Sunday, February 26th, 2017
সেলফি তোলা ও ভুলে যাওয়া দুটোই মানসিক রোগ
February 26th, 2017 at 7:27 pm
সেলফি তোলা ও ভুলে যাওয়া দুটোই মানসিক রোগ

শাহানাজ ইসলাম মুক্তা: শরীর আর মন একই স্বত্বার দুটি ভিন্ন রূপ। শরীরকে দেখা যায় আর মনকে অনুভব করা যায়। তবে শরীর, মন দুটো বিষয় অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত। শরীর, মন ভাল থাকলেই একজন মানুষ সুস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে। শারীরিক রোগের মতো মানসিক রোগও আছে। বর্তমান সময়ের একটি সাধারণ ঘটনা সেলফি তোলা। ঘন ঘন সেলফি তোলা এক ধরনের মানসিক রোগ।

আজকাল রাস্তা-ঘাটে, শপিং মল, রেস্টুরেন্ট, বিয়ে, গায়ে হলুদ, জন্মদিন যেখানেই যান না কেন দেখবেন হাতে লম্বা স্টিক অথবা একজন হাতটা সামনে উঁচু করে ধরে ঠোঁট বাঁকিয়ে, জিহ্বা বের করে, মুখ বাঁকিয়ে, চোখ ট্যারা করে অথবা দল বেঁধে মাথা জোড়া লাগিয়ে ছবি তুলছে। এভাবে ছবি তোলাকে সেলফি বলে। টিভির বিজ্ঞাপনে দেখা যায়-পাত্রের মোবাইলে সেলফি তুলতে পারেনি বলে পাত্রী তাকে পছন্দ করেনি। এই সেলফি শুধু সামাজিক অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপনেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় দেখা যায় ওমরা বা হজেও সেলফি তুলছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করছে। আসলে তারা হজ্ বা ওমরা করছে নাকি সেলফির জন্য হজ বা ওমরার অভিনয় করছে তা বোঝা মুসকিল।

জুমায় সেলফি, নামাজে সেলফি, রান্নায় সেলফি, বাথরুমে সেলফি-আসলে জীবনটাই সেলফিময়। এই সেলফি ছোঁয়াচে রোগের মতো ছোট বড় সকলের মধ্যেই বিস্তার লাভ করছে। তরুন-তরুনীরা রাস্তা-ঘাটে এমন সব ভঙ্গীমায় সেলফি তুলছে যা একটি অসুস্থ মানসিকতা। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন নিশ্চিত করে বলেছেন এট মেন্টাল ডিসঅর্ডার এর মধ্যে পড়ে।

তারা এই ডিসঅর্ডারকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন যেমন- প্রথমত: বর্ডারলাইন সেলফিটিস-এরা দিনে তিনটি সেলফি তোলে কিন্তু কোথাও পোস্ট করে না। দ্বিতীয়ত: একুয়েট সেলফিটিস-এরা তিনটি সেলফি তোলে এবং তিনটি ছবিই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে। তৃতীয়ত: ক্রোনিক সেলফিটিস-এরা প্রচুর সেলফি তোলে এবং ছয় বারের বেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে। এই ধরনের সেলফিপ্রেমীরা সাধারণত নার্সিসিজম রোগে ভোগে। নার্সিসিজম মানে তারা আত্মপ্রেমে ভোগে। যা একটি মানসিক রোগ।

একটি মার্কিন জার্নালের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যারা সেলফি পোস্ট করার আগে বার বার ছবি এডিট করে তাদের মধ্যে নার্সিসিজম অতি মাত্রায় থাকার সম্ভবনা বেশি। এই নার্সিসিজম একটা অসামাজিক ব্যাধি। এই ধরনের রোগীরা যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজের শরীর ও চেহারাকে আর্কষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে চায়।

এই সেলফি জ্বরে আক্রান্ত লোকেরা বিভিন্ন বিপদজনক জায়গায় সেলফি তুলে থাকে। এই ভাবে সেলফি তুলতে গিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশে রেলে কাটা পড়ে সহোদরের মৃত্যু হয়। তবে সেলফি মৃত্যুর তালিকায় ভারত প্রথম, দ্বিতীয় স্থানে পাকিস্তান।

এই অসামাজিক ব্যাধি সেলফি থেকে মুক্ত হতে বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী অথবা কাউন্সলিদের সাহায্য নেয়া যেতে পারে।

কিছু মনে রাখতে পারি না, ভুলে যাই, চশমাটা কোথায়, চাবি কোথায় রাখলাম টিভির রিমোট টা পাচ্ছি না, সঠিক সময়ে সঠিক কিছু খুঁজে না পাওয়া আমাদের মানব জীবনের একটি সাধারণ ঘটনা। আসলে ভুলে যাওয়াটাকে আমরা সাধারণ মনে করলেও এটিকে স্বাভাবিক ঘটনা মনে করা উচিত নয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে এটি একটি মানসিক রোগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে ডিমেনশিয়া বলে। অন্য ভাবে একে মেমরি লস অথবা পারসিসটেন্ট ফেইলিওর বলা হয়। এটা সাধারণত ৬০ বছরের পরে দেখা দেয়। এই ভুলে যাওয়া রোগটি আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলে। তাই ভুলে যাওয়া নামক মানসিক রোগটিকে বাড়তে দেয়া যাবে না।

মানুষ বিভিন্ন কারণে ভুলে যাওয়া রোগে আক্রান্ত হয়। যেমন-মস্তিস্কে ক্ষত সৃষ্টি হলে, কোনো কারণে মস্তিস্কে রক্ত চলাচল কম হলে, শরীরে ভিটামিন ও খনিজের অভাব হলে, অনিয়ন্ত্রিত বহুমূত্র রোগ, থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা, অতিরিক্ত মাদকাসক্তি, অনিদ্রা, ঔষধের পার্শ¦ প্রতিক্রিয়া, হতাশা ও মানসিক চাপ ভুলে যেতে সাহায্য করে। ভুলে যাওয়া রোগ রোধে আমাদের সচেতন হতে হবে। কিছু অভ্যাস ও নিয়ম মেনে চলতে থাকলে আমরা ভুলে যাওয়া রোগ থেকে মুক্ত হতে পারবো।

প্রতিদিন সুষম খাদ্য তালিকা অনুযায়ী খাবার খেতে হবে। খাবার তালিকায় তাজা শাক সবজী, ফলমূল, সবুজ শাক, কমচর্বি যুক্তখাবার যেমন-চর্বি ছাড়া গোসত, চামড়া ছাড়ানো হাঁসের গোসত, মুরগির গোসত ইত্যাদি। মাছের তেল স্মরণ শক্তি প্রখর বা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে তাই খাবার তালিকায় মাছের তেল থাকতে হবে অবশ্যই। শরীর চর্চা বা ব্যয়াম শরীরকে যেমন সুস্থ রাখে তেমনি মস্তিস্কে ও প্রফুল্ল রাখে। শরীর চর্চার ফলে শরীরের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে ফলে মস্তিস্কের স্মরণ শক্তি প্রখর হয়।

ধূমপান, অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে। ঘুমের সময় মস্তিস্ক সেইভিং মুড এর কাজ করে থাকে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে নিদ্রাপূর্ব পাঠের স্মৃতি সহজে বিলীন হয় না কারণ নিদ্রার ফলে স্মৃতি বাধাগ্রস্ত হয় না। প্রতিদিন, বই পড়া, ম্যাগাজিন পড়া সহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে মস্তিস্কে সক্রিয় রাখতে হবে। দাবা খেলা, গাণিতিক চর্চা, নেটে কিছু সময় গেমস খেললেও মস্তিস্ক সক্রিয় থাকে।

প্রয়োজনে রুটিন পদ্বতিতে আমরা কাজের অভ্যাস করতে পারি। দৈনিক কাজ গুলো ছক আকারে লিপিবদ্ধ করে রাখবে। কাজটি শেষ হলে টিক দিয়ে রাখতে পারি। নিয়মিত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। তাদের খোঁজ খবর নিতে হবে।

সর্বোপরি মানসিক চাপ বা অস্থিরতা থেকে দূরে থাকতে হবে। মানসিক এবং অতিরিক্ত কর্মভারের ফলেও আমরা অনেক কিছু ভুলে যেতে পারি। মানসিক চাপ দূর করতে বাগান করতে পারেন অথবা রোমানটিক ছবি বা গান শুনতে পারেন।

সর্বোপরি সুস্থ মন, সুস্থ দেহ মানুষের কাম্য। তাই সুস্থ থাকতে দেহ মন দুটোই আপনাকে সুস্থ রাখতে হবে। দেহের সঙ্গে প্রয়োজনে মনের চিকিৎসা করতে হবে। মানসিক সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন মনোচিকিৎসকের সাহায্য নেয়া যেতে পারে অথবা থেরাপি নিয়েও ভুলে যাওয়া সমস্যার অনেকটা সমাধান করা যায়।

লেখক: অধ্যক্ষ, উত্তরা আইডিয়াল কলেজ

 


সর্বশেষ

আরও খবর

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সংবিধান এবং আশাজাগানিয়া মুরাদ হাসান

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সংবিধান এবং আশাজাগানিয়া মুরাদ হাসান


গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার

গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার


মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন


নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!


তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!

তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!


সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?