Thursday, August 6th, 2020
স্বপ্ন বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে
August 6th, 2020 at 3:00 pm
স্বপ্ন বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে

মাসকাওয়াথ আহসান:

গত ৩১ জুলাই রাতে মেজর (অব.) সিনহা ও সাহেদুল রাতে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে যাচ্ছিলেন। বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের ভাষায় ‘আত্মরক্ষার্থে’ ছোড়া গুলিতে নিহত হন সিনহা মো. রাশেদ খান। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সাহেদুলকে। তিনি ও শিপ্রা দেবনাথ দুটি আলাদা মামলায় এখন কারাগারে।

শিপ্রা, সাহেদুল আর তাসিন স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া স্টাডিজের ছাত্র-ছাত্রী। এরা নিহত মেজর সিনহার সঙ্গে তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজে সেখানে যান। তাসিনের বাবা মা বোধ হয় কিছুটা প্রভাবশালী বলে কিংবা দৈবচয়নে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর সাহেদুল ও শিপ্রাকে আটকে রেখে রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ।

এটা নতুন মিডিয়া বুমের যুগ; এসময় বিশ্বের নানাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মিডিয়া স্টাডিজের ছাত্রছাত্রী বদলে যাওয়া মিডিয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্রিয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি কোর্সে ৬০ নম্বর থিওরিতে তো ৪০ নম্বর প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষার মূল্যায়নে নিবেদিত। ফলে মিডিয়া স্টাডিজের ছেলে-মেয়েরা নিজ নিজ দেশে সারাক্ষণই কোন না কোন অডিও-ভিজুয়াল কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অতীতে চারুকলার ছাত্রছাত্রীদের দিনমান ছবি আঁকার নেশায় বিষয় খুঁজতে যেমন নানা জায়গায় ঘুরতে দেখা যেতো; আজকের যুগের মিডিয়া স্টাডিজের ছাত্রছাত্রীদের জীবন কতকটা তেমন সতত বিষয় অন্বেষণের জগত।

প্যাশন ছাড়া কোন কাজেই পারফেকশনিজম অর্জন করা যায় না। আজকের বাংলাদেশের মিডিয়া ও ফিল্মের নিম্নমান নিয়ে যে অসন্তোষ জনমনে দেখা যায়; বিশ্বের নানা দেশের মিডিয়া ও ফিল্মের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার গ্লানিতে যখন দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়; দেশ নিয়ে আশাবাদি মানুষের মনে; সেই দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটাতে পারে কেবল মিডিয়া ও ফিল্ম বিষয়ে প্রশিক্ষিত এই তরুণ ও তরুণীরা। এদের হাতেই মিডিয়া ও ফিল্মের সম্ভাবনাময় আগামি।

কিন্তু বাংলাদেশে এখন পুলিশ ও এলিটফোর্সকে বিভিন্ন জায়গায় তাদের ভাষায় “আত্মরক্ষার্থে” গুলি চালাতে হয়। পুলিশ প্রধান মেজর সিনহার মৃত্যু প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, ক্রসফায়ার বলে কিছু নেই আসলে; এটা এনজিও-র সৃষ্টি। একই প্রসঙ্গে সেনা প্রধান বলেছেন, এরকম হত্যাকাণ্ডের দায় ব্যক্তির; প্রতিষ্ঠানের নয়।

এতে করে আমাদের জনপদে বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের অবসানের কোন দিশা নেই। এরকম হত্যাকাণ্ডগুলোতে হয় তরুণেরা মারা যাচ্ছে; কিংবা পুলিশি হয়রানির মাঝে পড়ছে।

ফলে তরুণেরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে; ক্লাস করবে; ভাগ্য ভালো হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ক্ষমতার ফুটসোলজারের “ডিটেনশান সেন্টার”-এর নির্যাতনে আধমরা হয়ে বাঁচবে; এরপর কেরানি অথবা রাজনৈতিক দলের ফুটসোলজার ও উন্নয়নের ঠিকাদার হবে; এরকম একটি খর্ব চিন্তার বাংলাদেশ গড়ার আয়োজন চোখে পড়ছে ভীতির সংস্কৃতিতে লীন মানুষের চোখে। বাংলাদেশীদের মধ্যে অভিবাসী হবার প্রবণতাও একরকম জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যাবার মতো।

ফলে স্বপ্ন দেখার সাহস হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে।  আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর গল্পটি নিম্ন-মাঝারি মানের সৃজনশীলতার কোন পুলিশ বা সেনা কর্মকর্তা লিখেছিলেন; যে নিজেও গল্প লেখার স্বপ্ন ফেলে একটা সরকারি চাকরি নিয়ে সেইখানে একটু গল্প লেখার চেষ্টা করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। এই গল্পে নিহত লোকের পকেটে মাদক আর মৃতদেহের পাশে একটা পিস্তল থাকে। নিহতের সঙ্গে থাকারা বেঁচে গেলেও পুলিশ তার বুদ্ধির দৈর্ঘ্য অনুযায়ী মাদক কিংবা অন্য কোন প্রপস (যা নাটকের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়) থাকার অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করে আদালতে রিমান্ড চায়।

এই পুলিশেরা বাংলাদেশের ভুল সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় স্বপ্ন হারিয়ে একটা চাকরি করে বেঁচে থাকার স্বপ্নহীন জগতের মানুষ। স্বপ্নহীনতার কারণে অসুখি মানুষ। সুতরাং পথে কারো সঙ্গে দেখা হলে; যার স্বপ্ন আছে; পুলিশ তখন সেই স্বপ্নকে ছেঁটে দিয়ে নিজের স্বপ্নহীনতার প্রতিশোধ নেয়; দীর্ঘকালের পুলিশি আচরণ থেকে এমন মনোস্তত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

আর পুলিশ স্বজন ও প্রেম বঞ্চিত মানুষ তার চব্বিশ ঘন্টার পুলিশি দায়িত্বের কারণে। ফলে পার্কে গিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকাকে কান ধরে উঠবস করানোর কাজটি করে। নিজের শখের চুলে বাটি ছাঁট দিতে হয়েছে বলে, কারো লম্বা চুল দেখলে ছেঁটে দিতে চেষ্টা করে। “আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোঁড়ার” গল্পটি ক্ষমতায় টিকে থাকার খুঁটি গল্প হয়ে পড়ায়; ক্ষমতার সহমত ভাইয়েরা; শৈশব বঞ্চিত-স্বপ্নহীন আরেকদল ফুটসোলজার; যাদের জীবন পাকস্থলী কেন্দ্রিক; যাদের মাঝে প্রেম প্রীতির আলোড়ন নেই; বড় জোর লাল বাতি লাস্যে ‘পাপিয়া’ লোভ নিয়ে বাঁচে যারা; এরা আবার “আত্মরক্ষার্থে আরো গুলি ছোঁড়া” চাই বলে একে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

ফলে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া স্টাডিজের ছাত্র-ছাত্রীর মতো স্বপ্নের পিছে ছুটে চলা সুখি মানুষ দেখলে; নিজেদের স্বপ্নহীন শৈশব-প্রেমহীন বর্তমান-উদ্দেশ্যহীন জীবনের প্রতিশোধ জাগে পুলিশ ও সহমত ভাইয়ের মনে।

প্রতিদিনের জীবনে দৃশ্যমান নায়ক ও খলনায়ক এরা যে সমাজ বাস্তবতায় বাস করে; সেখানে স্বপ্ন বনাম স্বপ্নহীনতার লড়াইটিই আসলে দেখি আমরা।

১৯৭১ সালের স্বপ্নহীন দখলদার খুনি পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে “আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো” ও এরপর রক্তের নেশার রিসংসায় নারীদের রিমান্ডে নিয়ে আদিম অন্ধ অক্ষম লোমওঠা নেকড়ে হয়ে উঠতে দেখা যায়। অস্ত্র মনস্বত্ব হচ্ছে; এই অস্ত্র স্বপ্নহীন মানুষের মাঝে স্বপ্ন হত্যার ক্ষমতা দেয়। “আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো” ও “নারীদের রিমান্ডে নেয়া” এই দুটি আইডেন্টিক্যাল বৈশিষ্ট্য আইনের শাসনহীন স্বপ্নহীন সমাজ গড়ার রেসিপি।

এই হত্যা ও নারী লিপ্সার জাস্টিফিকেশানে দখলদার স্বপ্নহীনদের মাঝে ডিনাইয়াল বা অস্বীকার প্রবণতা তৈরি হয়। তখন “মুক্তিযুদ্ধ ভারতের সৃষ্টি”; “বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি”, “বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ড সুশীলের সৃষ্টি” এরকম সৃষ্টিছাড়া কথা বার্তা বলে স্বপ্নহীন মানুষেরা।

কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, বা মেজর সিনহা নিহত হবার পর তার তথ্য চিত্র প্রকল্পের তরুণ-তরুণীদের কারাগারে নিক্ষেপ এসবই পেডোফিলিক আচরণ। স্বপ্নহীনতাই তারুণ্য নিধনের ও স্বপ্ন হত্যার কাজের মধ্যে দিয়ে পেডোফিলিয়া হিসেবে প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও দায়িত্বপূর্ণ পদে কর্মরতদের এই ফয়সালা এখন করতে হবে; তারা স্বপ্নের বাংলাদেশ চান নাকি স্বপ্নহীনতার বাংলাদেশ চান! বাংলাদেশে গত তিনটি দশকের দুর্নীতি বিপ্লবের মাঝ দিয়ে যে নতুন রুলিং এলিট জন্ম নিয়েছে; তারা দেশের সম্পদ লুন্ঠন করে বিদেশে সেকেন্ড হোমে পাঠিয়েছেন তাদের ছেলে-মেয়েদের; সভ্য জগতের স্বপ্ন দেখতে।  বাংলাদেশ যেন স্বপ্নহীন এক “জিজিয়া-কর” আদায়ের ক্ষেত্র; যেখানে তারুণ্যের জন্য বেদনার নীলচাষ করে নতুন সাহেব হয়ে উঠেছেন স্বদেশী সাহেবেরা; যারা চোখের ছানি কাটতে বিদেশের হাসপাতালে যান; বাঁচার স্বপ্নে করোনাকালে দেশে ভি আই পি হাসপাতাল গড়েন অথবা এয়ার বাসে উড়ে যান সেকেন্ড হোমে।

এই স্বদেশী ঔপনিবেশিক নব্য জমিদারদের গড়া স্বপ্ন-হত্যার উপনিবেশ থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে হবে। ষোলকোটি মানুষের পক্ষে জীবন বাঁচাতে অন্য কোথাও পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়; সাতে পাঁচে থাকিনা দাদা বলে বারান্দায় উঠে গিয়ে বাঁচার উপায় নেই, ও মানুষ দুইডো চোখ দেখপা, দুইডো কান শুনবা, একটা মুখতো, একটু কথা কম কবা গান গাইলেই স্বপ্নহননের বুলেটের নিশানা হবে না তার সন্তানের দেহ; এমন গ্যারান্টিও নেই । তাই নিজেকে বাঁচতে হবে; সন্তানকে বাঁচাতে হবে; এ এক অস্তিত্বের লড়াই; স্বপ্ন বাঁচানোর লড়াই। কেবল স্বপ্ন বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে।


মাসকাওয়াথ আহসান

সর্বশেষ

আরও খবর

৪২ ও ৪৩তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

৪২ ও ৪৩তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ


বিদায় কিংবদন্তি যুদ্ধ সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক

বিদায় কিংবদন্তি যুদ্ধ সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক


করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত


ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড


মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী


আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার

আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার


পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি

পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি


দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির

দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির


বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে

বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে


অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ

অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ