Monday, September 5th, 2016
স্মৃতি
September 5th, 2016 at 4:00 pm
স্মৃতি

সৈয়দা মমতাজ টুকু:

স্মৃতি! ‘ফুলনা ফুলনা… ফুলনাআ, নোনতা হলো রে… একা হলো রে…; কাউয়া কইছে সাতপাতা, গাছ্ছা রে ভাই গাছ্ছা… কুম্বির তুমি ধরতে পারলা না…’ কত খেলা! মাঠে জঙ্গলে দৌড়াদৌড়ি, সারাদিন, গাছের মগডালে বসে ছড়া কাটি, ঘুমানোর ভান করি, আজ আমি গাছেই ঘুমাবো, হিহিহি… ‘টুক্কা সাঁতার জানে না,দো দো…’ খেলার সাথীরা ভেঙায়, আমি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদি!

খাওয়ার সময় চিৎকার করি, ‘আমার ডাইল কই? ডাইল ছাড়া ভাত খাইতাম না!’ আমার কান্না শুনে হিন্দুবাড়ি থেকে গ্লাস ভর্তি ডাল আসে। ‘এই ছেড়ি বেরবেরি খাডলের কোষ, তোর মা মারছে আমার কি দোষ, হিহিহি, বাবু, গাবু… কান্দে!’ বাবুকে সেই খেপানো…হা! হা!হা! এমন দিনগুলোতে বাবা হঠাৎ হঠাৎ আসে। দূরে কোথায় যেন থাকে, আসলে আমাদের চার বোনের সেই আনন্দ। আব্বা কি নিয়ে আসছে দেখার জন্য সেই লাফালাফি। টোস্ট বিস্কুটের বাক্স, এত বড় চিংড়ি মাছ হয়! ওরে বাবা! লাল রঙের ওটা কি? মাথার রাবার ব্যান্ড? দুইবোনে কাড়াকাড়ি করে চুলে বাঁধার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর জানলো ওটা বাসন মাজার মাজুনি, ভিমের মাজুনি! তারপর সেই হাসি! হা! হা!হা!

আমাকে ঘাড়ে নিয়ে বাবা ছড়া কাটে, ‘ব্যা ব্যা ব্ল্যাক শিপ…’ সারাদিন খেলা খেলা খেলা, এত ছোট একটা লাঠি যে টুকু লাঠি দিয়ে কাউকে পিটানো সম্ভব না, ততছোট একটা লাঠি নিয়ে বাবা আমাকে মারতে আসে… ‘তোরে আজ..খাড়া! গোসল নাই, কিচ্ছু নাই, খাড়া…’ আমার সেই দৌড়, ভয়ে জঙ্গলে গিয়া লুকাই! বিকেল বেলা আসি, কাঁদতে কাঁদতে দেই একটা গালি! আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আরো বলবি খারাপ কথা?’ একটা চড় খাই! আবারো জিজ্ঞেস করে, ‘আরো বলবি খারাপ কথা?’ আমিও কেঁদে কেঁদে বলি, ‘একশো বার বলবো!’ আরো কয়েকবার সেই গালিটা দেই! আমার জন্য শাস্তি জারি হয় আমি খারাপ কথা বললে কেউ যেন আমার সাথে কথা না বলে! আমি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদি, আম্মার কাছে যাই, ডাকি, ‘আম্মা, ও আম্মা!’ আম্মা তো কথা বলে না! ডাকি, ‘তিন্না, ওই তিন্না’ তিন্নীও কথা বলে না! আবারো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদি আর বলি, ‘আমি আর কোনোদিন খারাপ কথা বলবো না…’

স্কুলে যাই, কিসের পড়াশোনা! স্কুল ছুটি,গরম গরম রুটি! একটাকা দিয়ে নারকেলি আইসক্রিম কিনে খেতে খেতে বাড়ি আসি। তিন্নী আর তন্বী ওদের পাইলট স্কুলের টিফিন রুটি হালুয়া না খেয়ে আমার জন্য নিয়ে আসে। বিকেলে শিয়ালজানী খালের পাড়ে রোদে বসে আমরা তিনবোন পড়তে বসি। শব্দ করে পড়তে হবে যেন আরো পাঁচবাড়ি শোনা যায় যে আমরা পড়ছি। মাঝে মাঝে আমি গাছের মগডালে উঠে পড়তে বসি মানুষকে চমকানোর জন্য! হিহিহি…

একদিন এক মানব আমার আপুকে মারছিলো, কি কারণে জানি না! বাবা ফিরাতে আসতে চাইলে সেই মহামানব দরজাটা বাইরে থেকে লাগিয়ে দেয়। বাবার অনেক কষ্ট ছিল শুনেছি! সে চিঠি লিখত। তার অনেকগুলা ডায়েরি ছিলো, ডায়েরিতে কোনো দুঃখ কষ্টের কথা লেখা ছিল না। আমাদের একটা শীতল পাটি ছিলো, আমরা সবাই একসাথে খেতে বসি, বড় আপা আর ভাইয়া বাদে। আপা দূরে কোনো একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়, সেখানেই থাকে, তার ফাহিম নামে ছোট একটা ছেলে আছে। আমরা সন্ধ্যাবেলা খেতে বসেছি, ভাবি, আমি, তন্বী, তিন্নী আর কে ছিলো মনে পড়ে না। হঠাৎ বাবার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো, সবাই ভাবলাম কাচা মরিচ খেয়ে ঝাল লেগেছে বোধহয়। তারপর বাবা বলতে লাগলো তার শরীরটা ভালো লাগছে না। তাকে বিছানায় শোয়ানো হয়; চতুর্থবার ব্রেইন স্ট্রোক!

আমি স্ট্রোক বুঝি না, ঘুমিয়ে গেলাম, কান্নার শব্দে বিরক্ত হচ্ছি! পরদিন সকালবেলা, ঘরভর্তি মানুষ, আগরবাতির গন্ধ, সাদা কাপড়ে বাবাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে, আমি ঘুরছি, দেখছি, যারা আসছে সঙ্গে করে পাউরুটি, চানাচুর, বিস্কুট, নানারকম খাবার নিয়ে আসছে! সব আমার, বাহ! বাইরে আমার বান্ধবী নিশা দাড়িয়ে আছে। কি ভাব! আমার বাবা মারা গেছে বলে আমার সাথে কথা বলছে না! দূরে দাড়িয়ে আছে, ক্লাসে আর কোনোদিন ওর সাথে বসবো না..হুহ! ‘আম্মা, ও আম্মা, কাঁদো ক্যান?’ ধুর! কি বিচ্ছিরি রকমের হাত পা ছুড়ে কান্নাকাটি, তন্বী বারবার কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে ক্যান, ধুর! ভালো লাগে না, আব্বা ভালো হয়ে গেলে বিচার দিবো! আবীর আকাশ আসছে, ওর মা ঝর্না খালাও আসছে, আম্মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না! আবীর আকাশ আমাকে খেপানো শুরু করলো, ‘টুকু,তোমার আব্বা মারা গেছে, তুমি ছছি..ছছি..!’ আমি ওকে ছোঁয়ার জন্য দৌড়াতে লাগলাম, আমি ছুঁয়ে দিলে ওকে গোসল করতে হবে, ও ‘ছছি’ হয়ে যাবে! এরপর আমরা গ্রামের বাড়ি গেলাম, বাবাকে কবর দেওয়া হলো, এরপর আমার হঠাৎ মনে হলো, ‘আমার আব্বা কই?’

কতদিন পর স্কুলে গেলাম। ম্যাডাম রোল কল করছেন,‘রোল নাম্বার বত্রিশ, টুকু?’ আমি বললাম,‘উপস্থিত’। ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতদিন আসো নি কেন?’ আমার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল, আরে আমি কাঁদতেছি? কথা বলতে পারতেছি না কেন? আমি চুপ, একদম চুপ! পিছন থেকে নিশা বললো,‘দিদিমনি, ওর বাবা মারা গেছে!’ ক্লাস টু, রোল নাম্বার বত্রিশ, ২০০৩ সাল, আমার নাম টুকু। ২৫ জানুয়ারি আমার বাবা মারা গেছেন। আমি সেদিন কাঁদি নি। শুনেছি আমার বাবা খুব বেশি ভালো মানুষ ছিলেন। ১৯৯৭ সালে বাবার লেখা একটা চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘টুকুর জন্য মন কাঁদে।’ ২৫ জানুয়ারি ২০১৬ সাল, আমার নাম টুকু! আমি আমার বাবার সবচেয়ে দুষ্টো মেয়ে, সবচেয়ে বেশিবার ভুল করা মেয়ে, ভালো মানুষ হতে পারি নি বলে আমারো বাবার জন্য মন কাঁদে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদনা: তুসা


সর্বশেষ

আরও খবর

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা