Wednesday, January 4th, 2017
হিজড়াদের জীবন ও অধিকার
January 4th, 2017 at 12:17 pm
হিজড়াদের জীবন ও অধিকার

মো. অহিদুজ্জামান লিটন: পুরুষও নয় আবার নারীও নয়, এ ধরনের এক শ্রেণীর মানুষদের আমরা প্রায়ই পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, স্টেশন ও পার্কসহ বিভিন্ন স্থানে মেয়েলি সাজে নানান রকম অশালীন অঙ্গভঙ্গি করতে দেখি। তারা দলবেঁধে এসে দোকানে, গাড়িতে চাঁদা তোলে। এরা পরিবার ও সমাজে অবহেলিত, নিগৃহিত ও নানান বৈষম্যের শিকার। অবহেলিত মানব সন্তানের এই শ্রেণী হিজড়া বা উভয়লিঙ্গ হিসেবেই আমাদের সমাজে বেশি পরিচিত। সমাজের মূল স্রোতধারায় অর্ন্তভূক্ত করার জন্য বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে গত ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর এদেরকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

প্রকৃতির অমোঘ খেয়ালে পৃথিবীতে এদের জন্ম। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে এরা জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধি। এ শ্রেণীর লোক মেয়েলি আচরণ করতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। শারীরিক গঠনের দিক থেকে এদের নারীদের সকল বৈশিষ্ট্য থাকলেও নারী জননাঙ্গ থাকে না, পুরুষের সকল বৈশিষ্ট্য থাকলেও পুরুষ জননাঙ্গ থাকে না এবং আবার অনেকের মধ্যে উভয় বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান ।

সমাজ সেবা অধিদফতরের জরিপমতে বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। বিভিন্ন সংস্থাগুলোর হিসেবে দেশে হিজড়া ২০ থেকে ২৫ হাজার । মানবাধিকার সংস্থার তথ্য মতে সারাদেশে হিজড়ার সংখ্যা ৫০ হাজারের অধিক ।

হিজড়া সন্তানের জন্মের পর আধুনিক চিকিৎসা বা অস্ত্রপাচারের মাধ্যমে কোন লিঙ্গের অধিকারী হবে – তা নির্ধারণ করা জটিল হলেও সম্ভব। এরা একই বাবা-মায়ের সন্তান হয়েও অন্য ছেলেমেয়েদের মতো একই সন্মানযোগ্য অবস্থানে নেই। তারা প্রতিনিয়তই প্রচলিত সমাজের, রাষ্ট্রের ও পরিবারের কাছে অবহেলিত।

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে অবহেলিত ও বৈষম্যের ফলে এই হিজড়া জনগোষ্ঠী সমাজে উপেক্ষিত হয়েই দিনাতিপাত করে । রাষ্ট্রের মধ্যে থেকেও নাগরিক সুযোগ সুবিধা ও অধিকার থেকেও তারা অনেক দূরে। সভ্যসমাজ থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন এই শ্রেণীর লোকগুলো ছোটবেলা থেকেই বিকৃত মানসিকতা ও চরম হতাশা নিয়েই বেড়ে উঠে। ধীরে ধীরে এরা পা বাড়ায় অপরাধ জগতে।

যদি এদেরকে ঘৃণা না করে ভালোবেসে সুস্থ জীবনে ফেরানো যায়, দেখানো যায় আলোর পথ, শেখানো হয় স্বাবলম্বি হবার কর্ম কৌশল এবং সম্পৃক্ত করানো যায় বিভিন্ন সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে, তাহলে তারা নিশ্চয়ই পরিণত হবে মানব সম্পদে । ফলে তাদের মধ্যে তৈরি হবে এক ধরনের দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি প্রতিশ্রুতি।

এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার হিজড়াদের সমাজের মূল ধারায় এনে দেশের সার্বিক উন্নয়নে সম্পৃক্তকরণের জন্য “হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচী – ২০১৩” প্রণয়ন করেছে । পাইলট কর্মসূচী হিসেবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৭২ লাখ ১৭ হাজার টাকা বরাদ্দ নিয়ে দেশের সাতটি জেলায় এই কর্মসূচী শুরু হয় । যার বরাদ্দের পরিমাণ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৭২ হাজার টাকায় এবং ৩৫টি জেলায় এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো- ১. স্কুলগামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে চার স্তরে উপবৃত্তি প্রদান, ২. পঞ্চাশ বা তদুর্ধ্ব বয়সের অক্ষম ও অসচ্ছল হিজড়াদের বিশেষ ভাতা প্রদান, ৩. বিনামূল্যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হিজড়াদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং ৪. প্রশিক্ষণোত্তর আর্থিক সহায়তা ।

গত ২০১৫ সালের ৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক তৃতীয় লিঙ্গের উদ্যোক্তাদের এসএমই খাতের ঋণ গ্রহণের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করে এসএমইএসপিডি একটি সার্কুলার জারি করায় কৃষিভিত্তিক ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নঁকশীকাথা ও তাঁত, নার্সারি, নির্মাণ শিল্প ও গৃহায়ণ, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, বিস্কুট ফ্যাক্টরি, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও পর্যটন, সেলুন ও বিউটি পার্লার প্রভৃতির জন্য ঋণ গ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তৃতীয় লিঙ্গের বা হিজড়াদের অবস্থান ধীরে ধীরে আরোও দৃঢ় হচ্ছে । অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ২০১১-১২ সালে তৃতীয় লিঙ্গের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে । ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে জার্মানি সর্বপ্রথম হিজড়া জনগোষ্ঠীকে অনির্ধারিত লিঙ্গ হিসেবে জন্ম সনদ নিবন্ধনের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেয় । ভারত ২০১৪ সালের এপ্রিলে তৃতীয় লিঙ্গকে স্বীকৃতি দেয় এবং পাকিস্তান সরকারও ২০০৯ সালে হিজড়াদের জন্য জাতীয় পরিচয় পত্র প্রণয়ন করে । যদিও মালদ্বীপসহ আরো ৫৪ টি দেশ জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত লিঙ্গ পরিচিতির বিরোধীতা করে আসছে।

হিজড়া নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সময় সাহিত্য চর্চা ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে । ২০১২ সালে হিজড়াদের জীবনযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে ”কমন জেন্ডার” নামে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ভারতের বিখ্যাত পরিচালক মহেশ ভাট হিজড়াদের নিয়ে ”তামান্না” (১৯৯৭) চলচিত্র নির্মাণ করেন যা ভারতীয় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে । ব্রিটিশ লেখক লেসলি ফরবেস ১৯৯৮ সালে তার বিখ্যাত উপন্যাস “বোম্বে আইস” এ হিজড়াদের নিয়ে লিখেছেন । এছাড়াও ব্রিটিশ লেখক ও ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ডালরিম্পেল তার বিখ্যাত উপন্যাস “সিটি অব ডিজিনস” (১৯৯৪) এ হিজড়াদের জীবনযাপন তুলে ধরেছেন ।

সহানুভূতি নয়, নিজের অধিকার নিয়ে বাঁচার অধিকার সকল মানব সন্তানের । আলাদা কোনো অংশ না হয়ে সমাজের অংশ হয়েই হিজড়াদের বাঁচার সুযোগ দিতে হবে । সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে মেধা ও যোগ্যতা প্রমাণের।

কলাম লেখক ও যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি (ল্যাব)


সর্বশেষ

আরও খবর

নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!


তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!

তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!


সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?


আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?