Wednesday, July 13th, 2016
স্মরণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
July 13th, 2016 at 5:14 am
স্মরণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

ডেস্কঃ তিনি ছিলেন কৃতী শিক্ষার্থী, গুণী শিক্ষক, সফল রাজনীতিবিদ, শখের আইনজীবী, দার্শনিক এবং ডক্টরেট ডিগ্রীধারী প্রথম বাঙালী। বহুভাষাবিদ হিসেবে তার সুখ্যাতি বিশ্বজোড়া। যে শব্দের কোন উৎপত্তি খুঁজে পাওয়া যেতো না, সে শব্দেরও খোঁজ মিলতো তার কাছে, তাই বুদ্ধিজীবি সমাজে জনপ্রিয় ছিলেন ‘চলিষ্ণু বিদ্যাকল্পদ্রুম’ নামে। ইংরেজি, ফরাসি, সিংহলি, জার্মান, আরবি, উর্দু, হিব্রু, গ্রীক, ল্যাটিন, পাঞ্জাবী, গুজরাটি, মারাঠি ও তামিল সহ বিশটিরও বেশী ভাষায় তার দক্ষতা ছিল অপরিসীম।

তিনি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৯৬৯ সালের এই দিনে (১৩ জুলাই) ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এই গুণী ব্যক্তিত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। ভাষাক্ষেত্রে তার অমর অবদানকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ঐ বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ঢাকা হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় শহীদুল্লাহ হল। আজ, তার ৪৭ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে নিউজনেক্সটবিডি ডটকম পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণের আয়োজন করা হল।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্ম ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই তৎকালীন ভারতের পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার পেয়ারা গ্রামে। পিতার নাম মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ এবং মাতার নাম নুরুন্নেছা।

১৯০৪ সালে হাওড়া জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স এবং ১৯০৬ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ পাশ করেন। ১৯১০ সালে সিটি কলেজ, কলকাতা থেকে সংস্কৃতে সম্মান-সহ বি.এ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ (১৯১২) ডিগ্রী অর্জন। এছাড়াও, ১৯২৫ সালে তিনি সরবন বিশ্ববিদ্যালয়, প্যারিস থেকে পি.এইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করার পূর্বেই কিছুকাল তিনি যশোর জেলা স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।

প্রথম বাঙালী মুসলমান হিসেবে সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে পাশ করার পর একই বিষয়ে মাস্টার্স করতে চাইলে তৎকালীন পন্ডিতবর্গ অমুসলিম কাউকে সংস্কৃত পড়াতে অমত প্রকাশ করায় বাধ্য হয়ে তাকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করতে হয়।

এন্ট্রান্স পাশের সময় থেকেই মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিভিন্ন ভাষার প্রতি অতি উৎসাহী ও আগ্রহী হয়ে উঠেন এবং একাধিক ভাষা শিক্ষা শুরু করেন। ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত চব্বিশ পরগণার বশিরহাটে আইন ব্যবসা করেন। তিনি একবার বশিরহাটে পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেনের সহকর্মী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পাশাপাশি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২২ থেকে ১৯২৪ সালে পর্যন্ত আইন বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৩৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও রিডার হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখান থেকে ১৯৪৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর তিনি বগুড়ার সরকারী আজিজুল হক কলেজে প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ফরাসি ভাষার খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৫৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও পালি বিভাগে যোগদান করে ১৯৫৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই দেশের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে যে ক’জন ব্যক্তি জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তার এই ভূমিকার ফলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ অনেকখানিই প্রশস্ত হয়। জাতিসত্তা সম্পর্কে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র স্মরণীয় উক্তি ছিল

“আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালি”

বিভিন্ন ভাষায় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর দখল ছিল অসাধারণ ও অসামান্য। উর্দু ভাষার অভিধান প্রকল্পেও তিনি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। পরে পূর্ব পাকিস্তানি ভাষার আদর্শ অভিধান প্রকল্পের সম্পাদক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে যোগ দেন। ১৯৬১ – ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমির ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্পের অস্থায়ী সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক গঠিত বাংলা একাডেমির পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন। তার নেতৃত্বে বাংলা পঞ্জিকা একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত রূপ পায়।

তার গবেষণামূলক গ্রন্থ ও প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। এছাড়া তিনি ৪১টি পাঠ্যবই লিখেছেন, ২০টি বই সম্পাদনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের উপর তার লিখিত প্রবন্ধের সংখ্যা ৬০টিরও বেশী। ভাষাতত্ত্বেও উপর রয়েছে তার ৩৭ টি রচনা। এছাড়া তিনি তিনটি ছোট গল্প এবং ২৯টি কবিতাও লিখেছিলেন। ১৯২০ সালে কলকাতা থেকে ‘অঙ্কুর’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। ১৯২২ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত পাক্ষিক ও মাসিক জার্নাল সম্পাদনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হল- ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, দীওয়ানে হাফিজ, রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম, বিদ্যাপতি শতক, বাংলা সাহিত্যের কথা (২ খণ্ড), বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমেরিটাস অধ্যাপক পদ লাভ করেন। একই বছর ফ্রান্স সরকার তাকে সম্মানজনক পদক ‘নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার্স’ প্রদান করে।

নিউজনেক্সটবিডিডটকম/এসকেএস


সর্বশেষ

আরও খবর

প্রয়াণের ২১ বছর…

প্রয়াণের ২১ বছর…


বীর উত্তম সি আর দত্ত আর নেই, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শোক

বীর উত্তম সি আর দত্ত আর নেই, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শোক


সংগীতের ভিনসেন্ট নার্গিস পারভীন

সংগীতের ভিনসেন্ট নার্গিস পারভীন


সিরাজগঞ্জে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে কামাল লোহানীকে

সিরাজগঞ্জে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে কামাল লোহানীকে


জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আর নেই

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আর নেই


ওয়াজেদ মিয়ার ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ওয়াজেদ মিয়ার ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ


একুশে পদকপ্রাপ্তদের হাতে পুরষ্কার তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

একুশে পদকপ্রাপ্তদের হাতে পুরষ্কার তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী


প্রধানমন্ত্রীর হাতে রান্না করা খাবার সাকিবের বাসায়

প্রধানমন্ত্রীর হাতে রান্না করা খাবার সাকিবের বাসায়


জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী আজ

জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী আজ


জাপানে হেইসেই যুগের অবসান হচ্ছে আজ

জাপানে হেইসেই যুগের অবসান হচ্ছে আজ