Friday, February 17th, 2017
হুমকিতে ভারতবর্ষের সুফিভাব
February 17th, 2017 at 5:25 pm
হুমকিতে ভারতবর্ষের সুফিভাব

শরীফ খিয়াম আহমেদ ঈয়ন:

[খবর: পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে একটি মাজারে আত্মঘাতী হামলায় অন্তত ৭৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক। বৃহস্পতিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭) সন্ধ্যায় শেহওয়ান এলাকার ইন্দুস হাইওয়ের কাছে এ বোমা হামলার ঘটনাটি ঘটে। লাল শাহবাজ কালান্দার মাজারে এই হামলার দায় স্বীকার করে আমাক নিউজ এজেন্সিতে বিবৃতি দিয়েছে আইএস।]

‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’ – গানটির কল্যাণে সিন্ধী সুফি ঝুলেলাল শাহবাজ কালান্দার (১১৪৯-১২৭৪ খ্রি.) শুধু পাকিস্তানে নয়, সমগ্র ভারতবর্ষেই কমবেশী পরিচিত, সাধক সমাজে বেশ জনপ্রিয়ও। তার মাজারের মতো ভারত-বাংলাদেশের বহু মাজার আর আখড়ায়ও প্রতি বৃহস্পতিবার স্থানীয় ভক্তরা জড়ো হন। এমন একটি দিনে অত বিখ্যাত মাজারে এই আত্মঘাতী হামলা আদতে ভারতীয় সুফি দর্শনকে মধ্যপ্রাচ্যের আইএস (ইসলামিক এস্টেট) দর্শনের হিংস্রতম হুমকি বলেই মনে হচ্ছে।

বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো পরিচালনাকারীদের কাছে বাংলাসহ সারা ভারতের সকল মাজার, আখড়া, সাধন গৃহসহ সব ধর্মের তামাম ধর্মালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি। মনে রাখবেন হে রাষ্ট্রনায়কেরা, আপনাদের ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কাই জনগণকে আতঙ্কিত করে।

‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’ মূলত উর্দু আর পাঞ্জাবি মিশ্রিত ভাষার একটি গান। যদ্দুর জানা যায়, এটি প্রথম লিখেছেন আমীর খসরু (রা)। পরে সামান্য পরিবর্তন করে গানটিকে উপাসনার জন্য তৈরি করেন বুল্লে শাহ (রা)। এরপর সিন্ধী কবিরা গানটিকে আরো পরিবর্তন করে ঝুলেলাল শাহবাজ কালানান্দারের স্তুতি সঙ্গীতে পরিণত করেন।

সোহরাওয়ার্দিয়া ত্বরিকার অনুসারী এই সুফি দার্শনিক ও কবির আসল নাম ছিলো সৈয়দ মুহাম্মদ উসমান মারওয়ান্দি। তিনি মারওয়েন্দের দরবেশ সৈয়দ ইব্রাহিম কবিরউদ্দিনের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষ বাগদাদ থেকে চলে আসেন। মারওয়েন্দে স্থায়ী হওয়ার আগে তারা মাশহাদে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

লাল শাহবাজ কালান্দর মাজার

বেশ প্রাসঙ্গিকভাবে, সম্ভবত ‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’ – গানটির কারণেই আজ স্মরণে এলেন প্রখ্যাত কাওয়ালি শিল্পী আমজাদ সাবরি। গত বছরের (২০১৬ খ্রি.) জুনে পাকিস্তানের করাচির লিয়াকতবাদ এলাকায় গুলি করে হত্যা হয়। পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে কাওয়ালি অর্থাৎ সুফি ঘরানার ভক্তি সঙ্গীতের জগতে শীর্ষ একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন আমজাদ সাবরি। তার প্রয়াত বাবা গুলাম ফরিদ সাবরি সাবরি ব্রাদার্স নামে কাওয়াল সঙ্গীত দলের প্রধান গায়ক ছিলেন। সত্তর দশক থেকে সাবরি ব্রাদার্স উপমহাদেশের সুফি সঙ্গীতের জগতে ঝড় তুলেছিলো। শুধু তারাই নন – নূরজাহান, নুসরাত ফতেহ আলী খান, ওয়ার্দি ব্রাদার্স মতো উপমহাদেশের আরো অনেক প্রখ্যাত শিল্পী ‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’ গেয়েছিলেন। আবিদা পারভিন, রুনা লায়লারা গানটি এখনো গেয়ে থাকেন।

অনেক পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, বাংলাদেশে ইসলামের নামে চলমান ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের নায়কদের টার্গেটে শুধু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী লেখক, প্রকাশক, ব্লগার, সংখ্যালঘু বা বিদেশীরা নন, সুফিভাবের অনুসারীরাও আছেন ।

লালনের মাজারে ভক্তকূল

২০১৬ সালের মে মাসেই কুষ্টিয়ায় বাউল সাধক লালনের ভক্ত, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক মীর সানাউর রহমানকে কুপিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে আইএস। একই সময়ে রাজশাহীর তানোর উপজেলার সুফি সাধক, মুদি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে হত্যা করা হয়। তার আগের মাসে, মানে এপ্রিলে একই কায়দায় খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মুক্তমনা অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম। চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিতি ছিলো তার। আরো আগে ২০১৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশ্য সড়কে খুন হয়েছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফিউল ইসলাম , যিনিও লালন ভক্ত ছিলেন।

এর আগে ২০১৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় মধ্য বাড্ডার নিজ বাসায় সুফিবাদী পীর, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খিজির খানকে জবাই করে হত্যা করা হয়। একই মাসে আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি চলার সময় পুরনো ঢাকা হোসেনী দালান চত্বরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় একজন নিহত হন। তার আগের মাসে চট্টগ্রাম নগরের আকবর টিলা এলাকায় ‘ল্যাংটা ফকিরের মাজারে’ রহমতউল্লাহ ওরফে ল্যাংটা ফকির ও তার খাদেম আবদুল কাদেরকে জবাই করা হয়। আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৪ সালের আগস্টে ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নুরুল ইসলাম ফারুকীকে জবাই করে দুর্বৃত্তরা। তার আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ইমাম মাহদির প্রধান সেনাপতি দাবিদার লুৎফর রহমান ফারুক, তাঁর বড় ছেলে ও চার অনুসারীকে গোপীবাগের বাসায় ঢুকে জবাই করে দুর্বৃত্তরা।

এসব দেখেশুনেও কেন যে সুদিনের আশায় থাকি! ঠিক বুঝি না কি করে ভাবি একদিন এই দুনিয়ায় আর কোনো মতাদর্শিক হত্যাকাণ্ড ঘটবে না। বোধকরি – সেদিন এ ধরায় কোনো মানুষই থাকবে না।

লেখক: সাংবাদিক, চিত্রগ্রাহক ও প্রকাশক


সর্বশেষ

আরও খবর

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সংবিধান এবং আশাজাগানিয়া মুরাদ হাসান

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সংবিধান এবং আশাজাগানিয়া মুরাদ হাসান


গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার

গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার


মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন


নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!


তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!

তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!


সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?