Sunday, February 26th, 2017
‘সরকারের মদদেই ধারাবাহিক ব্লগার হত্যা’
February 26th, 2017 at 7:47 pm
‘সরকারের মদদেই ধারাবাহিক ব্লগার হত্যা’

ঢাকা: সরকারের মদদেই ধারাবাহিক ব্লগার হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। মুক্তচিন্তক ও বিজ্ঞানলেখক অভিজিৎ রায়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে শাহবাগে গণজাগরণের সকল শহিদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ‘মুক্তবুদ্ধি চর্চা ও সামাজিক ন্যায়বিচারঃ কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এই মন্তব্য করেন তিনি।

ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘অভিজিৎ রায়কে হত্যার দুই বছর অতিক্রান্ত হলো আজ। আপনারা জেনে আশ্চর্য হবেন এই দুই বছর সময়ে কেবল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখই অন্তত ষোলোবার পিছিয়েছে। বিচারে নেই কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি। একজন একজন করে ব্লগার খুন হয়েছেন আর সরকারের কর্তাব্যক্তিরা আমাদের নসিহত দিয়েছেন আপনারা এটা লিখবেন, ওটা লিখবেন না। তারা দুইদিন পরপর বক্তব্য পরিবর্তন করেছেন। যাদেরকে অভিযুক্ত হিসেবে দেখিয়েছেন তাদের গ্রেফতার করেননি, যারা গ্রেফতার হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ নেই বলে দাবি করেছেন গণমাধ্যমে। সরকারের এই ইঁদুর-বেড়াল খেলার মাঝে একটি একটি করে ঝরে গেছে অনেকগুলো তাজা প্রাণ।’

সরকারের মদদেই ধারাবাহিক ব্লগার হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে মন্তব্য করে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন রাজীব হায়দার শোভন ও অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের পেছনে একই ব্যক্তির হাত রয়েছে। অথচ রাজীব হত্যার মূল কুশীলবকে জামিন দিয়ে রাতের আঁধারে পালানোর সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। আমাদের মনে তাই প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি অভিজিৎ রায়কে হত্যার জন্যই জামিন পেয়েছিল সেই খুনি?’

ইমরান আরো বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে একজন সাংসদকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তারা এটিকে ‘ক্লু-লেস’ হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। সেসময় ক্ষমতাসীন দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করে বক্তব্য এসেছিল। এখন জানা গিয়েছে আসল খুনি তাদের মহাজোটের ভেতরেই ঘাপটি মেরে বসেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদিচ্ছায় সে সত্যটি আমরা জানতে পেরেছি। তাদের এই আন্তরিকতাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। একই সাথে প্রশ্ন রাখতে চাই, দুই মাসের ভেতরে যদি একটি ক্লু-লেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয় তবে কেনো ত্রিস্তর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে হওয়া অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবেদন দুই বছরেও দাখিল করা সম্ভব হয় না? কে আপনাদের বাধা দিচ্ছে? কাদের ইন্ধনে আপনারা হাত গুটিয়ে বসে আছেন? যে আন্তরিকতা আপনারা সাংসদ খুন হলে দেখাতে পারেন একই আন্তরিকতা কেনো ব্লগারদের ক্ষেত্রে দেখাতে পারেন না?’

সরকারকে উদ্দেশ্য করে ইমরান বলেন, ‘শত শত পুলিশ, গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের নাকের ডগায় এসে আপনাদের কোনো রকম মদদ ছাড়া জঙ্গিরা খুন করে গেল, এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। সাংসদ হত্যাকাণ্ডের মতো এই হত্যাকাণ্ডের রহস্যও একদিন উদঘাটিত হবে।’

আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রগতিশীল শক্তির ঐক্যের কাছে মৌলবাদের রক্তচক্ষু সবসময়ই পরাজিত হয়েছে। সাময়িক বাধা-বিপত্তি হয়তো আসে কিন্তু দিনশেষে বিজয় আমাদেরই অর্জিত হয়েছে।’ এসময় বিরুদ্ধ পরিবেশেও মুক্তচিন্তার আন্দোলনের পতাকা উঁচিয়ে ধরার জন্য গণজাগরণ মঞ্চকে অভিনন্দন জানান তিনি।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি ইমরান হাবিব রুমন বলেন, ‘আমাদের দেশের স্কুলে বিজ্ঞান পড়ানো হয়, বিজ্ঞান শেখানো হয় না। অভিজিৎ রায় নিরলস পরিশ্রম করেছিলেন আমাদেরকে তাঁর সহজাত সাবলীল ভাষায় আমাদেরকে বিজ্ঞান শেখানোর, বিজ্ঞানমনষ্ক করে তোলার। আমাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শেখানো হচ্ছে বিজ্ঞান মানে প্রযুক্তি, উপেক্ষিত থাকছে বিজ্ঞানমনষ্ক মনন গঠনের চর্চা। অভিজিৎ রায় সেখানেই আলোকপাত করেছিলেন।’

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা কেবল একটি স্বাধীন ভূখণ্ডই পাইনি, পেয়েছিলাম একটি অসাধারণ সংবিধানও। সেই সংবিধানের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলেই দেখব আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে। আজ যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে সেভাবেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়তো ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কখনোই বিনির্মাণ করা সম্ভব হবে না।  বাংলাদেশ হয়ে যাবে বাংলাস্তান।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই প্রসিকিউটর বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আমার ইচ্ছে করে শাহবাগে ছুটে যেতে। কিন্তু আমরা আশ্চর্য হয়ে যাই, আজ কাদের ইন্ধনে রাষ্ট্র হেফাজতের প্রতি এমন নতজানু আচরণ করছে? আমরা বিএনপিকে বলতে চাই আপনারা জামায়াত ছাড়েন আর সরকারকেও বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের স্বার্থে আপনারাও হেফাজতকে ছাড়েন।’

মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির বলেন, ‘সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে প্রয়োজন বিচারিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। ব্লগার-প্রকাশক-মুক্তচিন্তকদের হত্যাকান্ডের বিচারের মাধ্যমে সেই বিচারিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, এই প্রশ্নের উত্তরে আমার মনে হয় আমাদের সরকার দাঁড়িয়ে আছে মৌলবাদের পাশে আর এদেশের মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ যথারীতি মুক্তচিন্তা ও উদারতান্ত্রিকতার পক্ষেই আছে।’

সভাপতির বক্তব্যে ডঃ অজয় রায় বলেন, ‘আমি কেবল অভিজিৎ নয়, প্রথিতযশা লেখক হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে মৌলবাদীদের হাতে নিহত সকল মানুষকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।’

অনুষ্ঠানের শুরুতেই শাহবাগে স্থাপিত অস্থায়ী প্রতিকৃতিতে মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা নিবেদন করে গণজাগরণ মঞ্চ। শ্রদ্ধ্যার্ঘ নিবেদন করেন ডঃ অভিজিৎ রায়ের পিতা খ্যাতিমান পদার্থবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ডঃ অজয় রায়, অভিজিৎ রায়ের সহোদর অনুজিৎ রায়, আদিবাসী যুব পরিষদ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, অংকুর প্রকাশনী, মুক্তিশিখা, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চ, জনউদ্যোগ ইত্যাদি ব্যক্তি ও সংগঠন এবং সাধারণ জনতা। গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী জীবনানন্দ জয়ন্তের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আকরামুল হক, ভাস্কর রাশা, হরেন সিং প্রমুখ।

সভাপতির বক্তব্যের পর একটি আলোর মিছিল শাহবাগ থেকে অভিজিৎ চত্বর অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। অভিজিৎ চত্বরে গিয়ে আলোক প্রজ্জ্বলন ও নীরবতা পালনের মাধ্যমে অভিজিৎ রায়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা।

প্রকাশ: ইয়াসিন


সর্বশেষ

আরও খবর

টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হলেন আইভী

টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হলেন আইভী


অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে বাস চলার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন

অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে বাস চলার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন


আগুনে পুড়ল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১২০০ ঘর

আগুনে পুড়ল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১২০০ ঘর


এবারের বিজয় দিবসে দেশবাসীকে শপথ পড়াবেন প্রধানমন্ত্রী

এবারের বিজয় দিবসে দেশবাসীকে শপথ পড়াবেন প্রধানমন্ত্রী


কমলো এলপিজির দাম

কমলো এলপিজির দাম


উন্নয়নশীল দেশ নিয়ে খুশি না হয়ে, উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

উন্নয়নশীল দেশ নিয়ে খুশি না হয়ে, উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির


জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম মারা গেছেন

জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম মারা গেছেন


ডিআরইউর নতুন সভাপতি মিঠু, সাধারণ সম্পাদক হাসিব

ডিআরইউর নতুন সভাপতি মিঠু, সাধারণ সম্পাদক হাসিব


ওমিক্রন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ; সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

ওমিক্রন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ; সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার


নির্বাচনী সহিংসতায় ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু

নির্বাচনী সহিংসতায় ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু