমরা বিদ্যমান।

বিবিধ বিশ্লেষণে যাবার পূর্বে আমাদের গোড়ার দিকে মনোযোগ দিতে হবে, এবং গোড়ার কথা চিন্তা করতে হবে, সেই চিন্তাটা কি?

কিভাবে আমরা জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করবো, এর মানে সন্ত্রাসবাদ আমাদের নাকের ডগায় হাজির। দ্বিতীয়ত অপরাধীদের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কি? রাষ্ট্রের অপরাধের সংজ্ঞা কি? একইভাবে অপরাধীরা কোন জিনিষটাকে অপরাধ মনে করে এবং কোন বিষয়টাকে নৈতিকতার দ্বারা সিদ্ধ মনে করে, এ বিষয়ে কথোপকথন জরুরি কিনা!

যেমন এই যে ‘সন্ত্রাসবাদ’একটি অপরাধ, বুদ্ধিজীবীরা যখন এই কথা বলেন, তখন তারা কি পুলিশ বা আদালতের হয়ে বলেন? বা সন্ত্রাসবাদ অপরাধ কিনা এই বিষয়ে বিচারকের আসন গ্রহণ করেন! ফলে কারো ভূমিকায় না থেকে নিরপেক্ষ হয়ে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে চিন্তাভাবনা চালানোর চেষ্টা শুরু হতে পারে।

এটা কি সত্যি নয় যে, জনগণের ভেতর থেকে অগ্রসর বুদ্ধিজীবীরা এ বিষয়ে বিস্তর পড়াশুনা শুরু করেছে, তাদের সাথে কথা বলতে গেলে রীতিমত বাকযুদ্ধে আপনাকে তথ্যের তীরে বিদ্ধ করে দেবেন! তাহলে এই যে চৈতন্য, এই তথ্য আপনার রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় কাজে দিচ্ছে না কেন? বাস্তবতা হচ্ছে এই যে জনসচেতনতার মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে, এমনটা নয়। জনসচেতনা অপরাধীকে ধরিয়ে দিলেও আইন শৃঙ্খলাবাহিনী ক্রসফায়ার দিয়েছে, এই হচ্ছে বাস্তবতা।

তাহলে? জনগণ যখন বুঝে যায় যে তার চৈতন্যের কোনও গুরুত্ব নেই তখন সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা রাষ্ট্রের একান্ত নিজস্ব বিষয়। এই প্রশ্ন করা যায় কিনা যে, জনগণের কারণে কি সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি হয়েছে? যদি জনগণের দ্বারা সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি না হয় তাহলে জনগণ কেন সে দায় নেবে? এবার প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের দায় নিচ্ছে কিনা? কিংবা কিভাবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করবে? সরকার কি জনগণকে জানিয়েছে যে সে এভাবে এভাবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করবে!!

আমরা সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে জনগণ এবং রাষ্ট্র বা সরকার নিয়ে আবার ফেরত আসবো তার পূর্বে কিছু প্রশ্ন তোলা যাক। যেমন, যে ছেলেগুলো এই হত্যাকাণ্ড ঘটালো, তাদের মনস্তত্ত্ব অনুধাবন করা জরুরী কিনা? বা এই প্রশ্নটাও করা যায় যে তাদেরকে এ বিষয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলে তার উত্তরটা কি হবে? অর্থাৎ তাদের সাথে কথা বলার, সংলাপ করার মাধ্যম কি হবে? এই যে ছেলেগুলো আত্মাহুতি দিলো অনেকজনের মৃত্যু নিশ্চিত করে, এই ছেলেগুলো কি অর্থ সংকটে এই কাজ করেছে? না, মৃত্যুর পরে তারা বেহেস্তে চলে যাবে বলে প্রলোভনে ভুলাতে পেরেছে?

মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া কতটা সহজ? কতটা শক্তির প্রয়োজন? সুতরাং যে লোকটি আদমবোমা হয়ে মৃত্যুর দিকে কতটা নার্সিং প্রভাবে এগিয়ে যায় কতটা নেজেই কর্তার ভূমিকায় থাকে, বোঝা খুবই শক্ত। গুলশানের ঘটনার দায় আইএস বা আলকায়েদা বা আনসারুল্লাহ যারাই নিক না কেন ঘটনায় ব্যক্তির সাথে সংগঠনের অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সন্ত্রাসবাদ এখন প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করেছে।

সন্ত্রাসবাদের সাথে ‘বাদ’ বা ইজম যুক্ত হওয়ার ফলে এটার একটা তাত্ত্বিক ভিত্তি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সন্ত্রাসবাদকে জ্ঞানকাণ্ড হিসাবে বিবেচনায় নিলে পুরো বিষয়টিকে বোঝার, অনুধাবন করার পরিধিও বিস্তৃত হয়। আজ এই প্রশ্ন করা সমিচীন কিনা যে, ইসলামে সন্ত্রাসবাদ জায়েজ বা নাজায়েজ? ধরা যাক ইসলামের ভেতর সন্ত্রাসবাদের ভিত্তি খুঁজে পাওয়া গেল! তো অমনি টপ করে সন্ত্রাসবাদ আপনাআপনি মিশন শুরু করে দিলো? ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ কি তার তাত্ত্বিক মালমসল্লা দিয়ে নতুন কোনও অস্ত্র তৈরী করেছে?

এভাবে প্রশ্ন করে অর্থাৎ ইসলামের সাথে যুক্ত করে বা না করে সন্ত্রাসবাদকে দেখার দিন বোধ হয় শেষ হয়ে গেছে। ইসলামিক টেরোরিজম এখন স্বয়ংক্রিয় একটা জিনিস যেটা নিজে নিজে রান করতে পারে! কেবল ফুয়েল আর সুইচে একটি টিপ দিতে হয়। এই ফুয়েল আর সুইচে টিপ দেওয়ার উৎস কোথায় সেটা জনগণ কিছুটা আন্দাজ করতে পারেন বলে মনে হয়। তার মানে ইসলামের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করে বা সৃষ্টি না করে উভয়ভাবে এই সন্ত্রাসবাদকে দেখলে বা না দেখলে সন্ত্রাসবাদের কিছু আসে যায় না। সন্ত্রাসবাদ আপনাআপনি চলে!

শুরুতেই বলেছি বাংলাদেশ গুলশানের ঘটনার পরে সন্ত্রাসবাদের দ্বিতীয় মাত্রায় প্রবেশ করেছে। যথারীতি তাদের টার্গেটও পরিবর্তন হয়েছে। মনে রাখতে হবে আইএস একটি মতাদর্শ, তালেবান কিংবা আনসারুল্লাহ বা হুজির থেকে আঘাত আসা মানে একটি মতাদর্শ থেকে আঘাত আসা। এই আঘাতের টার্গেটও থাকে এক বা একাধিক মতাদর্শ। রাষ্ট্র হচ্ছে এই ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মতাদর্শিক প্রতিষ্ঠান। ফলে আঘাত ক্রমশ রাষ্ট্রের দিকে আগাবে এটাই স্বাভাবিক। এই মতাদর্শের আঘাতের ধরণ মতাদর্শকে মানুষের ভেতরে নয়, রাষ্ট্রের ভেতরে প্রবেশ করা, রাষ্ট্রের ভেতরে প্রথিত করা। এই ক্ষেত্রে চরমপন্থি মতাদর্শগুলো প্রথমেই রাষ্ট্র ও জনগণের ভেতর দূরত্ব সৃষ্টি করে সরকারকে দুর্বল করে ফেলে, রাষ্ট্র যদি মতাদর্শে দুর্বল হয় তাহলে উগ্র মতাদর্শ কোথাও কোথাও সফল হয়েছে, সে নজির রয়েছে।

শুরুর দিকে আমরা জনগণ রাষ্ট্র ও সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে কথা বলেছি, রাষ্ট্র ও জনগণের ভেতর সন্ত্রাসবাদকে রেখে কথা বলেছি। এবার এই বিষয়টার দিকে মনোযোগ দেয়া যাক।

রাষ্ট্রের ভেতর যে কোনও ঘটনায় প্রতিরোধ সৃষ্টি করার প্রয়োজন হলে জাতিয়তাবাদ, দেশপ্রেম অত্যন্ত ভালো উপাদেয়। রাষ্ট্র বা বুদ্ধিজীবীরা এই প্রণোদনা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে শুরুতেই নিজেদের গুরুদায়িত্ব লুকাতে পারেন ঠিকই কিন্তু এতে কিছুটা লাভও হয়। বাংলাদেশেও হয়েছে। অর্থাৎ মতাদর্শিক সংঘাতে জাতীয়তাবাদ প্রথম মুখোমুখি হয়েছে, সুতরাং বলিও হতে হয়েছে তাকে প্রথম, কিন্তু এক্ষণে আমরা দেখছি জাতিয়তাবাদ তাত্ত্বিকভাবে আর ইসলামিক সন্ত্রাসবাদকে মোকাবেলা করতে পারছে না। কারণ, জাতীয়তাবাদ ব্যবহারে কেমন হবে গোড়ার এই প্রশ্নটি ঠিক করেনি। ইসলামী সন্ত্রাসবাদ তাত্ত্বিক জায়গা থেকে ব্যবহারিক জায়গায় প্রবেশ করেছে। ফলে ব্যবহারিকভাবে জাতীয়তাবাদ আর আগাতে পারছে না, মুখোমুখি হতে পারছে না। এক্ষেত্রে জাতিয়তাবাদের প্রতিনিধি হিসাবে রাষ্ট্রের উপরে দায়িত্ব বর্তেছে, রাষ্ট্র কিভাবে ব্যবহারিকভাবে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদকে মোকাবেলা করবে সেটাই দেখার বিষয়।

রাষ্ট্র নাগরিক ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে আমাদের আরেকটি অবজারভেশন হচ্ছে, আপনাদের হয়তো মনে থাকবে যখন প্যারিসে হামলা হলো, কিংবা শার্লি পত্রিকা, প্যারিস বা শার্লির প্রতি সহমর্মিতায় এখানকার প্রফাইল পিক পরিবর্তন হয়েছে, আমিই শার্লি বা আমিই প্যারিস পিকে ভরে উঠেছিলো ফেসবুক। কিন্তু গুলশান এটাকের পরে আমরা কি দেখলাম বা কি দেখছি?

অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম এইসব শব্দবন্ধের বিবেচনা বাংলাদেশের জন্য আলাদা হয়ে গেছে, জাতীয়তাবাদ এখন নিজেই সাহস করছে না আমিই বাংলাদেশ বলে প্রোফাইল পিক সেট করতে। কারণ, সন্ত্রাসবাদের স্বাদ রাষ্ট্র পাওয়ার পূর্বে খণ্ড খণ্ড ভাবে হলেও জাতীয়তাবাদীরাই পেয়েছে। সুতরাং জাতীয়তাবাদীদের সাথেও রাষ্ট্রের এক প্রকার বিচ্ছেদ দেখা যাচ্ছে! এই বিচ্ছেদের কারণ কি?

লর্ড ক্লাইভ রাণীর কাছে পলাশীর যুদ্ধের বিষয়ে বলেছিলেন,‘ পলাশীর যুদ্ধের ময়দানের চতুর্দিকে দাঁড়িয়ে যত লোক যুদ্ধ দেখছিলো তারা যদি একটি করে পাথরও ছুঁড়তো তাহলে বৃটিশরা ঘাসের সাথে মিশে যেত’। রাষ্ট্রের সাথে জনগণের এই যে দুরত্ব, এই দুরত্বে জনগণ কি পুরো ঘটনাকেই নাটক ভেবেছিলো? অনেকেই বলে থাকেন যে বাংলাদেশে আজকে সন্ত্রাসবাদের যে সমস্যা সেই সমস্যা ১ ঘন্টার মধ্যেই র‌্যাবের হাতে ছেড়ে দিলে কাফি, সমাধান চলে আসবে? কিন্তু র‌্যাবকে কি জনগণের মধ্যে পাঠানো সম্ভব হবে? জনগণের ভেতর র‌্যাব পুলিশ, আইন-শৃঙ্ক্ষলাবাহিনীর বিষয়ে ধারণা কি? অভিজ্ঞতাই বা কেমন?

এ ছাড়াও সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে আন্তর্জাতিকতা তো রয়েছেই। সন্ত্রাসবাদ এখন একটি ইনভেস্টের বড় ক্ষেত্র। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো রিভার্স প্লেই্ং করে এই ইনভেস্টমেন্টকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পরিণতির দিকে নিয়ে চলছে। রয়েছে সন্ত্রাসবাদ প্রবণতার নিবিড় পাঠ ও পর্যবেক্ষণ, কেবল দারিদ্রে পিষ্ট হয়ে কোনো এতিমখানার ছাত্রকে আদমবোমা বানানো যায় এই একপাক্ষিক তথ্যের মিথ ভেঙ্গে গেলো গুলশান এটাকের মধ্যে দিয়ে। এভাবেই সন্ত্রাসবাদের মিথ ভাঙ্গাগড়ার মধ্যে দিয়ে পরিপুষ্ট হবে। আপনি ঠিক কোন হিসাব মিলাতে মিলাতে সন্ত্রাসবাদকে বুঝবেন এই সময়টুকুতেই যদি কাছিম তার গন্তব্যে পৌঁছে যায়, খরগোশের তখন চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।

gosai pahlovi

লেখকঃ ভাষ্কর, গবেষক ও নির্মাতা


সর্বশেষ

আরও খবর

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?


প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ

প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ


দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন

দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন


দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন

দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ