Monday, July 11th, 2016
সন্ত্রাস প্রতিরোধ অথবা নিশ্চিত নিমজ্জন
July 11th, 2016 at 10:34 pm
সন্ত্রাস প্রতিরোধ অথবা নিশ্চিত নিমজ্জন

সন্ত্রাসবাদ এমন একটি সংকট যা নিরসনে সবচেয়ে জরুরি জন সাহস। যে কোনো এলাকায় অন্ততঃ দশটি করে পরিবারের মাঝে যদি একটি সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক ধরে রাখা যায়; তাহলে ঐ দশটি পরিবার নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই দিতে সক্ষম। একটি বাইকে এসে তিনটি কিশোর ছেলে ঐ দশটি পরিবারকে কিছুই করতে পারবে না। এইভাবে রাস্তাঘাটে থাকা অন্ততঃ দশজন মানুষ যদি যে কোনো মুহূর্তে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যেতে পারে; সন্ত্রাসবাদ বিদায় নেবে বাংলাদেশ থেকে।

সন্ত্রাসবাদের মূল কৌশল হচ্ছে জনমনে ভীতি প্রবেশ করানো। সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক ওষুধ খুব সম্ভব একে বিন্দুমাত্র ভয় না পাওয়া। জীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাওয়া। মৃত্যুতে ভয় পাওয়া কোনো কাজের কথা নয়। আমাদের মৃত্যুভীতিই সন্ত্রাসীদের সাহসী করে তোলে। জীবনকে নিজ নিজ সামর্থ্যের জায়গা থেকে এমনভাবে উদযাপন করা যায় যাতে একটু পরে মৃত্যু হলেও কোন আক্ষেপ না থাকে। এরকম একটি শক্তপোক্ত মনোভঙ্গী ছাড়া শুধু সন্ত্রাসবাদ কেন জীবনের কোনো সমস্যাই সমাধান করা যায় বলে মনে হয় না।

সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহতের জন্য সমবেদনা জ্ঞাপনের পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের প্রতি জনপ্রত্যাখ্যান নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। “যাই হইতেছে ভালই হইতেছে; আওয়ামী লীগ পইড়া যাইবো; আমরা ক্ষমতায় যামু”–এরকম চিন্তা আত্মঘাতী। আবার “যাই হইতেছে হোকনা আমরা বুশের মতো সন্ত্রাসবাদের জুজু দেখাইয়া আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকমু” এরকম আওয়ামী চিন্তাও আত্মঘাতী।

এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে বুঝতে হবে দেশবাসী তাদের নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত না। সবাই নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। এই চিন্তাটি ক্রমশঃ সামষ্টিক করে তোলাই এখনকার চিন্তার অগ্রাধিকার। কাজেই তারা তাদের “চোখের বদলে চোখ” খেলাটিকে বন্ধ রাখতে পারে। তারা কেউই অবোধ শিশু নন; সেটাই প্রত্যাশিত। যে যার বিশ্বাস-অবিশ্বাস ব্যক্তিগত পর্যায়ে পালন করাই সঙ্গত। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের সময় এটি নয়। কারণ গোটা পৃথিবী একটি যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস যে কোন পক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের অশুভ লড়াইটিকে আর বরদাশত করবে না। যারা এই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে ইসলাম ধর্মীয় আবেগের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ভাবছেন, খিলাফত আইলে তো ভালোই হয়; তারা চিন্তা করে দেখুন সিরিয়ার শরণার্থীদের কথা; সাগর পাড়ে পড়ে থাকা সেই ছোট্ট শিশুটির মৃতদেহের কথা। সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয়া মানেই পাকিস্তান-আফঘানিস্তান-ইরাক-সিরিয়া-সৌদি আরবের মতো অস্বাভাবিক জীবন যাপন করা।

ধর্মপালন মানে শুধু নামাজ পড়া; রোজা রাখা; হজ করা নয়। ধর্মের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মানবকল্যাণ। খুনীকে সমর্থন মানে খুনের গুনাহর অংশ হয়ে যাওয়া। খোদা কোন খুনী বা খুনের সমর্থককে বেহেশতে অনন্ত আনন্দের জীবন উপহার দেবেন না নিশ্চিতভাবেই। বেহেশতে যাবে সেইসব মানুষ; যারা সৎ উপার্জন করেছেন, কারো ক্ষতি করেননি, পরচর্চা করেননি, কোন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি, বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

আর্টিজান রেষ্টুরেন্টে যে পর্দানশীন নারী এতোগুলো লাশের পাশে বসে কথিত “সেহরি” করেছেন তিনি বেহেশতে গেলে ঐরকম বেহেশতে অন্ততঃ আমি যেতে চাইনা। ধর্ম চর্চার মাঝ দিয়ে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য পেতে গেলে মানবিক সততার বিষয়ে একশোতে একশোই পেতে হবে। পরীক্ষাটা সহজ নয়; আবার অতো কঠিনও নয়। “সন্ত্রাসবাদের প্রতি জিরো টলারেন্স”-ই তো পৃথিবীতে প্রতিটি ধর্মের প্রধান লক্ষ্য। অহিংসা পরমধর্ম। এমনকি অবিশ্বাসীদেরও লক্ষ্য। মানুষ আত্মপরিচয়ের অভিলক্ষ্য। কে বিশ্বাসী; কে অবিশ্বাসী তা বিচারের দায় সৃষ্টিকর্তার একার।

এখানে মাঝখানে কারো ফড়িয়াগিরি করার দরকার নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে বসে আল্লাহ আছেন কী নাই নিয়ে ঝগড়া করার মনোবৃত্তি কোন মানসিক ভাবে সুস্থ মানুষের থাকার কথা নয়। আর যারা খিলাফতের স্বপ্ন দেখছেন তাদের জানা প্রয়োজন, ঢাকা আর্টিজান হামলা; সৌদী আরবে মহানবীর চিরবিশ্রাম স্থানটিতে হামলা উদযাপন করেছে জায়নিস্ট একটি গ্রুপ। আই এসের পোষাক পরে তেল-আভিভে এই সেলিব্রেশান পার্টি হয়েছে।

কারণ জামায়াতকে সামনে রেখে জায়নিস্ট ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে “ইসলামী ব্যাংক” সহ অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরী করে মুনাফা লুটেছে। “ইসলাম” নামটিকে সাইনবোর্ড হিসেবে ঝুলিয়ে তারা “রাষ্ট্রের মাঝে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে”। বলে রাখা প্রয়োজন জায়নিস্টরা ইহুদী নামধারী ব্যবসায়ী ও নরখাদক। অন্য ইহুদীরা মুসলমানদের মতোই মানুষ; তারা মুসলমান হত্যার প্রতিবাদ জানায়। সুতরাং যেটাকে ইসলাম বলে বাংলাদেশের কিছু মানুষ খিলাফতের স্বপ্নে দৌড়াচ্ছে; তারা ভুতের আলোর পিছে দৌড়াচ্ছে। ইসলামতো সেইসব মানুষের হৃদয়ে থাকে যারা সম্প্রীতি ও সাম্যভিত্তিক সমাজের জন্য কাজ করে। ইসলামের সমাজ কল্যাণের মডেল সবচেয়ে বেশী অনুসৃত হয় আয়ারল্যান্ডে; স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলোতে।

মুসলমানেরা সারাক্ষণ কথিত “অনুভূতি” নিয়ে অযৌক্তিক চিন্তা-ঝগড়া বিবাদ করে ইসলাম ধর্মের সমাজ-কল্যাণের আদর্শ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কীই বা হতে পারে। তাইতো মুসলমান অধ্যুষিত দেশগুলোতে আজ এতো সন্ত্রাস-দুর্নীতি-অনাচার। এরা যেন ফিরে গেছে ইসলাম পূর্ববর্তী অমানবিক মক্কার আদিম জীবনাচারে। ভ্রান্তিতে সময় নষ্ট না করে; সাইড লাইন ইস্যুতে হাট-বাজার গরম না করে কট্টরচিন্তার প্রতিষেধক নিয়ে এখন সন্ত্রাস প্রতিরোধই প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। কারণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ছাড়া বসবাসযোগ্য সভ্য সমাজ প্রতিষ্ঠা একেবারেই অসম্ভব।

maskaoathমাসকাওয়াথ আহসান: প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক


সর্বশেষ

আরও খবর

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?


প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ

প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ


দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন

দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন


দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন

দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ