Monday, August 15th, 2016
সুকান্ত: দুঃসাহসী এক বীর
August 15th, 2016 at 10:58 pm
সুকান্ত: দুঃসাহসী এক বীর

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ:

সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন ইংরেজ শাসিত পরাধীন রাষ্ট্র-যন্ত্রের তথা অবিভক্ত ভারতবর্ষের একজন দুর্বার কবিতা সৈনিক। বৃটিশভারতের পরাধীন জাতিগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক দৈন্যদশা, মানবিক বিপর্যয়, ভুলুণ্ঠিত অধিকার, মানবতার অবক্ষয়, দুর্বৃত্তপনা এবং দুর্বলের উপর সবলের দমনরীতি ইত্যাদি মূর্তছায়ারূপে তাঁর এক একটি কবিতায় ঝলক দিয়ে উঠেছে। বিশ শতকের সর্বপ্রধান অসাম্প্রদায়িক কবি এবং বিদ্রোহী কবিতার জনক কাজী নজরুল ইসলাম ও সুকান্ত ভট্টাচার্য দু’জনই হয়ে উঠলেন ইংরেজবিরোধী শক্তির দুই প্রান্তের দু’জন দুঃসাহসী কলমী-সেনাপতি।

নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার আগুনকে আরো উস্কে দিতে শুরু করেছিলো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার ঝড়। তার সরল কথার সুঁই তলোয়ারের চেয়েও তীক্ষ্ণ, সাপের জিহ্বার চেয়েও ভয়ঙ্কর। স্বাধীনতাকামী জাতিকে তার কবিতা স্বপ্ন দেখানোর নিরন্তর উৎসাহ জুগিয়েছে বারবার। অপশক্তির নির্মমতায় বার বার জ্বলে-পুড়ে মরে ছারখার হওয়া এ জাতিকে তিনি নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। নীতির পদস্খলন না ঘটিয়ে বুকটান করে দাঁড়িয়ে থাকার কৌশল। বলা হয়, দুঃসাহসী এক বীরের প্রতীকরূপ সুকান্ত।

বাংলা সাহিত্যের মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার বৈপ্লবিক ভাবধারাটি যাদের সৃষ্টিশীল রচনায় সমৃদ্ধ হয়েছে, সুকান্ত তাদের অন্যতম। তারুণ্যের শক্তি দিয়ে উন্নত শিরে মানুষের মর্যাদার জন্য মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান সুকান্তের কবিতায় লক্ষণীয়।

সুকান্তের কবিতা সাহসী করে, উদ্দীপ্ত করে। তার কবিতার ছন্দ, ভাষা, রচনাশৈলী এত স্বচ্ছন্দ, বলিষ্ঠ ও নিখুঁত যে, তার বয়সের বিবেচনায় এরূপ রচনা ছিলো অসাধারণ ও বিস্ময়কর। সুকান্তের কবিতা সব ধরনের বাধা-বিপত্তিকে জয় করতে শেখায়। তার বক্তব্যপ্রধান সাম্যবাদী রচনা মানুষকে জীবনের সন্ধান বলে দেয়। যাপিত জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণাকে মোকাবেলা করার সাহস পাওয়া যায় তার কবিতা থেকে।

অভিনবত্বের চেয়েও প্রকাশ ভঙ্গির বলিষ্ঠতা এবং প্রতিমা নির্মাণের অভিনবত্বের জন্য পাঠক সমাজে অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছে | উচ্চতর মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হন তিনি। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় তার জন্ম। মানবতার জয়ের জন্য লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী কবির আজ ৯০তম মৃত্যুবার্ষিকী। তারুণ্যের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মুত্যুদিনে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

তার পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের ব্যবসা করতেন এবং মা সুনীতি দেবী ছিলেন গৃহবধূ। তাদের পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার (বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া থানার উনশিয়া গ্রামে)। জন্মের আগেই তার পূর্ব পূরুষেরা এ দেশ থেকে ভারতে চলে যায়। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সুকান্তের নিজের ভাতুষ্পুত্র।

সুকান্তের বাড়িতে সাহিত্যের খুব ভাল পরিবেশ ছিলো। মনীন্দ্রলাল বসুর ‘রমলা’ উপন্যাসের নায়ক সুকান্তের নামেই আদরের ভাইটির নাম রেখেছিলেন জ্যাঠতুতু দিদি রানি। রানি দিদির উৎসাহেই লেখালেখিতে সুকান্তের হাতে খড়ি। স্কুলের ছাত্র হিসেবে ভালো মার্ক্স পাওয়া মেধাবী ছাত্র হবার নজির ছিলোনা সুকান্তের। অর্থাৎ সাধারণ মানের ছাত্র ছিলেন তিনি। তাই লেখাপড়ায় খুব একটা আগ্রহ দেখাতেন না। তদূপরী ভারত জুড়ে ভারতীয়দেv ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের কারণে লেখাপড়া বাধা গ্রস্থ হচ্ছিলো তার। এ সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষাতে অকৃতকার্য হলে তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

কৈশোর থেকেই সুকান্ত যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে। পরাধীন দেশের দুঃখ দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণ মুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। শোষিত মানুষের কর্ম জীবন এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম তার কবিতার মূল প্রেরণা। ১৯৪১ সালে সুকান্ত কলকাতা রেডিওর গল্পদাদুর আসরের যোগদান করেন। সেখানে প্রথমে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেই আসরেই নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে তাকে শ্রদ্ধা জানান। গল্পদাদুর আসরের জন্য সেই বয়সেই তার লেখা গান মনোনীত হয়েছিল আর তার সেই গান সুর দিয়ে গেয়েছিলেন সেকালের অন্যতম সেরা গায়ক পঙ্কজ মল্লিক।

সুকান্তকে আমরা কবি হিসেবেই জানি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যেমন কেবল মাত্র কবি ছিলেন না, সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে তার ছিলো অবাধ বিচরণ। তেমনি সুকান্তও ঐ বয়সেই লিখেছিলেন কবিতা ছাড়াও, গান, গল্প, নাটক এবং প্রবন্ধ। তার ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ প্রবন্ধটি পাঠেই বেশ বোঝা যায় ঐ বয়সেই তিনি বাংলা ছন্দের প্রায়োগিক দিকটিই শুধু আয়ত্বে আনেন নি, সে নিয়ে ভালো তাত্বিক দক্ষতাও অর্জন করেছিলেন। ১৯৪৫ সালে সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। ৮/৯ বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন। স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ একটি ছোট্ট হাসির গল্প লিখে আত্মপ্রকাশ করেন। তার দিনকতক পরে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে প্রথম ছাপার মুখ দেখে তার লেখা বিবেকান্দের জীবনী।

মাত্র ১১ বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতি নাট্য রচনা করেন। এটি পরে তার ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয়। বলে রাখা ভালো, পাঠশালাতে পড়বার কালেই ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্য বন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন। অরুণাচল তার আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন। মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন। সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি। অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তার কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে নজরুলের মতো সুকান্তও ছিলেন সক্রিয়।

যাবতীয় শোষণ-বঞ্চনার বিপক্ষে সুকান্তের ছিল দৃঢ় অবস্থান। তিনি তার কবিতার নিপুণ কর্মে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণী বৈষম্য। মানবতার জয়ের জন্য তিনি লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অসুস্থতা অর্থাভাব তাকে কখনো দমিয়ে দেয়নি। মানুষের কল্যাণের জন্য সুকান্ত নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। তিনি মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন। তার অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন। মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন।

ক্ষনজন্মা এই কবির রচনার সংখ্যা খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু যদি তার বয়সটির বিবেচনায় আনা হয়, তাহলে সেই সংখ্যা অবিশ্বাস্য। তার রচনাবলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলোঃ ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি। পরবর্তীকালে উভয় বাংলা থেকে সুকান্ত সমগ্র নামে তার রচনাবলি প্রকাশিত হয়।

সুকান্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পিসঙ্ঘের পক্ষে আকাল (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। সুকান্তের কবিতা বিষয়বৈচিত্র্যে ও লৈখিক দক্ষতায় অনন্য। সাধারণ বস্তুকেও সুকান্ত কবিতার বিষয় করেছেন। বাড়ির রেলিং ভাঙা সিঁড়ি উঠে এসেছে তার কবিতায়। সুকান্তের কবিতা সব ধরনের বাধা-বিপত্তিকে জয় করতে শেখায়। যাপিত জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণাকে মোকাবেলা করার সাহস সুকান্তের কবিতা থেকে পাওয়া যায়। তারুণ্যের শক্তি দিয়ে উন্নত শিরে মানুষের মর্যাদার জন্য মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান সুকান্তের কবিতায় লক্ষণীয়।

সুকান্তের কবিতা সাহসী করে, উদ্দীপ্ত করে। তার বক্তব্যপ্রধান সাম্যবাদী রচনা মানুষকে জীবনের সন্ধান বলে দেয়। স্বল্প সময়ের জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দিজেন্দ্রলাল রায়, জীবনানন্দ দাশসহ সে সময়ের বড় বড় কবির ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাননি। নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন নিজ প্রতিভা, মেধা ও মননে। সুকান্ত তার বয়সিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছেন তার পরিণত ভাবনায়। ভাবনাগত দিকে সুকান্ত তার বয়স থেকে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন।

মনীন্দ্র বসুর উপন্যাসের সুকান্তকেও অকালেই যক্ষা রোগে চলে যেতে হয়েছিল। কবি সুকান্তেরও সেই একই গতি হবে তা হয়তো পরিবারে কেউ ভাবতেও পারেননি। একাধারে বিপ্লবী ও স্বাধীনতার আপোসহীন সংগ্রামী কবি সুকান্ত ছিলেন কমুনিষ্ট পার্টির সারাক্ষণের কর্মী। পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের উপর চলে প্রতিনিয়ত অত্যাচার। ফলে ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। প্রথমে ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হন সুকান্ত। অতঃপর ১৯৪৭ সালের ১৩ মে মাত্র ২১ বছর বয়সে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন মাত্র মাত্র ২১ বছরের। এরমধ্যে লেখালেখি করেন মাত্র ৬/৭ বছর। সামান্য এই সময়ে নিজেকে মানুষের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তার রচনা পরিসরের দিক থেকে স্বল্প অথচ তা ব্যাপ্তির দিক থেকে সুদূরপ্রসারী। আজ ক্ষনজন্মা তরুন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য়ের জন্মবার্ষিকী। এদিনটিতে তাকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/টিএস


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা