Thursday, June 2nd, 2016
হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র: কথাশিল্পী আকবর হোসেন
June 2nd, 2016 at 2:18 pm
হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র: কথাশিল্পী আকবর হোসেন

ডেস্ক: কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায় স্থান এবং ব্যক্তি, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারপরো নিজ সংস্কৃতির নিদর্শন সংরক্ষণ করার তীব্র প্রচেষ্টা রয়ে যায় মানব সমাজে। নয়তো সময়ের নিষ্ঠুরতম চরিত্র- ভবিষ্যত থেকে মানুষকেই হারিয়ে ফেলার আশংকা থাকে। নশ্বর এই জগতে কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়। সে নিয়ম মেনে আমরা হারিয়ে ফেলেছি বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা, আমাদের মনের পাতা থেকে মুছে গিয়েছে বহু গুণী ব্যক্তির নাম। তেমনি একজন কথাশিল্পী আকবর হোসেন। বাংলা সাহিত্যে শব্দ বা কথার ব্যবহারকে যারা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম, অগ্রগণ্য। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রায় অপরিচিত রয়ে যাওয়া এই সাহিত্যিক ১৯৮১ সালের এই দিনে, অর্থাৎ ২ জুন, পৃথিবীর সাথে সকল বন্ধন ছিন্ন করেন। তাই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার পাশাপাশি নব্য পড়ুয়াদের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়াস রইলো আজকের আয়োজনে।

জন্ম

প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক আকবর হোসেন ১৯১৭ সালের ১ অক্টোবর কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার কেয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তারবাবা হাজী আব্দুল বিশ্বাস ও মাতা ময়জান নেছা।

শিক্ষা জীবন

আকবর হোসেন ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৩৬ সালে, কুমিল্লা হাইস্কুল থেকে। তারপর কলকাতা রিপন কলেজ থেকে বি.এ. ডিগ্রি নিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন।

কর্ম জীবন ও সাহিত্য চর্চা

ছাত্রাবস্থায় লেখালেখি শুরু করলেও শিক্ষা জীবনের অবসান ঘটিয়ে পুরোদমে সাহিত্য চর্চা শুরু করেন আকবর হোসেন। ‘সন্ধানী’ ‘শিক্ষা’ ‘দৈনিক আজাদ’ ও ‘নবযুগ’ ইত্যাদি পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশের মাধ্যমে পাঠক তার প্রতিভার পরিচয় পান। তার প্রথম উপন্যাস ‘অবাঞ্চিত’ বিপুল পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। তিনি সাহিত্য চর্চা করেছেন প্রকৃতি ও অন্তরের টানে। তার লেখায় সমাজ ও সংসার জীবন, পারিপার্শ্বিকতা আর তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ধরা দিয়েছে সাবলীলভাবে। গ্রামীণ সমাজ সংস্কার, সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্খা, নাগরিক জীবনের দুঃখ-বেদনা, সমসাময়িক জীবনচিত্র, সমকালীন চিমত্মা-চেতনা, চারপাশের চেনাজগত, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আমাদের অহংকার ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং প্রেম ও রোমান্টিকতা প্রভৃতি দারুন মুন্সিয়ানার সাথে উপস্থাপিত হয়েছে আকবর হোসেনের উপন্যাস ও লেখনিতে।

তার ভাষার সাবলীলতা কাব্যময়তা, গতিময়তা এবং শৈল্পিক সন্নিবেশ উপন্যাসগুলোকে জনপ্রিয় করেছে। সময়কে সংরক্ষণ করার শৈল্পিক প্রয়াসে তিনি সফল, শিল্পী হিসেবে নিজ কর্তব্য পালনে তিনি একনিষ্ঠ। বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে নীরবে নিরলসভাবে সাধনা করে গেছেন এই নিভৃতচারী। আজ এদেশে উপন্যাস, সাহিত্যে ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার শীর্ষে যারা অবস্থান করছেন আকবর হোসেন এদের চেয়ে বেশি নিরেট ও শক্তিশালী ঔপন্যাসিক ছিলেন। অথচ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পাঠকমনে কাঁপন ধরিয়ে দেয়া কীর্তিমান এই ঔপন্যাসিক আজও এদেশ অবমূল্যায়িত রয়ে গেছেন। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে অবাঞ্ছিত (১৯৫০), দু’দিনের খেলাঘরে (১৯৬৫), মেঘ বিজলী বাদল (১৯৬৮), নতুন পৃথিবী (১৯৭৪),আভা ও তার প্রথম পুরুষ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ইতোমধ্যে ‘মেঘ বিজলী বাদল’ উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্রনির্মাণ করেছেন কাজী নূরুল হক।

কুমারখালীর প্রভাব

সংস্কৃতির রাজধানী খ্যাত কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর মাটি ও মানুষ শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে সব সময় গৌরবময় ভূমিকা রেখে আসছেন। কুমারখালীর শিলাইদহে এসে সাহিত্য চর্চা করেছেন বিশ্বকপি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।এছাড়াও বাউল সম্রাট লালন ফকির, বিষাদসিন্ধু রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন, কাঙ্গাল হরিণাথ মজুমদার, কবি ডক্টর হরগোপাল বিশ্বাস, বাউল সাধক গগন হরকরা, কবি আজিজুল হক, ড. আবুল আহসান চৌধুরী, শিশু সাহিত্যিক জোবেদা খানম, কবি জলধর সেন, বিপ্লবী নেতা কাজী মিয়াজান, বাঘা যতীন (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়), কলকাতার বিখ্যাত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ছড়াকার নাসের মাহমুদ, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক রকিবুল হাসান কুমারখালীর অহংকার। এদের মধ্যে বাঘা যতিন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও রকিবুল হাসানের জন্ম কেয়া গ্রামে। এমন একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেও আকবর হোসেন সে সময় সাহিত্য চর্চা শুরু করেছিলেন। কুমারখালীর আরো একটি অলংকার নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের পরে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আকবর হোসেনই সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ছিলেন। এ দেশে বাংলা কথাসাহিত্যে যে ক’জন জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছেন আকবর হোসনে তাদের মধ্যে অন্যতম।

প্রকাশিত উপন্যাসসমূহ

অবাঞ্ছিত (১৯৫০)
কি পাইনি (১৯৫১)
ঢেউ জাগে (১৯৬১)
আলোছায়া (১৯৬৪)
দু’দিনের খেলাঘরে (১৯৬৫)
মেঘ বিজলী বাদল (১৯৬৮)
নতুন পৃথিবী (১৯৭৪)
দুষ্টক্ষত
আভা ও তার প্রথম পুরুষ

কে থাকে বল বদ্ধ ঘরে

প্রাবন্ধিক অ্যাডভোকেট শামিম উল হাসান অপুর সম্পাদনায়, কথাশিল্পী আকবর হোসেনের ৯৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে, তার উপর বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখকদের লেখা নিয়ে একটি সম্পাদিত গ্রন্থ ‘কে থাকে বল বদ্ধ ঘরে’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে গত বছর। বর্তমান সাহিত্যাকাশ থেকে, দিক প্রদর্শক উজ্জ্বল এই নক্ষত্রকে হারিয়ে ফেলা অপরাধবোধ থেকে শামিম উল হাসানের এই প্রায়শ্চিত্তের প্রচেষ্টা। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন ভবিষ্যতে বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সাহিত্য এবং কাব্যচর্চায় নিয়োজিত গুণীজনেরা সাহিত্যে আকবর হোসেনের অবদানকে তুলে ধরে তাকে সঠিকভাবে মূল্যায়নের উদ্দ্যোগ গ্রহণ করবেন। গ্রন্থটি কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে বইমেলা বুকশপে পাওয়া যায়। এ ছাড়াও ‘আকবর হোসেনের কথাসাহিত্য’ নামে প্রকাশিত হয়েছে রকিবুল হাসানের একটি গবেষণা গ্রন্থ।

নিউজিনেক্সটবিডিডটকম/এসকে/ওয়াইএ


সর্বশেষ

আরও খবর

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু


করোনা সংক্রমন ঠেকাতে ব্রিটিশ সরকারের নতুন আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ  ১০ হাজার পাউন্ড জরমিানা

করোনা সংক্রমন ঠেকাতে ব্রিটিশ সরকারের নতুন আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড জরমিানা


ভাইরাসের সাথে বসবাস

ভাইরাসের সাথে বসবাস


মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা

মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা


অস্ট্রিয়ায় চালু হলো করোনাভাইরাস ট্রাফিক লাইট ব্যবস্থা

অস্ট্রিয়ায় চালু হলো করোনাভাইরাস ট্রাফিক লাইট ব্যবস্থা


কটন টপ ট্যামারিন, খোঁজা বানর!

কটন টপ ট্যামারিন, খোঁজা বানর!


প্রকৃতির স্থিতি আর আমাদের অস্থিরতা: কোভিড-১৯ পরবর্তী ভাবনা

প্রকৃতির স্থিতি আর আমাদের অস্থিরতা: কোভিড-১৯ পরবর্তী ভাবনা


রানীর ভাষণ: খুঁটিনাটি

রানীর ভাষণ: খুঁটিনাটি


মুজিব বর্ষঃ স্মৃতিচারন করলেন মুক্তিযোদ্ধাদের দুই সহচর

মুজিব বর্ষঃ স্মৃতিচারন করলেন মুক্তিযোদ্ধাদের দুই সহচর


মুজিব বর্ষঃ আওরঙ্গজেব’র বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারন

মুজিব বর্ষঃ আওরঙ্গজেব’র বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারন