Saturday, September 5th, 2020
স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন
September 5th, 2020 at 12:29 am
স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর – নাজমুল আহসান শেখ রচিত ১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে বইয়ের ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্ব)


জনাব এ কে খন্দকার সাহেব তার বইয়ের ৫৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার জন্য সংবাদ পাঠিয়েছিলেন। কোথাও কোথাও এমনও উল্লেখিত হয়েছে যে বঙ্গবন্ধু ইপিআরের বেতার যন্ত্রে বা ডাক ও তার বিভাগের টেলিগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণার বার্তাটি প্রচার করেন।’ স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও জনাব এ কে খন্দকার সাহেব বস্তুত দুটি বিষয়ে যুক্তিসংগত প্রমাণের অপেক্ষায় আছেন। বিষয় দুটি হলো : ‘বঙ্গবন্ধু কি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন আর তা কীভাবে চট্টগ্রামে জনাব জহুর আহমেদ সাহেবের কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল!’

যুক্তিসংগত নির্ভরযোগ্য্রমাণেরপ সন্ধানে : ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এভাবে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এ প্রসঙ্গে জি ডব্লিউ চৌধুরী The Last Days Of United Pakistan গ্রন্থের ১৬১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন ..The daily Telegraph (London) reported on March 9, 1971 that Sheikh Mujibur Rahman appears to have declared the independence of East Pakistan. একই দিন দৈনিক টেলিগ্রাফ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয় – ‘Already we hear the putative name of the separate state that East Pakistan could become Bangladesh’ Similar reports appeared in the Economist (March 13, 1971) and the Time magazine (March 15, 1971): Pakistan as it stands today is Finished.

একই ভাষণে বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্টভাবে বলে গিয়েছিলেন যদি (পরিস্থিতিগত কারণে) তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে না পারেন, তাহলে কী করণীয়,
 
‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’ ৭ মার্চের ভাষণেই বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে এই ধরনের পরিস্থিতিতে কী করণীয় তার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে গিয়েছিলেন।

আর ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার পর সে রকম পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে যারা বিদ্রোহ করেছিলেন, তাদের বক্তব্যে তাই প্রমাণিত হয়। রামগড়ে মেজর রফিক বীরউত্তম (লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম), ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মেজর শাফায়াত জামিল বীরবিক্রম (একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর, কর্নেল শাফায়াত জামিল), জয়দেবপুরে মেজর শফিউল্লাহ ‘এদের কেউই’ কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন নাই। আরো যেমন বসে থাকেন নাই রাজারবাগের বীর পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা, পিলখানার আর চুয়াডাঙ্গার মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিডিআরের সৈনিকরা।

রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রান্ত হয় ২৫ মার্চ রাত ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রাজারবাগ ওয়্যারলেস বেজ স্টেশনে বসে থাকা কনস্টেবল শাহজাহান তার ওয়্যারলেস সেটে বলতে শুরু করল, ‘Base for all stations of East Pakistan Police, keep listening, watch, we are already attacked by PAK army, try to save yourself over.’  (নক্ষত্রের রাজারবাগ, মোশতাক আহমেদ পৃ. ১৬৭-১৬৮)।


কনস্টেবল শাহজাহানের এই মেসেজটি সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। হুমায়ূন আহমেদের বাবা জনাব শহীদ ফয়জুর রহমান ২৫ মার্চ রাতে পিরোজপুরে কর্মরতঅবস্থায় এই মেসেজ শুনতে পেয়েছিলেন। (প্রফেসর ডক্টর মুহম্মদ জাফর ইকবালের সাক্ষাৎকার ৮ জুলাই ২০১১, একাত্তর এবং আমার বাবা, হুমায়ূন আহমেদ)। তাই দেখা যাচ্ছে টেলিগ্রাফ ছাড়াও ঢাকা থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা বা বার্তা চট্টগ্রামে বা দেশের যে কোনো স্থানে পাঠানোর একাধিক উপায় ছিল। এর পরপরই রাজারবাগ পুলিশ লাইনে শুরু হয় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ, যার বিস্তারিত এবং জীবন্ত বর্ণনা পাওয়া যায় মোশতাক আহমেদ রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘নক্ষত্রের রাজারবাগ’ গ্রন্থে। রাজারবাগের বীর পুলিশ বাহিনী প্রকৃতপক্ষেই যার যা আছে তাই (৩০৩ রাইফেল) দিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাত ১০-১১টার মধ্যে ক্যান্টনমেন্ট থেকে শহরে প্রবেশ করে এবং রাজারবাগ, পিলখানা ও ঢাকা ইউনিভার্সিটির দিকে অগ্রসর হতে থাকে। গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু কমপক্ষে দু’বার সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গিয়েছিলেন তার প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায় সাংবাদিক ডেভিড লোশাকের ‘পাকিস্তান ক্রাইসিস’ গ্রন্থের ৯৮-৯৯ পৃষ্ঠায়। তিনি লিখেছেন ‘The voice of Sheikh Mujibur Rahman came faintly through on a wavelength close to that of the official Pakistan Radio. In what must have been, and sounded like a Pre-recorded message, the Sheikh Proclaimed East Pakistan to be the People’s Republic of Bangladesh.’

সম্প্রতি শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদের কন্যা শারমিন আহমেদের লেখা গ্রন্থ ‘তাজউদ্দীন আহমেদ নেতা ও পিতা’ গ্রন্থে (পৃ ৩০১-৩১০) আমরা সেই ব্যক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। তিনি হচ্ছেন টিঅ্যান্ডটির শহীদ প্রকৌশলী এ কে এম নুরুল হক, যিনি একসময় পাকিস্তানে টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। তিনি ২৫ মার্চ জনাব আমিরুল ইসলামকে জানিয়েছিলেন যে তিনি খুলনা থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ট্রান্সমিটার এনেছেন। এই ট্রান্সমিটারের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রচার করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় ঘোষণাটি রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানা আক্রমণ বিষয়ে প্রণীত। এই ঘোষণাটির মূল ডিকটেশন তিনি নিজেই দিয়েছিলেন টেলিফোনে। জনাব এ কে খন্দকার সাহেবের মতো অনেককেই প্রশ্ন করতে পারেন যে, ‘কার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু এই টেলিগ্রাফ প্রেরণ করেছিলেন?’টেলিগ্রাফ অফিসে বঙ্গবন্ধুর এক কর্মী এই ডিকটেশন গ্রহণ করে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে তা চট্টগ্রামে জহুর আহমেদ চৌধুরীকে প্রেরণ করেন।পাকিস্তানিরাএই মহান দেশপ্রেমিক কর্মীকে শহীদ প্রকৌশলী এ কে এম নুরুল হকের মতো হত্যা করে। এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় HERBERT FELDMAN Gi The End And The Beginning (Pakistan 1968-1971)  গ্রন্থে। (পৃ. ১২৮/ ফুটনোট অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস ১৯৭৫)

টেলিগ্রাফে যে বার্তাটি পাঠানো হয়েছিল তা নিম্নরূপ : The message of Sheikh Mujib

To

The people of Bangladesh

On the night of 25th March, 1971

Pakistan armed forces suddenly have attacked our country under the cover of darkness. They have treacherously attacked the East Pakistan rifles base, Pilkhana and Rajarbag police barracks in Dacca, killing lacs of unarmed people. The East Pakistan rifles in Dacca, the police and the people are fighting the enemy forces sternly. Let the world know of the genocide. Brethern, take up the arms, whichever you have Resist the enemy forces at any cost. May Allah bless you and help you in your struggle for freedom.

Jai Bangla

-S.M.R


১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে Indian Associated Publishing Co. Private Ltd. থেকে প্রকাশিত গাজীউল হকের Bangladesh Unchained গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।] লক্ষণীয় যে বার্তাটির শেষে বঙ্গবন্ধুর নামের আদ্যাক্ষর ‘ এস.এম. আর’ লেখা। যার অর্থ শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭১ সালে সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতিদিনই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ‘বজ্রকণ্ঠ’ অনেকবার প্রচার করা হতো। তাজউদ্দীন আহমেদের মতো বড় মাপের নেতা থাকা সত্ত্বেও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তার কোনো নিয়মিত বক্তব্য, ভাষণ বা বাণী প্রচারের প্রয়োজন হয় নাই। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে এবং একই সঙ্গে তার স্বকণ্ঠে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার রেকর্ড না থাকার কারণে, ৭ মার্চের সেই স্বাধীনতার পরোক্ষ ঘোষণাই সময়ের দাবিতে স্বাধীনতার ঘোষণায় পরিণত হয়।

ডা. বেলায়েত হুসাইন, এম. ডি বর্তমানে ট্রয়, ওহাইও, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের ছাত্র। তিনি লিখেছেন, “রাত আনুমানিক ১২টা ৩০ মিনিট। মাইকের শব্দে ঘুম ভাঙল। কান পেতে শুনলাম ঘোষণা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেছেন। দেখলাম দু’জন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক। আগের সৈনিকটি ততোধিক উত্তেজনা মিশ্রিত স্বরে বলল, ‘শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। লড়াই শুরু হয়ে গেছে’।” (একাত্তর স্মরণে, ডা. বেলায়েত হুসাইন পৃ. ১৩-১৪)

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা যে চট্টগ্রামে ২৫ মার্চ রাতেই পৌঁছেছিল, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ডা. বেলায়েত হুসাইন এম ডি’র মতো চট্টগ্রামে অবস্থিত অনেকের লেখাতেই পাওয়া যায়।

আসুন সঠিক ইতিহাসের স্বার্থেই আরেকবার ফিরে যাই চট্টগ্রামে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে। এখন দৃষ্টি দেয়া যাক ক্রমানুসারে রেডিওতে স্বাধীনতার ঘোষণা কে এবং কখন প্রচার করেছিল।

রেডিওতে স্বাধীনতার ঘোষণা: স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা : হারুন হাবীব সম্পাদিত ‘প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থে মোস্তফা আনোয়ারের বেতার বিদ্রোহ শীর্ষক লেখায় তিনি লিখেছেন : ‘আওয়ামী লীগের হান্নান সাহেব প্রথম বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি পড়েছিলেন (কালুরঘাট ট্রান্সমিটার থেকে ২৬ মার্চ দুপুর ১টা ৫ মিনিটে।’ [পৃ. ৪৬])

স্বাধীনতার দ্বিতীয় ঘোষণা : এর প্রায় মিনিট পনেরো পর এম. এ হান্নান আবার একটি লিখিত বক্তব্য প্রচার করতে আসেন। কিন্তু বেলাল মোহাম্মদ এম. এ হান্নানকে নাম প্রচার করতে দেননি, তবে বক্তব্য প্রচার করতে দিয়েছিলেন (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বেলাল মোহাম্মদ)।

স্বাধীনতার তৃতীয় ও চতুর্থ ঘোষণা : ‘২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণ প্রসঙ্গে দু’বার এম. এ হান্নানই শুধু প্রচার করেননি বরং বঙ্গবন্ধুর তারবার্তাটির মূল ও অনুবাদ আবুল কাশেম সন্দ্বীপ এবং আব্দুল্লাহ আল ফারুক পাঠ/প্রচার করেছিলেন’। “সেই সূত্রে দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ২৭ মার্চ আমাদের সঙ্গে যোগদান করে মেজর জিয়া যে ঘোষণা প্রচার করেছিলেন, তাকে অবশ্যই পঞ্চম ঘোষণা বলা সংগত”। (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র.পৃষ্ঠা-২৬৯)

প্রকৃতপক্ষে জিয়াউর রহমানের আগে পঞ্চম ও সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘোষণাটি দিয়েছিলেন মাহমুদ হোসেন!  স্বাধীনতার পঞ্চম ঘোষণা : ‘মাহমুদ হোসেন বলেছিলেন : আমি ইংরেজি একটা ঘোষণা প্রচার করেছি মাত্র। বলতে পারেন এস ও এস। সম্বোধন করেছি ‘হ্যালো ম্যান কাইন্ড বলে। এই মিনিট দশেক।’ (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র. পৃষ্ঠা-৩৭)

এই মাহমুদ হোসেন ছিলেন ইউরোপ প্রবাসী বাঙালি যুবক। অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের ‘এ লিগেসি অব ব্লাড’ থেকে জানা যায়, এই মাহমুদ হোসেনের বাড়ি ছিল বগুড়ায়। ২৫ মার্চে তিনি চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ হোটেলের বোর্ডার ছিলেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাইয়ের ভ্রাতৃ কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। তার দৃঢ়বিশ্বাস ছিল তিনি ভারত থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারবেন। তাই তিনি বেলাল মোহাম্মদকে নিয়ে মেজর জিয়ার কাছে গিয়েছিলেন। তারপর এক পর্যায়ে মাহমুদ হোসেন জিয়াউর রহমানের অষ্টম বেঙ্গলের সৈনিকদের গুলিতে মারা যান। মাহমুদ হোসেনের মৃত্যু রহস্যাবৃত। তার লাশ বুড়া মৌলভীর টেকে তিনদিন জলে ভেসে ছিল, কেউ সে লাশ দেখতে যাননি, এমনকি তার বন্ধু বেলাল মোহাম্মদও নন! (অন্তর্ঘাত ১৯৭১, মানিক চৌধুরী) মেজর রফিক (লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম) এবং বেগম মুশতারী শফির বইয়ে আমরা এই মাহমুদ হোসেনের বর্ণনা পাই (স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন, বেগম মুশতারী শফি)। জেনারেল নিয়াজী হয়তো এসব রহস্যের কারণেই তার বইয়ে বলেছিলেন, ‘চট্টগ্রাম ছিল প্রতারণামূলক স্থান’।

উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে আজমপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে অবস্থিত ‘আমীর কমপ্লেক্স’-এর অন্যতম স্বত্বাধিকারী ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল হক সাহেব তার স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থের ৪০-৪১ পৃষ্ঠায় (ছড়ানো পৃথিবী, মুহাম্মদ ফজলুল হক) ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রামের এই মাহমুদ হোসেন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।

স্বাধীনতার ষষ্ঠ ঘোষণা : ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান প্রথম বাঙালি সামরিক অফিসার হিসেবে এই ঘোষণাটি পাঠ করেন বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দিয়ে নিজের নামে। এই ঘোষণা কিছুক্ষণ পরপরই প্রচার করা হতে থাকে কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে। পরবর্তী সময়ে উপস্থিত সবার চাপে তিনি বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করতে বাধ্য হন।
গোলাম মুরশিদ (মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর একটি নির্দলীয় ইতিহাস, গোলাম মুরশিদ) তাই যথার্থই লিখেছেন মেজর জিয়ার এই ঘোষণা সম্পর্কে: ‘তিনি ঘোষণা দেওয়ার অন্তত ৪০ ঘণ্টা আগে থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বাঙালিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করেছিলেন। তার ঘোষণা শুনে কেউ সংগ্রাম আরম্ভ করেননি। কিন্তু একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, তার ঘোষণা বাংলাদেশের যেসব জায়গায় শোনা গিয়েছিল, সেসব জায়গার লোকেরা দারুণ উৎসাহিত হয়েছিলেন।’ প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা তাই ছিল।

স্বাধীনতা  যুদ্ধের  প্রথম  প্রহরে  ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়  মেজর  শাফায়াত  জামিল বীরবিক্রম এবং জয়দেবপুরে মেজর শফিউল্লাহ বীরউত্তম’এর নেতৃত্বে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, রাজারবাগের বীর পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা, পিলখানার আর  চুয়াডাঙ্গার  মেজর  আবু  ওসমান  চৌধুরীর  নেতৃত্বাধীন  বিডিআরের  সৈনিকরা এবং এস. পি মাহাবুব বীরবিক্রম ও জনাব তৌফিক ই ইলাহি চৌধুরী বীরবিক্রম’এর নেতৃত্বে পুলিশ এবং জনগণ যুদ্ধ শুরু করলেও সেই সময় অত্যন্ত দুর্বল যোগাযোগ ব্যাবস্থার কারণে শুধু স্থানীয় জনগণ ব্যতীত সমগ্র দেশবাসী বাঙালি সৈনিকদের বিদ্রোহ এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগদান সম্পর্কে
একেবারেই অবহিত ছিল না। রেডিওতে মেজর জিয়ার ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশবাসী প্রথম বাঙালি সৈনিকদের বিদ্রোহ এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগদান সম্পর্কে  প্রথমবারের মতো অবহিত হয়।

এক পর্যায়ে জনাব এ কে খন্দকার সাহেব আবার লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা আর ঘোষকের (আসলে লেখা উচিত ছিল রেডিওতে) বিষয়টি আমাদের  মুক্তিযুদ্ধকে খুব বেশি প্রভাবিত না করলেও পরবর্তী সময়ে অনেক বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে।’ আসলে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে প্রথম এক সপ্তাহের পর উল্লেখ করার মতো কোনোভাবেই প্রভাবিত করে নাই, আর সেই কারণেই স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নিয়ে কোনো বিতর্ক বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় নাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ইতিহাস বিকৃতির ফলে অনেক মানুষ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়েছিল। আর জনাব এ কে খন্দকার সাহেব তার বইয়ের মাধ্যমে সম্প্রতি (ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃতভাবে) সেই বিভ্রান্তিকে আর একটু উসকে দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের ছাত্র বেলায়েত হুসাইন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং জেড ফোর্সের সঙ্গে তিনি ‘ডাক্তার সাব’ হিসেবে কাজ করেন। তিনি তার বইয়ের (একাত্তর স্মরণে, ডা. বেলায়েত হুসাইন) মুখবন্ধে লিখেছেন, ‘১৯৭৫ সালে যখন আমি পিজি হাসপাতালে, তখন আমি প্রথম আমার ডায়েরিটা প্রকাশ করার কথা ভাবি। ঘটনাক্রমে জেনারেল জিয়াকে এটা বলায় তিনি লেখাটি পড়তে চান। পড়ার পর তিনি আমাকে বলেন এটাকে রি-রাইট করতে!’

ইতিহাস বা সত্য ঘটনা রি-রাইট করা যায় না, কারণ সত্য একটাই; ইতিহাস বা সত্য ঘটনা অবশ্য বিকৃত করা যায়।


 
মূল তথ্যসূত্র :
১. মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর একটি নির্দলীয় ইতিহাস, গোলাম মুরশিদ, ২. অন্তর্ঘাত ১৯৭১, মানিক চৌধুরী, উন্মেষ প্রকাশনী, সেক্টর ৩, উত্তরা, ঢাকা,  ৩. একাত্তর এবং আমার বাবা, হুমায়ূন আহমেদ, ৪. স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বেলাল মোহম্মদ, ৫. প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে মুক্তিযুদ্ধ, হারুন হাবীব সম্পাদিত, ৬. একাত্তর স্মরণে, ডা. বেলায়েত হুসাইন, ৭. স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন, বেগম মুশতারী শফি, ৮. নক্ষত্রের রাজারবাগ, মোশতাক আহমেদ, ৯. লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম, ১০. Pakistan Crisis, David Loshak, ১১. তাজউদ্দীন আহমেদ নেতা ও পিতা, শারমিন আহমেদ, ১২. মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন, এ কে খন্দকার, মঈদুল হাসান, এসআর মির্জা, ১৩. নিয়াজীর অত্মসমর্পণের দলিল, সিদ্দিক সালিক/ ভাষান্তর মাসুদুল হক, ১৪. একাত্তুরের জীবনযুদ্ধ, শামসুল ইসলাম সাইদ, ১৫. The Last Days Of United Pakistan, জি ডব্লিউ চৌধুরী, ১৬. Bangladesh Unchained গাজীউল হক, ১৭. একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর, কর্নেল শাফায়াত
জামিল, ১৮. HERBERT FELDMAN, The End And The Beginning, ১৯. বিদ্রোহী মার্চ ১৯৭১, মেজর রফিকুল ইসলাম (অব.) পিএসসি, ২০. একাত্তর আমার, মোহম্মদ নুরুল কাদের

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি : ২১. কর্নেল হুদা এবং আমার যুদ্ধ, নীলুফার হুদা, ২২. একাত্তুরের দিনগুলি, জাহানারা ইমাম, ২৩. গেরিলা থেকে সম্মুখযুদ্ধে, মাহবুব আলম, ২৪. জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা, মেজর কামরুল ইসলাম ভুইয়া , ২৫. একাত্তুরের গেরিলা, জহিরুল ইসলাম, ২৬. একাত্তুরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা’, মেজর হামিদুল হোসেন তারেক, বীর বিক্রম, ২৭. যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা, মেজর নাসিরউদ্দীন, ২৮. স্বাধীনতা ৭১, কাদের সিদ্দিকী, বীর উত্তম, ২৯. একাত্তুরের বীরযোদ্ধা, প্রথম খ- সম্পাদক মতিউর রহমান, ৩০. মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস, মেজর এম এস ভুইয়া, ৩১. ছড়ানো পৃথিবী, মুহাম্মদ ফজলুল হক


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ জিয়া-এরশাদ-খালেদা কর্তৃক খুনিচক্রের স্বার্থরক্ষা

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ জিয়া-এরশাদ-খালেদা কর্তৃক খুনিচক্রের স্বার্থরক্ষা


বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, কথা বলছে ইতিহাস!

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, কথা বলছে ইতিহাস!


বাঙালির শোকের দিন!

বাঙালির শোকের দিন!


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে