Sunday, September 6th, 2020
সৌন্দর্যসেবায় আয় কমেছে সবার: বেকার ৪০ শতাংশ উদ্যোক্তা-কর্মী
September 6th, 2020 at 12:37 am
শিল্পখাত ঘোষণার সুফল মিলছে না।
সৌন্দর্যসেবায় আয় কমেছে সবার: বেকার ৪০ শতাংশ উদ্যোক্তা-কর্মী

বিশেষ প্রতিনিধি ঢাকা,

কোভিড মহামারির কারণে সৌন্দর্যসেবা খাতের ১৩ লক্ষাধিক উদ্যোক্তা-কর্মীর গড় আয় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। অনেক বড় বিনিয়োগকারীও আর্থিক ক্ষতি কমাতে এ খাত ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।  

এমনটা জানিয়ে বাংলাদেশ নরসুন্দর কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার শীল নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “কখনোই এত বড় বিপর্যয়ের মুখে পরিনি আমরা। এই পেশায় যারা আছেন, তাদের অবস্থা এখন খুবই শোচনীয়।” 

“শুধুমাত্র ঢাকাতেই ছোট-বড় ৫০-৬০টি স্যালন, পার্লার ও স্পা বন্ধ হয়ে গেছে। যার মধ্যে গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় কোটি টাকা বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠিত সুবিশাল পার্লারও রয়েছে,” বেনারকে বলেন তিনি।

দীপকের দাবি, সারাদেশে কমপক্ষে ১০ লাখ পুরুষ নরসুন্দর বা ক্ষৌরকারক এবং তিন লক্ষাধিক নারী সৌন্দর্য কর্মীকে চলমান সঙ্কট মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

এদের ৪০ শতাংশই করোনার কারণে কাজ হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিউটি সার্ভিস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএসওএবি) মুখপাত্র আফরোজা পারভিন। “তারা ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে বা চাকরি হারিয়েছে,” নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন তিনি।

সৌন্দর্য কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নকারী বেসরকারি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান উজ্জ্বলার এই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কোভিড শুরুর আগে দেশে ছয় লক্ষাধিক স্যালন, পার্লার ও স্পা ছিল। যার মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ নিবন্ধিত।

সংক্রমণ ঠেকাতে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাস পর্যন্ত অঘোষিত লকডাউন চলাকালে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো আয় ছিল না। সেলুন ও পার্লার কর্মীরা নিউজনেক্সটবিডিকে জানিয়েছেন, ৮ মার্চ দেশে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর থেকেই আয় কমতে শুরু করে তাদের।

জুলাইয়ের শুরুতে সবকিছু সীমিত আকারে খুলে দেওয়া হলেও নিয়মিত গ্রাহকদের বড় একটি অংশ সেবা নেওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় সেলুন ও পার্লারগুলোর অবস্থা নাজুকই রয়ে গেছে।

“উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। ঢাকার বাইরের মহানগর এবং জেলা-উপজেলা শহরগুলো থেকেও একের পর এক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার খবর আসছে,” বলেন দীপক।

ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোয় কিছু গ্রাহক গেলেও গত দুই মাসে তারাও দোকানের খরচের টাকা আয় করতে পারেনি। খোলা আকাশের নীচে সেবাদানকারী ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের আয়ও কমে গেছে।

ঢাকার মিরপুরের গ্রামীণ ব্যাংক সংলগ্ন এলাকায় চার দশক ধরে রাস্তার পাশে বসে মানুষকে এই সেবা দেওয়া মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন নিউজনেক্সটবিডিকে জানান, করোনা মহামারি শুরুর আগে দৈনিক চার-পাঁচশ টাকা আয় ছিল তাঁর, আর এখন দিন শেষে মাত্র ৭০-৮০ টাকা নিয়েও বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।

গত ১৭ মে বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিডব্লিউসিসিআই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, কোভিডের কারণে দেশের প্রায় ১৫ হাজার বিউটি পার্লার বন্ধ হয়ে গেছে। যার সাথে ১৫ হাজার নারী উদ্যোক্তাসহ প্রায় দেড় লক্ষ নারীর কর্মসংস্থান জড়িত।

গত কয়েক মাসে বন্ধ হওয়া বিউটি পার্লার আর বেকার কর্মীর সংখ্যা আরো বেড়েছে বলে জানিয়েছেন আফরোজা। বহু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পথে বসে গেছে বলেও জানান বিডব্লিউসিসিআই-এর এই সংগঠক।

এই বিপর্যয়ের মধ্যেই ৭ জুন জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে সরকার সৌন্দর্যসেবাকে শিল্পখাত ঘোষণা করে। “এ খাতের উদ্যোক্তারা যাতে সব ধরণের সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পায় সেজন্য এটাকে আমার শিল্পখাতের মর্যাদা দিয়েছি,” নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। 

তবে “প্রায় তিন মাস হতে চললেও ওই প্রজ্ঞাপন সৌন্দর্যসেবা খাতের বাণিজ্যে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলেনি,” বলেন রেড বিউটি স্টুডিও অ্যান্ড স্যালনের কর্ণধার আফরোজা।

একই বক্তব্য বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্যালনের ব্যবসা পরিচালনাকারী দীপকেরও। তাঁর দাবি, “জাতীয়ভাবে শিল্প ঘোষণা করা হলে আমাদের অবশ্যই সুবিধা পাওয়া উচিত।”

“এতদিন এই খাতের কোনো স্বীকৃতিই ছিল না,” উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “সৌন্দর্যসেবা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) একটি সম্ভাবনাময় খাত। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি নীতিমালা করে এ খাতের ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানকে তার আওতায় নিয়ে আসা হবে।”

বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিজেই উদ্যোক্তা, সেগুলোকে যাতে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায় সেই চেষ্টা করা হবে বলেও বেনারকে জানান মন্ত্রী। ঢাকার বাইরে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বেশী বলে জানিয়েছেন আফরোজা ও দীপক।  

শিল্পমন্ত্রী হুমায়ূন নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “এরা ছোট ছোট উদ্যোক্তা। গ্রাহক আসছে না, আয় নেই – এমন অবস্থায় টিকে থাকা এদের জন্য বেশ কঠিন।”

“করোনার কারণে শিল্প-বাণিজ্যের সবগুলো ক্ষেত্রই কমবেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে এখন যেহেতু সব কিছু খুলে দেওয়া হয়েছে, আশাকরি এই অবস্থা আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠতে পারবো আমরা,” যোগ করেন তিনি। 

বাড়ছে দুর্দশার গল্প : ঢাকার পল্লবীর লামিয়া হেয়ার স্টাইলিস্ট এন্ড ফেসিয়ালে কর্মচারী পঞ্চাশোর্ধ্ব মোহাম্মদ রশিদ। স্থানীয়ভাবে বিহারি ক্যাম্প হিসেবে পরিচিত শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি ৩৫ বছর ধরে এই পেশায় আছেন।

এত কম আয় তাঁর কখনোই হয়নি। তিন সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের পরিবারের খরচ যোগাতে তিনি এখন হিমশিম খাচ্ছেন। “ঘর ভাড়া দিতে পারছি না। খুব সাধারণ খাবার খেয়ে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছি আমরা,” নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন তিনি।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কমপক্ষে অর্ধশতাধিক নরসুন্দর ও বিউটি পার্লার কর্মী বেনারকে একইধরণের দুরাবস্থার কথা জানিয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জের নরসুন্দর শ্রমজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মানিক চন্দ্র শীল নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “বাধ্য হয়ে পেশা বদলানোর কথাও ভাবছেন অনেকে।”

“তবে আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় আছি তাদের পক্ষে অন্য কোনো কাজে অভ্যস্ত হওয়া সম্ভব নয়,” বলেন নরসুন্দরদের কেন্দ্রীয় নেতা দীপক।

মিরপুরের ছয় নম্বর সেকশনের নুপুর স্যালুনের নারায়ন দেবনাথ ২৫ বছর এবং মায়ের দোয়া স্যালুনের ওয়াজেদ মিয়া ২১ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। আয় কমে গেলেও এই পেশা ছাড়ার কোনো উপায় নেই বলে জানিয়েছেন তারাও।  

৪৮ বছর বয়সী রাব্বী হাছান ভাটারা এলাকার ওয়াজউদ্দিন রোডে যে স্যালুনটিতে কাজ করতেন, করোনার আগ মুহুর্তে সেটি কিনে নিয়েছেন। “সেখানে জীবনের পুরোটা সঞ্চয়ের পাশাপাশি ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। করোনা পরিস্থিতির কারণে দুশ্চিন্তায় পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে এখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন,” বলেন দীপক।

নিউজনেক্সটবিডিকে তিনি জানান, গুলশানে এক হাজার দুইশ বর্গফুটের একটি জেন্টস পার্লারের মালিক সব কর্মচারী বিদায় দিয়ে শুধুমাত্র নিজে কাজ করার জন্য ৬০ বর্গফুট রেখে বাকি জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন।

দীপকের নিজের স্যালনে তিনিসহ মোট চারজন কাজ করেন। করোনার আগে তাঁর তিন কর্মচারীর প্রত্যেকে গড়ে ১৫-১৮ হাজার টাকা আয় করতেন। এখন সবাই মিলে পুরো মাসেও এত টাকার কাজ পাচ্ছেন না তারা। 

লকডাউনের সময় রেডের তিনটি শাখার একটি বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন আফরোজা। তাদের দৈনিক গ্রাহকের গড় দুই হাজার থেকে পাঁচশতে নেমে এসেছে।

“সবধরণের স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে, আমরা নিরাপদ, এমন প্রচারণায়ও কাজ হচ্ছে না। সিংহভাগ গ্রাহক নিরাপদ বোধ করছেন না। দেড়শ কর্মী নিয়ে আমাদের জন্যও টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে,” বলেন তিনি। 

দীপক বলেন, “আসলে পেশাগত কারণে আমাদের যেভাবে গ্রাহকদের সংস্পর্শে আসতে হয়, তাতে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই কষ্টকর।” 

সাহায্য পায়নি সবাই : লকডাউন চলাকালে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরকারিভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা হলেও ঢাকার ৫২ হাজার নরসুন্দরের ভাগ্যে তা জোটেনি বলে জানান দীপক। এর জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ধ্বর্ণা দিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

“সেকেন্ডে সেকেন্ডে ফোন আসছে। সবাই জানতে চাচ্ছেন – আমাদের জন্য কী করছেন?” বলেন তিনি।

গত মাসে উজ্জ্বলার পক্ষ থেকে এক হাজার অসহায় নারী সৌন্দর্য কর্মীকে আর্থিক সহায়তা করার কথা জানিয়ে আফরোজা নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “যে পরিমাণ সাহায্যপ্রার্থী রয়েছে তার তূলণায় এই প্রয়াস খুবই সামান্য।”

উজ্জ্বলার ফেসবুক পেইজের ইনবক্সে সারাদেশ থেকেই সাহায্যের আকুতি আসছে বলেও উল্লেখ করেন এই রূপ বিশেষজ্ঞ।

স্যালন ও পার্লারগুলো কর্মরতরা সাধারণত ১৮-৬০ বছর বয়সী। পুরুষ নরসুন্দররা সাধারণত দৈনিক চুক্তিতে কাজ করেন। পারিশ্রমিকের অর্ধেক তাদের মালিককে দিয়ে দিতে হয়। করোনার আগেও মাসে গড়ে ১২-২০ হাজার টাকার বেশী আয় করতেন না তাদের কেউ।

“তবে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা বখশিশ হিসাবে অনেক টাকা আয় করতেন,” বলেন দীপক। 

অন্যদিকে আফরোজার দাবি, এ খাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ নারী কর্মীরা ৬০-৭০ হাজার টাকাও আয় করেন। তবে ঢাকায় নূন্যতম পাঁচ হাজার টাকা বেতন পেলেও রাজশাহী, খুলনার মতো বড় শহরে পাঁচ-সাতশ টাকা মাসিক বেতনেও কাজ করছে অনেক মেয়ে।


সর্বশেষ

আরও খবর

ভাইরাসের সাথে বসবাস

ভাইরাসের সাথে বসবাস


পেঁয়াজে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার

পেঁয়াজে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার


২৪ ঘণ্টায় আরও ৩২ জনের মৃত্যু

২৪ ঘণ্টায় আরও ৩২ জনের মৃত্যু


হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আটকেপড়া পেঁয়াজ ঢুকছে বাংলাদেশে

হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আটকেপড়া পেঁয়াজ ঢুকছে বাংলাদেশে


করোনায় মৃত্যু আরও ২২, নতুন শনাক্ত ১৫৪১

করোনায় মৃত্যু আরও ২২, নতুন শনাক্ত ১৫৪১


করোনায় আরও ৩৬ জনের মৃত্যু

করোনায় আরও ৩৬ জনের মৃত্যু


স্বর্ণের দাম বাড়ল ভরিতে ২ হাজার ৪৪৯ টাকা

স্বর্ণের দাম বাড়ল ভরিতে ২ হাজার ৪৪৯ টাকা


ভারতে এক দিনে রেকর্ড প্রায় ১ লাখ রোগী শনাক্ত

ভারতে এক দিনে রেকর্ড প্রায় ১ লাখ রোগী শনাক্ত


২৪ ঘণ্টায় ৪৩ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৭২৪

২৪ ঘণ্টায় ৪৩ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৭২৪


ভারত থেকে আসছে না পেঁয়াজ

ভারত থেকে আসছে না পেঁয়াজ