Thursday, June 14th, 2018
স্মরনে হাবিবুর রহমান মিলন
June 14th, 2018 at 12:02 pm
স্মরনে হাবিবুর রহমান মিলন

সৌম্য রহমান:

তিনবছর হয়ে গেলো; ১৩ তারিখ সন্ধ্যা ৬টা থেকে খবর আসছিলো নানাভাই’র শারীরিক পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে ক্রমশ, আমরা প্রত্যেকে, বাসায় এবং হাসপাতালে, জেগে ছিলাম। অবচেতন বলছিলো তাহলে আজকে রাতই…এবং ভোররাত দুটো পয়তাল্লিশ মিনিটে মৃত্যুসংবাদ এলো। সে রাতে বাসার অনেককে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়তে দেখেছিলাম। পরের দুইদিন অনেকটা স্বপ্ন আর ঘোরের মধ্যদিয়ে চলে গেলো মনে হলো। কবরে কখনো নামতে চাইনি কিন্তু ১৫ জুন বিকেলে নেমে গেলাম; মরদেহ কবরে শায়িত করার অনুভূতি খুব ভালো নয়। মৃত মানুষের নিথর অনুভূতিশূন্য মুখ; কোনো না কোনো একদিন প্রত্যেকের নিয়তি এ-ই, কিন্তু যখন এটি ঘটতে থাকে, কোনোকিছু এর সাথে তুলনীয় থাকে না।

এরপর তিন বছর চলে গেছে; বছর দুই নানার কক্ষটিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি, তাঁর পোশাক-সিগারেট-কলম-ঔষধসমেত আলনা, খাটের পেছনে অটবি’র ছোটো একটা ড্রয়ার আর এপাশ-ওপাশ বইপত্রের আরো দুটো ড্রয়ার। এখন অবশ্য তেমন নেই; জীবনচক্রে পরম্পরা বলে একটি বিষয় থাকে। এখন নানার ঘরটি হয়ে উঠেছে আমাদের শহুরে-সংস্কৃতিতে-বেমানান-প্রায়যৌথপরিবারের-আড্ডাস্থল।

নানা-নানীর প্রভাব আমাদের পুরো পরিবারে ব্যাপক (দুজন দুভাবে) – অন্তত আমার নিজস্ব বেড়ে উঠা, কর্ম, দর্শন এবং মানসপ্রক্রিয়ায় মা-বাবার থেকে নানার প্রজন্মের প্রভাব অনেক বেশি (এবং এতে আমার মা-বাবার সম্ভবত আপত্তি নেই কোনো) – কিন্তু তাঁদের শারীরিক অনুপস্থিতিতেও জীবনচক্র ব্যাহত হবার সম্ভাবনা নেই। এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মৃত্যুর পর নানাকে কিংবদন্তিরূপে গড়ে তোলা বা তাঁকে নিয়ে উপকথা তৈরি করার প্রয়োজন হয়নি। ও ছাড়াই আমরা অনেকখানি নানাভাই’র এবং তাঁর বড়ো ভাই “ভীমরূল”এর পরিচয়ে পরিচিত থাকি – সামাজিকভাবে এবং অন্তঃস্থে।

সামাজিকভাবে পরিচয় পাওয়ার ব্যাপারটি আমাকে মাঝেমধ্যে বিস্মিত করে (সুখী করে বটেই); বিস্মিত করে কারণ আমার একটা ধারণা ছিলো (এবং এখনো আছে) যে নানাভাই খুব বেশি পরিচিত নন। অন্তত নিজের সামাজিক পরিচিতি তিনি খুব পছন্দ করতেন না। তাঁর বাসা পুরস্কারে ও পদকে ভরে যায় নি; যে সম্মাননাগুলো না পেলেই নয় উনি সেটুকই পেয়েছেন, এটা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে সুখী করে – কেননা বাঙলাদেশে ঘনঘন পুরস্কৃত হওয়া ভিন্নভাবে অর্থপূর্ণ, যা নানাভাই ও তাঁর পরিবারের মানুষজনের জন্য মোটেই স্বস্তিকর নয়। সাধারণত নিজের নানার পরিচয় – খুব ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষবাদে – দিতে স্বস্তি হয় না। আমাদের রক্তের এই দিকটি – অর্থ, কর্মসাফল্য-ব্যর্থতার বাইরে মানুষ হিশেবে দ্য সেন্স অফ ডিগনিটি – এইসময়ে বিশেষত ঢাকা-শহুরে সংস্কৃতিতে খুব চোখে পড়ে না।

এখনো অনেক মানুষ আছেন, ঢাকা শহরেই আছেন, যাদের এমন পাই – কিন্তু তাঁরা সংখ্যায় কম এবং ব্যতিক্রম তো উদাহরণ নয়। নানার, যাকে “এসেন্স” বলে, আমি দেখেছি শেষ কয়েকবছর – চুপচাপ নিজের ঘরে ঘুমোতেন, সিগারেট টানতেন (তাঁর ব্র্যান্ড ছিলো বেনসন), ভোরে এক থেকে দু’ঘণ্টা আম্মার সাথে নিজের জীবনলব্ধ জ্ঞান-অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা নিয়ে বলতেন, বারান্দার চেয়ারে বসে থাকা, মানুষের আসা-যাওয়া দেখতে দেখতে ও ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতে ভাতঘুমে যাওয়া, প্রেসক্লাব ও রাতে বাসায় ফিরে আসা। নানা খানিকটা কুঁড়ে এবং খুবই উদাসীন স্বভাবের ছিলেন – দুটি বড়ো প্রভাবক যা নির্ধারণ করেছে তাঁর কর্মজীবনে বাড়তি কিছুর পিছে না ছোটার বিষয়টি।

২০০৭ এরপর থেকে দেশে টকশো’র ধুম শুরু হয়; নানাকে হাতেগুণে তিনটি বা চারটি টকশো’তে যেতে দেখেছি। মাঝেমাঝে এ নিয়ে যে তাঁর সন্তানেরা অনুযোগ করতো না তা নয়। তবে আমার গর্ব হতো নানার প্রজ্ঞার কথা চিন্তা করে; ষাট –পয়ষট্টি পেরিয়ে যাবার পর সাধারণত মানুষের আর খুব বেশিকিছু দেয়ার থাকে না; প্রাজ্ঞরা সরে আসেন এবং সূর্যাস্ত উপভোগ করতে বেরিয়ে পড়েন – কেননা কোনোকিছু দেয়ার থেকে ভারমুক্ত হবার পাশাপাশি তরুণদের এগিয়ে আসার ও নিজেদের মতো ক’রে বিনির্মাণের নিমিত্তে জায়গা করে দেয়ার একটি দায় তাঁদের থাকে। আর বাঙলাদেশের বয়স্ক অর্বাচীনেরা – যাঁরা ষাট-সত্তর-আশি পেরিয়ে যাবার পরও কর্মে-রাস্তায়-টকশো’তে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়ার জন্য পাগল হয়ে থাকেন – তাঁরা না নিজেরা বিকশিত হন, না তরুণদের বিকাশের ক্ষেত্র গড়ে দেয়ার দায়টি নেন।

নানাভাই, আমার দৃষ্টিতে, সে দায়টি নিয়েছিলেন – সরে এসে, সকাল-দুপুর-সূর্যাস্ত উপভোগ করে এবং প্রয়োজনের সময় পরামর্শক হিশেবে কাজ করে। তিনি একজন প্রবীণ হিশেবে, আমার মতে, তাঁর যা করা স্বপ্রজ্ঞার পরিচায়ক হতে পারতো, তিনি তা-ই করেছেন এবং তাঁকে কিছু দেয়া হচ্ছে না বলে অনুযোগ করার কোনো প্রবণতা তাঁর কখনো হয়নি (আসলে কোনো প্রয়োজনও ছিলো না)।

আজকাল নানাভাই’র উপস্থিতি ভেতরে টের পাই অন্যভাবে। সবকিছুর পর নানাভাই একজন বহিরস্থিত মানুষ ছিলেন, যিনি কিনা খাপ খান না প্রথাগত সমাজের সাথে। তীব্র মেজাজ কিন্তু একই সাথে অসামান্য সারল্য ছিলো তাঁর (এবং এই দুটোর মিশেল কীভাবে হয় সেটা আমার কাছে পরিষ্কার নয়) ।

কিছু জীবনাচরণ ছিলো তাঁর যেগুলো এই উচ্চ-মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির সাথে যায় না- কিন্তু সেগুলোর সৌন্দর্য অন্যরকম। একটির কথা আমি সবসময় মনে করি (এবং আমিও এই অভ্যাসে অভ্যস্ত) – সেটি হলো নানাভাই কখনো মানিব্যাগ ব্যবহার করতেন না। আরেকটি ছিলো – নানাভাই পোড়ামাটির তৈরি কোনো প্লেট-কাপ-গ্লাস, যেটি এখন শহুরে সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্যের একটি অংশ, ইত্যাদিতে খেতে বা পান করতে চাইতেন না। একবার বলছিলেন এটি তাঁকে তরুণ জীবনের পাটকল শ্রমিকদের খাবারের কষ্টের কথা মনে করিয়ে দেয় – কেননা তিনি শ্রমিকেরা পোড়ামাটির সানকিতে খাবার নিতে দেখতেন। পোড়ামাটির তৈজস তাঁর কাছে সংস্কৃতির বদলে অপসংস্কৃতির প্রতীক ছিলো, কেননা এর সাথে জড়িত আছে শ্রমিকের জীবনসংগ্রাম অবলোকনের স্মৃতি। এরকম কিছু আদর্শগত বিষয় – কঠোরভাবে মানতেন। বা হয়তো ঐ বিষয়গুলো তাঁর অন্তস্থ থেকে আপনি আসতো।

কিন্তু সবচেয়ে বড়ো যে দিকটি আমি আমার নিজের ভেতর টের পাই এবং তা আমাকে নিজের ভেতর নানার প্রজন্ম’র উপস্থিতির জানান দেয়, সেটি হলো নাগরিক হয়েও নাগরিক উন্মাদনার উত্তাপ ও ভাঁপে নিজেকে নিমজ্জিত না করে দেয়া; ব্যস্ততম সড়কে দাঁড়িয়ে চারদিকের নাগরিক দালান ও তাঁর বাসিন্দাদের তপ্ত-স্মার্ট-ফিটফাট-এয়ারকন্ডিশনারটয়োটাসমৃদ্ধ পর্যাপ্ত জীবনের অংশ হয়েও মাঝেমাঝে সেখান থেকে বেরিয়ে নির্লিপ্তভাবে শহর আর নাগরিকত্বের ভঙ্গুর কাঠামোটি দেখে যাওয়া স্থির।

নাগরিক হয়েও আদিম-আদি-বিশুদ্ধ সত্তার সাথে সংযোগের সুযোগ তৈরি করে নেয়া। এবং খুব বেশি বিকৃত হয়ে না যাওয়া। একেকজন এ সংযোগ একেকভাবে রক্ষা করে কিন্তু সবাই করতে পারে না; তবে আমার নানাভাই করতেন। তাঁর মতো করে। তাই তিনি মানুষ হিশেবে, সাফল্য-ব্যর্থতা-সত্য-মিথ্যা সবকিছুর পর, ছিলেন অত্যন্ত সফল। আর মৃত্যুগন্তব্যে এটুকই মানুষ নিজের সাথে নিয়ে যেতে পারে।

নানাভাইকে নিয়ে পুরো লেখায় তাঁর কর্ম ও লেখকজীবনের সাফল্য নিয়ে আমি কিছু লিখতে পারি নি। এটাই নানাভাই’র আমাদের পরিবারে সবচেয়ে বড়ো অবদান মনে হয় আমার কাছে। তাঁর কর্ম-লেখা তাঁকে যখন প্রতিষ্ঠিত করার করে ফেলেছে। তাঁর পরিবার তাঁকে স্মরণ করুক – কেননা মানুষ হিশেবে তিনি আমাদের প্রভাবিত করেছেন গভীর থেকে।

 

সৌম্য রহমান,  প্রয়াত হাবিবুর রহমান মিলনের দৌহিত্র


সর্বশেষ

আরও খবর

সকল টিভি চ্যানেল পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে: প্রধানমন্ত্রী

সকল টিভি চ্যানেল পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে: প্রধানমন্ত্রী


ফটোগ্রাফিক সংগঠন বিডি ফটোগ্রাফার্স ইউনিটির আত্মপ্রকাশ!

ফটোগ্রাফিক সংগঠন বিডি ফটোগ্রাফার্স ইউনিটির আত্মপ্রকাশ!


সাংবাদিক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আর নেই

সাংবাদিক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আর নেই


খ্রিস্ট ধর্মীয় অনুভূতি: কবি ও সাংবাদিক হেনরী স্বপন গ্রেপ্তার

খ্রিস্ট ধর্মীয় অনুভূতি: কবি ও সাংবাদিক হেনরী স্বপন গ্রেপ্তার


স্মৃতির ভিতর চেতনার গুরু  মিনার মাহমুদ

স্মৃতির ভিতর চেতনার গুরু মিনার মাহমুদ


প্রখ্যাত সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর আর নেই

প্রখ্যাত সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর আর নেই


মানবকণ্ঠ সম্পাদক আবু বকর চৌধুরী আর নেই

মানবকণ্ঠ সম্পাদক আবু বকর চৌধুরী আর নেই


‘ভুঁইফোড়’ অনলাইন মোকাবিলা করা হবে: তথ্যমন্ত্রী

‘ভুঁইফোড়’ অনলাইন মোকাবিলা করা হবে: তথ্যমন্ত্রী


স্মরণ: সাংবাদিক আহমেদুর রহমান

স্মরণ: সাংবাদিক আহমেদুর রহমান


মিডিয়ায় বর্তমান সরকারের ইতিবাচক সংবাদ খুবই দুর্লভ

মিডিয়ায় বর্তমান সরকারের ইতিবাচক সংবাদ খুবই দুর্লভ